আমাকে দেখতে আসা পাত্র, আমার ছোট বোনকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। আমার জীবনের প্রথম পরাজয়টা আপন বোনের কাছে। রূপ বড় হিসাবি জিনিস। যুগ বদলায়, সভ্যতর পরিবর্তন হয় কিন্তু মানুষের মন বদলায় না। মানুষ এখনো রূপের কদর করে বড় কায়দা করে। যোগ্য পুরুষ, যোগ্য নারীতে আটঁকানোর বদলে, আঁটকায় সুন্দরী নারীতে। আমি অসুন্দর ছিলাম না। রূপ আমারও ছিলো, কিন্তু লতার মতো চোখ ধাঁধানো লাবণ্য ছিলো না। গায়ে-গতরে পালের আকর্ষণীয় বাছুরটার মতো ছিলাম না, যাকে সবার আগে হাঁটে তোলা হয়।
সময় টা ১৯২৮ সাল।
দেওয়ানপুর ইউনিয়নের সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ পরিবারগুলোর মধ্যে একটি 'মিয়া বাড়ি'। 'মিয়া বাড়ির' অন্দরমহলে শুক্রবার সকাল থেকে চলছিল হুলুস্থুল আয়োজন। বাড়ির নারীরা রান্না, ঘর গোছানো এবং কনে সাজানোর কাজে ব্যস্ত। ঐ কনে ছিলাম আমি।
দাদিমা বাড়ির বড় নাতনী হিসেবে শখ করে নাম রেখেছিলেন জুলেখা।
তেরো বছর বয়স। বুঝ হওয়ার আগে বিয়ের বয়স চলে এসেছিল। অত কিছু না বুঝেও সেদিন আমি বড় আনন্দিত ছিলাম। মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ছিলাম। চাচীর ঘরের আয়নায় নিজেকে তিনবার দেখেছিলাম। খুশির কারণ, আমার ভাগ্য।
মা-চাচীরা কাজের ফাঁকে ফাঁকে বলাবলি করছিলেন, মাইয়াডার কপাল ভালা, রূপ একটু কম হইলেও পাঁচ কপাল নিয়া জন্মায়ছে, নাহয় অমন সোনার পাত্র কি আর বিয়া করবার চায়? সেকান্দারের মতো পোলা হইবো মিয়া বাড়ির জামাই!
সেদিন আমি হাতের পাঁচ আঙ্গুল দিয়ে কপালের মাপ নিয়েছিলাম। আমার কপাল হয়েছিল তিন আঙ্গুলের একটু বেশি। মনে মনে, মা-চাচীদের বোকা ভেবে হেসেছিলাম। সাড়ে তিন আঙ্গুলের কপাল কে পাঁচ কপাল ভাবা কি বোকামি নয়?
আমি তারপরও খুশি ছিলাম, সোনার পাত্র আর ভালো কপাল এর ভরসায়।
আমার বাবা গোলাম রহামন।
মিয়া বাড়ির বড় কর্তা। আমরা দুই বোন; ছোট বোন লতা, বয়স ১১।
পিঠাপিঠি জন্ম আমাদের। আমার দুই বছরের ছোট লতা, চঞ্চলতায় পুরো ঘর মাতিয়ে রাখতো। লম্বায়, স্বাস্থ্যে,রূপে আমাকে ছাড়িয়ে গেছে।
আমার ছিলো চাপা স্বভাব। মরিচা রঙের ত্বক। লিকলিকে শরীর। চুল পিঠের মাঝামাঝি পৌঁছেছে মাত্র। সেই হিসাবে লতার চুল তখন কুমোর ছাড়িয়ে গেছে। এই নিয়ে মা-চাচিদের আফসোসের শেষ নেই। মেয়েদের সৌন্দর্য বিবেচনায় তখন লম্বা কালো চুল মুখ্য।
আমার মা বেগম বাহার প্রতিদিন আমার চুলে নারকেল তেল দিয়ে দেন। জবা ফুল,আমলকী থেঁতলে রস লাগিয়ে দেন। তবুও চুলগুলো লতার চুলের মতো হয় না। লতার ঘন কালো চুলের গোছা কুমোর ছাড়িয়ে হাঁটু পর্যন্ত পৌছেছে। সামান্য কোঁকড়ানো চুলগুলো নদীর ঢেউয়ের মতো। চুলের কালো ভাব এতটাই চওড়া যে সূর্যের আলোয় তা নীলচে রঙে চিকমিক করত।
