মেয়েকে এভাবে বসে যেতে দেখে ঈষৎ ভয় পেলেন শাহানা। আপন মনে ভাবলেন -মেয়েটার শরীর আর কতক্ষণ ই বা কুলাবে। সেই ভোর থেকে বের হয়েছে। না খাওয়া হয়েছে, না বিশ্রাম।
আশেপাশে কাওকে খোঁজার চেষ্টা করলেন শাহানা আক্তার। বেশির ভাগ মুখই অচেনা লাগছে।
শেষ বার যখন শাহানা এসেছিল মামা তখন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। দ্বিতীয় বিয়ে দেখে শাহানার মন ক্ষানিকটা অপ্রসন্ন হয়েছিল। তবে ছোট বউয়ের আদর যত্ন দেখে শাহানা মুগ্ধ হয়ে যায়।
নতুন আনা বউটি খুব আহ্লাদ করতো শাহানা কে নিয়ে। শাহানাও অল্প কয়দিনে ছোট মামীর ভক্ত হয়ে যায়। সারাদিন ছোট মামীর পেছন পেছন ঘুরত।মামী কাজ করার ফাঁকে টুপ করে এসে বুকে জড়িয়ে নিতো। শাহানাও আহ্লাদ করে নাকের চিকচিক করা নাক ফুলে আলতো করে ছুঁয়ে দিতো।
মামী সময় পেলেই চুল আছড়ে বেনী করে দিতো, কাঁচা আম পেড়ে ভর্তা করে দিতো,মুড়ি ভেঙে দিতো,আরো কত কি,,।
সেবার শাহানা টানা ৩২ দিন ছিলো মামার বাড়ি। মামার দুই বউয়ের মধ্যেও ছিলো খুব মিল!
ছোট মামী বড় মামীকে বুবু বলে ডাকতেন। সতীনের মাঝে যে এতো ভালো সম্পর্ক হতে পারে তা শাহানা আর কোথাও দেখেনি। বড় মামীর ঘরে ছিলো দুই পুত্র সন্তান, যারা শাহানার চেয়ে বয়সে বড়।
ছোট মামীর ফুটফুটে এক কন্যা সন্তান। মায়ের মতো ই ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ।
দশগ্রামে সবার পরিচিত নাম ছিলো আলি দফাদার।
কি ছিলো না দফাদারের?
বিশাল বিস্তৃত ফসলী জমি,বড় বড় পুকুর, বাহারী ফলের বাগান,গোয়াল ভরা গরু,গোলা ভরা ধান,,।
তৎকালীন গৃহস্থ বাড়িতে যা সম্ভার থাকতো তার সবিই ছিলো দফাদার বাড়ি।
তখনকার সময়ে এমন গৃহস্থ বাড়িতে দুই -চারটা বউ থাকাও ছিলো স্বাভাবিক ব্যাপার।
কিন্তু মামার বসত ভিটার এই দূর্বল হাল কি করে হলো? এতো ঘর,এতো ছেলেমেয়ে,,!
মামার নাতি-নাতনি হবে হয়তো!
-বড় মামী,ছোট মামী কে খোঁজে দেখি। তুই একটু বস মা।
শুকেন্তো নিরুত্তর বসে রইলো।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাদের মধ্য থেকে মধ্য বয়সী এক মহিলা এগিয়ে এলেন । মাথার চুল গুলো চারপাশ থেকে টেনে ঠিক উপরে ঝুটি করে বাঁধা। পান খাওয়া লাল ঠোঁট দুটো গুলো করে কায়দা করে পানের ফিক ফেললেন তিড়িক করে। সেই ফিকের ফোঁটা ছিটকে পড়লো পাশের আরেক মহিলার গায়ে। ভ্রু কুঁচকে মা*,, বলে প্রস্থান করলেন সেই মহিলা।
সেই গালি কে অতি স্বাভাবিক ভাবে গায়ে মেখে পান খাওয়া মহিলা শাহানার দিকে চেয়ে বললেন -
তোমাগোর আগে এই তিনজন আইছে। আইজ শনিবার তাই মেলা মানুষ আইছে চিকিৎসা করাইতে। ঐ মাইয়াডারে দাওয়ার থেইকা উঠাইয়া দাও। পথ আগলাইয়া বইয়া থাকলে তো তিনি আইতে পারবো না। তিনি আইবো বাতাসের বেগে। সামনে বাঁধা পাইলে রাগী যাইবো।
