Story

আয়না বন্দী

September 12, 2026

3
View

বাসা খুজতে খুজতে রেবেকা আর মিজান শহর থেকে বেশ দূরে চলে আসলো। যদিও এদিক থেকে বের হলেই বড় রাস্তা আর অফিসে যাবার যানবাহন সহজেই পাওয়া যাবে। এলাকার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বাসা ভাড়া একটু কমই হতে পারে।

আসরের আজান অনেকক্ষণ হল শেষ হয়েছে। কাছে একটা মসজিদ দেখে মিজান রেবেকাকে বাইরে দাড় করিয়ে নামাজে ঢুকল। রেবেকা আবার খুব অস্থির প্রকৃতির মেয়ে। এমনিতে চুপচাপ, কথা টথা কম বলে কিন্তু এক জায়গায় বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে পারে না। তাই মসজিদকে পিছনে ফেলে সামনে এক গলি ধরে হাঁটতে শুরু করলো। অন্ধ গলি, মাথা পর্যন্ত গিয়ে দেখল একটা পুকুর বা ডোবা বললেও চলে, সেখানে গলি শেষ। ঘুরে চারপাশ দেখতে দেখতে যখন আবার হাটা শুরু করলো হাতের বামে একটা দোতলা বাড়ি লক্ষ করল, দেয়াল দিয়ে ঘেরা। মেইন গেটের সাথে একটা দেবদারু গাছের পাতার আড়ালে একটা টুলেট দেখে ওর ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাঁসি ফুটে উঠলো।

ওদিকে নামাজ পরে মিজান বের হয়ে রেবেকাকে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে খুজতেই চোখে পরে গেলো, গলির মাথায় একটা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বাড়ির ভেতরে দেখার চেষ্টা করছে।

সে একটু জোরে পা চালিয়ে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি দেখছ উকিঝুকি দিয়ে?

রেবেকা হেসে বলল, দেখেন স্যার টুলেট। বাড়ির সামনে একচিলতে বাগান। ওই দেখো পাশে আবার পুকুর আছে।

আঙ্গুল তুলে ডোবাটা দেখাল।

মিজান হেসে বলল, ওটা হল মশা তৈরির কারখানা আর এটা হল ভুতের বাড়ি। চল এবার।

হাত ধরে টেনে গলি থেকে বের হতে চাইলো।

রেবেকা একটু বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে বলল, আরেহ দাড়াও, আগে দেখি তো বাবা! ওই দেখো ভেতরে মানুষ হাঁটছে আর দোতলার ডান পাশের ফ্লাটের জানালা খোলা। চল তো দেখি।

রীতিমত জোর করে হাত ধরে নিয়ে মেইন গেটের পকেট দরজা দিয়ে ঢুকে পরল দুজন। ইট বাধাই সরু রাস্তা। দুজন পাশাপাশি হাটা যাবে। এই রাস্তা দিয়ে খুব কম হাটা হয় দেখেই বোঝা যাচ্ছে। একচিলতে বাগানে আগে যে অনেক রুপ ছিল সেটা মরে নুয়ে থাকা ফুলের গাছ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। লম্বা আকৃতির বাড়ি। মাঝে দিকে কেচিগেটের পরে সিঁড়ি। গেটের সামনে এক মাঝ বয়সী লোক ঝিমুচ্ছে। দারোয়ানই হবে। রেবেকার পাশে দাঁড়িয়ে একটু কাশী দিলো। ওমনি সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পরল।

কাঁপতে কাঁপতে বলল, বলেন আম্মা?

রেবেকার ঘুরে সামনে দাঁড়িয়ে বলল, মামা টুলেট দেখলাম, তাই।

এবার দারোয়ান তার দিকে তাকিয়ে এক চওড়া হাঁসি দিয়ে বলল, আলহামদুলিল্লাহ্‌। আমি আপনাগো ১০০ ভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারি ঘরটা খুবই ভালা লাগবে। লন ভিত্রে আম্মার লগে কথা কইবেন। আব্বা একটু বাহিরে। কল দিতাছি চলেন আগে।

সামনে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বলল, আমার নাম হাসেন। এই বাড়ির দারোয়ান কাম কেয়ারটেকার। অনেক দায়িত্ব, অনেক কাজ আমার।