লতার দুধবরণ রঙের গোলগাল চেহারা। স্বাস্থ্যবান শরীর, আর ভারি চুলের গোছায় দেখতে, আমার চেয়েও বয়সে বড় লাগে। অধিক রূপবতী দেখায়।
দুই বোনকে একসাথে দেখলেই, এই পার্থক্যের কথা বারে বারে মনে করিয়ে দিতো পড়শীরা।
একটা কথা বড় কঠিন লাগতো ঐটুকু বয়সেও। বলতো-"জুলেখা, তোর আগেই লতার বিয়ে হয়ে যাবে দেখিস। লতার ভালো বর হবে, ভালো ঘর হবে।"
আমি মেনেই নিয়েছিলাম লতার সবকিছু আমার চেয়ে ভালো হবে।
কিন্তু যখন শুনলাম, আমার কপাল খুলে গেছে, আমার পাঁচ কপালের গুণে, বড় ঘরের সোনার পাত্র আমাকে বউ করে নিতে চাই, তখন আমার চিন্তা বদলালো। নতুন করে নিজেকে ভালো লাগলো। ভালো লাগলো পুঁটি মাছের চচ্চড়ি, পৌষের হিমঝরা সকাল, লতার রূপ, পুঁথি পাঠ.. সবকিছুই বড় ভালো লাগতে শুরু করলো। কাবাড়ি খেলায় দম বাড়লো, চুলের গোছা ইঞ্চি কয়েক বাড়লো, কোরআনের তিন পাতা শেষ হলো। মেহেদি পাতা বেঁটে, ফোঁটায় ফোঁটায় দুই হাত রাঙিয়ে নিলাম।
জুমার নামাজ শেষে পাত্রপক্ষ আসলেন।
পাত্রপক্ষের পুরুষদের বৈঠকখানায় বসতে দেওয়া হয়। আর মেয়েদের অন্দরমহলে ।
তাঁরা আমাকে হাঁটিয়ে দেখলেন, হাত-পায়ের আঙুল পরখ করলেন। চুলের গোঁছা গভীর মনোযোগে পরীক্ষা করলেন।
তারপর কঠিন পর্দা রক্ষা করে, আমাকে পাত্রের সামনে আনা হলো। পুরুষদের সামনে কনে আনার নিয়ম তখনও খুব বেশি প্রচলিত নয়। কিন্তু 'জোতদার' পাত্রকে সে কথা বলার সাহস আমার বাবা গোলাম রহমানের নেই।
গ্রামে যার কথা আইন, যিনি ব্রিটিশ সরকারের নিকটস্থ লোক, জমিদারদের বা হাত, আর গ্রামের অলিখিত রাজা। তার মুখের উপর কথা বলার সাহস কে করবে? প্রভাবশালী জোতদার সেকান্দার আলীর কাছে মেয়ে দিতে পারাটাই তখন বাবার কাছে পরম সৌভাগ্যের।
সেকান্দার তসরের সিল্কের শেরওয়ানি পরে, রুপোর নল লাগানো হুঁকো হাতে চৌকিতে বসেছেন ।
তাঁর গায়ে মাখা চন্দনের সুবাস আর আতরের ঘ্রাণ আমার নাকে এসে লাগতেই , হৃদয়ে আচমকা দুল খাওয়ার মতো অনুভূতি হলো। কক্ষের মাঝখানে পর্দার ব্যবস্থা করে আমাকে বসানো হয়েছে। পাতলা পর্দার ফাঁক দিয়ে সেকান্দারকে দেখছিলাম। সেই পুরুষালি অবয়ব,গাম্ভীর্যময় পোশাক আর সুঘ্রাণে তখন আমি জ্ঞানশূন্য প্রায়। এমন সুন্দর ঘ্রাণ জীবনে প্রথম পেয়েছিলাম সেদিন। আমার কিশোরী মনে, প্রথমবারের মতো কিছু অদ্ভুত ঘটলো। বুকে অনবরত হাতুড়িঘাত, অধরের কম্পন আর দীর্ঘশ্বাসের বাড়ন্ত গতি.. আমার মস্তিষ্ক ফাঁকা করে দিচ্ছিল।
সেকান্দার গভীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে, গোঁফে হাতের আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমাকে পরখ করছিলেন।
আমি যথাসম্ভব বিনয়ের সাথে, চোখের পাপড়ি নত অবস্থাতেই বসেছিলাম। যেমনটা শিখিয়ে দিয়েছেন মা-চাচিরা। গম্ভীর রাশভারি কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লেন সেকান্দার, কোরআন পড়তে জানো?
