পর্ব–২: মায়ের শেষ চিঠি
হাসপাতালের ছোট্ট ঘরটায় তখন অদ্ভুত এক নীরবতা।
জানালার বাইরে রাত নেমেছে।
দূরে শহরের গাড়িগুলোর শব্দ শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু রহিমের কাছে মনে হচ্ছিল, পুরো পৃথিবীটা যেন থেমে গেছে।
বিছানায় তার মা আমেনা বেগম শুয়ে আছেন।
মুখটা আগের চেয়ে অনেক ফ্যাকাশে।
চোখ দুটো ক্লান্ত।
তবুও ছেলেকে দেখে তিনি হাসার চেষ্টা করলেন।
রহিম মায়ের হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বসে ছিল।
তার চোখের পানি আর থামছিল না।
— “আম্মু… তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন?”
মা আস্তে করে বললেন,
— “কী বলব বাবা?”
— “তুমি এত অসুস্থ… অথচ আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছ!”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর মৃদু হেসে বললেন,
— “তুই এমনিতেই অনেক কষ্ট করিস। তোকে আর কষ্ট দিতে চাইনি।”
রহিম মাথা নিচু করে ফেলল।
— “আমি কি তোমার ছেলে না আম্মু? তোমার কষ্টে আমার অধিকার নেই?”
মায়ের চোখে পানি চলে এল।
তিনি ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
— “আছে বাবা… সব অধিকারই আছে।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর মা বললেন,
— “বাড়িতে একটা জিনিস রেখেছি।”
রহিম তাকাল।
— “কী জিনিস?”
— “তুই বাড়ি গেলে আলমারির নিচের ড্রয়ারটা খুলবি।”
— “তার মধ্যে কী আছে?”
মা হেসে বললেন,
— “চিঠি।”
রহিম অবাক হয়ে গেল।
— “চিঠি?”
মা মাথা নাড়লেন।
— “হ্যাঁ। তোর জন্য।”
রহিম মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
— “তুমি নিজেই আমাকে দেবে।”
মা কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
যেন সেই মুখটা মনে গেঁথে নিতে চাইছেন।
১
পরদিন সকালে রহিম বাড়ি ফিরল।
মায়া দরজার কাছে বসে ছিল।
ভাইকে দেখেই দৌড়ে এসে বলল,
— “ভাইয়া! আম্মু কেমন?”
রহিম হাসার চেষ্টা করল।
— “ভালো আছে।”
মায়া বলল,
— “সত্যি?”
— “হ্যাঁ।”
রহিম জানত, সে মিথ্যা বলছে।
কিন্তু ছোট বোনটাকে সত্যিটা বলার সাহস তার হচ্ছিল না।
সে ঘরের ভেতরে ঢুকে আলমারির সামনে দাঁড়াল।
অনেকদিন ধরে এই আলমারিটা খোলা হয়নি।
পুরোনো কাঠের দরজা।
এক পাশে রঙ উঠে গেছে।
রহিম নিচের ড্রয়ারটা টেনে খুলল।
ভেতরে কিছু পুরোনো কাপড়।
একটা ছোট্ট কাপড়ের ব্যাগ।
আর তার নিচে…
একটা সাদা খাম।
খামের ওপর লেখা—
“আমার ছেলে রহিমের জন্য।”
রহিমের বুকটা কেঁপে উঠল।
সে খামটা হাতে নিল।
তার হাত কাঁপছিল।
মনে হচ্ছিল, খামের ভেতরে শুধু একটা চিঠি নয়…
তার পুরো জীবন লুকিয়ে আছে।
সে ধীরে ধীরে খামটা খুলল।
ভেতরে কয়েক পৃষ্ঠা কাগজ।
মায়ের হাতের লেখা।
রহিম প্রথম লাইনটা পড়েই থেমে গেল।
চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
সে আবার চোখ মুছে পড়তে শুরু করল।
২
চিঠিতে লেখা ছিল—
“বাবা রহিম,
তুই যখন এই চিঠিটা পড়বি, তখন হয়তো আমি তোর সামনে থাকব না।
এই কথাটা লিখতে গিয়ে আমার হাত কাঁপছে। কিন্তু তোকে কিছু কথা না বলে গেলে আমার মনটা শান্ত হবে না।
তুই ছোটবেলা থেকেই খুব জেদি ছিলি। মনে আছে? তোর আব্বা যখন তোকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছিল, তুই প্রথম দিন স্কুলে যেতে চাসনি।
