আমার মা আমাকে অনিচ্ছায় জন্ম দিয়েছিলেন। জন্মের পর থেকে একটু একটু করে আমার অস্তিত্বের মৃত্যু হয়েছে। শখের,ইচ্ছার মৃত্যু হয়েছে। আমাকে কখনোই বেঁচে উড়তে দেয়নি আমার মা। কিন্তু রক্ত-মাংসে আমি বেঁচে আছি আজও। নিভো নিভো প্রাণে জীবনের হিসাব কষতে বসেছি।
আমার জীবন টা মায়ের কাছে বিরক্তিকর আর অপ্রয়োজনীয় ছিলো। অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান হয়ে; মায়ের কোলে বেড়ে উঠার যন্ত্রণা পৃথিবীর আর কোনো মানব সন্তান ভোগ করেছে কিনা আমার জানা নাই।
বলছি আমার গর্ভধারিণী মায়ের কথা। তিনি আমাকে দশ মাস দশ দিন গর্ভে রাখেন নি। রেখেছিলেন সাত মাস তেরো দিন।
আমি যখন ভ্রূণ হয়ে মায়ের গর্ভাশয়ে আসি,মা তখনও বুঝতে পারেন নি। যখন বুঝলেন তখন বয়স তিন মাস। মা পাগলের মতো ছুটলেন, এই সন্তান তিনি পৃথিবীতে আসতে দিবেন না কোনো ভাবেই। মা তখনও নিশ্চিত ছিলেন না বাবার সংসার টা করবেন কি-না। আমার বাবা জালাল জাবেদ। বড় অকর্মা, বাউণ্ডুলে স্বভাবের লোক। বড় বংশ,বড় ঘর,বড় ব্যবসা আর বাড়ির বড় ছেলে দেখে বিয়ে দিয়েছিলেন নানা ভাই। সব বড় হলেও বাবার স্বভাব যে কতখানি ছোট রয়ে গেছে, সেই খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি তিনি। বিপত্তিটা ঘটলো বিয়ের পর। আমার মা চওড়া মেজাজের মানুষ। প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস, জেদ,রাগ আর অহংকারের নিপুণ মিশ্রণের এক নারীস্বত্তা। সেই নারী বিয়ের পর দেখলেন-তার স্বামী কোনো কাজ করে না, গুছিয়ে কথা বলতে জানে না,ব্যক্তিত্ববোধ নেই, দায়িত্বজ্ঞানহীন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো-বাড়ির বড় ছেলে হলেও জালাল জাবেদের কোনো কথাই বাড়িতে খাটেনা। এমনকি বাড়ির চাকর-বাকরদের কাছেও তার কথার কদর নেই। কথা অবশ্য বলেও না জালাল জাবেদ । বাড়ির কোনো ব্যাপারে তিনি থাকেন না। খাবার সময় হলে,খেতে আসেন। টাকার দরকার পড়লে, টাকা চেয়ে নেন। বাকি সময় বাইরে ই কাটান। দোকানে আড্ডা দেওয়া, খেরাম খেলা,পাড়ার নানান সংগঠন পরিচালনা.. এসব মুখ্য কাজে তিনি ব্যস্ত থাকেন। বাড়িতে নতুন-সুন্দরী বউ আনা হয়েছে। এলাকায় জাবেদের স্ত্রী'র রূপের,গুণের প্রশংসা নিয়ে বিয়ের পর টানা সাত-আট দিন আলোচনা চলল। কেউ কেউ একাধিক বার বউ দেখতে যায়। কেউ কেউ সারাদিন কাটিয়ে আসে। কিন্তু টনক নড়ে না জালালের। সে তার মতো ই থাকল। জালালের বাবা শিকদার সাহেব বড় হতাশ হলেন। তিনি ভেবেছিলেন সুন্দরী আর বিচক্ষণ বউ পেলে জালালের স্বভাবে পরিবর্তন আসবে। ঘরমুখো হবে। কাজে-কর্মে জড়াবে।দায়িত্ববোধ আসবে। কিন্তু জালালের মাঝে সেই
পরিবর্তনের ছিটেফোঁটাও দেখা গেলোনা।
শিকদার বাড়ির ছেলের নাম 'জালাল শিকদার' না-হয়ে, 'জালাল জাবেদ' কেন হলো ভাবছেন? শিকদার নামটা বাবার পছন্দ না। কোনো কারণে তিনি শিকদারদের পূর্বপুরুষের স্বভাব পছন্দ করতেন না। তাই বড় হয়ে নিজের নাম নিজে ঠিক করলেন জালাল জাবেদ। একবার এক বন্ধু বিয়ের দাওয়াত করতে এসেছিলেন। কার্ডে নাম লিখেছিলেন জালাল শিকদার। রাগে-দুঃখে তিনি সেই কার্ড তো ছিঁড়লেন-ই। সেই বন্ধুর সাথে সারাজীবনে আর কথা বলেন নি। এই ঘটনা আমাকে বাবা বলেছেন। বাবাকে আমি কখনো রেগে যেতে দেখিনি। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাবা তোমার কখনো রাগ হয় না? বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, " না-রে মা। এই জগৎ সংসার এতোটাই তুচ্ছ যে, রাগ দেখানোর মতো কিছু ই নাই। আর রাগ মানুষ কে হারিয়ে দেয়। আমি তো হারতে চাই না মা জীবনে। রাগ একবার করেছিলাম বুঝলি,বন্ধু সজীব তার বিয়ের কার্ডে আমার নাম শিকদার লিখেছিল তাই। "
বাবার কথায় আমি অবাক হয় না। তাঁর স্বভাব আমার জানা। কিন্তু একটা কথা সেদিন মনে এসেছিল, বাবা বললেন তিনি জীবনে হারতে চান না। কিন্তু তিনি কি জীবনে জিতেছেন কখনো !