মহিলার কথার পিঠে ব্যাঙ্গাত্বক স্বরে ভেসে এলো এক বৃদ্ধার ক্ষীণ কন্ঠ। " এ্যাঁ তেনারে আসার পথ দেন,রাগ কইরবো,,,,যত্তোসব নাটক।
শয়তান, সব কইটা শয়তান,,। "ফোকলা দাঁত বের করে হাসতে লাগলেন বৃদ্ধা।
শাহানা বৃদ্ধার ঠোঁটের দুই পাশে চেয়ে আছে।
এই যে ঠোঁট জোড়া নড়ছে, খুব চেনা লাগছে।
দুপাশে চামড়া কুঁকড়িয়ে গেছে। সমস্ত শরীরে জীর্ণতা আর দারিদ্র্যের ছাপ। কিন্তু নাকের এই বড়ই ফুলের নাক ফুলটা তার খুব চেনা। সে সারাজীবনে যতবার ছোট মামি কে কল্পনা করেছে, ততবার তার চোখে ভেসেছে দুধের মতো শুভ্র গোল মুখে বড়ই ফুলের মতো এক নাক ফুল। মামি হাসলে ঠোঁটের আগে হাসার ঝিলিক ছড়াতো এই নাক ফুলে। সেই
ঝিলিক হাসি তে মুগ্ধ হয়ে শাহানা কতবার স্পর্শ করেছে এই নাক ফুল।
শাহানা পায়ে ধরে সালাম করলো বৃদ্ধাকে। বৃদ্ধার ভাজ পড়া কপালের রেখাগুলো আরো গাঢ় হলো।
- মামি আমাকে চিনতে পারছেন না? আপনার ননাস সাহেদার মেয়ে শাহানা।
অতি আশ্চর্যভঙ্গিতে শাহানার দুই বাহু ধরে উঁচু রিনরিনে কন্ঠে বলল-শাহানা? আমাগো ছোট্ট শাহানা! এতো বছর পর তুই আইলি মা।
ঐ ওম্মালকি কই গেলি রে,,এইদিকে আয়।
-মামি তোমার শরীরের এ কি অবস্থা ?
শাহানা বৃদ্ধার দুপাশের গাল আলতো করে ছুঁয়ে বলল-আমার এ-তো সুন্দর ছোট মামীর এ কেমন দশা!
-তুই কী আগের মতোই আছস? তুই আমারে দেখেছিলি জোয়ান কালে। শরীরে বল আছিলো, রুপ আছিলো। আর এহন কিছুই নাই। আছে শুধু এই জাহান্নাম আর মৃত্যুর অপেক্ষা।
-মামা, বড় মামী উনারা কোথায় ছোট মামী ?
- ঐ যে তোর মামা আসনে বইয়া আছে দেখেছস নাহ? ভণ্ডামি করতাছে।
আর তোর বড় মামীডা মারা গেছে কয়েক বছর হইলো। বড় বুবুও আমারে রাইখা চইলা গেলো।
এই জাহান্নামে কি আর থাকন যায়?
জড়ানো গলায়, এলোমেলো বিষন্ন কন্ঠে কথা গুলো বলেই আবার ঠোঁটে হাসি টেনে বললেন -
এইসব কথা পরে হইবো। আগে জিরাইয়া নেয়।আয় ভিতরে আয়।
টিনের চালের ঘরটার ঠিক সামনে খানিক দূরে আরেকটা ছোট ঘর। সামনের জায়গাটা স্যাঁতস্যাঁতে।শাহানা মেয়েকে ধরে ওম্মালকি নামের মেয়েটিকে অনুসরণ করলো।
ভিতরে একটা মাদুর পেতে বসতে দিলো। বৃদ্ধা বসলেন উঁচু কাঠের তক্তায়।
-তোর মাইয়া নাকি শাহানা?
-হ্যাঁ, আমার এই একটাই মেয়ে মামী।
"আপনাদের ট্রাংক আর ব্যাগগুলো আব্বার ঘরে তুলে রেখেছি" -ওম্মালকি নামের মেয়েটি বলল।
-ও আমার ছোট মাইয়া ওম্মালকি। বড় দুই মাইয়া বিয়া কইরা সংসারী হয়ছে। এই মায়াডা নিজেই তার সংসার ভাইঙা চলি আইছে। নিজেই বিয়া করলো, আবার নিজেই ভাইঙা দিলো। পোড়ামুখী!"
