দুপুরের তপ্ত রোদ তখন তেজ হারাতে শুরু করেছে। শরতের আকাশে ছেঁড়া মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। পথের দু'পাশে জমে থাকা পানিতে আকাশের ফ্যাকাশে নীল রঙ কাঁপছে। দূরের মাঠে সমীরণে নুয়ে পড়ছে ভেজা ঘাস।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ তখন। যাওয়ার সময় প্রচণ্ড পিপাসা পেয়েছিল ; ভেবেছিলাম লতার বাড়ি গিয়ে পানি পান করব , কিন্তু সেই একই তৃষ্ণা নিয়ে ফিরতে হলো। মনে হচ্ছিল, এই তৃষ্ণা শুধু পানির নয়। আপন বোনের কাছে গিয়ে যে মমতার এক পেয়ালা জল আশা করেছিলাম, সেই জলটুকুও যেন আমার ভাগ্যে জোটেনি।
নিজেকে বড্ড বেমানান লাগছিল ,নিজের কাছে। এই বিস্তৃত মাঠ, অবাধ জলরাশি, নীল অন্তরীক্ষ..সবকিছুই আমাকে ধিক্কার দিচ্ছে মনে হল। পুরো প্রকৃতি যেন আমার অসহায়ত্ব, অপমানিত চিত্ত দেখে উপহাস করছে। ধরণী যদি দ্বিখণ্ডিত হতো, এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতাম অতল গহ্বরে।
যতটা দ্রুত গতিতে হাঁটি, পথটা যেন ততই দীর্ঘতর হতে থাকে । যাওয়ার সময়ের সরল পথটা ক্রমশই বন্ধুর ঠেকল। কম্পিত দুর্বল পা বারেবারে হোঁচট খাচ্ছে সমতল পথে। তবুও হাঁটতে থাকি,,।
পেছনে পড়ে রইল সেকান্দারের বিশাল প্রাসাদ, তার উঁচু দেয়াল আর লতার আঁচলে ঝুলে থাকা অসংখ্য চাবি।
আচ্ছা , গাম্ভীর্য আর আভিজাত্যে কানায় কানায় ভরপুর এই রমণী কখনোই কী আমার বোন ছিল? আমার বোন তো সুবোধ বালিকা লতা। যে আমার অস্তিত্বকে অবজ্ঞা করে, জীর্ণতার মাফকাঠিতে বিচার করেছে সে তো মাধবী। জোতদার সেকান্দারের স্ত্রী মাধবী।
আপন মনে হেসে, নিজেকে ধাতস্থ করে কুটিরে পা দিই। মনে হলো, ভাঙা আর কাঁদায় মাখামাখি এই কুটিরটি যেন ভালোবাসা আর সরলতার চাদরে মুড়ানো এক টুকরো স্বর্গ।
----------------------------
১৯৩৮ সাল।
দেওয়ানপুরে খরায় ফেটে যাওয়া মাটির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল কৃষকরা, চারদিকে কৃষকদের আহাজারি । সেই সাথে নিত্য বেড়েই চলছিল জমিদার-জোতদারদের শোষণ, নির্যাতন।
ঠিক তখন কলকাতায় সাহেবরা মিলে
'ফ্লাউড কমিশন ' গঠন করল। গ্রাম বাংলার বাতাস তখন ভারী। হঠাৎ ভিন্ন সুর ওঠল বাতাসে। নীরব মিটিং, ফিসফিস পরিকল্পনা আর টগবগে রক্তে স্রোত আসতে শুরু করেছে। গ্রামে গ্রামে তরুণরা উজ্জীবিত হতে শুরু করে। খুব গোপনে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মননশীল চর্চা শুরু সবে!
