শুকেন্তোর ঘুম ভাঙলো খুব ভোরে।
যেহেতু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েছিল,তাই ঘুমটাও আজ একটু আগে আগেই ভেঙেছে।
ঘর থেকে বের হয়ে দক্ষিণ পাশের পুকুর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালো। পুকুরের পানি স্বচ্ছ পরিষ্কার। অবশ্য চারপাশে বেশ আগাছা জন্মেছে। পুকুরের পাড়েই পর পর অনেক গুলো নারকেল গাছ। একটা তাল গাছে ঝুলছে বেশ কিছু চড়ুই পাখির বাসা। চারপাশ টা পাখিদের কিচিরমিচিরে মাতোয়ারা। সামনেই বিস্তৃত ধানক্ষেত। আধপাকা ধানগুলো দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে। ধান গাছের সরু ডগায় চিকচিক করছে বৃষ্টির ফোঁটা। সম্ভবত রাতে বৃষ্টি হয়েছে। আকাশ টা নির্মল সতেজ চকচকে। যেন ধুয়েমুছে সাজানো নীল-সাদা ক্যানভাস।
শীতল বাতাস টা খুব আরাম লাগছে শুকেন্তোর।
শরীরের সব ক্লান্তি যেন মিলিয়ে গেলো নিমিষেই,স্নিগ্ধ হাওয়ায় পরশে।
কাল এসে এই বাড়ির পরিবেশ যতটা বাজে লেগেছিল,এদিক টাই এসে আজ সকাল টা ততটাই প্রশান্ত-সুন্দর লাগছে।
আনমনে ধানক্ষেতের মাঝখানে কাঁচা ছোট রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালো শুকেন্তো।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ই এই বাড়ি গুলোর সুর গুল শুরু হয়ে গেছে। ছেলে-মেয়ে গুলো ঘুম থেকে উঠেই পাখির মতো কিচিরমিচির করছে।
একজন বদনা নিয়ে পলিথিন মোড়ানো টয়লেটে ঢুকে গেলো।সেখানেই পেটে হাত দিয়ে বসে আরেকজন,সম্ভবত আটকে রাখার চেষ্টা।
অন্য একজন বদনা হাতে আশেপাশে তাকিয়ে ঝোপের মধ্যে বসে গেলো।
শুকেন্তো সেদিকে তাকিয়ে আছে, ছেলেটা মাথা তোলার অপেক্ষায়।
হঠাৎ খেয়াল করলো তার পেছনে কিছু টা দূরে, বড় এক ছেলে বসে মূত্র ত্যাগ করছে।
কি বাজে একটা অবস্থা!
শুকেন্তো দৌড়ে চলে গেলো।
ওম্মালকি এবং আরো কয়েকজন পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সবার হাতে কয়লা। দাঁত মাজছে কয়লা দিয়ে। ওম্মালকি শুকেন্তোর দিকেও একটা কয়লা বাড়িয়ে দিলো।
এক মহিলা পুকুরের ঘাটে বাঁধানো কাঠের তক্তায় বসে পানিতে চাল ধুচ্ছেন। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় পানির ঢেউ কেঁপে উঠছে, গোলাকৃতির ঢেউ হয়ে সরে যাচ্ছে ক্রমাগত , আর সেই সঙ্গে মুখে চলেছে একটানা বকবকানি। কথাগুলো শুনে মনে হয়, তিনি তাঁর ছেলে-মেয়েদের বকাঝকা করছেন-কখনো রাগে, কখনো আবার মায়া মেশানো সুরে। চারপাশের শান্ত পরিবেশের সাথে তার মুখের অবিরত চলতে থাকা শব্দাবলী যেন একটা ছন্দ তৈরি করেছে।
শুকেন্তো ভাবলেশহীন ভাবে চেয়ে আছে মহিলার দিকে।
ওম্মালকি শুকেন্তো কে তাড়া দিয়ে বললো -অমন দাঁড়িয়ে থাকলে হবে না। একপাশ দিয়ে মুখ ধুয়ে নাও।
আমরা মাছ ধরবো। তুমি যাবা? গেলে তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে আমার সাথে আসো।