মামীর কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে শাহানা পানি চাইলো ওম্মালকির কাছে। মেয়েটির এখনো পানি খাওয়া হলোনা। বুক ফোলিয়ে তেড়ে আসা গরম দীর্ঘশ্বাস টি চেপে নীরবে ছাড়লো শাহানা। যেন কেউ বুঝে ফেলার ভয়!
ওম্মালকি মেয়েটি ভারি চঞ্চল।
বাড়িতে হঠাৎ এমন নতুন মানুষ দেখেও যে কেউ খুশি হতে পারে তা এই মেয়েটি কে না দেখলে বুঝা মুশকিল।
সে জগ-গ্লাস এনে মাদুরে রাখলো।
হাসি মুখে এক গ্লাস পানি ঢেলে শুকেন্তোর দিকে বাড়িয়ে দিলো।- নাও,পানিটুকু খেয়ে নাও। মাটির কলসির পানি,ঠান্ডা। খেলে ভালো লাগবে।
তারপর তাড়াহুড়ো করে চলে গেলো।
ঠান্ডা ভাত,শাক আর ডাল নিয়ে ফিরে এলো দ্রুতই ।
শাহানা বিনা বাক্য ব্যয়ে প্লেটে ভাত নিয়ে শুকেন্তোর মুখে তুলে দিলো।
তৃপ্তির হাসি দিয়ে ওম্মালকি নামের মেয়েটি আয়না দেখছে। কপালের টিপ টা একটু সরিয়ে ঠিকঠাক জায়গায় বসালো।কাজলটা চোখের কাজলের উপর আরেকবার ঘষলো। তারপর গুনগুনিয়ে গান ধরে বের হয়ে গেলো।
শুকেন্তো সেই লাপানো পায়ের ঝনঝন আওয়াজ তুলা নুপুর জুড়ার দিকে চেয়ে আছে। ভারি অবাক করছে তাকে এখানকার সবকিছু,,।
কিন্তু এই মেয়েটি কে ভালো লাগছে।
একটু অন্য রকম!
---------------------------------
গভীর রাত্রি। চারপাশে সুনশান নীরবতা।
ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ, ব্যাঙের ডাক রাতের গুমোট ভাব কে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে বাড়ির পোষা কুকুর গুলো এদিক ওদিক ঘেউঘেউ করে ছুটে যাচ্ছে।
শুকেন্তো সন্ধ্যায় সেই খাবারটুকু খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল। পরে অম্মালকির বিছানায় শুয়ে দিয়েছে।
শাহানার চোখে ঘুম নেই। নারকেল গাছের শিকড়ে বসে আছে।
এখানে এসে সে বিরাট বোকামী করে ফেলেছে। সে কি জানতো এখানকার এই পরিস্থিতি!
নিজের মনেই নিজের হিসেব কষছে শাহানা।
মামার সাথে দেখা ও কথা হয়েছে। এখানে কোনো কিছু ই আগের মতো নেই। মামারও বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। মামা দেখা হতেই স্বাভাবিক ভাবে টুকটাক কথা বললেন।মামার দশ আঙুলে দশ আন্টি। বিভিন্ন রঙের পাথর। মুখের চামড়া ঝুলে গেছে। মুখের মাংস শুকিয়ে হাড় উঁচু হয়ে গেছে। চোখ গভীরে গিয়ে , কেমন যেন বিশ্রী এক রুপ চেহারায়। সারা শরীর জুড়ে আতরের তীব্র গন্ধ। গা গুলিয়ে আসার মতো বাজে গন্ধ। আর কিছুক্ষণ থাকলেই শাহানার বমি আসতো হয়তো।
কিন্তু তিনি বললেন -জরুরি একটা কাজ পড়েছে শাহানা। থাক। রাইতে কথা হইবো।
ততক্ষণে আমার পরিচয় ছড়িয়ে পড়েছে। বাড়িতে নতুন আত্মীয় এসেছে শুনে সন্ধ্যার পর সবাই জড়ো হয়েছিল। সবাই কে খুব উৎসুক দেখা গেলো।
সেই জড়ো হওয়া মানুষের মধ্যে মামার এগারোটা বউয়ের সাথেও দেখা হয়েছে শাহানার।