রেবেকা আর মিজান এক সাথে মাথা ঝাকিয়ে বলল, জী সেটা তো দেখতেই পেলাম।

ওদের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে দাঁত বের করে হেঁসে দিয়ে বলল, সবসময় না। একটু বয়স হইছে তো। টায়ার লাগে।

সিঁড়ির গোঁড়ায় রং চটা দরজায় দু ঘা দিলো হাসেন। ২-৩ মিনিট বাদে মাঝে বয়সী এক মহিলা দরজা খুলল। গায়ের রঙ শ্যামলা আর কাচাপাকা চুল।

চোখেমুখে বিরক্তি নিয়ে বলল, তুই আর কলিংবেল দেয়া শিখলি না! কি হইছে?

হাসেন বলল, আম্মা কোতায়? এনারা বাসা ভাড়া নিবে তাই দেখবার চায়।

মহিলার মুখের হাঁসিও চওড়া হয়ে গেলো। খুব আদরে সম্মানে তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে বসার ঘরে নিয়ে এলো। সব কেমন যেন মরা মরা, নিরিবিলি, পুরনো পুরনো ভাব। মহিলা তাদের বসতে বলে ভিতরে চলে গেলো। হাসেন ভিতরে ঢুকেনি। ওরা চুপচাপ বসে আছে। পিন ড্রপ সাইলেন্ট।

মিজান ফিসফিস করে বলে উঠলো, কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে?

রেবেকা ওর হাতে আলতো করে হাত রেখে বলল, ভয় পেয়ো না। কেউ তোমার ইন্টার্ভিউ নিবে না।

খসখস হাটার শব্দ শুনে ওরা উঠে দাঁড়ালো। বলতে গেলে বৃদ্ধা এক মহিলা ওদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখল। পাশে ওই শ্যামলা মহিলা যিনি দরজা খুলেছিলেন। বৃদ্ধা যে যুবতী বয়সে সুন্দরি ছিলেন সেটা তার মুখের গরন আর গায়ের রং দেখে বোঝা যায়। হাতের ইশারায় ওদের বসতে বললেন। নিজেও বসে পরলেন।

ঘাড় ঘুরিয়ে শ্যামলা মহিলাকে বললেন, আলেয়া চা করে আন।

রেবেকার বাধা দেবার শুরে বলল, না খালাম্মা থাক। আমরা শুধু বাসাটা দেখি? সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে অনেক দূরে যেতে হবে। 

মহিলা মুচকি হেসে বললেন, আচ্ছা তবে তাই হোক। একটু দেখি উনি কত দূরে আছে।

হাতে ধরা মোবাইলটা তুলে ডায়াল করে কানে ধরলেন। ওপাশে রিসিভ হতেই মহিলা করুন ভাবে বললেন, আপনি কোথায়? কতখন লাগবে আসতে?

বলে থেমে গেলেন, চেহারে দেখে মনে হচ্ছে ওপাশের মানুষটা ওনাকে ধমকাচ্ছে।

কিছুক্ষন শুনে বললেন, না মানে বাসা দেখতে এসেছে।

একটু থেমে আবার বললেন, জী, দেখতে ভালো। যুবক যুবতী।

আবার চুপ হয়ে গেলেন, শুনে উত্তর করলেন, আচ্ছা জিজ্ঞেস করছি, আপনি আসেন তাহলে।

রেবেকা আর মিজানকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে উনি একটু লজ্জা পেয়ে গেলেন।

লাজুক মুখে বললেন, কিছু মনে কর না তোমরা। উনি একটু এমনই। কিন্তু ভেতরে অনেক মায়া। চলো উপরে, ঘর দেখিয়ে আনি।

