Story

শুকেন্তো পর্ব-৫(অন্তিম-পর্ব)

September 20, 2026

5
View

উত্তর পাড়ার জমিতে ছোট্ট দুই রুমের একটা ঘর করে দিয়েছে আলি দফাদার।

শাহানা এতোটাও আশা করে নি তার মামার কাছে। এমনকি শাহানার মনে হয়েছিল, হয়তো জায়গা টুকুও দিবে না। অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো শাহানা।

অবশ্য দফাদারের মতো মানুষরা স্বার্থের বাইরে গিয়ে কিছু করে না। শাহানার মায়ের ভাগের জমি বহু বছর ধরে ভুগ করছে দফাদার। হয়তো সেই মানবিকতা থেকে ছোট একটা জমি আর ঘরটা করে দিয়েছে।

এতটুকু মানবিকও কি হতে পারে আলি দফাদার?

এই মানসিকতার আড়ালে অন্য কোনো পরিকল্পনা নেই তো চতুর এই মানবের?

'কলাবতী' গ্রাম আর ' উত্তর পাড়া' র মাঝখানে একটা নদী। শাহানা তার মামার বাড়ির পরিবেশ থেকে একটু দূরত্বে থাকার চেষ্টা করছেন। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া মামার বসতি তে যান না।

কিন্তু উত্তর পাড়ায় কোনো স্কুল নেই। অগত্যা মেয়েকে "কলাবতী " পাড়ারই একটা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন।

শাহানা চিন্তা করছে তার কাজ নিয়ে। এই গ্রামে গৃহস্থালির কাজ জুটানো কষ্টকর। যতটুকু সংশয় হিসেবে শেষ সম্বল আছে তা অতি সামান্য। কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

বাড়ির আঙিনায় কিছু সবজি লাগালেন। ছোট মামী এক বস্তা চালও দিয়েছেন। এরচেয়ে বেশি সহযোগিতা করার সামর্থ্য ই বা কোথায় বৃদ্ধার।

শাহানা দর্জির কাজ জানে। তবে এখানে তো মেশিন নেই। আশেপাশের মানুষের সাথে তেমন পরিচিতি ও নেই। জানা-শোনা না হলে কাপড় সেলাইতেই বা কে দিবে!

তবে শাহানার এইটুকু বিশ্বাস সৃষ্টিকর্তার উপর আছে ,মা-মেয়ের জন্য দু মুঠো ভাতের ব্যবস্থা ঠিক করে নিতে পারবে।

শুকেন্তোর নতুন স্কুলে আজ সপ্তম দিন।

প্রথম কয়েকদিন মা সঙ্গে আসলেও এখন সে একাই যাওয়া আসা করছে।

গ্রামের স্কুলে হঠাৎ এমন শান্ত, শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলা মেয়ে পেয়ে সবাই আগ্রহী শুকেন্তো র প্রতি। ক্লাসের সবাই শুকেন্তো র সাথে কথা বলার চেষ্টা করে। ভাব জমাতে আসে উপর শ্রেণীর শিক্ষার্থীরাও।

তবে কিছু ব্যতিক্রম পাবলিক তো সবখানেই থাকে। তেমনি কিছু ছেলে-মেয়ে শুকেন্তো র নামে নাক ছিঁটকাতে ভুললো না।

-এইরে,শুকেন্তো নামের মেয়েটি নাকি দফাদারের আত্মীয়। এইরকম মেয়ের সাথে কথা বললে নষ্ট হয়ে যাবে। আরো বিভিন্ন রকম কথা তারা রস মিশিয়ে বলে বেড়ায়।

শুকেন্তো র তাতে হেলদোল নেই। সে দিব্যি স্কুলে আসছে,পড়ছে,গল্প করছে,ফিরছে। অনেক বন্ধু জুটে গেলো অল্প কয়দিনে। শুকেন্তোর কিশোরী মনে যেন হঠাৎ নতুন বসন্ত এলো। এতো এতো বন্ধু পাওয়ার আনন্দে পড়াশোনায় ও মনোযোগী হয়ে উঠলো।