দুই পা-টি দাঁত বের করে বিকালে পান খাওয়া সেই মহিলা হাসতে হাসতে বলল-আমি তোমার মামার উনিশতম বউ। আমি হলাম সবার ছোট। তোমার মামা আমার ঘরেই খাই,থাকে।
শেষের কথায় কিছু টা অহংকারের আঁচ ছিলো।
মহিলা আবার বলল -এখানে আমরা এগারো জন বউ আছি। দুই জন মারা গেছে, বাকি আটজন পালাইয়া গেছে। কারো সাথে তালাক হয় নাই অবশ্যি।
আর এরা তিন জন হইলো ছেলের বউ। কথা শেষ করে একটা বাচ্চা কে হাত দিয়ে সরিয়ে পানির ফিক ফেললেন তিড়িক করে।
কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো শাহানা। তার মাথা ভনভন করছে। তার আশেপাশে ছয়-সাতটা তরুণী মেয়ে। মামার মেয়ে হবে নিশ্চয়।
কে, কত তম বউয়ের মেয়ে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলো না শাহানার।
ছোট ছোট ছেলে-মেয়েও কম না।
এখানে, এই পরিবেশে শুকেন্তো কে রাখা যাবে না। শাহানা মানুষের বাড়ি কাজ করলেও মেয়েকে খারাপ পরিবেশের সংস্পর্শে আসতে দেয় নাই কখনো। সবসময় চেষ্টা করেছে মেয়েটাকে ভালো শিক্ষা, ভালো আচরণ, ভালো পরিবেশ সব দিতে। জীবনে একবার ভুল হয়ে গেছে।
মস্ত বড় ভুল।
জ্বরে পড়ে মেয়েটাকে মুন্সী বাড়ি পাঠিয়েছিল গৃহকর্ত্রী কে ঠুকঠাকঃ কাজে সাহায্য করবে ভেবে। কিন্তু,,!
সেই কথা মনে পড়তেই আবার বুক টা ভারি হয়ে এলো শাহানার।
রাতের নির্বিঘ্নতায় কারো নীরব উপস্থিতি টের পেয়ে ফিরে তাকালো শাহানা।
-ছোট মামী তুমি ,,। অহ তুমি তো এখন আর ছোট মামী নও। তুমি হবা মেজ মামী। মামার উনিশতম মামী হবে ছোট মামী।
শাহানার কথায় হাসলেন বৃদ্ধা। রাতের আঁধারে সেই হাসি অদ্ভুত হাসফাস ঠেকল শাহানার কাছে।
-মামার এই বহু বিবাহের কারণ কি মামী? একটা, দুটো না,,,উনিশ টা বউ!
তোর মামারে শয়তানে ধরছে ,শাহানা… ভয়ংকর শয়তান!
আমাগো দুই বউ আর পোলা-মাইয়া লইয়া সংসারডা ভালোই যাইতাছিল। আহা! কী সুখের সংসার আছিল আমাগো…
তারপর শুরু হইল শয়তানের খেলা।
পাশের গেরামের এক গৃহস্থের নববধূর রূপ দেইখা আলি দফাদারের মাথা আউলাইয়া গেল। নানা চাল-চলন কইরা চেষ্টা করল নিজের ভাগে আনতে,পারল না। শেষে খোঁজ পাইলো এক কবিরাজের…
ঐ কবিরাজের জাদু-টুনার জোরে মানুষরে পুতুলের মতো বশ কইরা রাখা যায়। কালা জাদু!
কালা জাদু কইরা ওই বউডারে কেমনে কেমনে পাগল বানাইয়া ফেলল।
গভীর রাইতে ওই মাইয়াডা দৌড়াইয়া আইল আমাগো বাড়ি। মুখে একটাই কথা-সে আলি দফাদাররে ভালোবাসে, ওরেই বিয়া করবো । এক কথা, এক বাক্য-অইডাই অনর্গল কইতেই থাকে।
কইতে কইতে মুখে ফেনা আইসা যায়, তবুও থামে না-"আলি দফাদাররে বিয়া করমু"
সারা গেরামে খবর রইটা গেলো-কাজী বাড়ির নববধূ আলি দফাদাররে বিয়া করতে পাগল হইয়া গেছে!
শেষে গেরামের গণ্যমান্য লোকজন বইসা আলি দফাদাররে কইলো-"মাইয়াডারে বিয়া করেন। ইজ্জত তো দিয়া দিছে… আবার যদি জানডাও দিয়া দেয়!"