কথা শেষ করে উঠে হাটা দিলেন, ওনার পিছনে রেবেকা আর মিজান বিরক্ত মুখে হাটা শুরু করলো। দরজা খুলে বাইরে এসে দেখল প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছে। সিঁড়ি ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। দূরে কোথাও থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। বৃদ্ধা মাথায় কাপড় দিলেন। ঘাড় ফিরিয়ে রেবেকার দিকে তাকালেন। রেবেকা তার গায়ে থাকা ওড়নাটা টেনে মাথায় দিল। সিঁড়ি বেয়ে সবাই উঠতে শুরু করলো। মিজান সবার শেষে। সে লক্ষ করলো তার পিছনে দারোয়ান হাসেন আর কাজের মহিলা আলেয়া ফিসফিস করে কথা বলছে আর মনে হল হাঁসছে। মিজান পিছনে ফিরতে ওরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। ভদ্র মহিলা খালি ঘরের তালা বন্ধ দরজার কাছে দাঁড়ালেন। খুবই ক্ষীণ আলো। চাবির গোছা থেকে খুব কষ্টে হাতড়ে একটা চাবি বের করে ধুলো জমা তালাটায় ফু দিয়ে তালার ফুটোয় চাবি ঢুকিয়ে খুলে ফেললেন।

তালার উপর ধুলোর আস্তর দেখে মিজান রেবেকার কানে ফিসফিস করে বলল, মনে হচ্ছে কেউ খুব একটা দেখতে আসেনি বাসাটা।   

রেবেকা ওর হাতে ছোট্ট একটা চিমটি কেটে থামিয়ে দিলো। ঘরে ঢুকতেই তীব্র একটা উটকো গন্ধ সবার নাকে এসে লাগলো। রেবেকা আর মিজান নাক-মুখ চেপে ধরলেও মহিলা স্বাভাবিক রইলেন। প্রথমেই বিশাল এক ঘর, হ্যাঁ এটা বসার ঘর, দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। বাইরে থেকে ভালো লাগলেও ভেতরে ঢুকে কেন জানি রেবেকার আর মনে ধরল না। ভিতরে আরও তিনটা ঘর। দুটো খোলা একটা তালা বদ্ধ। মোবাইলে আলো জ্বালিয়ে খোলা ঘর দুটো উকি মেরে দেখল ওরা। কেমন তীব্র কটু গন্ধ, ওরা থাকতে পারছে না।

রেবেকা প্রশ্ন করলো, কতদিন ধরে খালি?

মহিলা একটু আমতা আমতা করে বলল, এই ৭-৮ মাস।

কি বলছ ৭-৮ মাস? ৭-৮ সপ্তাহ তো হল না।

ভারী একটা গলা শুনে তিনজন চমকে উঠে একবারে পিছনে ফিরল। দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক ভদ্রলোক। সাদা চুল, ক্লিন শেভ, পরিপাটি জামা কাপড়, হাঁসি মুখে ঘরে ঢুকলেন। তার পিছনে দারোয়ান আর কাজের মহিলাটাও ঢুকল। ওদের মুখেও হাঁসি। হাঁসি দেখে রেবেকার গা শিরশির করে উঠল।

ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন, আমি মোঃ হাকিম। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার। আর এই বাড়ির মালিক। অল্পকিছুদিন হল এই দোতলা খালি হয়েছে।

দারোয়ান আর কাজের মহিলা হাঁসি মুখে একসাথেই মাথা নাড়ল। হাকিম সাহেবের কথাটাকে আরো জোর দিতে।  

উনি বলতে লাগলেন, ভাড়া বেশি না। কারণ আমার টাকার অভাব নেই। ঘর গুলো দেখেছেন? আচ্ছা ভালো কথা, আপনারা বিবাহিত তো?

দুজনে একসাথে বলে উঠলো, অবশ্যই। একবছর হতে চলল।

ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা চাবি বের করে বললেন, আসুন মাষ্টার বেড দেখাই।

মিজান লক্ষ করলো দারোয়ান আর কাজের মহিলাটার ঠোঁটের কোনে হাঁসি লেগেই আছে। এবার মিজানের গাও কেমন ছমছম করে উঠলো। ভালো লাগছে না ওর কিছু।

মিজান বলল, না আংকেল থাক। আজ তো রাত হয়ে গেছে কাল বা পরশু দিনে এসে দেখে যাবো। ভাড়া কত?