আমার নব-বধূ মা বাবার জন্য অপেক্ষা করতেন। গভীর রাত পর্যন্ত। কিন্তু বাবা ফিরতেন নিজের মর্জি মত। বউয়ের প্রতি বিশেষ যত্ন-ভালোবাসা তিনি দেখাননি। মায়ের আত্মসম্মানে লাগলো স্বাভাবিকভাবেই। বাবার প্রতি তিনি রুক্ষ হয়ে উঠলেন ধীরে ধীরে।
এমন দিনাতিপাতের এক সময় মা জানতে পারলেন, পেটে সন্তান এসেছে। মা বোধহয় সেদিন সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু দাদার বাড়িতে চলছিল খুশির পূর্ণ উৎসব। শিকদার বাড়ির ছেলের ঘরে প্রথম সন্তান আসতে চলেছে বলে কথা! আমার বাবাও খুশি হয়েছিল। বাবা হওয়ার আনন্দ জালাল জাবেদের মতো সংসারধর্মহীন মানুষকেও স্পর্শ করলো। কিন্তু স্পর্শ করতে পারলো না গর্ভধারিণী মা'কে।
মা সন্তান নষ্ট করার ওষুধ আনালেন গোপনে। সেকাল কিংবা একাল। টাকা দিয়ে সব গোপন কাজ সারা যায়। ওষুধ খেলেন টানা দুই মাস। পেটে,কোমরে হালকা ব্যথা। গোলাপি রক্তের দাগ প্রতিদিন দেখলেন একটু একটু। মা নিশ্চিত ছিলেন এ-ই সন্তান টিকবে না। ওদিকে বাড়িতে চলছিল মায়ের যত্নে বিশাল আয়োজন। প্রয়োজনীয় খাবার,ওষুধ, ভেষজ ঘরোয়া ট্রিটমেন্ট.. নিয়ম করে চলছিল। মা মনে মনে হাসতেন আর সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতেন।
একদিন পেটে আমার নড়াচড়া অনুভব করলেন মা।
তখন মায়ের অনুভূতি কেমন ছিলো জানি না। এ-ই অনুভূতির কথা মা কাওকে জানায়নি। তবে তিনি যেমন অবাক হয়েছিলেন, তেমনি অস্থির হয়ে উঠেছিলেন পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। পাঁচ-ছয় মাস চলছিল তখন। ঠিক কি করা যায় মায়ের বুঝে আসছিল না।
দিন দিন মায়ের দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকল। তিনি খাওয়া-বিশ্রাম-ঘুৃম সব ছেড়ে দিলেন। নিজেকে কষ্ট দেওয়ার সব রকম পদ্ধতি তিনি প্রয়োগ করলেন। মানসিক অস্থিরতা, জীবন যাত্রার অতিরিক্ত অনিয়ম সবকিছুর ফলাফল স্বরূপ একদিন প্রচন্ড পেট ব্যথা ও রক্তপাত শুরু হয়।
তারপর নিকটস্থ সরকারি ক্লিনিকে সাত মাস তেরো দিনের এক অকাল প্রাণের জন্ম নেয়।
অতি ছোট আর দুর্বল একটা দেহ। অপরিণত ফুসফুস, অপরিণত চোখ আর মুখের উপর ক্ষুদ্র দাগের মত নাকের দুটি ছিদ্র। প্রথম দিকে সবাই মনে করে মৃত। কিন্তু সবাইকে অবাক করে নবজাতকের ক্ষীণ স্পন্দন দেখা গেল।
মা প্রসবের পরপর জ্ঞান হারিয়েছিলেন। নিথর আমাকে এক পলক দেখেই জ্ঞান হারান। জানি না তিনি কি ভাবছিলেন। বহুবার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়েছে, মা আমাকে প্রথম দেখে তোমার কি মাতৃত্ব জাগেনি একটুও?