কাকতালীয় ভাবে শুকেন্তোর বাড়িতে নানারকম সাহায্য আসতে শুরু হয়েছে কয়দিন ধরে।

গত পরশু দিন ইউনিয়ন পরিষদের এক লোক এসে চাল-ডাল-তেল দিয়ে গেলো। সাথে একটা কার্ডও দিয়েছে। যার মাধ্যমে পরিষদের সহযোগিতা পাবে নানান সময়।

তার পরের দিন এক মহিলা এলো সংস্থা থেকে। ঝুম বৃষ্টিতে ছাতা হাতে পেছনে ব্যাগ নিয়ে ছুটে ঘরে ঢুকলো। ঢুকে বললো -আমাদের সংস্থা মহিলাদের জন্য কাজ করে। আপনি হাতের যে-ই কাজ জানবেন আমরা সেই কাজটি শুরু করতে আপনাকে সাহায্য করবো।

প্রফুল্ল মুখে শাহানা তার দর্জির কাজ জানার কথা বললেন । সেদিন বিকালেই মহিলা ভ্যানে করে একটা মেশিন দিয়ে গেলো।

আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই শাহানার। ছলছল চোখে আল্লাহর শুকরিয়া জানালেন শাহানা।

মায়ের চেয়ে অধিক নির্বোধ বালিকা টি কেবল ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো।

****

সকালের ঝুম বৃষ্টির পর হঠাৎ ধরনী জুড়ে ফকফকা রোদ্দুর। নীলাম্বরী জুড়ে উচ্ছ্বসিত মেঘ। অন্ধকার কাটিয়ে আলো ফুটেছে যেন পৃথিবীতে।

শুকেন্তো প্রতিদিনের মতো স্কুলের জন্য তৈরি হচ্ছে। সকালে অমন বৃষ্টি দেখে মন খারাপ হয়েছিল, নদীতে পানি বেড়ে গেলে যাওয়া হবে না তাই। ঝলমলে রোদ দেখতেই তৈরী হয়ে নিল ঝটপট। শাহানা চুল আঁচড়িয়ে দুই পাশে বেণী করে দিলেন।

স্কুলে পৌঁছাতে ই হৈচৈ কানে এলো শুকেন্তোর। পুরো স্কুল জুড়ে কানাঘুষা চলছে -

উত্তর পাড়ার চেয়ারম্যানের, ভাইয়ের মেয়ে কাজল, আলি দফাদার কে বিয়ে করতে চাই । দফাদার জাদু করে তাকে ঘর থেকে বের করে নিয়েছে। এতো বছর পর দফাদার আবার তার কুৎসিত কাজটি শুরু করেছে। অনেক বছর ধরে আশেপাশের কেউ ঐ বাড়ি যায় না। কিন্তু দু এক বছর ধরে কিছু মানুষ চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে। তাছাড়া দফাদার বৃদ্ধ হয়েছে,শেষ কয় বছরে নতুন কোনো মেয়ের দিকে নজরও দেয়নি। তাই মানুষ ভুলতে বসেছিল তার ঘৃণ্য কার্যাবলি ।

কাজল এই স্কুলের ই নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

তাছাড়া চেয়ারম্যান বাড়ির মেয়ে হওয়ায় বিষয় টা ধামাচাপা দেওয়ার বদলে ছড়িয়ে পড়ছে বেশি।

ঐ যে একটি চক্র শুকেন্তো কে ভালো চোখে দেখে না,তারা শুকেন্তো কে দেখেই ছুটে এলো।

ঘেরাও করে ধরলো চারপাশ থেকে।

কি হচ্ছে বুঝার চেষ্টা করছে শুকেন্তো।

এক মেয়ে বলে উঠলো - ওর আত্মীয় হয় দফাদার। আমাদের কাজলরে ফিরাই না দিলে ওরে বাড়ি যাইতে দেওয়া হইবো না।

-এ-ই মাইয়ারে বাইন্ধা রাখ, অন্য একজন বললো।

-আমাদের এক দাবী সুস্থ ভাবে কাজলরে ফেরত চাই আজকের মধ্যে।

-কোনো চল-চাতুরী র বিয়া আমরা মানি না। এখন যুগ প্লাটাইছে, দফাদারের বিকৃত কাজ এখন চলবে না। আগুন জ্বালায় দিবো দফাদারের সব ঘরে।

-বৃদ্ধ কালেও ভীমরতি যায় না। এক পা কবরে তবুও মাইয়া দেখলে মাথা ঠিক থাকে না।

-দফাদারের উচ্ছেদ চাই,,,,।

একেকজন একেক মন্তব্য করতে ই লাগলো। তাদের মাঝখানে শুকেন্তো বিপাকে। কি করবে সে?