আমার স্বামী জাবেদ, চাষা করিম শেখ, লুৎফর হুজুরের বড় ছেলে মিলে কিছু একটা পরিকল্পনা করছে।
১৯৪০ সালে ' ফ্লাউন্ড কমিশনের ' বড় বাবুরা খাতা-কলমে সই করে রায় দিলেন; ফসলের অর্ধেক নয়, চাষীরা পাবে তিন ভাগের দুই ভাগ। আর জোতদার পাবে মাত্র এক ভাগ।
কাগজে কলমে অধিকার মিললেও সেকান্দারের মতো জোতদারদের লাঠির জোর কমেনি।
সেকান্দার হুঙ্কার দিয়ে বলল," সাহেবদের কাগজ দিয়ে কি আর পেট ভরবে চাষার পো? ধান কাচারিতেই উঠবে।"
এর পরের কয়েকটা বছর দেওয়ানপুরের বুকে এক নরক নেমে এলো। আমাদের জীবন তখন বাঁচা-মরার প্রশ্নে প্রতিনিয়ত দুদল্যমান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচ ততটা গ্রামে না পড়লেও, তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের দামামা তখন ঘরে ঘরে।
পেটের ক্ষিধের মুখে, নির্ভীক চাষিরা জোতদারদের খাজনা বয়কট করল । গ্রামে গ্রামে যখন না খেতে পেয়ে মানুষ মরছিল, তখন এক সন্ধ্যায় করিম শেখ শহরে পড়া এক কমরেড বাবুকে নিয়ে গ্রামে ঢুকল। ভাঙা লণ্ঠনের আলোয় কাঁপতে থাকা কৃষকদের দিকে তাকিয়ে করিম শেখ বলল,
"কমিশন আমাদের ভাগ লিখে দিয়ে গেছে, কিন্তু আদায় আমাদেরই করতে হবে। লড়লে বাঁচব, না লড়লে এমনিও মরব।"
নারী-পুরুষ, শিশু আমরা প্রত্যেকে বুঝেছিলাম সময়টা লটারির। বাঁচা-মরার লড়াইয়ের। বাঁচতে হলে একবার শেষ চেষ্টা করতেই হবে!
---------------------------
পৌষের কনকনে ঠান্ডা বাতাস দেওয়ানপুর গ্রামের আমন ধানের মাঠে এক অদ্ভুত উত্তেজনা বয়ে নিয়ে আসছিল।
মাঠের সোনালী ধান কাটার সময় হয়ে গেছে, কিন্তু এবার সেই ধান জোতদার সেকান্দারের কাচারি প্রাঙ্গণে যাচ্ছে না।
করিম শেখ, আমার স্বামী জাবেদ আর তরুণদের লাল পতাকার ডাকে সাড়া দিয়ে কৃষকরা এবার একজোট। তাদের একটাই পণ-"জান দেবো, তবু ধান দেবো না, তেভাগা চাই"।
টান টান উত্তেজনা গ্রাম জুড়ে!
বাঁচব, মরব কিংবা মারব,,। শুণ্য হাত, এক বুক সাহস আর জীবনের আকুতি নিয়ে চলতে থাকল অধিকার আদায়ের চেষ্টা।
বিশাল সিংহদুয়ারওয়ালা জোতদার বাড়ির ভেতরে বসে সেকান্দার তামাক টানছিলেন, কিন্তু তার হাত কাঁপছিল। তার নিজের লেলিয়ে দেওয়া লাঠিয়াল বাহিনী গ্রামের নারীদের কাস্তে আর বঁটির তাড়া খেয়ে অস্ত্র ফেলে পালিয়েছে। শহর থেকে পুলিশ ডেকেও লাভ হয়নি; রাতের অন্ধকারে গ্রামের চারপাশ ঘিরে রাখা হাজারো কৃষকের মশাল আর সমবেত স্লোগান-"নিজ খামারে ধান তোলো!" জোতদার বাড়ির শক্ত দেওয়ালগুলোকে কাঁপিয়ে তুলছিল।
সেকান্দার হয়তো বুঝতে পারলেন, ব্রিটিশ পুলিশের বন্দুকও এই ক্ষুব্ধ জনস্রোতের সামনে তাকে বাঁচাতে পারবে না। সেদিন মাঝরাতেই তার আজীবনের অহংকার আর জমিদারি পোশাক খসে পড়ল। সাধারণ এক চাদরে মুখ ঢেকে, সিন্দুকের সোনা-দানাটুকু বগলে চেপে, বাড়ির পেছনের দিঘির ঘাট থেকে সপরিবারে নৌকায় উঠে তিনি শহরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলেন।
পরদিন দেওয়ানপুরে এক নতুন সকালের সূর্য উঠল। জোতদারের বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে, কিন্তু তার কাচারি প্রাঙ্গণ আজ মুক্ত।
কৃষকরা সুশৃঙ্খলভাবে সমবেত হয়ে জোতদারের বিশাল শস্যগোলার তালা ভাঙল। কোনো লুটপাট হলো না; তেভাগার নিয়ম মেনে ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ বুঝিয়ে দেওয়া হলো সেই চাষীদের, যাদের রক্ত জল করা পরিশ্রমে এই ধান ফলেছে। গ্রামের সকল কৃষকের ইচ্ছায় জাবেদকে জোতদারের সেই গদিতে বসানো হলো , তবে চাবুক মারার জন্য নয়, গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখের হিসাব মেলাতে।