তারপরের ঘটনা খুব সাধারণ। শহরের সবচেয়ে ভালো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।
হাসপাতালের গভীর পর্যবেক্ষণ, উষ্ণ তাপমাত্রা, সব রকম সাপোর্ট.. একটা প্রাণ বাঁচানোর পেছনে ছুটল। ডাক্তার-নার্সের সাথে ছুটলেন পুরো শিকদার বাড়ি। ছুটলেন বাবাও।
বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও আশা আর চেষ্টা ছিলো পুরোপুরি। আমার বাবা জালাল জাবেদ সারাদিন ঐ কাঁচের ঘরের সামনে বসে থাকতেন। নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়েছেন টানা সাত দিন।
বাবা আমাকে এভাবে বলতেন, " মাঝে মাঝে পাতলা পাতার মতো সামান্য চোখের পাতা খুলতো তোর।
আর ঐ চোখের পাতার সাথে আমার বুকটা ফোলে উঠত। আমি গভীর সমুদ্রের মাঝখানে ডুবতে ডুবতে নিজের বেঁচে উঠা অনুভব করতাম।"
বাবার চোখে তখন আনন্দ অশ্রু টলটল করত,আমি অনুভব করতাম নিজের বেঁচে উঠা।
শ্বাস সহায়তা, নল দিয়ে দুধ,পরিচর্যা আর সবার প্রার্থনায় ধীরে ধীরে আমি পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হলাম। ততদিনে মাও সুস্থ। আমাকে মায়ের কোলে তোলে দেওয়া হল। মায়ের চোখের দৃষ্টি, মুখের ভাব আর মনের অবস্থা সেদিন কেমন ছিল আমি জানি না। কোনো দিন জানতেও চাই না।
এই হলো আমার অভিশপ্ত আর অনাকাঙ্ক্ষিত জন্ম। আমি শিকদার বাড়ির কাঙ্ক্ষিত সন্তান ছিলাম বটে। বাবারও প্রত্যাশার। কিন্তু মায়ের? পুরা দুনিয়া আমাকে না চাইলেও আমার দুঃখ লাগতো না। শুধু যদি মায়ের চাওয়ার হতে পারতাম। আমার মায়ের অন্য দুই সন্তানের মতো হয়ে জন্ম নিতে ইচ্ছে করে।
মা সংসার টা করেছিলেন। শিকদার বাড়ির সংসারে থেকে নয়,আলাদা বাড়ি করে। বাবা শুধু মা'কে আমার মা হয়ে থাকার অনুরোধ করেছিল। বিনিময়ে মা ঘর ছাড়ার শর্ত দিল। বাবা শর্তে রাজি হয়ে, মায়ের সঙ্গে চলে আসে নানার বাড়ি। সেখানে মা নিজের মনের মতো করে বাড়ি করেন,সংসার সাজান। মায়ের কর্তৃত্বের সংসার। যে-ই সংসারে বাবার কোনো অধিকার ছিল না। এখনো নেই।
বাবারও তাতে বিশেষ আপত্তি নেই। তিনি বরাবরই সাংসারিক টাইপ না। সুতরাং সংসারের দায়িত্বে নিজের অনুপস্থিতি তিনি বিশেষ খেয়াল করেননি। তিনি নিজের জগত আর আমাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।
আমার বয়স যখন পাঁচ বছর আমার ভাই শোয়াইবের জন্ম হয়। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, কি সুন্দর ফুটফুটে একটা শিশু। মা শোয়াইবকে দেখেই প্রাণোচ্ছল হাসলেন। বুকে টেনে নিলেন।
সেদিন প্রথমবার আমার সামনে মা'কে হাসতে দেখলাম। সেদিনটা ছিল আমার ঐ বয়সের প্রথম সুন্দর মুহূর্ত।
শোয়াইবের জন্মের ঠিক দুই বছর পর আমার বোন পৃথিবীতে এলো। ঝাঁকড়া কুঁকড়ানো চুল,মার্বেলের মতো দুটি চোখ, লাল আভা ছড়ানো মুখ। কানের দুই পাশে কেশের গোল কুণ্ডলী। কি যে আদুরে একটা বাচ্চা। আমি ছুটে ধরতে গেলাম। মা আমাকে হাত দিয়ে বাঁধা দিলেন।
সাত-আট বছর বয়সের আমি সেদিন অনেক বড় ক্যালকুলেশন করেছিলাম জীবনের।
বুঝেছিলাম অনেক কিছু। দেখেছিলাম পেছনের জীবন আর সামনের জীবনের চিত্ররেখা। চুপচাপ সরে এসেছিলাম। আমার মনটা এতটুকুন হয়ে ছিলো।
আমার কান্না আসেনি। বুক টা ভারি হয়েছিল। যে-ই ভার আমি আজও বয়ে চলেছি।