ভীত আমি জড়তামাখা কন্ঠে, জি সূচক উত্তর দিই। সেই উত্তরে সেকান্দার সন্তুষ্ট হলেন কিনা বুঝা গেলো না। কিন্তু সেকান্দরের পেছনে দাঁড়ানো খাস-খাদেম রহমতুল্লাহ দাঁত দিয়ে জিহ্বায় চাপ দিলেন।
সেকান্দার পুনরায় কন্ঠে পুরুষালি তেজ মিশিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'পুঁতি পাঠ পারো?'
এবারের কন্ঠস্বরে ভয়ে কেঁদে ফেলি আমি।
বিরক্ত ভঙ্গিতে সেকান্দার উঠে দাঁড়ালেন। ভারি চামড়ার তৈরি জুতার ঠকঠক শব্দকে দ্বিগুণ চাপ প্রয়োগে, খটখট শব্দে রূপ দিলেন।
নিজের রাগকে জুতার শব্দে বাজিয়ে প্রস্থান করলেন।
তাঁর পেছন পেছন বের হয়ে গেলো বিশ্বস্ত খাদেম রহমতুল্লাহ এবং সঙ্গে আসা লাঠিয়াল বাহিনী।
আমার বুকের ধুকধুকানি আরো বহুগুণে বেড়ে গেলো। আমি দৌড়ে মাটির ঘরের দোতলায় উঠে, জানালার পাশে দাঁড়ায়।
যেখান থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম জোতদার সেকান্দার আলীর হনহন করে চলে যাওয়ার দৃশ্য। উনার এমন রৌদ্র মূর্তির কারণ তখনও আমি জানি না। তবুও আমি উনাকে বিস্মিত ভালো লাগার চোখে দেখছিলাম।
প্রধান ফটক পার হতেই সেকান্দার দাঁড়িয়ে পড়লেন। দক্ষিণ পাশের পুকুর পাড় থেকে রিনরিনে হাসির শব্দ আর পানির ছলাৎ ছলাৎ ভেসে আসছিল।
নারকেল পাতার ছাওনি দিয়ে ঘেরাও করা পুকুর পাড়। উত্তুরে হাওয়ায় একটা নারকেল পাতা খসখস শব্দ করে সরে গেলো। সেই পলকে সেকান্দার দেখলেন, অপূর্ব কেশরাশি মেলে, পানিতে পা ডুবিয়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে, এক রূপবতী বালিকা কচি সুপারি ভাঙার চেষ্টা করছে। রূপালী আলোর ঝিলিকে চুলগুলো স্বর্ণলতার মতো ঝলঝল করছে।
লাঠিয়াল বাহিনীকে ইশারা করে সেদিকে এগিয়ে গেলেন জোতদার সেকেন্দার আলী।
এক মিনিটও ব্যয় না করে লম্বা কেশরী বালিকাকে নিজের কোলে তুলে হাঁটা ধরলেন।
বিস্মিত লাঠিয়াল বাহিনী পিছু পিছু এগিয়ে গেলো।
হিতাহিত জ্ঞান শূন্য আমি আচমকা একটা চিৎকার দিয়ে, বসে পড়ি। বুকের মধ্যে অসম্ভব ছুরিকাঘাতের ব্যথা হচ্ছিল। বোনের এই পরিস্থিতির ব্যথা, নাকি নিজের প্রত্যাখানের ব্যথা জানি না। আজও জানি না।
বাড়ির অন্দর মহলের মেয়েরা মুখে কাপড় গুঁজে চোখের জল ফেললেন। নীরব নদীর মতো সরে গেল শুধু আমার কিশোরী মন।
আফসোসের হায়! শব্দে ভারি হলো পরিবেশ। বাবা গোলাম রহমান রাগে,অপমানে,হিতাহিত জ্ঞান শূণ্য হয়ে বসে পড়লেন।
------------------------------
