রাত ১২টায় চট্টগ্রাম ছেড়ে আসা 'তূর্ণা এক্সপ্রেস'-এর 'ঝ' এসি বগিটিতে ভোরের আলো ফুটতেই ব্যস্ততা বেড়ে গিয়েছিল।
আধা ঘন্টা দেরীতে ছাড়াতে, অনেক যাত্রীর মেজাজ বিগড়ে আছে।
সকাল পৌনে ৬টা নাগাদ ট্রেনটি বিমানবন্দর স্টেশনে এসে পৌঁছালে বেশ ক’জন যাত্রী লাগেজ টেনে নেমে গেলেন।
ট্রেনটি আবার ঢাকার অভিমুখে গতি নিতেই ১২ নম্বর সিটের যাত্রী আসিফ সাহেব খেয়াল করলেন—ওপরের ওভারহেড লাগেজ র্যাকে একখানা ভারী মেটালিক অ্যাশ রঙের স্যুটকেস একাই পড়ে আছে। স্যুটকেসের নীচে সিট ফাঁকা।
আসিফ সাহেব পাশের সিটের জহির সাহেবকে ডেকে বললেন, "ভাই, দেখুন তো! স্যুটকেসটা কি কেউ ভুল করে ফেলে রেখে নেমে গেলো কিনা?"
কথাটা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না। এসি বগির যাত্রীরা নিজেদের সিট ছেড়ে ব্যাগটার নিচে এসে জড়ো হতে লাগলেন।
বিমানবন্দর স্টেশনে এত যাত্রী নামল, তাদের মধ্যেই হয়তো কেউ তাড়াহুড়োয় ব্যাগটা ফেলে নেমে গেছেন—এমনটাই ধরে নিলেন সবাই।
শুরু হলো জল্পনা-কল্পনা। জহির সাহেব বললেন, "ব্যাগটা বেশ ভারী আর ধাতব। জিপারও নেই, কোডেড লক করা। পুলিশে খবর দেওয়া উচিত নয় তো? আজকাল তো ব্যাগে কত কী থাকে! বোমা- টোমা নয় তো!"
অন্য এক যাত্রী ভয় পেয়ে বললেন, "আরে ভাই, আগে ট্রেনের অ্যাটেনডেন্টকে ডাকুন। কে নেমে গেছে ওনি হয়তো জানতে পারবেন।"
এভাবেই ব্যাগটির উৎস, ভেতরে কী থাকতে পারে এবং কার ফেলে যাওয়া—তা নিয়ে পুরো বগিতে চলল টানা ১০ মিনিটের সরগরম আলাপ-আলোচনা আর তীব্র কৌতূহল।
পরিস্থিতি যখন প্রায় আতঙ্ক আর উত্তেজনার চরমে পৌঁছেছে, ঠিক তখনই বগির পেছনের খটখট শব্দে দরজা খুলল।
দরজা খুলে এলেন লাল টি-শার্ট পরা এক যাত্রী। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। চুল উস্কোখুস্কো, মুখে ঘুম ঘুম ভাব। তিনি এতগুলো মানুষকে নিজের সিটের কাছে ভিড় করে থাকতে দেখে কিছুটা থমকে দাঁড়ালেন।
ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে তিনি বেশ সহজভাবে বললেন, "কী হয়েছে ভাই? আপনারা আমার স্যুটকেসের দিকে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?"
আসিফ সাহেব অবাক হয়ে বললেন, "আপনার স্যুটকেস? বিমানবন্দর স্টেশনে এত লোক নামল, সবাই তো ভাবল ভুলে ব্যাগ ফেলে কেউ নেমে গেছে!"
লোকটি একগাল হেসে উত্তর দিলেন, "আরে না ভাই! আমি চট্টগ্রাম থেকেই আছি। সকালে বাথরুমে একটু বেশি সময় লাগে, তাই বিমানবন্দর স্টেশন আসার আগেই ভেতরে ঢুকেছিলাম। বের হতে হতে ট্রেন স্টেশন ছেড়ে দিল। ব্যাগ ফেলার লোক আমি নই ভাই!"
যাত্রীরা যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। থমথমে রহস্যময় পরিবেশটা এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল, আর ঠিক সকাল ৬টায় তূর্ণা এক্সপ্রেস এসে থামল কমলাপুর স্টেশনের ৪নং প্ল্যাটফর্মে।