তার অপরাধ টা-ই বা কি? সে কেন এইসবে ফেঁসে গেলো!

শুকেন্তো টলমলে চোখে সবার দিকে চেয়ে আছে।

লিখন হাত উঠিয়ে সবাই কে চুপ করতে বললো। লিখনের কণ্ঠস্বর শুনেই সবাই চুপ হয়ে গেলো।

-শুন সবাই, যা করার আমরাই করবো। দফাদারের আর কোনো অরাজকতা মেনে নেওয়া হবে না 'কলাবতী' গ্রামে। শুধু কলাবতী গ্রাম কেন অন্য কোথাও করতে পারবে না। আর একটা মেয়ের জীবনও আমরা নষ্ট হতে দেবো না।

তবে এখানে শুকেন্তো র কোনো দোষ নেই। হ্যাঁ শুকেন্তো তাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়, কিন্তু দফাদারের বহু বছর ধরে করে আসা নিকৃষ্ট কাজের দায় শুকেন্তোর কেন হবে?

দফাদার প্রতি বার একই অন্যায় করে ছাড় পেয়েছে দুটো কারণে -

প্রথমত, সে নিস্ব পরিবারের মেয়েদের বেশিরভাগ টার্গেট করতো। যাদের কাছে একবার ইজ্জত যাওয়া মানে, সব শেষ।

দ্বিতীয়ত, তার চল চাতুরী কে তখন মানুষ ভয় পেতো।

শুকেন্তো র দিকে ফিরে বললো -শুকেন্তো তুমি যাবে আমাদের সাথে?

শুকেন্তো উপর-নিচ মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিল।

লিখন নামের ছেলেটা তার নাম, পরিচয় কীভাবে জানলো তার মাথার আসছে না।

লিখন দশম শ্রেণিতে পড়ে। উত্তর পাড়ার চেয়ারম্যানের ছেলে। তামাটে গায়ের রঙ।

গোলগাল চেহারা। শরীরের চেয়ে মুখের মাংসের পরিমাণ যেন একটু বেশি। হাসলে মেয়েদের মতো দুই গালের কোণে দুটি টোল পড়ে।

মাঝারি গড়ন, না খুব লম্বা না খাটো।

চুল সাধারণত একটু এলোমেলোই থাকে।

কৌতূহলী চোখজোড়ার সাথে বেমানান, শান্ত মুখভঙ্গি। দেখলেই যে কারোর মায়া হওয়ার মতো মুখশ্রী।

দু'জন শিক্ষক সহ বেশ কিছু শিক্ষার্থী এসেছে দফাদারের বাড়ি।

তাঁরা আসার আগেই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। কাজল নতুন বউয়ের মতো ঘোমটা টেনে বসে আছে। লিখন সেই ঘোমটা এক টানে ফেলে দিলো।

মেয়েটি কে দেখেই অবাক হলো শুকেন্তো।

-এটা তো ঐ দিনের সেই মেয়ে। যাকে জ্বীন ছাড়াতে নিয়ে এসেছিলো। তাহলে ওর নাম কাজল! এতো সুন্দর মেয়েটা এই বৃদ্ধকে বিয়ে করলো!

শুকেন্তো বিষয় টা হজম করতে পারছে না। সে নিজের মনে অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খোঁজতে লাগলো।

শুকেন্তো কে দেখে দৌড়ে এলো ওম্মালকি। পরক্ষণই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে চুপচাপ এক পাশে সরে দাঁড়ালো।

লিখন কাজলের উদ্দেশ্যেে প্রশ্ন করলো -তুই এটা কি করলি কাজল?