এই ঘটনার প্রভাব তেরো বছরের বালিকা জুলেখার মনে কতখানি রেখাপাত করেছিল, তা কেউ বুঝেছিল কিনা আমি জানি না। বিয়ে নামক যে স্বপ্ন পুতুল খেলার মতো আমার মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই স্বপ্নই দুঃস্বপ্ন হয়ে আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
আমার বাবার কিছুই করার ছিল না। তার সামর্থ্য ছিল না সেকান্দারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। আর গ্রামের মানুষ? তারা সবাই জানত, সেকান্দারের ক্ষমতার ছায়া কতদূর বিস্তৃত। তাই কেউ মুখ খুলল না, কেউ প্রতিবাদ করল না।
সোনার পাত্র হঠাৎ করেই আমার পরিবারের কাছে তামার পাত্র হয়ে গেলো। আর আমার পাঁচ কপাল, পুড়া কপালে পরিণত হলো।
আমার কপাল যে, পাঁচ কপাল না সেটা যদিও আমি আগেই বুঝেছিলাম।
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই লতার রূপে যেন বসন্তের ছোঁয়া লাগল। কিশোরী মুখে ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে লাগল যৌবনের আভা। সেকান্দার মুগ্ধ চোখে দেখত তার বালিকা-বধূকে। দিনের পর দিন কীভাবে ছোট্ট মেয়েটি একটু একটু করে পূর্ণ যুবতী হয়ে উঠছে।
প্রাসাদের চার দেয়ালের মধ্যে লতার পৃথিবী সীমাবদ্ধ হলেও, তার বেড়ে ওঠার পথটি সেকান্দার বন্ধ করে রাখেনি। তার জন্য গৃহশিক্ষক রাখা হলো। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষা দেওয়া হলো আচার-ব্যবহার, শিষ্টাচার, গৃহস্থালির নিয়মকানুন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লতা হয়ে উঠল মার্জিত, সংযত ও সুশীল। সেকান্দারের বিশাল প্রাসাদের মতো বাড়ির যোগ্য গৃহকর্ত্রী হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হলো লতাকে ।
তার সৌন্দর্য ছিল চোখে পড়ার মতো, লতার সেই ঢেউ খেলানো লম্বা-ঘন-কালো চুলের নেশায় মাতোয়ারা সেকান্দার। ভালোবেসে লতাকে ডাকতো 'মাধবী '। শুধু সৌন্দর্যই নয়; তার ব্যবহারে, কথাবার্তায় এবং চলনে এমন এক অদ্ভুত স্থিরতা আর গাম্ভীর্য এসে জমেছিল যে, অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাসাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তাকে সমীহ করতে শুরু করল।
প্রথম দিকে যে অন্দরমহলে সে ছিল নিঃশব্দ এক বন্দিনী, কালক্রমে সেই অন্দরমহলের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তার ইশারায় পরিচালিত হতে লাগল। বিশাল প্রাসাদের ভারী দরজাগুলো যেমন তার হাতে থাকা চাবির গোছায় খুলত, তেমনি অন্দরমহলের ছোট-বড় কতকিছুই যেন তার কথাতেই নির্ধারিত হতো।
মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই লতা হয়ে উঠল এই বিশাল সংসারের গৃহকর্ত্রী।
১৯৩০ সাল।
সেপ্টেম্বর মাসের ১০ তারিখ, আমার বিয়েটাও হল। লতার বিয়ের তিন বছরের মাথায় আমার কপালেও বর জুটল। ছেলে চাষবাস করে খায়। বাপ-দাদার ভিটা মাটি, তার ওপর দুই চাওলার ঘর। দুইটা রুগ্ন গাভী,একটা সবল বাছুর। দক্ষিণের বিলে কয়েক গন্ডা জমির উপর কলা বাগান,আঁখের ক্ষেত, আরেকটা পুকুর। আমার গরিব স্বামীর সম্বল এইটুকুই।
আমার স্বামীর নাম সুলতান আহমদ। গরিব হলেও মানুষটা খাঁটি ছিলো। সৎ, পরিশ্রমী আর নীরব স্বভাবের মানুষ। বাবা-মা কেউ বেঁচে নাই।
বিয়ের দিনই আমি একটা সংসার পেলাম। দুটা চুলা, রান্নাঘরের সরঞ্জাম, তেল চিটচিটে তিনটা বালিশ, একটা চৌকিখাট আর একটা ছেঁড়া কাঁথা। এই সংসারে প্রাচুর্য ছিল না, ছিল না স্বচ্ছলতার নিশ্চয়তা। তবুও আমি কোমরে কাপড় গুঁজে সংসার করতে নেমে গেলাম।
বাঙালী মেয়েরা এমনই। তাঁরা বাবার বাড়ির সাথে স্বামীর বাড়ি মিলাই না। তাঁরা মিলাই সংসার আর নিজের মানুষ। আমারও লতার মতো একটা সংসার হলো। একটা নিজের মানুষ হলো। তিনবেলা ডাল-ভাত রান্না করার পুরো অধিকার হলো। অপরিণত বয়সের ক্ষত ধীরে মুছতে শুরু করল..।
বছর-পাঁচেক পরের কথা।
১৯৩৬ সাল।
কয়েক সপ্তাহ ধরে আকাশ ভেঙে নামা অবিশ্রান্ত বৃষ্টিতে চারপাশ অন্ধকার হয়ে রইল। গঙ্গা আর মেঘনার বুক চিরে আসা ঘোলাটে পানি রাক্ষুসে খিদের মতো গ্রাস করতে লাগল একের পর এক গ্রাম। চোখের পলকে মাঠ-ঘাট একাকার হয়ে গেল। নদীর বাঁধ ভেঙে তীব্র স্রোতে যখন গ্রামে পানি ঢুকল, তখন ঘরের মাটির দেয়ালগুলো তাসের ঘরের মতো ধসে পড়তে লাগল।
যে মাঠ কয়েকদিন আগেও আউশ আর আমন ধানের সবুজ চাদরে ঢাকা ছিল, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর তা এক চিলতে শ্মশানে পরিণত হলো। দিগন্ত বিস্তৃত সোনালী পাটের ক্ষেত, যা ছিল দরিদ্র কৃষকের একমাত্র ভরসা, তা পচা কালো মণ্ড হয়ে পানির নিচে তলিয়ে রইল। বন্যা শুধু ফসল কাড়েনি, কেড়ে নিয়েছে বেঁচে থাকার রসদ। কৃষকের ঘরের গোলার ধান পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরে এক ছটাক চাল নেই, চুলো জ্বলার মতো শুকনো কাঠ নেই। ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না আর মায়েদের অসহায় চোখের জল প্রতিটি কুঁড়েঘরের চেনা দৃশ্য হয়ে উঠল।
