সাত দিন ধরে টানা বৃষ্টি । চারপাশে পানি জমেছে । নিজেকে সামলে সতর্কতার সঙ্গে পা বাড়িয়ে চলেছে নিঝুম। নীল চুড়ি পড়া হাত দুটো ধরে আছে গাঘরার প্রান্ত। কাঁধে ব্যাগ। শূন্য দৃষ্টি মেলে, ধানের নরম কাঁদার আল দিয়ে হাঁটছে । এলোমেলো পা ফেলছে অনভ্যস্ত গতিতে। দূর্বল শরীর টা টেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে ।
দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলে , দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছে আবার হাঁটা শুরু করলো ।
অর্ধেক টেনে দেওয়া ঘোমটার নিচে খোলা চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু আছড়ে পড়ছে চোখে-মুখে । ঘাগরা, চুল,ঘোমটা, কাঁধের ব্যাগ সব যেন একসাথে বিদ্রুহ ঘোষণা করেছে আজ।
তবু পা চালিয়ে যাচ্ছে নিঝুম।
পাকা রাস্তা ফেলে এই কাঁচা রাস্তা ধরার দুটি কারণ। চেনাজানা কারো সাথে দেখা হওয়ার ভয় নেই। আর এই পথে গেলে ট্রেন স্টেশন কাছে। তাই নিঝুম অসুবিধা হবে বুঝেও এগিয়ে যাচ্ছে।
দম বন্ধ অনুভব হচ্ছে। জীবনের সব মানে যেন মিছে।বেঁচে থাকার স্পৃহা এক ঝটকায় কোথায় গিয়ে ঠেকলো!
চারপাশের পুরো প্রকৃতি সদ্য ধোঁয়া হাঁড়ি-পাতিলের মতো চকচক করছে। ফকফকা আকাশ। একদম পরিষ্কার, নির্মল,সতেজ। বিলে,ডোবায় এখনো পানি জমে আছে। কাঁচা রাস্তার পানি যদিও নেমে গেছে কিন্তু কাঁদায় পিচ্চিল হয়ে আছে।
পা যেন আর চলছে না নিঝুমের। একটি বকুল গাছের নিচে গিয়ে বসলো ।
চারপাশে তাকিয়ে, কাওকে না দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো উনিশ বছরের তরুণী নিঝুম মজুমদার ।
মজুমদার বাড়ির কেউ না হয়ে ও নিজের নামের সাথে এই পদবী কালেরচক্রে বাঁধা পড়েছে একটু একটু করে। মজুমদার বাড়ির কর্তা তাজউদ্দিন মজুমদার তিন বছরের ছোট্ট ফুটফুটে এক মেয়েকে নিয়ে বাড়ি এসেছিলেন এমনি কোনো এক বর্ষণমুখর দিনে।
তাজউদ্দীন মজুমদার প্রায় ব্যবসায়ের কাজে বাইরে যেতেন। একদিন ছোট এক মেয়ে নিয়ে ফেরায় গ্রামের অনেকেই বেশ অবাক হয়েছিলেন। কানাঘুঁষা ও কম হয়নি এই নিয়ে। জনে জনে রটে গিয়েছিলো, মজুমদার সাহেবের নিশ্চয় শহরে আরেকটা বউ আছে। এই জন্যে তো বেশির ভাগ দিন শহরেই পড়ে থাকেন ব্যবসার নাম করে। ঐ বউয়ের সাথে নিশ্চয় কোনো ঝামেলা হয়েছে। তাই তো এখন মেয়েকে বাড়ি নিয়ে এসেছেন।
এমন অনেক মন্তব্য সবাই করলেও চুপ ছিলেন শুধু মাত্র মজুমদার সাহেবের গৃহকর্ত্রী আয়েশা মজুমদার। অসম্ভব ধৈর্য্যশীল,দূরন্তর বুদ্ধির পাকা এই গৃহকর্ত্রী ছিলেন নিরব। অবশ্য তিনি কথার চেয়ে কাজেই বেশি মনোযোগী সবসময়।