তোর আব্বা তোকে কোলে করে নিয়ে গিয়েছিল।
সেদিন তুই কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলি—‘আমি স্কুলে যাব না।’
আর তোর আব্বা হেসে বলেছিল—‘একদিন তুই এই স্কুল নিয়েই গর্ব করবি।’
বাবা, তোর আব্বার সেই কথাটা আমি ভুলিনি।
তুই স্কুল ছেড়ে দিয়েছিস—এই কথাটা মনে পড়লেই আমার বুকটা ভেঙে যায়।
কিন্তু আমি তোকে কখনো দোষ দিইনি।
কারণ আমি জানি, তুই নিজের স্বপ্নটা ছেড়ে দিয়েছিস আমাদের জন্য।
তুই নিজের হাতে ঝালমুড়ির ঠোঙা ধরেছিস, শুধু যেন তোর ছোট বোনটার মুখে খাবার থাকে।
বাবা, তুই হয়তো ভাবিস তুই খুব গরিব।
কিন্তু তুই জানিস না—তোর মতো ধনী ছেলে আমি খুব কম দেখেছি।
কারণ যার নিজের কিছু নেই, সে-ও যদি অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারে, তার চেয়ে বড় মানুষ আর কে আছে?”
চিঠির এই জায়গায় এসে রহিম আর পড়তে পারল না।
সে কাগজটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরল।
চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।
মায়া পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
— “ভাইয়া… তুমি কাঁদছ কেন?”
রহিম তাড়াতাড়ি চোখ মুছে বলল,
— “কিছু হয়নি।”
মায়া বলল,
— “আম্মু কি চিঠি লিখেছে?”
রহিম মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ।”
— “আমার জন্যও কিছু লিখেছে?”
রহিম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
— “হ্যাঁ… তোকে নিয়েও লিখেছে।”
মায়া হেসে ফেলল।
— “আম্মু আমাকে অনেক ভালোবাসে, তাই না?”
রহিম মায়ার মাথায় হাত রেখে বলল,
— “অনেক।”
৩
রহিম আবার চিঠিটা খুলল।
শেষের দিকের কথাগুলো পড়তে শুরু করল।
“রহিম,
তুই একটা কথা আমাকে প্রতিশ্রুতি দিবি।
একদিন নিজের একটা দোকান করবি।
ছোট হলেও হবে।
সেখানে একটা চেয়ার থাকবে।
সেই চেয়ারে বসে তুই বলবি—‘এই দোকানটা আমার মায়ের।’
আমি হয়তো সেই দিনটা দেখতে পারব না।
তবুও তুই দোকানটা করিস।
আর মায়াকে পড়াশোনা করাস।
ও যেন কোনোদিন টাকার জন্য নিজের স্বপ্ন ছেড়ে না দেয়।
তুই যেটা পারিসনি, ও যেন সেটা পারে।
বাবা, তুই আমার কাছে শুধু ছেলে না।
তুই আমার স্বপ্ন।
তোর আব্বা চলে যাওয়ার পর আমি অনেক রাত একা একা কেঁদেছি।
কিন্তু তুই যখন আমার পাশে এসে বলেছিস—‘আম্মু, তুমি চিন্তা করো না, আমি আছি’—তখন মনে হয়েছে, আমার পৃথিবীটা এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
তুই ছিলি বলেই আমি এতদিন বেঁচে ছিলাম।
তাই একটা কথা মনে রাখিস—
জীবন যতই কষ্ট দিক, তুই কখনো মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারাবি না।
আর নিজের ওপর থেকেও না।
তুই পারবি বাবা।
তুই একদিন অনেক বড় হবি।
তখন হয়তো মানুষ তোর ঝালমুড়ির কথা মনে রাখবে না।
কিন্তু আমি চাই, তারা যেন তোর মানুষ হওয়ার গল্পটা মনে রাখে।
—তোর আম্মু।”
চিঠিটা এখানেই শেষ।
রহিম অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তার সামনে পুরোনো ঘর।
দেয়ালে বাবার ছবি।
পাশে মায়ের খালি চেয়ার।
আর হাতে মায়ের লেখা শেষ চিঠি।
সে ধীরে ধীরে বাবার ছবির দিকে তাকাল।
— “আব্বা… আমি পারব তো?”
