পর্ব–৩: আব্বার রেখে যাওয়া রহস্য
হাসপাতালের করিডোরটা সেদিন অস্বাভাবিক নীরব ছিল।
দেয়ালের ঘড়িতে রাত প্রায় এগারোটা।
রহিম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
ভেতরে ডাক্তার আর নার্সরা ব্যস্ত।
সে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।
তার হাতের মুঠোয় তখনও মায়ের চিঠি।
চিঠির শেষ কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছিল—
“তোর আব্বা আমাকে একটা জিনিস দিয়ে গিয়েছিল।”
কিন্তু কী জিনিস?
কেন এতদিন মা তাকে বলেননি?
আর সেই জিনিসের সঙ্গে তার বাবার কী সম্পর্ক?
রহিম কোনো উত্তর পাচ্ছিল না।
হঠাৎ দরজা খুলে গেল।
ডাক্তার বাইরে এলেন।
রহিম ছুটে গেল।
— “ডাক্তার সাহেব… আম্মু?”
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— “এখন একটু স্থিতিশীল আছেন। তবে খুব দুর্বল।”
রহিম চোখ বন্ধ করে গভীর একটা শ্বাস নিল।
— “আমি কি ওনার সঙ্গে দেখা করতে পারি?”
— “হ্যাঁ, তবে বেশি কথা বলাবেন না।”
রহিম ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল।
মা চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলেন।
রহিম কাছে গিয়ে আস্তে করে বলল,
— “আম্মু…”
মা চোখ খুললেন।
ছেলেকে দেখে মৃদু হাসলেন।
— “তুই এখনও আছিস?”
রহিম মায়ের হাত ধরল।
— “আমি কোথায় যাব?”
মা বললেন,
— “বাড়ি যা বাবা। অনেক রাত।”
রহিম মাথা নাড়ল।
— “না। তুমি ঘুমালে আমি যাব।”
মা কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “তুই ঠিক তোর বাবার মতো হয়েছিস।”
রহিম অবাক হলো।
— “কীভাবে?”
মা মৃদু হেসে বললেন,
— “তোর আব্বাও কাউকে বিপদে রেখে কখনো বাড়ি ফিরত না।”
রহিমের চোখ আবার ভিজে গেল।
তারপর সে মায়ের হাত ধরে বলল,
— “আম্মু, তুমি বলেছিলে আব্বা তোমাকে একটা জিনিস দিয়ে গিয়েছিল।”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “হ্যাঁ।”
— “কী?”
মা ধীরে ধীরে বললেন,
— “ওটা বাড়িতে আছে।”
— “কোথায়?”
— “তোর বাবার পুরোনো ট্রাঙ্কে।”
রহিম থমকে গেল।
তার বাবার সেই পুরোনো ট্রাঙ্ক!
বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে সেটি আর কেউ খোলেনি।
মা বললেন,
— “কাল সকালে বাড়ি গিয়ে ট্রাঙ্কটা খুলিস।”
— “চাবি কোথায়?”
মা বালিশের নিচে হাত দিলেন।
তারপর একটা ছোট্ট পুরোনো চাবি বের করলেন।
চাবিটা রহিমের হাতে দিয়ে বললেন,
— “এটা তোর আব্বা আমাকে দিয়ে গিয়েছিল।”
রহিম চাবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
চাবিটা পুরোনো।
কিন্তু তার কাছে মনে হলো—
এটা যেন শুধু একটা ট্রাঙ্কের চাবি নয়।
এটা তার অতীতের দরজা খোলার চাবি।
১
পরদিন সকালে রহিম বাড়ি ফিরল।
মায়া তখন ঘুমিয়ে।
রহিম নিঃশব্দে বাবার পুরোনো ট্রাঙ্কটার সামনে গিয়ে বসে পড়ল।
ট্রাঙ্কটা ঘরের এক কোণে অনেক বছর ধরে পড়ে ছিল।
ধুলো জমে গেছে।
উপরে বাবার পুরোনো একটা টুপি।
রহিম টুপিটা হাতে তুলে নিল।
মুহূর্তেই তার চোখের সামনে বাবার মুখটা ভেসে উঠল।
সেই হাসি।
সেই কণ্ঠ।
সেই কথা—
“তুই শুধু পড়াশোনা কর বাবা।”
রহিম চোখ মুছে ফেলল।
তারপর চাবিটা তালায় ঢোকাল।
একবার ঘুরাল।
তালা খুলে গেল।
ট্রাঙ্কের ঢাকনা তুলতেই একটা পুরোনো গন্ধ বের হলো।
ভেতরে বাবার কিছু কাপড়।
একটা পুরোনো রেইনকোট।
কয়েকটা কাগজ।
একটা রিকশার রসিদ।
আর একেবারে নিচে—
একটা কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট বাক্স।
রহিম বাক্সটা হাতে নিল।
তার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে কাপড়টা খুলল।
ভেতরে ছিল—
একটা পুরোনো ঘড়ি।
রহিম অবাক।
— “ঘড়ি?”