স্বামীর কোল থেকে স্ব স্নেহে নিজের কাছে নেন ছোট্ট নিঝুম কে।
পরীর মতো সুন্দর মেয়েটির নোংরা পোশাক পাল্টে গোসল করিয়ে, খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। কাজের ছেলে কলিম কে নতুন কাপড়, খেলনাসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু করার তাগিদ দিলেন।
হিসাব নিকাশ শেষে ঘুমাতে আসলেন মজুমদার সাহেব।
অত্যন্ত শান্ত-চিন্তাশীল কন্ঠে গৃহিণী বললেন, ' কি সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে এনে দিলেন আমাকে। মনে মনে এমন একটা মেয়েই আমি চাচ্ছিলাম। অনেক ধন্যবাদ এতো সুন্দর উপহারের জন্য। আমার তো আর কোনো সন্তান হবে না। একটা ই মাত্র ছেলে। কিন্তু সবসময় আমার শখ ছিলো একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তানের। ' এই বলে চোখ বুঝলেন আয়েশা। মনে মনে খুব খুশি হলেন এই ভেবে যে, "মজুমদার সাহেব তার কথা ভাবেন তাহলে! কই আমি তো ভাবতাম এই মানুষ কখনো ই আমার ভালো-মন্দ নিয়ে চিন্তা করে না।"
আয়েশার ভাবনায় ছেদ পড়লো মজুমদারের কন্ঠে,
" আয়েশা তুমি যা ভাবছো বিষয় টা সেরকম না।মেয়েটি আসলে......। "
আমি আর কিছু শুনতে চাই না এখন। ওকে আমি আমার নিজের মেয়ের মতো বড় করতে চাই কর্তা সাহেব। আপনার বাকি কথা আমার আপাতত শোনার ইচ্ছা বা প্রয়োজন কোনো টা-ই নেই। কে ও,কি পরিচয় এসব এখন থাক।
যদি কখনো নিজের জানার আগ্রহ আসে আপনাকে নিশ্চয় বলবো । এখন ঘুমান আপনাকে অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
আয়েশা’র কোমলতা যতটা হৃদয়স্পর্শী কঠোরতা ততটাই নিষ্ঠুর পাথর । নিজের মর্জি ছাড়া জগৎ সংসারের কোনো কিছু দিয়ে তাকে কাবু করা যায় না।তাই অযথা গৃহিণীর মনোঃ আসনে ধাক্কা না দিয়ে নিরব হয়ে গেলেন মজুমদার সাহেব।
অল্প কয় দিনেই মেয়েটি ঘরে আনন্দের সুর তুললো। বাড়ির সবার প্রিয় মুখ হয়ে উঠলো।
মজুমদার সাহেব কেমন একটা দূরত্ব রেখে চলতো ছোট্ট নিঝুমের সাথে। বাড়ির বাকি সবাই নিঝুম পাখি, নিঝুম পাখি বলে পাগল।
মার্বেলের মতো গোল দুটি চোখে যেন রাজ্যের কৌতূহল জমা। ঠোঁটের কোনায় হাসি মেখে আদো আদো বুলি, বার্মি ডলের মতো গোল মুখের সাথে কুঁকড়ানো চুলগুলো যেন একদম মানানসই।
আয়েশা মজুমদারের একটাই তাড়া, কখন হাতের কাজ গুছিয়ে নিঝুম কে সময় দেওয়া যায়। ওর মুখের মা' ডাক যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দ। কি ছন্দ সুরে মেয়েটা মা ডাকে!