জমির পাশের এক ডোবা। খুব বেশি পানি নেই। অল্প যা আছে তা হাতে হাতে তুলে ফেলে দিচ্ছে সবাই। সবার হাতে একটা করে গামলা।
প্রায় ১০-১২ জন নেমে পড়েছে।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ওম্মালকি। সে সবাইকে দেখিয়ে দিচ্ছে।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই শুকিয়ে এলো পানি।
হাঁটু সমান কাদামাটি। সেখান থেকে হাতড়ে হাতড়ে মাছ ধরছে সবাই । একটু পর পর হাত মুঠো করে তুলে আনে একেকজন। উপরে রাখা পাতিলে টুপ করে একটা মাছ রাখে।
মাঝে মাঝে শুকেন্তো কে পাতিল এগিয়ে দিতে হচ্ছে।
দারুণ উপভোগ করছে শুকেন্তো সময়টা।
একা একা বড় হওয়া শুকেন্তো র কাছে হঠাৎ এই সময় টা খুব ভালো লাগছে।
শুকেন্তো মা'কে ও বেশির ভাগ সময় পেতো না। যখন খুব ছোট ছিলো মা বাইরে থেকে দরজা তালা দিয়ে কাজে চলে যেতো।
মফস্বল শহর। চারপাশে কিছু অট্টালিকা, কিছু পাঁকা বাড়ি । সেখানেই বড় এক জায়গার মালিক বিদেশে থাকেন। নানারকম গাছ লাগিয়েছেন। দেশে আসলে,তখন বাড়ি করবেন। সেই জায়গায় টিন দিয়ে দুই রুমের ঘর করে দিলেন তাদের থাকার জন্য। কোনো ভাড়া দিতে হয়না, শুধু জায়গা আর গাছপালা গুলো দেখাশোনা করলেই হয়।
সেই টিনের ঘরেই শুকেন্তো ছোট থেকে কৈশরে পা দিয়েছে।
বন্ধু-বান্ধব ছিলো না আশেপাশে। মেশার সুযোগও হয়নি কখনো। একই ক্লাসে তিন বছর থাকলে বন্ধু পাবেই বা কোথায়? তার ক্লাসের সব পিচ্চি ছেলেমেয়েদের মধ্যে তাকে একটু বেশিই বড় দেখায়। তাই শুকেন্তো নিজেও খুব বেশি মেশার চেষ্টা করেনি কারো সাথে।
পাতিল ভর্তি মাছ এনে উঠানে রাখা হলো। কয়েকজন মিলে সে মাছের ভাগ বসালো। যে কয়জন মাছ ধরেছে সবার জন্য একটা করে ভাগ।
ওম্মালকির ভাগে একটু বেশিই মাছ পড়লো। কারণ শুকেন্তো তাদের ঘরে খাবে।
এরমধ্যে একজন উঠে গেলো নারকেল গাছে। ধপ করে নারকেল পড়ার শব্দ হতেই দফাদারের ছোট বউ বের হয়ে এলো-কোন মা*পোলা গাছে উঠছে,কার হুকুম উঠছে। এই গাছ আমাগো ভাগে সেকথা কি কারো মনে নাই?
সেই কথা শেষ হওয়ার আগেই হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এলো পঞ্চম বউ। হয়তো ভাত খাচ্ছিলেন। সেই এঁটো হাতটা একবার জিহ্বা দিয়ে টেনে নিয়ে বললো- সব তোর লাগে নারে। বেডাও তোর লাগে, গাছও লাগে, ঘরও লাগে,,। আর কি লাগবো বল,,,
তৎক্ষনাৎ "তোর মুখে ঝাঁটা মারি " বলেই এগিয়ে এলো ছোট বউ। এঁটো হাতে আসা,সেই বউ ধরে ফেললো ছোট বউয়ের চুলের মুটি,,,।
অকথ্য গালিগালাজ, টানাটানি,মারামারি,, চলছে!
ঝপ করে একটি নারকেল পুকুরের পানিতে গিয়ে পড়লো। ছুটে গেলো ছোট বউ।
কোলের বাচ্চা টা রেখে পানিতে নেমে গেলো। কোমর অবধি পানিতে নেমে নারকেল টা তুলে নিলো অতি দ্রুত। যেন পলক পড়লেই অন্য কেউ হাতিয়ে নিবে।
ভেজা শাড়িতে আরো মুহুর্তকাল দাঁড়িয়ে মুখ চালালো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। তবে এবার শব্দের ঝংকার ক্ষানিকটা কম। হয়তো একটা নারকেল ভাগে পাওয়ার স্বস্তি!