-বিয়া করলাম।

স্থির,নিস্তেজ কন্ঠে উত্তর দিলো কাজল।

দশম শ্রেণির আরেক ছাত্র বললো,এতো কথা শুনার সময় নাই। ঘর-বাড়ি সব ভেঙে ফেল।

তারপর কাজলকে নিয়ে যাবো। দেখি কোন শালা আটকায়। কথাটি মুখ থেকে শেষ হওয়ার আগেই ছেলে-মেয়েরা হামলে পড়লো।

হাতে যা পাচ্ছে তা নিয়েই আঘাত করছে,কেউ ঘরের চাউনি খুলে নিচ্ছে, কেউ জিনিসপত্র ছুটে মারছে,কেউ এদিক ওদিক এলোপাতাড়ি লাথি ছুটছে,,,,ঝড়ের বেগে হৈহৈ করে লাফিয়ে এলেন বৃদ্ধা(শাহানর ছোট মামী)।মহা আনন্দে হাত তালি দিতে লাগলেন অনবরত। যেন আজ তার বড় খুশির দিন।

হঠাৎ কোথাও থেকে ছুটে এলো আলি দফাদার। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে যেন কিছু ই বুঝতে পারলোনা। ঘটনা বোধগম্য হতেই কাজলকে টেনে নিয়ে যেতে চাইলো।

শুকেন্তো দৌড়ে গিয়ে সামনে দাঁড়ালো।

-আপনি এরকম করতে পারেন না। আপনি কাজল আপু কে ছেড়ে দিন। এখনই পুলিশ আসবে আপনাকে ধরতে।

শুকেন্তো কে ধাক্কা দেয় দফাদার , পড়ে যাওয়ার আগে লিখন এসে ধরে। লিখন মুষ্টিবদ্ধ হাতে এগিয়ে আসে দফাদরের দিকে।

একটা ঘুষি মুখে লাগাতেই দফাদার চাকু বের করে লিখনের গলায় ধরে।

লিখনের গলায় চুরি ধরে পিছিয়ে যেতে থাকে। সাথে কাজল কে নির্দেশ দেয় তার সাথে যেতে। কাজল পুতুলের মতো নির্বিকার ভাবে দফাদারের সাথে পা বাড়ায়। শুকেন্তো পেছন থেকে এসে দফাদারের মাথায় আঘাত করে। মাথার পেছনে হাত দিয়ে থমকে দাঁড়ায় দফাদার।

ভয়ংকর চক্ষু শুকেন্তোর দিকে নিক্ষেপ করে সেই প্রথম দিনের মতো।

হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে কোথাও ছুটে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে।

আশেপাশে খোঁজেও কোনো হদিস মিলে না দফাদারের।

কাজল কে তার পরিবারে নিয়ে যাওয়া হয়।

বৃদ্ধা হাসতে হাসতে বললো -নিয়া গেলেই কি,দফাদারের খাতায় তো বিশ তম বউ লেখা হইয়া গেলো।

আকাশে-বাতাসে যেন প্রতিধ্বনিত হলো কৌতুক মিশ্রিত সেই কথা।

দফাদারের উনিশ তম বউ বিষাদময় কন্ঠে আপসোস নিয়ে বললো -কত আশা আছিলো, আমি দফাদারের ছোট বউ হইয়া থাকমো আজীবন। আইজ ঐ কাজলের লাইগা আমার শখের পদটা হারাইলাম।

হয়তো আরো কিছুক্ষণ এই নিয়ে বিলাপ করতো।কিন্তু আরেক বউ এসে বললো-খুব তো অহংকার করতা ছোট বউ কইয়া। এহন?

এহন তো দফাদার থাকবো,খাইবো ছোট বউ কাজলের ঘরে।

মুখ ভেঙ্গিয়ে পানসে মুখে চলে গেলো অন্যত্র। তার মুখে আজ পান নেই। শুকেন্তোর মনে হলো-পান খাওয়া লাল জিহ্বা,ঠোঁট ছাড়া উনাকে বড্ড বেমানান লাগছে।

ঘর ভাঙা,দফাদারের পালিয়ে যাওয়া, পুলিশে খবর দেওয়া,,,কোনো কিছুতেই কাওকে বিচলিত দেখা গেলো না। দফাদারের বড় দুই ছেলে মধ্য বয়সী পুরুষ। তাঁরাও কেউ কোনো কথা বললো না।

বাড়ি ফেরার পথে লিখন, শুকেন্তো কে জিজ্ঞেস করে-তোমার নাম শুকেন্তো কেন?