সেদিনের পর আমি আর বোন কে স্পর্শ করিনি। মায়ের আত্মসম্মানের স্বভাব টা আমার মধ্যেও ছিলো। না ভুল বললাম,স্পর্শ-আদর সব করেছি। কিন্তু মায়ের আড়ালে। মা বোনের নাম রাখল পুতুল। দেখতেও পুতুলের মত সুন্দর। পুতুলের জন্মের পর মা আমার প্রতি আরো উদাসীন হয়ে গেলো। কারণ জানি না; ছোট সন্তানের দায়িত্ব, ব্যস্ততা না-কি আমার প্রতি অনীহা। শুধু বুঝলাম আমার আর মায়ের দূরত্ব বিস্তৃত হল আগের চেয়ে বেশি । আমি নিজে নিজে গোসল করা শিখলাম,চুল বাঁধতে শিখলাম, বিছানা গুছাতে শিখলাম,কাপড় ধোওয়া শিখলাম..। যা পারতাম না বাবা করে দিতেন।
বাবার কাছেই পড়তাম।
আল্লাহ আমাকে অনন্য প্রতিভা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। প্রতিবার ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করেছি। কোনো গান একবার মনোযোগ দিয়ে শুনলে,আমি সুর মেলাতে পারি। গান,গজল,কবিতা আবৃত্তি, নাচ..সবকিছু তে আমার বিচরণ আর দক্ষতার প্রকাশ হতে থাকলো ধীরে ধীরে। বাবা অবাক,শিক্ষক রা বাহবা দেন,প্রতিবেশী রা নিজের সন্তানদের আমাকে দেখে উৎসাহিত করেন। কিন্তু মা নীরব। স্থির পাহাড়ের পাশ দিয়ে নীরবে বয়ে চলা নদীর মত; মা আমার জীবনের পাশ দিয়ে, কাছের মানুষ হয়ে নীরবে এড়িয়ে গেলো। কূল, তীর ঘেষে গেলেন কিন্তু স্পর্শ করলেন না।
মা পুতুল, শোয়াইব আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আমি আর বাবা উনার জীবনের ঐচ্ছিক বিষয়।
আমার প্রতি মায়ের যত্ন-ভালোবাসা বাড়িয়ে না দিলেও,একটা বিষয় দিয়েছিন আমার হাতে তুলে। সংসারের দায়িত্ব। মা একটু একটু করে আমাকে সংসারে টানলেন। ভাত রান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা,থালা-বাসন ধোঁয়া, পুতুলের গোসল..সব দায়িত্ব আমার উপর দিলেন। কি ভেবে দিয়েছিলেন জানি না। বাড়ির বড় মেয়ে হিসেবে, না- চাপ বাড়িয়ে পড়াশোনা থেকে দূরে রাখতে। মায়ের উদ্দেশ্য যা হোক, আমি সংসারের কাজে দায়িত্বশীল হয়ে উঠলাম। পুরোপুরি ভাবে জড়িয়ে পড়লাম সংসার সমুদ্রে। ডেক্সি মাজা থেকে শুরু করে সংসারের যাবতীয় কাজ ততদিনে আমার দায়িত্বে। আমি আনন্দ নিয়েই করতাম। কিন্তু তাঁর প্রভাব পড়ছিল আমার পড়াশোনায়। আমার সবকিছু তে..। বাবা বুঝেছিলেন, বাঁধাও দিলেন। কিন্তু বাবার কথা এই সংসারে কবে আর শোনা হয়েছে!
বাবা আমাকে আদর করে ডাকে স্বর্ণলতা। বাবার খুব মন খারাপ হল তার স্বর্ণলতার এসএসসির রেজাল্ট দেখে। স্কুল ফার্স্ট মেয়ের রেজাল্ট কিনা ২.৫৬!
বাবা আমাকে উনার সঙ্গে দাদার বাড়ি চলে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। ওখানকার কলেজে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু আমি মায়ের কথা ভেবে, মেহের আর শোয়াইবের কথা ভেবে বাবাকে না করে দিলাম।
আমি মূলত মা'কে কষ্ট দিতে চাই নি। আমি সবসময় মা'কে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছি। কিন্তু আগাগোড়া তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন আমার প্রতি।
বাবা হতাশ হলেন। বললেন, " স্বর্ণলতা,আমি এ-ই বাড়িতে তোর জন্য পড়ে আছি। তুই নিজেকে একটু একটু করে হত্যা করছিস স্বর্ণলতা। নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের জীবন সবকিছু.. । একদিন ঠিক বুঝবি।"
আমি স্মিত হেসে বাবার কথাকে অগ্রাহ্য করে, চুলায় ভাত ছড়াতে চলে যায়।
আমার আসল নাম মেহেরুন। পুতুলের প্রথম বুলি ছিলো 'মেহের'। কি সুন্দর আদো আদো বুলিতে মেয়েটা আমাকে ' মেহের ' বলে ডেকেছিল। আমি আমার অস্তিত্বে ভালোবাসার পূর্ণাঙ্গ সতেজতা অনুভব করেছিলাম।
পুতুল আমাকে মেহের আপু ডাকে। মেয়েটা আমার সবচেয়ে অপছন্দের হওয়ার কথা ছিলো। জীবনে আমি যা পাইনি, মা আমাকে যা দেয়নি সব ওকে দিয়েছে। সব..