কেউ উত্তর দিল না।
শুধু জানালা দিয়ে বাতাস এসে চিঠির পাতাটা নড়িয়ে দিল।
৪
সেদিন বিকেলে রহিম আবার ঝালমুড়ির ঠেলাগাড়ি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াল।
কিন্তু আজ তার মুখে আগের মতো হাসি নেই।
সে শুধু দাঁড়িয়ে ছিল।
একজন ছোট ছেলে এসে বলল,
— “ভাইয়া, দশ টাকার ঝালমুড়ি দেন।”
রহিম ঠোঙা বানাতে বানাতে বলল,
— “ঝাল বেশি দিব?”
ছেলেটা বলল,
— “হ্যাঁ!”
রহিম ঝালমুড়ি বানিয়ে ঠোঙাটা এগিয়ে দিল।
ছেলেটা টাকা দিয়ে চলে গেল।
কয়েক পা যাওয়ার পর আবার ফিরে এসে বলল,
— “ভাইয়া!”
— “হুম?”
— “আজকে একটু বেশি দিয়েছেন।”
রহিম হেসে বলল,
— “তোর জন্য।”
ছেলেটা দৌড়ে চলে গেল।
রহিম তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো—
মা ঠিকই বলেছিল।
মানুষকে একটু সুখ দেওয়া যায়।
টাকা না থাকলেও।
৫
রাত হয়ে গেল।
হঠাৎ রহিমের ফোন বেজে উঠল।
হাসপাতাল থেকে ফোন।
রহিম ফোনটা ধরল।
ওপাশ থেকে একজন বললেন,
— “আপনি কি রহিম?”
— “জি।”
— “আপনি কি এখন হাসপাতালে আসতে পারবেন?”
রহিমের বুকটা ধক করে উঠল।
— “আমার আম্মুর কী হয়েছে?”
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ডাক্তার বললেন,
— “আপনি দ্রুত আসুন।”
ফোনটা কেটে গেল।
রহিম আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।
ঠেলাগাড়িটা রাস্তার পাশে রেখে দৌড়াতে শুরু করল।
তার পকেটে আজকের উপার্জনের টাকা।
হাতে মায়ের চিঠি।
আর মুখে শুধু একটা কথা—
“আম্মু, তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না…”
হাসপাতালে পৌঁছে রহিম ছুটে গেল মায়ের কেবিনের দিকে।
কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে থেমে গেল।
ভেতরে ডাক্তার।
নার্স।
আর বিছানায় তার মা।
মা চোখ খুলে ছেলের দিকে তাকালেন।
রহিম কাছে গিয়ে মায়ের হাত ধরল।
— “আম্মু… আমি চিঠিটা পড়েছি।”
মা মৃদু হাসলেন।
— “পড়েছিস?”
— “হ্যাঁ।”
— “কী বলেছে তোর মা?”
রহিম কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “তুমি আমাকে অনেক বড় দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছ।”
মা বললেন,
— “তুই পারবি।”
— “আমি পারব না আম্মু… তুমি পাশে না থাকলে আমি পারব না।”
মা তার হাতটা চেপে ধরলেন।
— “আমি সবসময় পাশে থাকব।”
রহিম মাথা নেড়ে কাঁদতে লাগল।
মা চোখ বন্ধ করলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন—
“বাবা… একটা কথা তোকে এখনও বলিনি…”
রহিম চোখ মুছে মায়ের দিকে তাকাল।
— “কী কথা?”
মা তার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“তোর আব্বা মারা যাওয়ার আগে… আমাকে একটা জিনিস দিয়ে গিয়েছিল।”
রহিম অবাক।
— “কী জিনিস?”
মা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন…
ঠিক তখনই হাসপাতালের মনিটরের শব্দ বদলে গেল।
ডাক্তার দ্রুত এগিয়ে এলেন।
রহিমকে বাইরে যেতে বলা হলো।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
রহিম দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে শুধু বলল—
“আম্মু… আব্বা তোমাকে কী দিয়ে গিয়েছিল?”
দরজার ওপাশে তখন কী ঘটছে…
রহিম জানত না।
আর সেই জিনিসটার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এমন এক সত্য—
যে সত্য জানার পর রহিমের নিজের পরিবার সম্পর্কেই ধারণা বদলে যাবে।
চলবে…
পর্ব–৩: খুব শিগগিরই…