তারপর ধীরে ধীরে সবাই শান্ত হলো,হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কিংবা এসব তাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
শুকেন্তো ভয়মিশ্রিত চোখে মায়ের হাত ধরে আছে শক্ত করে। শাহানার মুখে কোনো কথা নেই।
এখানকার পরিবেশ যে কতটা নিচুস্তরে গিয়ে পৌঁছেছে তা বুঝতে বাকি নেই।
ছোট্ট মেয়েটার কাছেও শাহানার লজ্জা লাগছে, তার মামার বাড়ির এমন অপ্রীতিকর পরিবেশ দেখে।
-------------------------
বেলা দুপুরের দিকে বেশ কিছু মানুষ এসে জড়ো হয়েছে উঠানে । আলি দফাদার কে ব্যস্ত দেখা গেলো।
১৫-১৬ বছরের এক তরুণী কে দু'জন লোক ধরে আছে। কুঁকড়ানো চুল গুলো শুষ্ক এবং অগোছালো হয়ে ঝট পাকিয়ে আছে। শুকনো চেহেরা। শূন্য চোখে ক্লান্তি আর ভয়।
মেয়েটা মাঝে মাঝে চটপট করছে। বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে। কখনো পা ছুটাচ্ছে,কখনো কামড় বসাচ্ছে ধরে থাকা লোকদের হাতে।
মেয়েটির দিকে উপস্থিত সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। যেন খুব মজার কোনো সার্কাস কিংবা খেলা শুরু হতে যাচ্ছে।
আলি দফাদার প্রবেশ করতেই গুঞ্জন থেমে গেলো।ফিসফিস আওয়াজ ছাড়া কোনো শব্দ নেই।
হাতে থাকা ময়লা ব্যাগ টা পাশে রাখলেন। সেখান থেকে একটা জীর্ণ বই,আয়না,শুকনো পাতা এবং আরো কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস বের করলেন।
"নাসির " বলে ডাকতেই একটা লোক ছুটে এলো।
একটা কলা গাছের চারা রাখল সামনে । ধূপ জ্বালিয়ে দিলো। মেয়েটিকে সামনে এনে বসানো হলো।
দফাদার নিচু গলায় পড়তে শুরু করে মন্ত্র বা আয়াত জাতীয় কিছু । তার গলা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে, শব্দগুলো স্পষ্ট না হলেও একটা চাপা ভয়ংকর পরিবেশ তৈরি করে,পরিবেশ টা কেমন অদ্ভুত ভয়ংকর ঠেকল শুকেন্তোর কাছে।
হাতের মুঠো থেকে মেয়েটির দিকে কিছু ছুটে মারে।
মেয়েটা প্রথমে চুপচাপ থাকে। তারপর হঠাৎ তার শরীর কেঁপে ওঠে।
দফাদার জোরে ভয়ংকর ভাবে বলে ওঠে— "কে তুই? নাম বল!"
সেই ডাকে মেয়েটি আৎকে উঠে। শাহানা বুঝতে পারছে মেয়েটি ভয়ে কাঁপছে। কিন্তু আশেপাশের সবার আগ্রহ যেনো শুধু পরবর্তী দৃশ্যপট দেখার।
শুকেন্তো মায়ের হাত শক্ত করে ঝাপটে ধরে।
দফাদার এবার আরো জোরে জোরে পড়তে থাকে। কি পড়ছে স্পষ্ট না,কিন্তু সেই পুরনো হলদেটে বই থেকে পড়েই চলেছে। পানির বাটিতে ফুঁ দিয়ে হঠাৎ মেয়েটার মুখে ছিটিয়ে দেয়। সাথে সাথে আম পাতার ডাল নিয়ে মেয়েটির মাথায়, পিঠে ঝাড়তে থাকে।
কম্পিত মেয়েটা এবার চিৎকার করে ওঠে। তার শরীর ছটফট করতে থাকে, যেন কেউ অদৃশ্যভাবে টানছে। দু’জন লোক ধরে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু সে যেন অস্বাভাবিক শক্তি নিয়ে লড়ছে।
সবার দৃষ্টিতে তা অস্বাভাবিক হলেও শুকেন্তোর মনে হলো, মেয়েটি র কষ্ট হচ্ছে। নিজেকে এখান থেকে মুক্ত করতেই সে প্রাণপণ চেষ্টায় চটপট করছে।
দফাদার এবার তার মাথায় হাত রেখে চাপ দেয়-"বের হয়ে আয়! বের হয়ে এক্ষুনি এই বোতলে প্রবেশ কর,না হলে জ্বালিয়ে দেব!"