স্বাভাবিক চিন্তায় আমার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্ধী পুতুল। কিন্তু আমি পুতুলের সেই প্রথম ' মেহের ' ডাকার আনন্দ এখনো ভুলতে পারিনা।
সেই অনুভূতি আমার মনে এখনো জীবন্ত।
আমার পড়াশোনা ঐ এসএসসি পর্যন্ত ই। তারপর মা আর কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন নি। আমি মা'কে অনুরোধ করতাম কিন্তু করিনি। কারণ এক রাতে মা আর বাবার কথোপকথন শুনেছিলাম।
বাবা বলছিল, " মেয়েটা কে ভর্তি করিয়ে দাও জয়নাব। আমার স্বর্ণলতা পড়াশোনায় খুব ভালো। অত্যন্ত প্রতিভাবান একটা মেয়ে। ওর ভবিষ্যৎ টা নষ্ট করিও না জয়নাব। তোমার কাছে এক জীবনে আমার শুধু এ-ই একটাই অনুরোধ। "
মা চওড়া গলায় উত্তর দিয়েছিল, " অকর্মণ্য লোকের কাছে অকর্মণ্য কথা। পড়াশোনা করে কি হবে তোমার মেয়ের? তোমার মেয়েরে কি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার জামাই দিবা? ওর যে-ই রূপ দুনিয়ার সব পাশ দিলেও ভালো ঘরে বিয়ে হবে না। তখন উল্টো পাত্র পেতে কষ্ট হবে। তারচেয়ে পড়াশোনা না করলেই ভালো। সাংসারিক কাজ-কর্মে দক্ষ হবে। তারপর ভালো ঘর দেখে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কারো সাথে বিয়ে দেওয়া যাবে।"
"জয়নাব!"-মায়ের সাথে বোধহয় বাবার প্রথম রাগান্বিত কণ্ঠস্বর ছিলো এটা।
বাবার সেই রাগী,উঁচু কন্ঠস্বরের চেয়ে দ্বিগুণ জোরে মা বলেছিল, " একদম চুপ। পড়াশোনা তুমিও তো করেছো। কি করছো বলতো? এ-ই বিষয়ে আর একটা কথাও শুনতে চাই না। বেশি দরদ থাকলে মেয়েকে নিয়ে তোমার বাবার বাড়ি চলে যাও।"
সেদিন ই আমার সব ইচ্ছার খবর দিয়েছি আমি। আমি সত্যি ই অসুন্দর। মা ভুল কিছু বলেন নি। কালো, কুৎসিত চেহারা আমার। জন্মের সময়ের একটা প্রতিবন্ধকতা আমার রয়ে গেছে। চোখ।
আমার চোখ ডান পাশের টা বড়,বাম পাশের টা ছোট। আর অন্ধকারে বাম পাশের চোখ দিয়ে কিছু ই দেখতে পাইনা। ডাক্তার অনেক দেখিয়েছে। এ-ই সমস্যার সমাধান চিকিৎসা বিজ্ঞানে নাই। এ-ই সমস্যা মায়ের গর্ভ থেকে নিয়ে আসা। যার জন্ম টাই অপ্রত্যাশিত, তার এমন দুই একটা সমস্যা নিয়ে পৃথিবীতে আসা দোষের কিছু না। আস্ত একটা দূর্বিষহ জীবন নিয়ে বেঁচে আছি,, সেটাই তো অনেক।
সেদিন বাবা-মা র ঘর নীরব হওয়ার পর, আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। চমকে দুই পা পেছনে সরে যায়। নিজেকে এতো টা কুৎসিত আগে কখনো ই মনে হয়নি। আমার ছোট চোখ টা'র ঘন পাপড়ি গুলো আমার খুব প্রিয় ছিল। ভ্রু টা কিছু টা ধনুকের মতো বাঁকানো। ভ্রু আর চোখ কোণার দিকে কাছাকাছি স্পর্শে। মাঝে মাঝে কাজল পড়ে, টিপ দিয়ে নিজের চোখ গুলো দেখতাম। আনমনে মিষ্টি সুরে গান ধরতাম। কতকটা প্রজাপতি উড়তো মন-আকাশে।
ঘন-কালো চুলে দুই বেণী করে, ঠোঁটে হালকা কালারের লিপস্টিক দিয়ে গান গাইতে গাইতে নিজেকে দেখতাম। নিজের শ্যামলা বর্ণের নিঁখুত চেহারার প্রেমে পড়তাম। কিন্তু আজ নিজেকে এতো কুৎসিত লাগছে!
মায়ের চোখে অসুন্দর হলে বোধহয়, জগতের সবকিছু তাঁর সৌন্দর্য হারায়।
একটা কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ।। একদিন আমি সেজেগুজে, গুণগুণ করে সুর তোলে আয়নায় নিজেকে দেখছিলাম। জানালার খুব কাছে,সকালের নরম আলোর ঝিলিকে নিজেকে এতো সুন্দর লাগছিল! পাশের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল পাশের বাড়ির এক আপু। বললেন, " এভাবে দেখলে আয়না রাগ করবে,চোখ সোজা করে দেখ, আয়না ভয় পাবে ।"
সেদিন আমি নিছক মজা ভেবে নিয়েছিলাম কথাটা। কিন্তু আজ আমার ভাবনায় লজ্জা এনে দিলো সেকথা।
তবে..তবে,লিটন যে আমার চোখ নিয়ে কতগুলো লাইন লিখেছিল সেগুলো কি মিথ্যা ছিলো?