সেই বন্যায় সবার মতো আমাদেরও সব গেলো। ফসল গেল, দুধ দেওয়া গাভিটা মারা গেল, গোলায় থাকা সামান্য ধানটুকুও পচে গেল। আমার ভাগ্য আবারও প্রমাণ করে দিল, আমার কপাল পাঁচ আঙুলের নয়।
ভালো থাকার ভাগ্য নিয়ে আমি জন্মাইনি। সন্তান তিনটার মুখের দিকে চাওয়া যায় না।
আমার অভাবের সংসারে এই প্রথম দুঃখের কালো মেঘ জমলো। আমার সংসারে ভালোবাসার অভাব কখনো ছিল না। স্বামীর যত্ন, সন্তানদের হাসি আর সন্ধ্যায় চুলার পাশে বসে দুজনের সাংসারিক আলাপ-এসব নিয়েই আমার জীবনে এক ধরনের ফুলের জগত বানিয়েছিলাম ।
এই চরম বিপর্যয়ের সুযোগ নিল গ্রামের জোতদার আর নিষ্ঠুর মহাজনেরা। ক্ষুধার জ্বালায় কাতর কৃষকরা বাধ্য হয়ে ছুটে গেল মহাজনের দুয়ারে। এক মুঠো চাল বা কয়েকটা টাকার বিনিময়ে বন্ধক পড়ে গেল পৈতৃক ভিটেমাটি আর চাষের বলদজোড়া। চড়া সুদের সেই ঋণের খাতা এমনভাবে লেখা হলো, যা শোধ করা এই জীবনে আর কোনোদিন দরিদ্র কৃষকের পক্ষে সম্ভব নয়।
এই পরিস্থিতিতে দিশাহীন হয়ে উঠি আমরা। চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠল আমার স্বামী জাবেদ।
সন্ধ্যার আবছা আলোয় মাটির দাওয়ায় বসে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল। স্বামীর চিন্তাগ্রস্ত অসহায় মুখের দিকে তাকানো যায়না । শান্ত গলায় বললাম, "এত চিন্তা করছ কেন? জোতদার সেকান্দার তো আমার ছোট বোন লতার স্বামী। আমি লতার কাছে যাব। আমাদের অবস্থার কথা খুলে বলব। জমি বন্ধক না দিয়ে, ওর কাছে সাহায্য চাইব। ও নিশ্চয় আমাকে ফিরিয়ে দেবেনা।
জাবেদ কিছুই বলল না। শুধু শূন্য দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাঁর নীরব চোখ দুটি মরা নদীর মতো স্থির হয়ে রইলো। বেঁচে থাকার জন্য অতি আবশ্যকীয় খাবারটুকুরও যখন নিশ্চিয়তা থাকে না,তখন একজন বাবার,একজন স্বামীর মনের অবস্থা কি হবে সেটা বোধহয় দায়িত্বশীল পুরুষরাই জানে একমাত্র। চরম আত্মমর্যদা সম্পন্ন জাবেদ, সেদিন সাহায্য চাওয়ার কথায় না করল না। বেঁচে থাকা যখন মুখ্য হয়ে ওঠে, আত্মসম্মান তখন বিলাসিতা বটে!
পরদিন সকালেই আমি লতার বাড়ির উদ্দেশে রওনা হই। অনেকটা পথ পেরিয়ে যখন সেকান্দরের প্রাসাদের সামনে এসে দাঁড়াই, তখন আমার চোখে যেন এক মুহূর্তের জন্য নিজের কুটিরের ছবি ভেসে উঠল। বিশাল লোহার ফটক, উঁচু প্রাচীর, পাহারায় দাঁড়িয়ে থাকা দারোয়ান..সবকিছুই আমার পরিচিত পৃথিবী থেকে কত আলাদা!