মেয়েটি মাথার চাপে আর্তনাদ করে ওঠে। শুকেন্তো ছুটে যেতে যায়। শাহানা মেয়েকে বাঁধা দেয়।
আশেপাশের সবাই নির্জীব। এমনকি মেয়েটির পরিবার ও।
যা ঘটছে তা যেন একান্তই মেয়েটির ভালোর জন্য ঘটছে।
আগুনে কিছু একটা পুঁড়াতেই খুব বাজে গন্ধে বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো।
গন্ধ টা ভারি,কেমন মাথা ঘুরানো।
সেই ধোঁয়া মেয়েটির নাকেমুখে দেওয়া হচ্ছে।
মেয়েটির চোখ জোড়া টকটকে লাল। নিস্তেজ প্রায় মেয়েটি কাশতে কাশতে বেহুশ হওয়ার অতিক্রম।
শুকেন্তো র মেয়েটির জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না এটা কেমন চিকিৎসা। তার কেন যেন বারবার মনে হচ্ছে মেয়েটি এই চিকিৎসা নামের অত্যাচার নিতে না পেরে মারা যাবে। আর সহ্য করা যাচ্ছে না।
একসময় ছুটে এলো শুকেন্তো।
আগুনের ধূপ টা দফাদারের দিকে ঠেলে দিয়ে মেয়েটিকে নিজের বুকে আড়াল করে নিলো।আকস্মিক ঘটনা বুঝে উঠতে সবার একটু সময় লাগলো।
দফাদার একটু হকচকিয়ে গিয়ে বলে উঠলো, এই মায়া কে? শয়তান এ-ই মায়ার উপর ভর করছে।
এই মায়ারে ধর নাসির ।
শুকেন্তো কে নাসির ধরতেই ছুটে আসে শাহানা।
ভয়মিশ্রিত কন্ঠে বলে," ও আমার মেয়ে, শুকেন্তো মামা। ও বুঝতে পারেনি। ওকে ছেড়ে দিন।"
চোখের পলকে মেয়েটির নিস্তেজ শরীর মাটিতে ঢলে পড়ে। চোখ বন্ধ, নিঃশ্বাস ধীর।
তৎক্ষনাৎ দফাদার লাফ দিয়ে উঠে যায়। ক্ষানিকটা উপরে হাত উঁচিয়ে কিছু একটা ধরার মতো করে,,। তারপর শক্ত সেই হাতের মুঠো এনে, একটা কাচের বোতলে কিছু রাখে।
বোতলের ডাকনা দিতে দিতে চওড়া ভারি কন্ঠে বলে,"ধরে ফেলেছি। ধরা তোকে দিতেই হলো।" আকাশে -বাতাস কাঁপিয়ে বিশ্রী শব্দে হাসতে লাগলো দফাদার।
যেন এক্ষুনি সে বিরাট কিছু জয় করে এসেছে।
সেই জয়ের হাসিতে উপস্থিতি জনতার চোখে-মুখে কৌতুক খেলা করছে। সেই কৌতুক যেন এক বিরাট রহস্য। জ্বীন ধরে ফেলেছে দফাদার,,!
নাসির" বলে ডাক দিলেন দফাদার।
নাসির শুকেন্তো কে ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে গেলো।
দফাদার কাচের বোতলটি নাসিরের হাতে দিয়ে বলল,- এখনই এটা মাটিতে পুঁতে দিয়ে আয়। কবরস্থানের মাটিতে পুঁতে দিবি। খবিশ জ্বীন সারাজীবনের জন্য আটকা পড়ে থাক এবার!"
-কিন্তু জ্বীন টা তো আমরা দেখতে পেলাম না। মেয়েটি বেহুশ হয়ে পড়ে গেলো আর আপনি বললেন জ্বীন ধরে ফেলেছেন। কই ঐ বোতলে তো জ্বীন দেখা যাচ্ছে না।
শুকেন্তোর আকস্মিক কথায় মেঘের গর্জনের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠলো দফাদার - জ্বীনরে তোমরা দেখতে পাইবা? সে ক্ষমতা আছে?
-শাহানা তোর মেয়ের উপর দুষ্ট জ্বীনের আলামত আছে। ওর চিকিৎসা দরকার। বড় কোনো অঘটন ঘটার আগে মেয়ের চিকিৎসা করানো দরকার।
বেলা পড়লে ওরে আমার ঘরে পাঠাই দিস।
হিংস্র আগুন ঝরা চোখ জুড়া শুকেন্তোর সারা শরীর একবার বুলিয়ে নিলো।
সেই রক্তচক্ষু দৃষ্টিতে ঢুক গিললো শুকেন্তো।
বুকে অজানা এক ভয় উঁকি দিলো।
-------------------------------------
আলি দফাদার বাজার থেকে বড় মাছ নিয়ে এসেছে। আজকে জ্বীন ছাড়িয়ে হয়তো মোটা অংকের টাকা এসেছে পকেটে। ছোট বউ কে ব্যস্ত দেখা গেলো সেই মাছ রান্নার তোড়জোড়ে।
শাহানা আর শুকেন্তো কে দুপুরে দফাদারের সাথে খেতে বলা হয়েছে।
শাহানার মন সায় দিলো না। এই মামা টা একসময় তার অনেক প্রিয় ছিলো। অথচ আজ সেই মামার পাশে বসে দুটো খাওয়ার রুচি আসছে না।
অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও মেয়েকে নিয়ে খেতে বসলেন একসাথে।
-শাহানা,অনেক বছর পর এদিকে আইলি। জামাই কেমন আছে? সব খবর ভালা? তোর বিয়ের সময় খবর পাইছিলাম, কাজ-কর্মের ঝামেলায় যাইতে পারি নাই। অবশ্য বছর দুই পরে একবার গিয়াছিলাম। গিয়া শুনি-তুই অনেক আগে নয়নপুর ছাইড়া চইলা গেছস।
তোর বাবার দেশ,স্বামীর দেশ, নয়নপুর। আর তুই কিনা সব ছাইড়া সেখান থেইকা নিরুদ্দেশ হইয়া গেছস।
বাপ নাই বলে কি শিকড় ছাড়তে হইবো?