মজুমদার সাহেবের একমাত্র ছেলে সোয়াত মজুমদার। নিঝুমের দশ বছরের বড় সোয়াত। এই সোয়াতের জন্মের পরপর আয়েশার জরায়ুতে একটা বড় অপারেশন হয়। তখনই ডাক্তার জানিয়েছে সে আর কখনো মা হতে পারবে না। অথচ বিয়ের আগে থেকেই আয়েশার একটা পুতুলের মতো মেয়ের শখ। তাই নিঝুম কে পেয়ে আয়েশার বহুদিন ধরে চেপে রাখা অপূর্ণতা যেন ঘুচে গেলো।
ধীরে ধীরে সোয়াতের কাছেও প্রিয় হয়ে উঠে নিঝুম।
সোয়াত নিঝুম কে আদর করে ' পাখি' ডাকে। পড়াশোনার বাইরে পুরো টা সময় সোয়াত তার আদরের পাখির সাথে কাটায়।
বাড়ির কাজের লোকদের মধ্যে ও প্রতিযোগিতা চলে কে করবে নিঝুম পাখির যত্ন। তাদের এই প্রতিযোগিতার,ঝগড়ার অবসানে গৃহকর্ত্রী দিন ভাগ করে দিলেন। একেক দিন একেকজনের দায়িত্বে থাকে নিঝুম।
এসমস্ত বিষয়ে মৌন থাকেন একমাত্র মজুমদার সাহেব । নিঝুম কে নিয়ে এতো বাড়াবাড়ি তিনি পছন্দ করছেন কি অপছন্দ সেটা বুঝা মুশকিল। উনি পুরো ব্যাপারটা এতটাই এড়িয়ে চলেন যেন বাড়িতে নতুন কিছুই ঘটছে না।
মাঝে মাঝে নিঝুম উনার সামনে পড়ে যায়। তখন হয় তিনি অন্যত্র সরে যান অথবা নিঝুম নিজেই সরে আসে। কারণ নিঝুমের অবুঝ মনে গেঁথে গিয়েছে এ বাড়িতে চাচা ছাড়া সবাই তাকে খুব ভালোবাসে,আদর করে । নিঝুম আয়েশা কে মা ডাকলেও, মজুমদার সাহেব কে চাচা ডাকে। আয়েশা মেয়ে কে বাবা ডাকতে বলেছিলেন। কিন্তু তাতে ঘোর আপত্তি জানালেন মজুমদার। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, বাবা ডাকলে নাকি গ্রামের মানুষ যা রটিয়েছে তাই সত্যি মনে করবে।
তাই নিঝুম নিজে নিজে এই ডাকটা আয়ত্ত করেছে কাজের লোকদের দেখাদেখি।
আয়েশার এটা ভালো না লাগলেও কিছু ই মুখ ফুটে আর বলেন নি।
হুট করে দূর-শহর থেকে নিয়ে আসা নিঝুমের মনে নেই তার কোনো অতীত। শুধু এ-ই টুকুন জানে, চাচা একদিন ওকে এনে মায়ের কোলে দিয়েছিলো। ব্যাস তার পর থেকে জীবনের সবকিছুতে জড়িয়ে আছে মজুমদার বাড়ি । আদর,যত্ন,ভালোবাসার কোনো অভাব একদিনের জন্যও সে বুঝতে পারেনি।
ছোট রাজ্যের একমাত্র রাজকন্যার মতোই বেড়ে ওঠা নিঝুমের।
মাঝে মাঝে নিঝুমের সব জানতে ইচ্ছে করে। তার অতীত, তার সত্যিকারের পরিচয় । নিঝুমের বয়স যখন তোরো-চৌদ্দ তখন মা কে একবার প্রশ্ন করেছিলো নিঝুম।
তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ' তোমার বাবা ছাড়া এই সত্যি কেউ জানেনা নিঝুম। তাছাড়া জানার দরকার ও নেই। তুমি আমার মেয়ে এটাই কি যথেষ্ট নয় মা? আমি চাই না তুমি আর কখনো এসব ব্যাপারে কথা বল।'
মা'য়ের মলিন মুখে বলা কথা। আর কঠিন কন্ঠের সাথে জলে পূর্ণ চোখ দুটো দেখে : সেদিন নিঝুম বুঝেছিলো মা কষ্ট পেয়েছেন । এরপর থেকে নিঝুম ও আর কখনো তার অতীত নিয়ে কোনো প্রশ্ন করে নি।
