ঝালমুড়িওয়ালা
পর্ব–৪:
দোকানের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলছিল।
রহিমের বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছিল।
মোস্তফা সাহেব তাড়াতাড়ি ফাইলটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিলেন।
— “পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে যা।”
রহিম অবাক হয়ে বলল,
— “কিন্তু আপনি?”
— “আমার কথা ভাবিস না। তুই আগে বের হ।”
রহিম কিছুতেই যেতে চাইছিল না।
ঠিক তখনই সামনের দরজাটা পুরোপুরি খুলে গেল।
একজন মধ্যবয়সী মানুষ ভেতরে ঢুকল।
তার চোখ সরাসরি মোস্তফা সাহেবের দিকে।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না।
তারপর লোকটা বলল,
— “এত বছর পরও ফাইলটা রেখে দিয়েছেন?”
রহিমের বুক কেঁপে উঠল।
মোস্তফা সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
— “তুমি এখানে কেন?”
লোকটা রহিমের দিকে তাকাল।
— “তুই করিমের ছেলে, তাই না?”
রহিম ধীরে ধীরে বলল,
— “হ্যাঁ।”
লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “তোর বাবাকে আমি চিনতাম।”
রহিমের চোখে রাগ আর কষ্ট একসঙ্গে জেগে উঠল।
— “আমার বাবাকে আপনি চিনতেন?”
— “হ্যাঁ।”
— “তাহলে বলুন… আমার আব্বার কী হয়েছিল?”
লোকটা চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— “তোর বাবা খুব ভালো মানুষ ছিল।”
রহিমের গলা কেঁপে উঠল।
— “আমি ভালো মানুষ ছিল কি না সেটা জানতে চাই না। আমি জানতে চাই… সেদিন আসলে কী হয়েছিল?”
লোকটা মাথা নিচু করল।
মোস্তফা সাহেব এবার ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখলেন।
— “আজ সব বলার সময় হয়েছে।”
১
মোস্তফা সাহেব ফাইলটা খুললেন।
প্রথম পাতায় ছিল কয়েক বছর আগের কিছু হিসাব।
কিছু নাম।
কিছু ঠিকানা।
আর কয়েকটা নোট।
রহিম কিছুই বুঝতে পারছিল না।
মোস্তফা সাহেব বললেন,
— “তোর বাবা রিকশা চালাত। কিন্তু মানুষের বিপদ দেখলে চুপ করে থাকতে পারত না।”
— “কী করত?”
— “কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিয়ে যেত। কারও ঘরে খাবার না থাকলে নিজের আয় থেকে সাহায্য করত। আর মায়ার চিকিৎসার জন্য সে কিছু মানুষের কাছ থেকে সাহায্যও চাইত।”
রহিম চুপ করে শুনছিল।
— “একদিন তোর বাবা জানতে পারে, এলাকার কয়েকজন অসহায় মানুষের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে টাকা নেওয়া হচ্ছে।”
রহিম বলল,
— “তারপর?”
— “তোর বাবা প্রতিবাদ করে।”
লোকটা এবার কথা বলল,
— “করিম ভয় পেত না।”
রহিম তার দিকে তাকাল।
লোকটা বলল,
— “আমি তখন একটা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। তোর বাবা আমার কাছে কয়েকজন মানুষের সাহায্যের জন্য এসেছিল।”
— “আপনি সাহায্য করেছিলেন?”
লোকটা মাথা নিচু করল।
— “করেছিলাম। কিন্তু এরপর কিছু মানুষ আমাদের ওপর চাপ দিতে শুরু করে।”
রহিমের গলা শুকিয়ে গেল।
— “তাহলে দুর্ঘটনাটা…”
মোস্তফা সাহেব বললেন,
— “দুর্ঘটনাটা ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, সেটা আমরা কখনো পুরোপুরি প্রমাণ করতে পারিনি।”
রহিম চুপ।
কিছুক্ষণ পর তিনি একটা কাগজ বের করলেন।
— “কিন্তু তোর বাবার শেষ দিনের একটা তথ্য আমরা পেয়েছিলাম।”
রহিম কাগজটা নিল।
সেখানে লেখা—
“করিম মিয়া নিজের পরিবারের জন্য নয়, মায়ার চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে শেষবার বাইরে গিয়েছিলেন।”
রহিমের চোখ ভিজে গেল।
— “আব্বা… আমার বোনের জন্য?”