-মামা,তার আরেক টা ভরা সংসার আছে। সেই ঘরে স্ত্রী-সন্তান সব আছে। বিয়ের সময় আমি জানতাম না।বিশ্বাস করে বিয়ে করলাম। বিয়ের পর পরই জানতে পারি সবকিছু। সেদিনই বের হয়ে যায় ও বাড়ি থেকে। চলে যায় নয়নপুর থেকে অনেক দূরে এক মফস্বল শহরে। প্রতারণা আমার সয় না।
পেটের দায়ে যা পাই করতাম। কয়েক মাস পর শুকেন্তো পৃথিবীতে আসে।
এতোদিন ভালো ই চলছিল।
কিন্তু মেয়েটা তো বড় হচ্ছে, একটা স্থায়ী ঠিকানা দরকার। যতদূর জানি,মায়ের ভাগের কিছু জমি তোমার কাছে আছে। উত্তর পাড়ার জমি টা দিলে মেয়েটা কে নিয়ে কোনো রকম মাথা গুঁজে থাকার ব্যবস্থা করতাম।
দফাদার কিছুক্ষণ নিরুত্তর থাকলো। হাতে তুলা ভাতের লোকমাটা প্লেটে রেখে দিয়ে বললো-
স্বামীর আরেকডা ঘর-সংসার থাকলে কি চইলা আসতে হইবো? স্বামী ভরনপোষণ দিতে না পারলেও স্বামীর ভিটাই পইড়া থাকতি। স্বামীর দেশে পইড়া থাকলেও মান। এমন দেশে দেশে ঘুরান উচিত না।
আমি বলি কি স্বামীর কাছে মাইয়াকে নিয়া ফিরা যা।হাত-পায়ে ধইরা একটু ঠাঁই মিলে কিনা দেখ।
-মামা,ঠাঁই মিলার হলে অনেক বছর আগেই মিলতো।
আপনি জমি দিতে পারবেন কিনা বলেন। আমি জোর করবো না আপনাকে। এই জমি সারাজীবন আপনি দেখাশোনা করেছেন। আপনি মায়ের এক মাত্র ভাই হওয়ায়, মায়ের ভাগ টা আপনার কাছে বিনা আপত্তিতে রেখেছিলেন তিনি । তাই আমিও চাই না জোর করে কিছু আদায় করতে।।শুধু উত্তর পাড়ার জমি টা দিন।
-চাইছস ভালো কথা, কিন্তু উত্তর পাড়ায় কেন? এখানে আমার বসত ভিটার পাশে লাগানো জমি থেকে যেকোনো একটা তে ঘর কইরা দিই তোকে।
শাহানা ইতস্তত করে বললো- মামা,আমি এখানে থাকতে চাচ্ছি না। তাছাড়া উত্তর পাড়ার ওটা তো মায়ের নামের জায়গা।
দফাদার ভ্রুক্ষেপহীন কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে কিছু চিন্তা করলো। রাঙ্গানিত চোখ জুড়া শীতল করার চেষ্টা করে, শুকেন্তো র পানে চাইলো।
সেই একই দৃষ্টি পলকহীন রেখেই বলল-বেশ,কিছু দিন এখানে থাক।আমি সব ব্যবস্থা করছি।
(পরবর্তী পর্বে শেষ হবে* পরবর্তী পর্ব পড়তে চাইলে কমেন্ট করুন)
(এটি সামাজিক কুসংস্কার এবং বাস্তব কিছু তথ্যের ভিত্তিতে লেখা গল্প)
লেখক : কুলচুমা ইয়াছমিন কনা