-জানি না। নিচু কন্ঠে উত্তর দিলো শুকেন্তো।

-আমি বলবো?

-হু

-সুখের অনেক কিন্তু তোমার মধ্যে আছে। তাই তুমি সুখেন্তো।

-সুখেন্তো?

-হ্যাঁ, আজ থেকে তোমাকে আমি সুখেন্তো বলে ডাকবো। আমার সুখের কিন্তু=সুখেন্তো। কেমন?

ভয় এবং লজ্জা মিশ্রিত চোখজুড়া খুব ধীরে চাইলো লিখনের দিকে। ঘন কালো ভ্রুযুগলের আড়ালে এক জোড়া ভয়ার্ত চোখ নজর এড়ালো না লিখনের।

লজ্জা ঠিক আছে। কিন্তু ভয় কেন? লিখন হঠাৎ প্রশ্নবিদ্ধ হলো নিজের কাছে।

কয়েক মুহূর্ত পরে সহজভাবে বলল-সুখেন্তো,তোমার মায়ের কাছে আমাদের বাড়ির কিছু কাপড় সেলাই করতে দিতে হবে। কাল সকালে পাঠিয়ে দিবো। আন্টি কে জানিয়ে রেখো।

-মা কাপড় সেলাই করেন, আপনি কীভাবে জানলেন?

লিখন দুর্বুদ্ধ এক হাসি দিয়ে দিগন্ত জুড়া ধানক্ষেতের দিকে চক্ষু স্থির করল।

বোকাসোকা শুকেন্তো যেন হঠাৎই এক বিরাট ধাঁধা নিয়ে বসেছে। কিশোরী মন সেই ধাঁধার উত্তর দিচ্ছে একটা, আর বোকা মস্তিষ্ক ধারণ করছে অন্য টা।

ধাঁধা র হিসাব নিয়ে ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরের রাস্তার দিকে পা বাড়ালো শুকেন্তো।

আজ মস্তিষ্ক টা যেন একটু বেশিই ফাঁকা হয়ে গেছে!

মনে মনে সেই কথা বলতেই লিখনের কন্ঠ ভেসে এলো-"ভালো থেকো সুখের কিন্তু -সুখেন্তো।"

--------------------------------------

শাহানা মেয়েকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিলো।

হঠাৎ দরজায় কিছুর শব্দ হতেই সতর্ক কর্নপাত করে সেদিকে। শাহানা লাইট জ্বালানোর চেষ্টা করলো।

বিদ্যুৎ নেই।

কুপিবাতি জ্বালানোর জন্য দিয়াশলাই খোঁজার চেষ্টা করছে, হাতড়ে সাবধানে,,।

দুই এক মিনিটের ব্যবধানে দরজা খুলে ফেললো এবং হুড়মুড়িয়ে কয়েকজন লোক ঢুকে পড়লো ঘরে।

শাহানার চোখ বরাবর টর্চের আলো নিক্ষেপ করলো।

শাহানা দেখার এবং বুঝার চেষ্টা করলো।

কিন্তু ব্যর্থ।

মেয়ের কথা মাথায় আসতেই ঘুরে দাঁড়ালো। আকস্মিক চোখ বেঁধে ফেললো কেউ। চিৎকার দেওয়ার চেষ্টা করলো।

একটা চিৎকার দেওয়ার সাথে সাথেই মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে পেছন থেকে বেঁধে ফেললো।

মায়ের চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে যায় শুকেন্তো র।

ভয়ার্ত কন্ঠে মা বলে ডাকে,,।

****

শুকেন্তোর যখন জ্ঞান ফিরে তখন নিজেকে আবিষ্কার করে একটা বদ্ধ করে।

দক্ষিণ পাশের ছোট জানালা দিয়ে দিনের আলো প্রবেশ করছে। শুকেন্তো বুঝতে পারলো দিন হয়ে গেছে। তাকে কোথায় আনা হয়েছে? কারা এনেছে?মা কোথায়,,কোনো উত্তর নেই শুকেন্তো র কাছে।

সে ভেবেই চলেছে,,।

তাদের জীবনে বারবার কেন এমন হচ্ছে? এই মাস-ছয়েক ভালোই তো কাটছিলো কিন্তু আবার?