ঠিক দুদিন পর লতা এসে দাঁড়ায় আমার ঘরের সামনে। এটুকু সময়ে মেয়েটার বয়স যেন বেড়ে গেছে দশ বছর। উসকোখুসকো চুল, দুর্বল শরীর, অগোছালো সিল্কের শাড়ি। লতাকে দেখে বিস্মিত হলেও, ওর অমন চেহারায় বড্ড মায়া হলো।
লতা ঠোঁট নেড়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিল। সেই সুযোগ না দিয়ে, ঝাপটে বুকে জড়িয়ে নিই লতাকে। লতা ফুঁপিয়ে ওঠে।
তখন দুই দেহের নিঃশ্বাসে একটাই স্রোত বইছিল। আমরা দুই বোন। আমরা একই রক্তের।
অনেকক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর, লতাকে নিয়ে ঘরে ঢুকি। বোনের এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে বলি, "তোর সব কথা পরে শুনবো। আগে স্নান করে, গোসল করে পরিপাটি হয়ে নেয়। আমার লতাকে এই অগোছালো অবস্থায় বড় বেমানান লাগছে যে!"
মাস তিনেক পরের কথা। দেওয়ানপুরের পরিবেশ ততদিনে অনেকখানি বদলে গেছে। যে কাচারি ঘরে একদিন কৃষকদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো, সেখানে এখন বসেছে গ্রামের প্রথম নৈশ বিদ্যালয়। দিনের বেলা শিশুরা সেখানে সগর্বে বর্ণমালা শেখে, আর রাতে হারিকেনের আলোয় বয়স্ক কৃষকরা হিসাব কষতে শেখে, যেন আর কোনো দিন কোনো শোষক তাদের টিপসই জালিয়াতি করতে না পারে। কৃষকরা নিজেদের ভাগ থেকে এক মুঠো করে ধান বাঁচিয়ে গড়ে তুলেছে একটি 'ধর্মগোলা' বা যৌথ শস্য ব্যাংক। আপদ-বিপদে এখন আর কাউকে চড়া সুদে মহাজনের পা ধরতে হয় না।
পুরো দেওয়ানপুরে সুখ ফিরে এলেও, আমার মনে কোনো সুখ ছিলোনা তখনও।
কারণ, আমার বোন লতা। লতা শয্যাশায়ী। কঠিন রোগ বাসা বেঁধেছে ওর শরীরে।
সেকান্দারের সাথে গিয়ে লতা কেন ফিরে এলো জানি না। লতা সেই কারণ মুখে উচ্চারণ করেনি কখনো।
সেদিনের পর থেকে নিস্তব্ধ পাথরে পরিণত হয়েছে লতা। বিষণ্ন চোখের চারপাশে কালো মেঘের ঘন আস্তরণ। কমলার মতো ওষ্ঠদ্বয়ের রুক্ষতা বেড়েই চলেছে। লতার আকর্ষণীয় ঘনকালো কেশরাশি ক্রমশ ঝরে পড়ছে। মেয়েটা কথা বলতে ভুলে গেছে। নিজের যত্ন নিতে ভুলে গেছে। হাসতে ভুলে গেছে।
তবুও সেই রূপে এখনো পুরুষ মানুষ আকর্ষিত হয়।
বিত্তবান শ্রেণির বেশ কয়জন বছর-দুয়েক লতার চারপাশে সুযোগ খুঁজে বেড়ালো।
নিয়মিত লতার খবর নেওয়া, সহানুভূতি প্রদর্শন, সুস্থতা কামনাসহ সবরকম সহযোগিতা দেখালো।
কিন্তু লতা বড় বিরক্ত হতো তাদের উপস্থিতিতে। বাইরের কোনো পুরুষের উপস্থিতিই সে সহ্য করতে পারতোনা। এদিকে শরীরটাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।
হতবিহ্বল আমিও চাইতাম মেয়েটা আবার হাসুক। সব শোক ঝেড়ে লতার সেই ঝনঝন শব্দের হাসি ফিরে আসুক।
কারো সান্নিধ্যে যদি মেয়েটা আবার হাসি ফিরে পায়! সেটুকু খুব করে প্রত্যাশা করতাম।
কিন্তু ধীরে ধীরে লতার শুভাকাঙ্ক্ষীর সংখ্যা কমতে থাকে। শরীর ভাঙনের সাথে সাথে এক এক করে সরে যাচ্ছিল লতার হাসি ফেরাতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা।
কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলো কবির। মনে হতো ছেলেটা লতাকে ভালোবেসে ফেলেছে। লতার নতুন জীবনের ক্ষীণ রঙ আশা করছিলাম!