আলি দফাদার নিরীহ মুখের ভান কইরা কইল,
"আমার দুই বউ লইয়া ভরা সংসার… আরেকটা বিয়া কেমনে করি? তবে জান বাঁচানো তো ফরজ। যাক, জান বাঁচাইতে নাহয় আরেকটা বিয়া করলাম…।"
গেরামবাসী যেন হাঁফ ছাইড়া বাঁচল।
তিন মাস পর ওই মাইয়াডার জাদুর ঘোর কাটল। সব বুঝতে পারল। ভদ্দর ঘরের মাইয়া আছিল…
একদিন ভর দুপুরে, গলায় কলসি বাইন্ধা ওই পুকুরে ঝাপ দিয়া জান দিয়া দিল।
আহা… মাইয়াডার মুখডা এখনও চোখের সামনে ভাসে।
সেই থেইকা সর্বনাশ শুরু হইল-আরও ভয়ংকরভাবে।
দফাদারের মাথায় ওই জাদু-টুনার নেশা ঢুইকা গেল গভীরভাবে।
যারে খুশি বশ কইরা ফেলা যায়,এইডা যেন তার নতুন খেলা হইয়া গেল।
ওই কবিরাজের নামে অনেক জমি লিখা দিয়া, তার থেইকা সব জাদুবিদ্যা শিখা নিল।
বছরের পর বছর সাধনা করল… মানুষ থেইকা বদলাইয়া গেল। হইয়া উঠল মানুষরূপী শয়তান!
ভয়ংকর শয়তান…।
যেই মাইয়াডারে ভালো লাগত, তারে কালা জাদু করত। তারপর ওই মাইয়াডা পাগলের মতো দৌড়াইয়া আইত…পাগলামি শুরু করতো দফাদাররে বিয়া করবার জন্য।
বিয়া হইত।
বিয়ার পর আর কই যাইবো? যেগো কই যাওনের জায়গা নাই, তারা সহ্য কইরা মাটি কামড়াইয়া এইহানে পইড়া থাকে।
আর যেগো সহ্য হয় না, তারা পালাইতে চায়।
মুক্তির লাগি চটপট করে।
আমি… আমি তাদের পালাইতে সাহায্য করি।
একটা মৃত্যু দেখছি,আর দেখতে চাই না।
তাই পাহারা দেই, বুঝাইয়া-সুঝাইয়া রাখি…।"
অনেকক্ষণ কথা বলতে পারলো না শাহানা।
কিছুক্ষণ পর নিজেকে ধাতস্থ করে বলল-এতো গুলো বউ,ছেলে-মেয়েদের ভরণপোষণ, পড়ালেখার খরচ কীভাবে চালাই মামা?
-"কিসের খরচ, কিসের ভরণপোষণ?
ও তো ছোট বউডার লগেই থাকে। কাওরে কুনো খরচাপাতি দেয় না-উল্টা তাদের থেইকাই নেয়। পোলাপাইনডারে দিছে নানা দোকানের কামে।
আর মাইয়াগো দিয়া আইছে গার্মেন্টসে। তারা যা বেতন পায়, এক ভাগ নিজে রাখে, এক ভাগ মারে দেয়, আরেক ভাগ বাপরে দেয়।
এইভাবেই সবার জীবন চলতাছে।
কুনো মাসে যদি মাইয়াগো টাকা দিতেও দেরি হয়, বা দিতে না পারে-এইহানে মায়ের উপর শুরু হয় নির্যাতন।
বারো-তেরো বছর হইলেই তাদের নিয়া যাওয়া হয় গার্মেন্টসে।
একেকটা মাইয়া কী যে সুন্দর, শাহানা…। দফাদার যেহেতু সব সুন্দরী মাইয়া বিয়া করছে, তাই মাইয়াগোও বেশিরভাগই সুন্দর। আশেপাশের দশ গেরাম ঘুইরা এমন সুন্দর মাইয়া একটা পাওয়া যাইবো না।
তয় কপাল দেখ-একটা বিয়ের সমন্ধও আসে না। আইবোই বা কেমনে? এইরকম পরিবেশে, এইরকম বাপের মাইয়া-কেডা ঘরের বউ কইরা নিব?