রতন? রতন কি তাদের খোঁজ পেয়ে গেলো তবে!

নিশ্চয় সব রতনের কাজ। ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো শুকেন্তোর।

হঠাৎ ঘরে প্রবেশ করলো আলি দফাদার। রক্ত চক্ষু দিয়ে যেন আগুনের পুলকি বের হচ্ছে। তার পেছনে আরো তিন জন লোক। একজন হুজুর, নাসির এবং অন্য একজন লোক।

-তোর মা'রে জীবন্ত দেখবার চাস? দফাদার প্রশ্ন করলো।

-জ্বী,,কি,,কি হয়েছে আমার মায়ের?

-এহনো কিছু হয় নাই , তবে হইব। যদি তুই আমার কথা না শুনস। চুপচাপ ' কবুল' বলবি। তবেই তোর মা বাঁচবো নাহয়,,,হাহাহা করে হেঁসে উঠলো দফাদার।

ভয়ে শুকেন্তোর মুখ শুকিয়ে এলো।

-মায়ের কিচ্ছু করবেন না। আমি আপনার সব কথা শুনবো। আমার মা'কে কিছু করবেন না।

-বাহ! খুব ভালা। কাজী সাব বিয়া পড়ানো শুরু করেন।

(গল্পের শুরুর অংশে বিয়েতে কবুল বলার বর্ণনা আছে)

নিস্তেজ শুকেন্তো সত্তর উর্ধ্ব বয়সের এক বিভৎস মানুষকে কবুল বললো। তার একুশতম স্ত্রী হিসেবে।

মা'কে বাঁচাতে আর কোনো পথ খোলা ছিলো না।

বুকে খুব কষ্ট হচ্ছে শুকেন্তো র।

শরীর স্থির রাখতে পারছে না। চোখ জুড়া বন্ধ হয়ে আসছে।

তবুও নিজেকে শক্ত করে বললো -আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে চলুন। আমি তো আপনার কথা রেখেছি।

লোকটা হা হা হা করে বিশ্রী ভাবে হেসে উঠলো।

দরজা বন্ধ করে শুকেন্তোর দিকে এগিয়ে এলো।

শুকেন্তো দিগবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়লো।

তখনই তার কানে এলো মায়ের কন্ঠ -শুকেন্তো, দূর্বল হলে চলবে না। এমন নর পিশাচদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। জীবনের পদে পদে এরা থাকবে। এদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে তো হবে না মা। হাতের মুঠো শক্ত কর,মনোবল বাড়া।"

শুকেন্তো হঠাৎ সজোরে লাথি ছুটলো। দফাদার নিজের লজ্জা স্থানে হাত রেখে বসে পড়লো। প্রচন্ড ব্যথায় নিজেকে ধাতস্থ করার আগেই ছুটে বেরিয়ে যায় শুকেন্তো। দরজা পার হওয়ার পর পরই খপ করে পেছন থেকে ধরে ফেলে দফাদার।

পুনরায় ঘরে ঢুকানোর চেষ্টা করে শুকেন্তো কে।শুকেন্তো নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে।

ততক্ষণে পুলিশ নিয়ে হাজির হয় লিখন।

সাথে শাহানা আক্তার। মাকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠে শুকেন্তো।

মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নেন শাহানা।

পুলিশ দফাদারকে থানায় নিয়ে যায়। সাহায্যকারীদের খোঁজার জন্য আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে পুলিশ।

শুকেন্তো মায়ের বুকে লেপ্টে আছে এখনো। কিছুতেই মাকে ছাড়ছে না।

সেদিকে চেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো লিখন।

******

দফাদারের সাজা হয়েছে।

সন্তান-স্ত্রীরা একদিন সবাই মিলে দেখতে গিয়েছিল। শত হোক সে তো একজন স্বামী, একজন বাবা ।

যায়নি শুধু ওম্মালকি আর তার মা।

এতোবড় পরিবার দেখে, হাবিলদার বারেকের, বড্ড আপসোস হলো- "এই জীবনে কিছু ই করতে পারলাম না। আলি দফাদারের জীবন স্বার্থক,এতো গুলো সন্তানের বাবা সে একজন। আমরা আর জীবনে কি করলাম, করিম সাহেব?"