মোস্তফা সাহেব মাথা নাড়লেন।
— “হ্যাঁ।”
২
রহিম হঠাৎ মাটিতে বসে পড়ল।
তার চোখের সামনে বাবার পুরোনো মুখটা ভেসে উঠল।
সেই হাসি।
সেই পুরোনো রিকশা।
সেই ভেজা সন্ধ্যা।
আর সেই শেষ কথা—
“তুই শুধু পড়াশোনা কর বাবা।”
রহিম চোখ বন্ধ করে বলল,
— “আমি তো পড়াশোনা করতে পারিনি আব্বা…”
তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।
— “আমি তোমার কথা রাখতে পারিনি।”
মোস্তফা সাহেব তার কাঁধে হাত রাখলেন।
— “না বাবা। তুই ব্যর্থ হোসনি।”
রহিম তাকাল।
— “তোর বাবা চেয়েছিল তুই ভালো মানুষ হোস। তুই হয়েছিস।”
রহিম কিছু বলতে পারল না।
৩
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
হাসপাতাল।
রহিম ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে নার্স বললেন,
— “আপনার মা আপনাকে ডাকছেন।”
রহিম আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
সে দৌড়ে হাসপাতালে গেল।
কেবিনে ঢুকে দেখল—
মা চোখ মেলে তাকিয়ে আছেন।
রহিম বিছানার পাশে বসে মায়ের হাত ধরল।
— “আম্মু…”
মা মৃদু হাসলেন।
— “সব জেনে গেছিস?”
রহিম থমকে গেল।
— “তুমি জানতেছিলে?”
মা ধীরে মাথা নাড়লেন।
— “হ্যাঁ।”
রহিম কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “তাহলে এতদিন আমাকে বলোনি কেন?”
মা বললেন,
— “কারণ আমি চাইনি তোর বাবার কষ্ট তোর জীবনটাকে থামিয়ে দিক।”
— “কিন্তু আমি তো এতদিন ভাবতাম… আব্বা শুধু দুর্ঘটনায় মারা গেছে।”
মা চোখ বন্ধ করলেন।
— “তোর আব্বা শেষ দিনেও তোদের কথা ভাবছিল।”
রহিম মায়ের হাত নিজের কপালে রাখল।
— “আম্মু… আমি কি তোমাদের জন্য কিছু করতে পেরেছি?”
মা চোখ খুলে ছেলের দিকে তাকালেন।
— “তুই যা করেছিস, সেটা কোনো টাকা দিয়ে করা যায় না।”
— “কী করেছি?”
মা বললেন,
— “তুই মায়াকে স্কুলে রেখেছিস। ওকে না খেয়ে ঘুমাতে দিসনি। আমাকে কখনো বুঝতে দিসনি যে তুই কত কষ্টে আছিস।”
মায়ের গলা ভারী হয়ে এল।
— “তুই আমার ছেলে না হলে আমি হয়তো এতদিন বাঁচতেই পারতাম না।”
রহিম মায়ের হাত ধরে কাঁদতে লাগল।
৪
কয়েকদিন পর আমেনা বেগমের অবস্থা কিছুটা ভালো হলো।
রহিম প্রতিদিন ঝালমুড়ি বিক্রি করত।
কিন্তু এবার তার স্বপ্নটা একটু বড়।
সে রাস্তার পাশে একটা ছোট দোকানের জায়গা খুঁজতে শুরু করল।
একদিন মোস্তফা সাহেব তাকে ডেকে বললেন,
— “তোর বাবার একটা জিনিস আমার কাছে ছিল।”
তিনি একটা পুরোনো খাম বের করলেন।
রহিম খুলে দেখল—
ভেতরে একটা ছোট কাগজ।
তাতে লেখা—
“যদি কোনোদিন পারি, আমি একটা ছোট দোকান করব। দোকানের নাম হবে—‘আমেনার ঝালমুড়ি’।”
রহিম অবাক হয়ে গেল।
— “আব্বা এই নাম কেন রেখেছিল?”
মোস্তফা সাহেব হেসে বললেন,
— “কারণ তোর বাবা বলত, তোর মা-ই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।”
রহিম কাগজটা বুকের কাছে ধরে রাখল।
তার চোখে পানি।
কিন্তু এবার সেই পানির সঙ্গে একটা হাসিও ছিল।
৫
কয়েক মাস পর।
রাস্তার এক কোণে একটা ছোট্ট দোকান দাঁড়িয়ে গেল।
উপরে সাইনবোর্ড—
“আমেনার ঝালমুড়ি”
নিচে ছোট করে লেখা—
“করিম মিয়ার স্মৃতিতে।”
দোকানের ভেতরে একটা পুরোনো চেয়ার।
সেই চেয়ারটা রহিম ইচ্ছে করেই রেখেছে।
একদিন মা দোকানে এসে চেয়ারে বসে পড়লেন।
রহিম হেসে বলল,
— “আম্মু, এই চেয়ারটা তোমার জন্য।”
মা অবাক হয়ে বললেন,
— “আমার জন্য?”