হাকিম সাহেব যেন একটু আদেশের শুরেই বললেন, কাল পরশু আমরা থাকবো না। এসেছেন যখন দেখেই যান।

বন্ধ ঘরের তালা খুলে ফেললেন। সব ঘর থেকে কটু গন্ধ আসলেও এ ঘর থেকে আসছে না। একটা মিষ্টি ঘ্রাণ পেলো ওরা। রজনীগন্ধা আর বেলি ফুল মিলে গিয়ে আর একটা অদ্ভুত ঘ্রানে রুপ নিয়ছে মনে হল ওদের দুজনের।

 সব ঘর নোংরা হলেও এই ঘরটা নোংরা না। বাকি দুই ঘরে বাতি নেই এই ঘরে আছে। তিনজন ঘরে ঢুকল, হাকিম সাহেব, রেবেকা আর মিজান। হাকিম সাহেব ঢুকে বাতি জ্বালিয়ে দিলেন। হাকিম সাহেবের বউ, দারোয়ান আর কাজের মহিলা দরজা ধরে দাঁড়ালো।

মিজান চারপাশটা দেখতে লাগলো। আর রেবেকার চোখে পরল ঘরের দক্ষিন কোনে সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা একটা ড্রেসিং টেবিল।

অবাক হয়ে যেন নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলো, খালি ঘরে ড্রেসিং টেবিল কেন?

পিছন থেকে কাজের মহিলা আলেয়া বলে উঠলো, অনেক সুন্দর আর পুরান তো তাই আম্মা আব্বা ফেলে নাই। যে ভাড়া আসে তারাই ব্যবহার করে।

মিজান পিছনে তাকাল। হাকিম সাহেব দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে। কেন জানি মনে হচ্ছে ওনারা দরজা আড়াল করে দাঁড়িয়েছে। ওরা কেউই ঘরে ঢুকেনি। ঘরের মাঝে মিজান আর রেবেকা সামনে হেটে ড্রেসিং টেবিলের কাছে দাঁড়ালো। ওরা চার জন কেমন অদ্ভুত ভাবে ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। মিজানের ভালো লাগছে না একটুও। বেরও হতে পারছে না। সবাই কেমন এক প্রকার ওদের জোর করে আটকে রেখেছে। দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে সবাই।

মিজান রেবেকার দিকে ফিরে বলে উঠলো, রেবেকা চল আর দেখতে হবে না।

রেবেকা একটু ফিসফিস করে বলল, দাড়াও এইটা একটু দেখি।

মিজান ওকে ফিরিয়ে আনতে যাবে তার আগেই রেবেকা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে সাদা কাপড়টা সরিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলো। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ভেতরে অনেক গুলো মানুষ দাঁড়িয়ে সবার চোখ থেকে রক্ত পরছে। একটা মেয়ে শুধু হাঁসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কাপড়টা সরে যেতেই পিছনে দরজা লাগানোর শব্দ। মিজান পিছনে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। দরজা লাগিয়ে দেয়া হয়েছে বাইরে থেকে।

আয়নার ভেতরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা শুধু বলল, আব্বু অনেক মজা হবে।

বিকট ভয়ংকর কণ্ঠ। রেবেকা কেপে উঠলো। মিজান দৌড়ে গিয়ে দরজা ধাক্কাতে শুরু করলো। ঘরের বাতি নিভে গেলো। তারপর ভয়ংকর এক চিৎকার। সব নিশ্চুপ, অন্ধকার, সুনসান। আবারো পিন ড্রপ সাইলেন্ট।

মিজান ফিসফিস করে ডাক দিলো, রেবেকা? কই তুমি?

নিজের গলাই নিজের কাছে অপরিচিত লাগছে।  

মিজান মোবাইলের বাতি জ্বালিয়ে ধীর পায়ে ড্রেসিং টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে আয়নায় আলো ফেলল। রেবেকা ভিতরে দাঁড়িয়ে চোখ বেয়ে রক্ত পরছে। আরো অনেকের সাথে আয়না বন্দী সে। মিজান রাগে আয়নাতে লাথি মারতে গিয়ে নিজেও আয়নার ভেতর ঢুকে আয়না বন্দী হয়ে গেলো।      

 

সমাপ্ত

বিদ্রঃ প্রথম দিকের লেখা একটি ছোট গল্প। যখন ভেবেছি গল্প লিখবো, বই বের হবে আমার, তখনকার সময়ের। মানে অনেক অনেক আগের। এতো আগের যে, দিন তারিখ মনে নেই।

Comments

    Please login to post comment. Login