তয় সুন্দরের লোভে পইড়া অনেক পোলা আবার বিয়া করতে চায়। কয়েকটা মাইয়া নিজেরাই বিয়া কইরা শহরে চইলা গেছে-ভিনদেশি, অচেনা পোলা,, বেশি দিন টিকেও না ওইসব বিয়া।
তবে আমার বড় দুই মাইয়ার বিয়াডা এখনও টিক্যা আছে। ডর লাগে-কখন জানি ভাইঙা যায়…।
এতোদিন পর কথা বলার সুযোগ পেয়েছে যেন বৃদ্ধা।বুকে জমানো সব কথা বলেই চলেছে,,।
শাহানা নীরব রাতের মতো চুপচাপ শুনে চলেছে কল্পকাহিনির মতো এই বাস্তবতা -
" গেরামের কেউ এ বাড়ির দিকে ফিরাও তাকায় না। কারো গরু-ছাগল পর্যন্ত এই বাড়ির ত্রি সীমানায় আইতে দেয় না। আগুন লাগলে,পানি ছিটাইতে ও কেউ আইবে না।
এমন জাহন্নামে আসবো ই বা কেন।
যে কয়জন আসে চিকিৎসা করাইতে আসে। চিকিৎসার নাম কইরা তাঁরাও জাদু টুনা করতেই আসে। আমি জানি সবি।
শয়তান ছাড়া শয়তানের কাছে আসবে কেডা?
আর ঐ যে ছোট বউ। এটা হইলো আরেক শয়তান। টাকা কামানোর জন্য দফাদারের সব কু কাজের সাথে হেই জড়িত।
যেই দফাদারের একসময় গেরামে এতো নাম-ডাক আছিলো। তার নাম শুনলে এহন মানুষ থুথু ফালাই।গ্রামের কোনো বিয়ে-শাদি, আয়োজনে ডাকে না। হেই গেলে যদি আবার তাদের বউ-ঝির উপর নজর পড়ে।
শকুনের নজর!
বুঝলি শাহানা,আমি এহানে পইড়া আছি দফাদারের শেষ দেখবার জন্য। "
-জ্বি ছোট মামী,বুঝিনি।
ছোট মামী ডাক টা শুনে স্মিত হাসলো বৃদ্ধা।
তারপর আশ্বস্ত কন্ঠে ফিসফিসিয়ে আবার বললো- "আমার বিশ্বাস এই দফাদারের মৃত্যু হইবো খুব কঠিন ভাবে। আল্লাহ তাকে শান্তির মৃত্যু কখনো ই দিবে না। সে চটপট করতে করতে কঠিন যন্ত্রণা নিয়া একটু একটু কইরা মারা যাবে। আমি তার সেই কঠিন মৃত্যু দেখবার জন্য অপেক্ষা করছি।
মরার আগে এই চোখ দুটি কে শান্তি দিয়ে তবেই মরতে চাই।
এইটুক বলে ক্ষানিকটা রসালো মজার কন্ঠে বৃদ্ধা বললো-ঐ সামনের বিলের একপাশে অনেক কচু শাক লাগাইছি,বুঝলি। প্রতিদিন কচু শাক রান্না করে খাই।
চোখের জ্যোতি ঠিক রাখতে হইবো না?
শয়তানের মৃত্যু যন্ত্রণা দেখতে হইলে শরীর দূর্বল হইলেও এই দুই চোখ অন্ধ হইতে দেওন যাবে না।
কথা শেষ করেই পরম তৃপ্তি নিয়ে হেঁসে উঠলেন বৃদ্ধা।
নিশুতি রাতে প্রগাঢ় সেই হাসি ভয়ংকর শব্দে প্রতিধ্বনিত হলো চারপাশে।
কুকুর গুলো ঘেউঘেউ করে ছুটতে লাগলো এদিক ওদিক।
-আলি দফাদারের বিশ্বস্ত কুকুর কি শিকারীর সন্ধান পাইয়া গেলো শাহানা?
শাহানা বৃদ্ধার প্রশ্নে নিরুত্তর।
নারকেল গাছের শিকড় গেঁড়ে বসা থেকে হঠাৎ সজাগ হওয়ার মতো করে উঠে দাঁড়ালো শাহানা। সামনের বিস্তৃত ধানক্ষেতের মাঝে মাঝে জোনাকিপোকা আলো ছড়াচ্ছে।
মাথা ঝেড়ে কানকে সজাগ করলো আরেকটু।
হাতের মুঠো খুলে স্বতর্পণে একবার শাড়ীর পেছনে নিয়ে কিছু একটা আছে কিনা দেখলো।
নিশ্চিত হয়ে শাড়ি ঠিক করে বৃদ্ধা কে বললেন -ঘুমাতে চলুন মামী।
পরবর্তী পর্বে....
লেখক:কুলচুমা ইয়াছমিন কনা