ঘড়িটা সে চিনতে পারল।
এটা তার বাবার হাতঘড়ি।
বাবা সবসময় এটা পরতেন।
কিন্তু ঘড়ির নিচে আরও একটা খাম ছিল।
খামের ওপর লেখা—
“রহিমের জন্য। যখন সে বড় হবে।”
রহিমের হাত কেঁপে উঠল।
সে খামটা খুলল।
ভেতরে বাবার হাতের লেখা।
২
চিঠির শুরুতেই লেখা—
“রহিম,
তুই যদি এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝব তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস।
আমি জানি না, তখন আমি তোর পাশে থাকব কি না।
কিন্তু একটা কথা তোকে আজই বলতে চাই—
তুই কোনোদিন ভাবিস না যে তোর বাবা তোকে ছেড়ে যেতে চেয়েছিল।
আমি তোকে আর মায়াকে রেখে কোথাও যেতে চাইনি।
আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল—তুই পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হবি।
আর মায়া নিজের পায়ে দাঁড়াবে।
কিন্তু জীবন সবসময় মানুষের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না।”
রহিম চিঠিটা পড়তে পড়তে থেমে গেল।
তার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
সে আবার পড়ল।
“আমি জানি আমাদের সংসারে টাকা কম।
অনেক সময় তোদের ভালো কিছু দিতে পারিনি।
তুই হয়তো একদিন আমাকে নিয়ে কষ্ট পাবি।
কিন্তু বাবা, আমি গরিব ছিলাম—অসহায় ছিলাম না।
কারণ তোরা ছিলি।”
রহিম এবার কাগজটা চোখের কাছে এনে ধরে কাঁদতে লাগল।
বাবা যেন এত বছর পর তার সঙ্গে কথা বলছেন।
৩
চিঠির পরের অংশে লেখা ছিল—
“একদিন যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তোর মায়ের পাশে থাকিস।
আর একটা কথা—
তুই নিজের স্বপ্নটা কখনো মেরে ফেলিস না।
সংসারের দায়িত্ব নেবি, অবশ্যই নেবি।
কিন্তু নিজের জীবনটাকেও একদিন গড়ে তুলবি।
কারণ আমি চাই না আমার ছেলে শুধু বেঁচে থাকুক।
আমি চাই, সে ভালোভাবে বাঁচুক।”
রহিম চিঠিটা বুকে চেপে ধরল।
তারপর নিচের লাইনটা পড়তেই সে থেমে গেল।
“আর যদি কোনোদিন তোর খুব বেশি কষ্ট হয়, তাহলে ঘড়িটার পেছনটা খুলিস।”
রহিমের বুক কেঁপে উঠল।
সে বাবার পুরোনো ঘড়িটা হাতে নিল।
ঘড়ির পেছনে একটা ছোট্ট ঢাকনা ছিল।
অনেক কষ্টে সেটা খুলল।
ভেতরে একটা ভাঁজ করা ছোট কাগজ।
রহিম কাগজটা বের করল।
সেখানে শুধু একটা ঠিকানা লেখা।
“মোস্তফা সাহেব
পুরোনো বাজার, ৩ নম্বর গলি।”
আর নিচে—
“এই মানুষটার কাছে গেলে তুই তোর বাবার অসমাপ্ত কাজের কথা জানতে পারবি।”
রহিম স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
অসমাপ্ত কাজ?
তার বাবা কী কাজ করতেন?
কী এমন কথা তিনি মায়ের কাছেও বলেননি?
৪
সন্ধ্যায় রহিম মায়ের কাছে গেল।
মা তখনও হাসপাতালে।
রহিম চিঠির কথা বলল।
— “আম্মু, মোস্তফা সাহেব কে?”
মা হঠাৎ চুপ করে গেলেন।
তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— “তুই কোথায় এই নাম শুনলি?”
রহিম বলল,
— “আব্বার চিঠিতে।”
মায়ের চোখে ভয় দেখা গেল।
— “তুই ওনার কাছে যাবি না।”
রহিম অবাক।
— “কেন?”
— “কারণ…”
মা থেমে গেলেন।
— “কারণ কী?”
মা উত্তর দিলেন না।
রহিম মায়ের হাত ধরে বলল,
— “আম্মু, এত বছর ধরে কী লুকিয়ে রেখেছ?”
মা চোখ ফিরিয়ে নিলেন।
রহিমের গলা কেঁপে উঠল।
— “আব্বার মৃত্যুর পেছনে কি শুধু দুর্ঘটনা ছিল?”
মা এবার ছেলের দিকে তাকালেন।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মা ধীরে ধীরে বললেন—
“তোর আব্বা শুধু রিকশা চালাত না, রহিম।”
রহিমের চোখ বড় হয়ে গেল।
— “তাহলে?”
মা বললেন,
— “তোর আব্বা কিছু মানুষের জন্য গোপনে কাজ করত।”
— “কী কাজ?”