আর মনে পড়ে গেলো অনেক বছর আগের কথা। এই প্রাসাদে আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। মনে পড়ে গেল সেই চন্দনের আর আতরের গন্ধ। অল্প সময়ের জন্য সেই বালিকা জুলেখার কথা ভাবতেই শ্বাস নিতে কষ্ট হল। বুকের বাঁপাশে চিনচিনে ব্যথা,অস্বস্তি আর সেই ঘরময় মাতোয়ারা ঘ্রাণ, এতো বছর পর আবার অনুভব করলাম ।
কিন্তু পরক্ষনেই নিজেকে সামলে, নিজের সংসার, নিজের স্বামী-সন্তানের মুখ মনে করতেই গভীর প্রশান্তিতে চেয়ে গেল হৃদয়।
প্রহরীর কাছে পরিচয় দিলে, প্রাসাদের এক পাশে বসতে বললেন। কিছুক্ষণ পর খবর গেল লতার কাছে।
পান খাওয়া ঠকঠকে লাল ঠোঁট জোড়া গোল করে আমার সামনে এসে দাঁড়াল লতা।
আমি বিস্ময়ে কতক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইলাম।
লতার পরনে দামী রেশমের শাড়ি। শাড়িজুড়ে ভারী ও নিপুণ কারুকাজ। গলায় মোটা হার, কানে ঝুমকা, হাতে ভারী চুড়ি। আর আঁচলের এক পাশে ঝুলছে বড় একগুচ্ছ চাবি।
এ কি সেই লতা? যে লতার সঙ্গে একই উঠোনে বসে একদিন পুতুল খেলেছিলাম! একই ঘরে বেড়ে উঠেছি..!
আমার মন সায় দিল, হ্যাঁ লতা এই সবকিছু পাওয়ার যোগ্য। লতা তো শুরু থেকেই জুলাখের চেয়ে রূপবতী ছিলো। লতার পাঁচ কপাল, সুখ সে সঙ্গে নিয়েই জন্মেছিল। নাহয় এমন ভয়ংকর রূপসী কী করে হল এই মেয়ে!
মিয়া বাড়ির সাত প্রজন্মেও এমন সুন্দর কেউ ছিল কিনা সন্দেহ হয়! বয়সের সাথে লতার রূপও যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
আমার বুকটা কেমন করে উঠল। ছোট বোনকে এমন রাজকীয় সাজে দেখে আনন্দে চোখের কোণে জল জমে উঠল। গর্ব অনুভব হলো। মনে হলো, আমার বোন সত্যিই বড় হয়েছে, খুব বড়। আমার বোনের মতো সুন্দরী এই তল্লাটে দ্বিতীয়টি নেই।
পায়ের আলতা, হাতের টকটকে মেহদির রঙ লতার রূপ যেন আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
আমি নিজেকে ধাতস্থ করে ধীরে ধীরে নিজের সংসারের কথা সবিস্তারে বলি। করুণ সুরে সাহায্য চাই বোনে লতার কাছে।
সব শুনে লতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ভ্রু সামান্য কুঞ্চিত করে অত্যন্ত শান্ত স্বরে বলল, "চাল নিয়ে যেত পারো জমি বন্ধক রেখে অথবা সুদে ঋণ।"
কথাটা শুনে আমি কিছুক্ষণ নীরবে থমকে থাকি।
লতা আবার বলল, "তুমি খেয়ে যাও। তোমার ছেলেদের জন্যও খাবার নিয়ে যেও। আর কর্মচারীদের বলে দিচ্ছি, আমার ব্যবহারের কিছু কাপড় পড়ে আছে। সেগুলো তোমাকে দিয়ে দেবে।
কথাগুলো বলেই লতা আর দাঁড়াল না।
দ্রুত পদক্ষেপে চলে গেল ভেতরের দিকে। আমি কয়েক পলক স্থির হয়ে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রই। গলায় কিছু একটা দলা পাকিয়ে আসছে।
আমার মুখে কোনো অভিযোগ নেই । বোন বলেই হয়তো এ বেলা খেয়ে যাওয়ার মহানুভবতা দেখিয়েছে।
চোখে বিস্ময় নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
অতি সতর্ক পায়ে প্রাসাদের সীমানা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। পেছনে একবারও তাকাইনি।
কেউ খেতে ডাকবে সেই ভয়ে ; অভুক্ত আমি দূর্বল পা চালিয়ে ছুটে চলি।
পরের পর্বে শেষ
জৌলুসের শরৎকাল
লেখক: কুলচুমা ইয়াছমিন কনা