"তোমার চোখ দুটি যেন নিরব নদী,
অতল গভীর সেই চোখের মায়ায়
ডুবতে চাই নিরবধি।
তোমার কালো চোখের মায়ায়,
হারায় আমার মন..
ফেরার পথ হারিয়ে, আছি ঘোরে
কবিতার পাতায় তোমার আঁখিদুটি ফুল হয়ে ঝরে।"
লিটনের দেওয়া এই কবিতা টা আমি অজস্র বার পড়েছি। সযত্নে রেখেছিলাম। হঠাৎ মনে হল এই কবিতার প্রতিটি শব্দ আমার দিকে চেয়ে বিদ্রুপমাখা হাসি দিচ্ছে । প্রতিটি লাইন মিথ্যা। এ আমার প্রতি ভালোবাসা বা প্রশংসা কোনো টাই নয়, এ শুধু আমাকে মজা করে লেখা কিছু লাইন। আর আমি বোকার মতো তা যত্নে তুলে রেখেছি!
নিজের প্রতি প্রচন্ড রাগ হল। কবিতাটা ছিঁড়ে অসংখ্য অসংখ্য টুকরো করে ফেলে দিই।
সঙ্গে ফেলে দিই আমার জীবনের প্রথম ভালো লাগা। আমার প্রথম অনুভূতি।
মায়ের চোখ কখনো আমার দিকে চেয়ে হাসেনি। মা আমার সাথে কখনো চোখ স্থির করে কথা বলেননি। মা যখন তাকাতেন, তখন মুখে কথা থাকতো না। শূন্য আর অমনোযোগী দৃষ্টি থাকতো। আমি খুব করে খেয়াল করতাম, মায়ের চোখ আমার মুখে কি খোঁজে। মায়া,মমতা,দরদ..এমন কিছু একটা। কিন্তু প্রতিবার আমি দেখতাম অনীহা আর বিতৃষ্ণা।
প্রতিবছর যখন ঈদের জামা কেনা হতো।
জুতা,জামা সবকিছুর ব্যাগ আলাদা থাকতো। পুতুলের জন্য দামি আর আমার জন্য সস্তা। এটা একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাড়িতে।
প্রতি বার এমন.. । একবার পুতুলের দামী একটা জামা দেখে, মা'কে বায়না করে বলেছিলাম -মা আমাকেও এমন একটা জামা কিনে দাও না।
মা আমাকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, তোকে কি এই জামায় মানাবে? এই জামা পড়ার জন্য সুন্দর ত্বক দরকার। তোকে দেখলে সেই ফকিন্নি মার্কায় লাগবে।
সেদিন মায়ের প্রতি আমার রাগ হয়নি,কষ্ট হয়নি। কিন্তু নিজের এমন জামা পড়ার শখ হওয়া কে ধিক্কার দিয়েছিলাম। এভাবে একটু একটু করে নিজের ইচ্ছে কে গলা টিপে হত্যা করছিলাম।
মা কোনো আত্মীয়ের বাড়ি গেলে সঙ্গে পুতুল কে নিতেন। কোনো প্রোগ্রাম বা আয়োজনে গেলেও পুতুল কে সঙ্গে নিতেন। দামী ড্রেস,জুতা, ব্যাগ আর সুন্দর সাজে পুতুল কে আরো অপূর্ব লাগত। মা বার বার হাসি মুখে পুতুলের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতো।
আমার তখন পুতুল হয়ে জন্ম নেওয়ার আপসোস হতো।
বাবা একদিন শহর থেকে দুই বোনের জন্য দুটি ভালো জামা নিয়ে আসেন। একই ডিজাইন শুধু কালার ভিন্ন। আমার যে কি খুশি লাগছিল! মা হঠাৎ জামাটি পুতুলের হাতে দিয়ে বললেন, "মেহেরুন কোথাও বের হয় না। এই জামা সে কোথায় পড়বে? এটাও বরং পুতুল নিক। ও এখানে ওখানে যায়, কলেজে যায়.. পড়া হয়ে যাবে। মেহেরুন তো অযথা ফেলে রাখবে। "
বাবা কিছু বলার আগেই আমি বলে উঠি, " হ্যাঁ, বাবা। মা একদম ঠিক বলেছে। আমার তো কোথাও যাওয়া হয়নি। তুমি বরং আমার জন্য কয়েকটা সুতির জামা নিয়ে আসিও। "
তারপর চুপচাপ নিজের রুমে চলে আসি। আমার আমি কে ঘৃণা করতে করতে..।
আমাকে দেখে মায়ের মুখে যতটা বেজার ভাব আসতো, পুতুল কে দেখলে ঠিক ততটাই আনন্দের ঝিলিক দেখা যেত। আমার প্রতি মায়ের অবহেলা,অনাদর এসব আগে ততটা আঘাত করতো না আমায়। কিন্তু যখন পুতুলও বড় হল,, সবকিছু আরো বেশি স্পষ্ট হতে থাকল।
পুতুুল আমার চেয়ে লম্বা, সুন্দর। কলেজে পড়াশোনা করে। মায়ের গৌরবের শেষ নেই পুতুলকে নিয়ে। মা পুতুল কে সব জায়গায় প্রেজেন্ট করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। আর আমাকে লুকিয়ে রাখতে।
আমাকে সবসময় এমন ভাবে ঢেকে রাখার চেষ্টা করতেন, যেন আমি পঁচা-নোংরা জিনিস। খুললেই দূর্ঘন্ধ ছড়াবে।
পরিণত বয়সের আমি বুঝতে পারছিলাম আমার অবস্থান। আমার অস্তিত্বের মৃত্যু আমার চোখের সামনে হচ্ছিল একটু একটু করে।