নিঝুমের বয়স যখন পনেরো, হুট করে একদিন মারা গেলেন আয়েশা মজুমদার। মায়ের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়ে নিঝুম। যে-ই মানুষ টা তাকে সবচেয়ে বেশি আগলে রাখতো সেই মানুষ টাও চলে গেলো।
এতো বড় বাড়ি। এতো এতো কাজ সব এলোমেলো হয়ে গেলো। সংসারের নিত্য নিয়মের ছন্দে আসলো পরিবর্তন। কাজের লোক থাকলেও সঠিক নির্দেশনা আর তদারকির অভাবে তারাও কাজে ফাঁকি দিতে শুরু করলো।
নিঝুম কয়েকদিন চুপচাপ থাকলেও ধীরে ধীরে বাড়ির সব কাজে মনোযোগ দিলো। কাঁচা মাটির মতো নরম নিঝুম কাঁধে তুলে নিলো বিরাট এক সংসারের দায়িত্ব।
বাড়ির সব কাজ একা হাতে সামলাতে শুরু করলো। কাজের তদারকি করা, কাজ বুঝিয়ে দেওয়া, মজুমদার সাহেবের খাবার , সবজি ক্ষেত সব।
যেন মায়ের সব কাজ এখন তার দায়িত্ব।
তাই মায়ের মতো সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখতে হলো মজুমদার সাহেবের।
আর আজ সেই মানুষ টাই কিনা তার সাথে,,!
চোখের জল মুচে উঠে দাঁড়ালো নিঝুম। সামনের তাল গাছের দিকে তাকাতেই বিপরীত দিক থেকে সোয়াত কে আসতে দেখে : সমস্ত শরীর অসাড় হয়ে যায় অবস্থা।
সোয়াত শহরে পড়াশোনা করে। হয়তো ছুটি হয়েছে বলে বাড়ি আসছে।
-সোয়াত ভাই? তুমি! মিনমিনে শুষ্ক গলায় জিজ্ঞেস করলো নিঝুম
- পাখি তুই এখানে কেন ? পিচ্ছিল কাদা মাখা রাস্তায় কেন বের হলি ? তাও এতদূর চলে এলি। একা কেন এসেছিস?পড়ে গেলে কি হতো? আর তোর কাঁধে ব্যাগ কেন?
নিঝুম চুপচাপ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। চোখ দিয়ে বেয়ে চলছে অঝোর ধারা।
কি সমস্যা তোর জবাব দিচ্ছিস না কেন। একা একা এমন কাদামাখা রাস্তায় কি করিস তুই। ব্যাগে কি?
চলচল চোখে নিঝুম কে চেয়ে থাকতে দেখে কন্ঠ নামিয়ে সোয়াত পুনরায় বললো, "আমাদের মহারানীর কি মন খারাপ? আপনার লিস্টের সব ফুল গাছ আর বই অর্ডার করেছি। আজই পৌঁছে যাবে। চলেন বাড়ি যায়। "
জলে ভর্তি চোখে তালপুকুরের দিকে তাকিয়ে আছে নিঝুম। টলটলে-স্বচ্ছ ভরা পুকুরে তালগাছের ছায়া পড়েছে। শিল্পের তুলিতে আঁকা ছবির মতো! হঠাৎ হঠাৎ ছোট ঢেউ উঠে মিলিয়ে যাচ্ছ।
একদল শুভ্র হাঁস পালক দুলিয়ে তালপুকুরে নেমে পড়লো। পুকুরে তাদের সাঁতার ঢেউ তুললো।
বড় বড় ঢেউ একটার সাথে আরেকটা মিলিয়ে যাচ্ছে।
সেই ঢেউয়ে লাল-সাদা শাপলা ডুব দিচ্ছে, উঠছে।
পুকুরের পানিতে জন্ম নেওয়া কলমিলতাগুলো বেশ মোটা আর লম্বা হয়ে গেছে। হঠাৎ একটি শাপ পাশের ক্ষেতের আল দিয়ে এসে কলমিলতায় ঢুকে গেলো।
"আমিও যদি এভাবে লুকিয়ে যেতে পারতাম কোথাও!