মা উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
— “এই কথাগুলো জানলে তোর জীবনও বদলে যেতে পারে।”
রহিম বলল,
— “আমার জীবন তো অনেক আগেই বদলে গেছে আম্মু।”
মা চোখের পানি মুছে বললেন,
— “তবুও কিছু সত্য না জানাই ভালো।”
রহিম মায়ের হাত ধরে বলল,
— “কিন্তু আমি সত্যিটা জানতে চাই।”
৫
পরদিন সকাল।
রহিম পুরোনো বাজারের দিকে রওনা দিল।
পকেটে বাবার ঘড়ি।
হাতে সেই ঠিকানা।
আর বুকের মধ্যে হাজার প্রশ্ন।
৩ নম্বর গলিতে গিয়ে সে একটা পুরোনো দোকানের সামনে দাঁড়াল।
দরজার ওপর লেখা—
“মোস্তফা অ্যান্ড সন্স।”
রহিম দরজায় নক করল।
ভেতর থেকে একজন বৃদ্ধ বের হলেন।
রহিম বলল,
— “আপনি কি মোস্তফা সাহেব?”
বৃদ্ধ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কিছুক্ষণ পর তার চোখ বড় হয়ে গেল।
— “তুমি… করিমের ছেলে?”
রহিম চমকে গেল।
— “আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন,
— “চিনতাম?”
তারপর তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “তোর বাবা আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল।”
রহিমের বুক কেঁপে উঠল।
— “তাহলে আব্বার কী হয়েছিল?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর দোকানের দরজা বন্ধ করে দিলেন।
— “ভেতরে আয়।”
রহিম ভেতরে ঢুকল।
মোস্তফা সাহেব একটা পুরোনো কাঠের বাক্স খুললেন।
তার ভেতর থেকে একটা ছবি বের করলেন।
ছবিতে তার বাবা।
আর পাশে আরও দুজন মানুষ।
রহিম ছবিটা দেখে থমকে গেল।
কারণ ছবির পেছনে লেখা ছিল—
“মায়াকে বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি—করিম।”
রহিম কাঁপা গলায় বলল,
— “মায়াকে বাঁচানোর?”
মোস্তফা সাহেব তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “তুই একটা কথা জানিস না, রহিম।”
— “কী?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন—
“তোর বোন মায়া জন্ম থেকেই যে অসুস্থতার সঙ্গে লড়ছে, তার চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতেই তোর বাবা শেষবারের মতো ওই কাজে গিয়েছিল।”
রহিমের চোখে পানি এসে গেল।
— “কোন কাজে?”
মোস্তফা সাহেব উত্তর দেওয়ার আগে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তারপর বললেন—
“তোর বাবার শেষ দিনটা দুর্ঘটনা ছিল না।”
রহিম যেন পাথর হয়ে গেল।
— “তাহলে?”
বৃদ্ধ নিচু গলায় বললেন—
“তোর বাবার রিকশার দুর্ঘটনার পেছনে একটা রহস্য ছিল।”
রহিমের হাতে থাকা ঘড়িটা মাটিতে পড়ে গেল।
টং করে একটা শব্দ হলো।
সে ধীরে ধীরে নিচে তাকাল।
তারপর ফিসফিস করে বলল—
“আমার আব্বাকে কে মেরেছিল?”
মোস্তফা সাহেব তার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“সেই উত্তরটা আমি জানি।”
এক মুহূর্ত থেমে তিনি আরও বললেন—
“কিন্তু তুই সেই সত্য জানার জন্য প্রস্তুত তো?”
রহিম চোখের পানি মুছে বলল—
“আমার আব্বার জন্য আমি সব সত্য জানব।”
মোস্তফা সাহেব একটা পুরোনো ফাইল বের করলেন।
ফাইলের ওপর লেখা—
“করিম মিয়া — শেষ তদন্ত।”
রহিম ফাইলটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মোস্তফা সাহেব বললেন—
“এই ফাইলটা তোর বাবার মৃত্যুর আগের রাতের।”
রহিম ফাইলটা খুলতে হাত বাড়াল।
ঠিক তখনই বাইরে কারও পায়ের শব্দ হলো।
মোস্তফা সাহেব হঠাৎ ফাইলটা বন্ধ করে দিলেন।
— “থাম!”
রহিম অবাক হয়ে তাকাল।
বৃদ্ধ ফিসফিস করে বললেন—
“কেউ আমাদের অনুসরণ করে এখানে এসেছে।”
রহিম দরজার দিকে তাকাল।
বাইরে একজন অচেনা মানুষ দাঁড়িয়ে।
সে দোকানের দিকে তাকিয়ে আছে।
তারপর ধীরে ধীরে দরজার হাতলে হাত রাখল।
রহিমের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
মোস্তফা সাহেব ফিসফিস করে বললেন—
“রহিম… তুই এখন বুঝতে পারছিস কেন তোর মা তোকে এই সত্য জানতে দিতে চায়নি?”
দরজাটা আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করল…
চলবে…
পর্ব–৪: “শেষ সত্য”
রহিম কি জানতে পারবে তার বাবার মৃত্যুর আসল কারণ?
মোস্তফা সাহেবের কাছে থাকা সেই ফাইলে কী আছে?
আর যে মানুষটা তাদের অনুসরণ করে এসেছে—সে আসলে কে?
পর্ব–৪-এ সব রহস্যের শেষ হবে…