মা আমাকে নিয়ে ভাবতে না চাইলেও, ভাবতে বাধ্য হলেন একপর্যায়ে । পুতুলের বিয়ের জন্য প্রস্তাব আসা শুরু হয়েছে । আমাকে বিয়ে না দিয়ে তো পুতুল কে বিয়ে দিতে পারেন না। এদিকে আমার বিয়ের বয়সও পার হয়ে যাচ্ছে। এবারে, মা আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগে গেলেন। কুমোর বেঁধে নামা যাকে বলে।
পাত্র ঠিক করলেন মায়ের পছন্দে।
পাত্র দিনমজুর। দারিদ্র সংসার।
মোটা অংকের যৌতুকে বিয়ে ঠিকঠাক। লিটনের কথা একবার মনে উঁকি দিয়েছিল,কিন্তু মা যদি রাগ করেন! এই এক ভয়ে.. বাদ দিলাম সেসব মাথা থেকে। বিয়ের কথা শুনে লিটন চেষ্টা করেছিল যোগাযোগ করার। আমি ধরা দিই নাই কোনো ভাবে। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলাম,মায়ের পছন্দে বিয়ে করবো। আরো একবার নিজেরে হত্যা করলাম; আমি কিংবা মা। খুন আমি ঠিকই হয়েছিলাম বিয়ের দিন রাতে।
নেশাগ্রস্থ হয়ে আমার উপর হামলে পড়েছিল স্বামী নামক মানুষ টা। বিয়ের প্রথম রাতের, প্রথম প্রহরে..স্বচ্ছ জলের সাথে ধুয়েছিলাম অসংখ্য রক্ত। আমার খুন হওয়া তরতাজা রক্ত। গলগল করে বমি করেছিলাম। প্রাণ টা বাইরে বের করে আনার ইচ্ছা হচ্ছিল।
তারপরের ঘটনা আমাদের সমাজের অসংখ্য বাস্তব চিত্রের মতো। স্বামীর মন-মর্জি মতো চলা,রাতের খোরাক হওয়া আর সারাদিন সংসার ধর্ম পালন।
এ হলো আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চিরাচরিত ভূষণ।
তবে মা বিয়ের পর আমার প্রতি টান অনুভব করেছিলেন। মাতৃত্বের মায়া জন্মেছিল হয়তো..।
অথবা এতোদিন সংসার সামলানো, চোখের সামনে থাকা মেয়েটার অভাব অনুভব করেছিলেন ক্ষানিকটা।
মা প্রায় আমার শ্বশুর বাড়ি আসতেন। সঙ্গে করে অনেক বাজার করে নিয়ে আসতেন।
ঝুপড়ি ঘরটায় বারবার চোখ বুলাতেন।
তারপর মা আমাদের একটা ঘর তুলে দিলেন, স্বামী কে নিজের টাকায় দোকান দিয়ে দিলেন।
তখনও নেশা করা,মারধর নিয়মিত ছিলো।
একদিন মা এসে আমার হাতে-মুখে আঘাতের চিহ্ন দেখলেন। আমাকে কিছু জিজ্ঞেস না করে সোজা থানায় গিয়ে, নারী নির্যাতন মামলার নোটিশ পাঠিয়েছিলেন। এতোদিনে আমার স্বামী বুঝতে পারল,আমারও পায়ের তলায় মাটি আছে। আমার প্রতি চরম অবহেলা দেখানো মা-ও আমার জন্য লড়তে পারে।
তারপর থেকে ধীরে ধীরে তার মধ্যে পরিবর্তন আসে। মা হুমকি দিয়েছিল,যদি আর নেশা করে আমাকে তো নিয়ে যাবে ই, সাথে জেলের ভাত খাওয়াবে।
মানুষ টা নেশা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল । ধীরে ধীরে সাংসারিক হয়ে উঠছিল। আমার প্রতি একটু আধটু মায়াও মাঝে মাঝে দেখছিলাম- খেয়েছি কিনা জিজ্ঞেস করা, নেশার বদলে আমার সাথে বসে বাদাম খাওয়া, লুঙ্গিতে গুঁজিয়ে ডাল ভাজা নিয়ে আসা..।
আমার তখন ডেলিভারি টাইম। হঠাৎ একদিন রক্তপাত শুরু হল। সকাল থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত টানা ভারি রক্তপাত। তারপর হাসপাতালে নেওয়া হলে..ডাক্তার জরুরী সিজার রুমে নিয়ে যান।
সবাই ততক্ষণে হাসপাতালে চলে এসেছে। অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছিল সবাই। আমাদের পুত্র সন্তান হলো। বাবা-মা, পুতুল, শোয়াইব, আমার স্বামী সবাই খুশী। মা প্রথমবার আমার কপালে হাত রাখল। সেই স্পর্শ কি যে মায়ার! বুঝতে পারার পর, শেষ কবে এ-ই স্পর্শ পেয়েছিলাম জানি না।
আমার মনে হল, আমার চেয়ে সুখী এই পৃথিবীতে আর কেউ নাই। শুনেছি, আল্লাহ তার বান্দাদের সারাজীবন কষ্টে রাখেন না। সুখ ফিরিয়ে দেন। এবার তবে আমার সুখের দিনের শুরু..।
মা আমার ছেলেকে কোলে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ছেলের কি নাম রাখবি মেহেরুন?