গ্রামের সুপুরুষ খ্যাত কবির লতার শরীর নিয়ে প্রথম দিকে বড়ই দুশ্চিন্তা গ্রস্ত ছিলো। লতার মুখে হাসি ফেরাতে চেষ্টার কমতি রাখেনি। নামীদামী উপহার লতার চরণে বিলিয়ে দিতে থাকে। লতার সেদিকে না ছিল মনোযোগ, না ছিলো সামান্য ভ্রুক্ষেপ।
তারপর লতার শারীরিক জটিলতা আরও বাড়ে। একদিন কবির হুট করেই শহরে চলে যায়। কবিরের এমন প্রস্থান আমাকে ব্যথিত করলেও লতার মুখে ছিলো কুটিল তাচ্ছিল্যের হাসি।
খালেদ হোসেন, জোতদারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। ছলচাতুরী করে গ্রামের মানুষের মন জয় করে নিয়েছিল সুযোগ বুঝে। পালানোর ভয়ে, সবার প্রিয় হওয়ার অভিপ্রায়ে, তোষামোদ শুরু করে। ধীরে গ্রামের মানুষের কাছে স্থান করে নেয়।
লতার আশেপাশে তাঁর আনাগোনা চললো কিছুদিন। বন্ধু পত্নীর প্রতি বড়ই বিচলিত দেখা গেলো খালেদ হোসেনকে। সকাল-বিকাল নিয়ম করে খোঁজ-খবর রাখেন। নিজে এসে দেখে যান।
অসুস্থ লতার প্রতি তার মায়া দেখে আরাম বোধ করি আমিও। কিন্তু লতার চোখ দুটো তাকে দেখলেই বিরক্তিতে খিঁচে আসতো। আমার হাতটা ধরে বসিয়ে রাখত জোর করে। একদিন কি একটা কাজে লতার হাতটা ছাড়িয়ে বাইরে যায়। সেদিন লতার শরীরে জ্বরের উত্তাপ ছিলো বেশ। আমি নিজেই খালেদ হোসেনকে বলি, ওর পাশটায় থাকুন। আমি এখুনি আসছি। লতার ঘোলা চোখদ্বয়ে হাহাকার ওঠে। আমি আশ্বস্ত করে বেরিয়ে আসি।
মিনিট-পাঁচেক পরে ফিরে গিয়ে দেখি, লতার জ্বরে অবশ প্রায় শরীরের উপর হামলে পড়েছে খালেদ। অস্পষ্ট গোঙানিতে মেয়েটা ছটফট করছে!
তারপর আর কখনো কোনো পুরুষ মানুষের কোনো আন্তরিকতা, সহযোগিতায় আমি বিশ্বাস করতে পারি না। পুরুষ মানুষ নারীর মন, অসুস্থতা কোনোটাই বুঝে না। তারা শুধু শরীরের ভাষা বুঝে!
লতা হয়তো আরও আগেই বুঝে ছিলো সেই সত্যি। তাই তো পুরুষদের প্রতি এতো বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা জন্মেছিল চোখে-মুখে।
পুরুষের মনে নারী দেহের সৌন্দর্য হলো কাম আর লালসার। শরীর ছোঁয়ার তাড়না যতটা থাকে, নারীর মন ছোঁয়ার তাড়না তার অর্ধেকও বোধহয় থাকেনা।
ফাল্গুনের এক বিকেলে লতা খোলা আকাশ দেখতে চাইল। ততদিনে লতার শরীরে পোকা এসেছে।
মুখে, পিঠে ঘা।
দানা না খাওয়ার বাইশতম দিন।
এতদিন পানি ব্যতীত কিছুই খেতে পারেনি। লতার সেই ঝলমলে চুলের মাথা ন্যাড়া হয়েছে আরও দুমাস আগে। টানা টানা চোখ দুটো বিশাল গহ্বরে।
একসময় যেই রূপ একবার দেখলে, বারবার ফিরে দেখার বাসনা অনুভব করতো মানুষ, সেই চেহারা ভয়ংকর কুৎসিত হয়ে উঠেছে। হঠাৎ দেখলে ভয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয় সকলে। চোখ ফেরাতে পারিনা শুধু আমি।
কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে লতাকে বাইরে নিয়ে আসি। ধরে যে আনবো ততটুকু অক্ষত জায়গাও মেয়েটির শরীরে নেই। অগত্যা বিছানা সহ তুলে এনেছি বাইরে। শেষ কয়েক মাসে এই একটা ইচ্ছায় প্রকাশ করেছে লতা!