সমগ্র জগতসংসারের আড়ালে।" মনে মনে বললো নিঝুম।
নিঝুম ? বাড়ি চল। সোয়াত কিছু টা রাগান্বিত স্বরে বললো।
"আমি যাবো না সোয়াত ভাই। আপনি বাড়ি চলে যান। ওটা আমার বাড়ি নই। আর কোন টা কে বাড়ি বলছি? ওটা একটা নরক।"
কি হয়েছে : কি সব বলছিস নিঝুম?
হ্যাঁ সোয়াত ভাই ঠিকই বলছি।
কি সমস্যা বল!
আমি বলতে পারবো না।
"না বললে তোকে অন্য কোথাও যেতে দেবো না। এবং বাড়ি ফিরতে হবে। "
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঝুম একটু এগিয়ে এসে বললো, "ঠিক আছে শুনেন তাহলে-
"আপনি তো জানেন আপনার বাবা আমার সাথে খুব একটা কথা বলতেন না। কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর থেকে উনি আমার সাথে কথা বলা শুরু করেন। যেহেতু মা নেই তাই আমিও চেষ্টা করতাম উনার কখন কি প্রয়োজন খেয়াল রাখতে। উনার খাবার,ওষুধ সবকিছু ঠিক সময়ে পাঠিয়ে দিতাম।
একদিন মায়ের কথা ভেবে আমি খুব কাঁদছিলাম। চাচা আমার রুমে এলেন। চুপচাপ আমার শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমি প্রথম বারের মতো যেন বাবার অস্তিত্ব অনুভব করলাম। পিতৃস্নেহ লাভে কাতর আমি চাচার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্ক জড়তা কাটিয়ে উঠলো।
চাচা কে তো ছোটবেলা থেকেই বাবার আসেন বসিয়েছি মনে মনে। এবার বাস্তবে
বাবার প্রিয় মেয়ে হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলাম। উনার কখন, কি দরকার তা যেন আমার মুখস্থ করা বইয়ের পাতা।
তারপর একদিন পাশের পাড়ার নিজামুদ্দিন আসলেন। বৈঠক ঘরে চাচা আর উনি বসে ছিলেন। চা নিয়ে যেতে যেতে উনাদের আলাপ কানে এলো।
"আপনার মেয়ে নিঝুম কে আমার ছেলের বউ করতে চাই।"
নিজামুদ্দিনের কথা শেষ না হতেই চাচা হঠাৎ রেগে গেলেন। চেঁচিয়ে বললেন, " আপনি এখনি আমার ঘর থেকে বের হয়ে যান। "
আমি অবাক হলাম। ভাবলাম হয়তো আমাকে এই মুহূর্তে দূরে করতে চান না। মা মারা যাওয়ার পর আমিও না থাকলে উনি একেবারে একা হয়ে পড়বেন। উনার প্রতি খুব মায়া হলো।
সেদিন রাতে চাচা আর খাবার খেলেন না । সারারাত পায়চারি করে কাটিয়ে দিলেন। পরের কয়েকদিন পরপর কয়েকজন আমাকে বিয়ে দেওয়ার কথা বললেন। প্রতিবারই চাচা ভীষণ রেগে যেতেন এবং খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেন।
গতকাল তিনি বাজার থেকে একটা বেনারসি এনে আমার হাতে দিয়ে বললেন, " নিঝুম এটা পড়ে রেডি হয়ে নাও। এক ঘন্টা পর কাজী আসবে তোমার বিয়ে পড়াতে।"
বিস্মিত আমি ভয়ে ভয়ে শাড়ি টা হাতে নিলাম।উনার রক্তচক্ষুর দিকে চেয়ে কিছু বলার সাহস পেলাম না। আপনাকে কল করলাম। আপনার নাম্বারে বারবার ট্রাই করেও সংযোগ পাইনি। অগত্যা শাড়ি টা পড়ে নিলাম। হতবিহ্বল আমি বুঝতে পারছিলাম না কি করবো। মনে হচ্ছিল, সৃষ্টিকর্তা আমার চেয়ে অসহায় কারো ভাগ্য লেখেননি।