আমি আনন্দ অশ্রু মুছে বললাম,তুমি রাখো মা।
"আমার নাতির নাম সম্রাট। আজকে থেকে আমার ঘরে তার রাজত্ব চলবে।"- মা হাসতে হাসতে বললেন। কেবিনের সবাই হেসে উঠল সাথে সাথে।
বাবা খুশিতে আত্মহারা হয়ে আমায় জড়িয়ে ধরলেন। আমার শরীর টা ঠিক লাগছে না। তবুও কম্পিত হাতে বাবার হাতটা ধরলাম।
ডাক্তার এসে আমাকে দেখলেন। নার্সের সাথে অনেকক্ষণ কথা বললেন। আমার চোখের পাতা পর পর অনেক বার খোলে দেখলেন। তারপর চিন্তিত ভঙ্গিতে বাইরে গিয়ে বাবা-মা কে ডাকলেন।
কাঁচের জানালা দিয়ে আমি স্পষ্ট দেখছি-বাবা কাঁদছে, মা সম্রাটকে আরো শক্ত ভাবে জড়িয়ে নিচ্ছে। শোয়াইব, পুতুল একে-অপরকে জড়িয়ে কাঁদছে। সম্রাটের বাবা দেওয়াল আঁকড়ে বসে পড়েছে।
যাদের ভালোবাসা আমি সারাজীবন পেতে চেয়েছিলাম, যে-ই সুখ আমি সারাজীবন চেয়েছিলাম..তা আজ পেয়েও স্পর্শ করতে পারছি না। খুব কাছে পেয়েও আঁকড়ে ধরতে পারছি না।
কিছু জীবনের ভাগ্যে সুখ জিনিস টা বোধহয় বিধাতা কখনোই লেখেন না।
আমার সমগ্র জীবনের বিনিময়ে একটা প্রাপ্তি হল, মা আমার জন্মে অসন্তুষ্টে মুখ ফিরিয়ে নিলেও, আমার সন্তানের জন্মে বুকে আগলে নিয়েছেন।
এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
বাবা আমার দিকে চেয়ে আছেন জানালার ওপাশ থেকে। কয়েক পা সামনে আগায়ে তিনি দাঁড়িয়ে পড়েছেন। সাহস পাচ্ছেন না হয়তো আমার সামনে আসার।
বাবা আমাকে হাসপাতালের বেডে দেখেছেন দুই বার। একবার জন্মের সময়। আরেকবার দেখছেন শেষ যাত্রায়। মাঝখানে কাঁচের জানালা।
আমার চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে,দৃষ্টি ক্ষীণ।
বাবা দুই হাত বাড়িয়ে বলছে,'আমার স্বর্ণলতা, আয় মা,কাছে আয়।'
আর কিছু ভাবতে পারছি না। সম্রাট কে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে। না, থাক। সম্রাট মায়ের কাছে থাক। সম্রাট কে মা মানুষ করবে জানি। যে-ই মা আমাকে আগলে রাখেন নি,সেই মা আমার সন্তান কে আগলে রাখবে সেটা আমি বিশ্বাস করি।
সম্রাট আর আমার মধ্যে অদ্ভুত এক মিল আছে। দু'জনেই মায়ের আদর ছাড়া বড় হওয়া। কিন্তু আমি তো মা'কে পেয়েছিলাম আর সম্রাট? সে তো মায়ের বুকের দুধটুকুও পাবে না। পাবে না মায়ের স্পর্শ, দেখবে না মায়ের মুখ, মায়ের গন্ধ, মায়ের চোখ.. কিছু ই পাবে না। আমার ছেলেটা আমার চেয়েও দুঃখী হয়ে জন্ম নিল।
বাবার দেওয়া স্বর্ণলতা নামটা সার্থক হল। আমি ছিলাম সারাজীবন অনাকাঙ্ক্ষিত আগাছা। আর আমার ছেলেটাও সারাজীবন থাকবে অন্যের আশ্রিত হয়ে। কিংবা পরগাছা হয়ে।
আহ! জীবন..!
#স্বর্ণলতা
লেখক-কুলচুমা ইয়াছমিন কনা
পেইজ- মায়াবিনী -গল্পকথন