লতা চোখ ঘুরিয়ে আশপাশ দেখছে। গভীর মনোযোগে।
ফাল্গুনের মায়াময় বিকেল নেমেছে গ্রামজুড়ে। পশ্চিম আকাশের নরম সোনালি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে ধানের খেত আর মেঠোপথে। আমের মুকুলের গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস, দূরের শিমুল-পলাশে লেগেছে আগুনরাঙা রং। পুকুরপাড়ে কচুরিপানা দুলছে মৃদু হাওয়ায়, বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে ভেসে আসছে দোয়েলের ডাক। লতার চোখে-মুখে আনন্দ। বহুদিন পর মেয়েটির ঠোঁটের আগায় হাসির রেখা। অন্য কারো কাছে হয়তো বিকৃত-শীর্ণ মুখের সেই হাসি কুৎসিত ঠেকবে। কিন্তু আমার বড় পবিত্র লাগলো সেই হাসি।
পাখির গুঞ্জনের সাথে একটা ডাক বড় কুৎসিত আর ভয়ংকর লাগছিল । মাথার উপর কয়েকটা কাক ক্রমশ ডেকে যাচ্ছে। বিশ্রী কা কা শব্দে কানে আঙুল দেওয়ার অবস্থা।
ফাল্গুনী আকাশ দেখতে দেখতে লতা ইশারায় পানি চাইলো। চামচ দিয়ে মুখে পানি দিই। লতার অবসন্ন চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। স্থির চোখে চেয়ে আছে আমার দিকে। খানিকটা সময় ধরে ঠাই চেয়ে আছে। নড়চড় নেই।
আমি লতার কপাল স্পর্শ করি, হাত স্পর্শ করি,পা স্পর্শ করি। দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি নিয়েছে লতার শরীর। ভারি নিঃশ্বাস ফেলে শুকরিয়া করি আল্লাহর দরবারে। দম বন্ধকর কষ্ট অনুভব করছি। লুটিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে ভূতলে, তীব্র হাহাকার আকাশে জমিনে দুলছে। তবুও আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ আমার বোনকে কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়ায়।
একটা অংক আমি মিলাতে পারিনা। কপাল খারাপ ছিলো আমার। চির দুঃখী ছিলাম আমি। অসুন্দর ছিলাম আমি। কিন্তু অতি রূপসী আর ভাগ্যবতী লতার জীবনটা কেন এমন হলো?
লতা তো এই কষ্টের ভাগিদার হওয়ার কথা নয়, তবে কেন এতো কষ্ট পেলো? এই ভাগ্য কি বিধাতা লিখে দিয়েছে নাকি লতা নিজের ইচ্ছায় বেছে নিয়েছে!
আমার মাঝেমধ্যেই মনে হয়, লতা কোনো এক প্রায়শ্চিত্তের জন্য নিজের আত্মাকে কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু অসুখ? শরীরের ভাঙন? ভয়ংকর রূপের বিভৎস হালের জন্য দায়ী কে!
রূপে পরিপূর্ণ বসন্তে বিদায় নিলো লতার সমস্ত জৌলুস। ধরণীতে বসন্তের সুর। পল্লবে পল্লবে সুমধুর সমীরণ। কিন্তু লতার বসন্ত হারিয়েছে আরও অনেক আগে। যবে থেকে লতা রূপ হারিয়েছে তবে থেকেই লতার বসন্ত ডুবে গেছে দিগন্তে। এতোদিন জৌলুসের শরৎকাল ঘিরেছিল লতাকে।
আজ লতার শরৎ নীলে নীলাভ হলো বাসন্তী আকাশ।
কুলচুমা ইয়াছমিন(কনা)