কাজী, চাচা আর দুজন লোক আমার রুমে আসলো।আমাকে কবুল বলতে বললো। একবার, দুইবার,তিনবার। চাচা রেগে যাবে ভয়ে গলার পানি শুকিয়ে গেছে ততক্ষণে।
ভাবলাম, এই মানুষ টা কি আমার খারাপ চাইতে পারে? পারে না। যে-ই মানুষ টা আমাকে বড় করার দায়িত্ব নিয়েছে, একটা পরিবার দিয়েছে,রাজকন্যার মতো করে বড় হওয়ার সুযোগ দিয়েছে সে নিশ্চয় আমার জন্য খারাপ পাত্র ঠিক করবে না।
দুচোখ বন্ধ করে কবুল বলে দিলাম।
তারপর,,,
হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো নিঝুম।
অস্থির কন্ঠে সোয়াত বললো, ' তারপর নিঝুম? তারপর বল প্লিজ।'
নিঝুম কে কিছুক্ষণ কান্না করার সুযোগ দিয়ে, পুনরায় জিজ্ঞেস করলো সোয়াত-" তারপর কি হলো বল প্লিজ।"
তারপর রাতে আমার ঘরে আপনার বাবা আসলেন। আমার স্বামীর দাবি নিয়ে নিজের বাসনা পূরণের গৌরবময় ঘোষণা দিলেন। জোর করে নিজের হিংস্রতা জাহির করে ছাড়লেন।
তার বিভৎস কথায়, কাজে গা গুলিয়ে বমি এলো। চারপাশে ঝাপসা অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখিনি আর।
আমার যখন জ্ঞান ফিরে তখন দেখি , আমি রসুই খালার ঘরে । সে চাচাকে দুধের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ায়। চাচা অচেতন হয়ে গেলে আমাকে তার ঘরে নিয়ে আসে।
রসুই খালা নাকি অনেক আগেই টের পেয়েছিল।সে আপনাদের বাড়িতে কাজ করে বিশ বছরের বেশি। তার স্বামী আপনার বাবার ডান হাত। তাই মানুষের আড়ালে আপনার বাবার পিচাশ রুপ টা তিনি আগে থেকেই জানতেন। তিনি আমার দুহাত ধরে বললেন, " এহনি পালাই যাও গো মা। দুচোখ যে দিহে যায় যাও।শুধু এই নরক থাইকা নিজেরে বাঁচাও।
চাচার ঘুম ভাঙবে নাকি ২৪ ঘন্টা পরে। ততক্ষণে আমি অনেক দূরে চলে যেতে পারবো তাই না সোয়াত ভাই? "
বাকরুদ্ধ সোয়াত শূন্য দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে তার পাখির দিকে। সে কি কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে?
তীব্র ব্যথা হচ্ছে বুকে। যেন প্রখর চুরির আঘাতে বিচূর্ণ হচ্ছে নিরবে। ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে হৃদয় !
নিজেকে সামলে : নিঝুম কে ঢাকার ট্রেনে তুলে দিলো সোয়াত।
আজ দশ দিন হলো, ঢাকা উত্তরার এক আবাসিক হোটেলে উঠেছে নিঝুম। সোয়াতের বান্ধবী তৃষ্ণার বাবার সুপারিশে। সোয়াতই ব্যবস্থা করেছে।
তৃষা আজ নিঝুমের সাথে দেখা করতে আসছে শুনে, নিচে এসে দাঁড়ালো নিঝুম।
তৃষা কৌশল বিনিময়ের পর বললো, " সোয়াত ভাইকে দেখতে যাবে,নিঝুম ?"
সোয়াত ভাই!কোথায় তৃষা আপু ?
জেলে।
জেলে!
"হুম। সোয়াত নিজের বাবাকে খুন করে, পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।"
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো নিঝুম। তার কানে ভাসছে," পাখি। আমার পাখি। কথা বল প্লিজ,প্লিজ,প্লিজ। এই দেখো কানে ধরলাম। আর এমন হবে না প্রমিজ। "
লেখক: কুলচুমা ইয়াছমিন কনা
পেইজ: মায়াবিনী_গল্পকথন