রহিম মাথা নাড়ল।
— “আব্বা বলেছিল, একদিন এই দোকানে একটা চেয়ার থাকবে।”
মায়ের চোখে পানি এসে গেল।
তিনি চারদিকে তাকালেন।
দোকানের এক পাশে মায়া বসে পড়ছে।
তার সামনে বই।
সে এখন নিয়মিত স্কুলে যায়।
রহিম তাকে পড়তে সাহায্য করে।
মায়া হেসে বলল,
— “ভাইয়া, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব।”
রহিম বলল,
— “হবি।”
— “আর তোমার দোকানের চিকিৎসা ফ্রি।”
রহিম হেসে ফেলল।
— “তুই শুধু মানুষ হ।”
মায়া বলল,
— “তুমিও।”
রহিম মায়ের দিকে তাকাল।
মা চোখ মুছে হাসলেন।
৬
এক বিকেলে একটা ছোট ছেলে দোকানে এল।
তার হাতে মাত্র পাঁচ টাকা।
সে লজ্জা করে বলল,
— “ভাইয়া… পাঁচ টাকার ঝালমুড়ি হবে?”
রহিম হেসে বলল,
— “অবশ্যই হবে।”
সে ঝালমুড়ি বানাল।
তারপর ঠোঙাটা হাতে দিয়ে আরও একটু মুড়ি যোগ করল।
ছেলেটা অবাক হয়ে বলল,
— “ভাইয়া, এত বেশি কেন?”
রহিম বলল,
— “আজ আমার মন ভালো।”
ছেলেটা হাসতে হাসতে চলে গেল।
মা দূর থেকে ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
তিনি বুঝতে পারলেন—
রহিম শুধু দোকান করেনি।
সে তার বাবার স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রেখেছে।
৭
রাতে দোকান বন্ধ করার আগে রহিম একা হয়ে গেল।
মায়া বই নিয়ে বাড়ি গেছে।
মাও চলে গেছেন।
দোকানের বাতি নিভিয়ে দেওয়ার আগে রহিম বাবার পুরোনো ঘড়িটা বের করল।
ঘড়িটা এখনো চলে।
সে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল—
— “আব্বা… দেখছ?”
কেউ উত্তর দিল না।
সে আবার বলল,
— “আমি তোমার মতো বড় মানুষ হতে পারিনি।”
তার চোখ ভিজে উঠল।
— “কিন্তু চেষ্টা করছি।”
সে দোকানের সাইনবোর্ডের দিকে তাকাল।
“আমেনার ঝালমুড়ি।”
তারপর মৃদু হেসে বলল—
— “তোমার কথা রেখেছি আব্বা।”
ঠিক তখন পেছন থেকে মায়ের কণ্ঠ শোনা গেল—
— “বাবা…”
রহিম ঘুরে তাকাল।
মা দরজায় দাঁড়িয়ে।
হাতে একটা পুরোনো শাড়ি।
রহিম বলল,
— “আম্মু, তুমি এখনও যাওনি?”
মা এগিয়ে এসে বললেন,
— “তোর আব্বার একটা কথা তোকে বলা হয়নি।”
রহিম অবাক।
— “আবার?”
মা হেসে বললেন,
— “হ্যাঁ।”
তিনি রহিমের মাথায় হাত রেখে বললেন—
“তোর আব্বা বলেছিল, ‘আমার ছেলে একদিন খুব বড় হবে।’”
রহিম মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
মা বললেন,
“বাবা, তুই বড় হয়েছিস।”
রহিম মাথা নিচু করল।
চোখের পানি মাটিতে পড়তে লাগল।
সে মাকে জড়িয়ে ধরল।
আর সেই ছোট্ট দোকানের ভেতরে মা-ছেলে দুজনেই কাঁদতে লাগল।
কিন্তু সেই কান্না ছিল শুধু কষ্টের নয়।
ছিল—
ভালোবাসার।
ত্যাগের।
স্বপ্ন পূরণের।
🌧️ শেষ কথা
বহু বছর পর “আমেনার ঝালমুড়ি” শহরের পরিচিত একটা দোকান হয়ে উঠল।
মায়া ডাক্তার হলো।
রহিম নিজের দোকানের পাশাপাশি গরিব বাচ্চাদের পড়াশোনার জন্য সাহায্য করতে লাগল।
দোকানের এক কোণে এখনও সেই পুরোনো চেয়ারটা আছে।
আর দেয়ালে ঝুলছে করিম মিয়ার ছবি।
ছবির নিচে লেখা—
“তিনি রিকশা চালাতেন।
কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল অনেক বড়।”
আর তার পাশে রহিমের বাবার সেই পুরোনো ঘড়ি।
ঘড়িটা এখনও চলছে।
টিক…
টিক…
টিক…
যেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা কথাই বলে যাচ্ছে—
কষ্ট মানুষকে ভেঙে দিতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা তাকে আবার দাঁড় করাতেও পারে।
আর একটা ঝালমুড়ির ঠোঙার ভেতরও কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে—
একটা পরিবারের পুরো ভালোবাসার গল্প। ❤️