করিম সাহেব বললেন- "বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির পেছনেও কিন্তু দফাদার কম দায়ী না।"

বারেক এবং করিম দুই জনই হু হু করে হেঁসে উঠলো।

একটা ব্যতিক্রমী বিষয় হচ্ছে - দফাদারের একটা মানসিক ডিসওর্ডার ধরা পড়েছে।

সাইন্টিফিক ব্যাখ্যা থেকে বিষয় টা অনেক টা এরকম-"তার এই বহু বিবাহ গঠিত আচরণ কোনো পরিকল্পিত অপরাধ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী মানসিক বিকারের ফল। এটা এক ধরনের ম্যানিক-ইম্পালসিভ পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, যেখানে আবেগের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে এবং সম্পর্ককে সে স্থায়ী বাস্তবতা নয়, বরং ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা হিসেবে দেখে। এতে রোগী অনিশ্চয়তায় ভোগে। এবং বারবার নতুন সঙ্গী খোঁজে নিতে পছন্দ করে। আর তখন সে নিজের ইচ্ছে কে জয় করার জন্য যেকোনো ধরনের কৌশল অবলম্বন করে থাকে।"

ওম্মালকি তার বৃদ্ধ মা'কে নিয়ে শুকেন্তোদের বাসায় এসেছিলো।

বৃদ্ধা ফিসফিস করে শাহানা কে বললো -"তুই যেইদিন এহানে আইলি,হেই দিনই আমার মন বলছিলো, দফাদারের সময় আর বেশি নাই।

শান্তি পাইলাম শাহানা,মেলা শান্তি। কত যুগ অপেক্ষা কইরা এই শান্তি পাইলাম।"

****

শুকেন্তো এখন দশম শ্রেণির ছাত্রী।

পড়ালেখায় গ্রামে এখন তার বেশ সুনাম। কয়েকজন ছেলে-মেয়ে ও পড়ায় শুকেন্তো।

লিখন শহরে পড়াশোনা করে।

আজই গ্রামে এসেছে গ্রীষ্মের ছুটিতে। শুকেন্তো র স্কুল থেকে ফেরার পথে দাঁড়িয়ে আছে।

দূরে আকাশীরং এর স্কুল ড্রেসে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে পেছন ঘুরে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে লিখন বুঝতে পারলো আসল ঘটনা -তাকে দেখেই ওখানে দাঁড়িয়ে গেছে শুকেন্তো । মেয়েটার লজ্জা একটু বেশিই,,,।

মুচকি হেসে এগিয়ে গেলো লিখন।

লিখন কিছু বলার আগেই, শুকেন্তো বলে উঠলো -"কেমন আছো, সুখের কিন্তু _সুখেন্তো?"

হকচকিয়ে গেল লিখন।

-এটা কি হলো?

শুকেন্তো সামনে ঘুরে উত্তর দিলো-

"কি আর হবে? যা হওয়ার তাই!

এই বাক্যই তো বলতেন। আমি-ই নাহয় বলে দিলাম। আপনার আর কষ্ট করে বলতে হলো না।

শুকেন্তোর কথায় হো হো করে হেসে উঠলো লিখন।

তামাটে বর্ণের সেই লিখন এখন পরিপূর্ণ যুবক।

গোলগাল সেই মুখের সাথে যুক্ত হয়েছে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। চুল গুলো আগের মতোই এলোমেলো।

এ-ই যে হাসছে, গালের দুই পাশে টুল পড়েছে। গরমে রক্তিম বর্ণের ঝলক সেই টুলে।

শুকেন্তো আড়চোখে বারংবার দেখছে টুল পড়া সেই তামাটে বর্ণের মায়াবী মুখশ্রী।

লেখক : কুলচুমা ইয়াছমিন কনা

সমাপ্ত

Comments