শনিবার সরকারি অফিস বন্ধ।বিজ্ঞাপন কর্মীদের বাহিরে গিয়ে ক্লায়েন্ট ভিজিট করতে হয় না।মার্কেটিং জি এম মাহবুব সাহেব এদিন সকালে অফিসে মিটিং কল করেন।বেলা এগারোটা বেজে গেছে।পিয়ন আক্কাস কে বললেন সবাইকে তার রুমে আসতে।
মিটিং চলছে।বার তের জন কর্মী মনোযোগ দিয়ে নির্দেশনা শুনছেন।কিন্তু স্বপন সাহেবের অনুপস্থিতি জি এম এর চোখ এড়ালো না।ডেপুটি ম্যানেজার শিহাব শাহেব কে জিজ্ঞেস করলেন।শিহাব সাহেব বলল গতকাল রাতে ফোনে কথা হয়েছে।ডাক্তার দেখিয়েছেন। ভালো আছেন। জি এম এবার বললেন, বিজ্ঞাপনে নূতন একটা গাধা আছে না অভি না কি নাম,ত্রিশ দিনে তিন ইঞ্চি বিজ্ঞাপন আনতে পারে নি..
জি এম এর কথা শেষ না হতে সবাই একসাথে হেসে ফেলে। জি এম আবার বলে, ওই গাধাটা কই?একজন বলল, সজল দা বলতে পারবে। কথার মাঝখানে জি এম এর ফোন আসে। তিনি হ্যালো বলে রিসিভ করেন।তাকে বলতে শুনা যায় ইন্না লিল্লাহে..।তারপর কাপা গলায় বলেন,কখন কোন হাসপাতালে? আচ্ছা আমরা এক্ষুনি আসছি..বলে ফোন রেখে দেন।জি এম মাহবুব সাহেব একহাতে চোঁখ থেকে চশমা নামাতে নামাতে বিমর্ষ মুখে বলেন, স্বপন সাহেব একটু আগে মারা গেছেন।অফিসে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ সময় দু বার বমি করে। হাসপাতালে নিতে নিতে শেষ।
তার এ কথায় পুরা মিটিং রুমে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। তারপর হই হুল্লোড়।সজল সাহেব কে বলতে শুনা যায়, গাধাটার কথাই শেষে সত্যি হলো।মুহূর্তে খবরের কাগজের অফিসে খবর ছড়িয়ে পড়ে- স্বপন সাহেব মারা গেছেন।
তার পরের দিন শোক কাটিয়ে যথারীতি ব্যস্ত অফিস।যে যার কাজে ব্যস্ত বিজ্ঞাপন কর্মীরা।খবরের কাগজে এরকমই। কেউ মারা গেলে সর্বোচ্চ এক দিনের শোক।একজন দেশসেরা নিউজ এডিটর ফার্স্ট পেজ এডিট শেষ করে উপরের দিকে দুই কলামে একটু জায়গা ফাঁকা রেখেছিলেন। জরুরি কোনো নিউজ আসলে দিয়ে দিবেন।মফস্বল এডিশন একটু পর প্রেসে যাবে, সেই তাড়া ও আছে। বেচারা বিড়ি (সিগারেট) ফুকার প্রচণ্ড অভ্যাস।নিচে নেমে একটা শলাকা ঠোঁটে ধরিয়ে ভাববেন নূতন আপডেট না আসলে হাতে থাকা নিউজ থেকে কোনটা ধরাবেন।বরাবর এরকমটা করেন। কিন্তু সেদিন আজরাইল তাকে সেই সুযোগ আর দিলো কোথায়।সিঁড়ি দিয়ে নামবেন, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন, এমন অবস্থায় পড়ে গেলেন। সহকর্মীরা ধরাধরি করে কাছের হাসপাতালে নেয়ার আগেই মৃত্যুকোলে ঢলে পড়েন।মিনিট ত্রিশেক পরে ডেপুটি নিউজ এডিটর সদ্য প্রয়াত নিউজ এডিটরের চেয়ারে বসে কাঁদতে কাঁদতে ফ্রন্ট পেজে তার রেখে যাওয়া খালি জায়গায় শিরোনাম লেখেন দৈনিক ...নিউজ এডিটর আর নেই।নিউজ এডিটর ফ্রন্ট পেজে যখন খালি জায়গা রেখেছিলেন এক মুহূর্তে কি ভেবেছেন এই খালি কলাম পূরণ হবে নিজের মৃত্যু সংবাদে!এ রকম হাজারো নির্মম সত্য লুকিয়ে থাকে সংবাদ কর্মীদের জীবনে।স্বপন সাহেবের মৃত্যু সংবাদ ও পরদিন রবিবার নিজেদের কাগজে এক কলামে ছবি সহ স্থান পেলো তৃতীয় পেজে। এ পর্যন্তই!
জি এম মাহবুব সাহেব অভিক ও সজল বাবুকে তার রুমে ডাকেন। অভিক আড়ষ্ট বোধ করে জি এম এর সামনে বসতে। মাহবুব সাহেব জিজ্ঞেস করেন, কাল অফিসে আসোনি কেন?অভিক চুপ থাকে। জি এম আবার বলে, কিছু জিজ্ঞেস করছি মিস্টার অভিক।
স্যার শরীর খারাপ ছিল
বৃহস্পতিবার জানতে শনিবার শরীর খারাপ থাকবে?অফিসে আসতে পারবা না।
না স্যার।
নিজের বিষয়ে জানোনা ।স্বপন সাহেবের মৃত্যু বিষয়ে আগাম জানলে কিভাবে।
অভিক চুপ।
জি এম আবার বলল,কথা বলো। কিভাবে ধারণা হলো। না মনে উদ্ভট যা আসে বলে ফেলো।
স্যার সিগন্যাল পাই।
সিগনাল পাও। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলো কাল আমার জন্য কি খারাপ অপেক্ষা করছে?বলো শুনি।
অভিক এক মুহূর্ত জি এম সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, স্যার কিছু দেখছি না।
তাহলে নিজেকে জ্যোতিষী সাজাতে উদ্ভট কথা বলো না। অফিসে তোমাকে নিয়ে সবাই হাসে।খারাপ দৃষ্টিতে দেখে।
এতক্ষণ সজল বাবু চুপ ছিলো। এবার সে মুখ খুলল, স্যার ও ভালো কিছু বলতে পারলে উপকার হতো,কিন্তু বলেতো স্যার নেগেটিভ কথা।ফলে ও যায়।আমি তো স্যার নিজেরে নিয়ে চিন্তায় আছি।
কেনো?
ওর পাশে বসি।কি বলে না বলে।আবার কোন বাতাস গায়ে লাগে।
জি এম সজল বাবু কে থামিয়ে দেয়।
অভিক এবার সাহস করে বলে, স্যার আমি ইচ্ছা করে এসব বলিনা।চিন্তা করে বা ভেবে বলিনা।বৃহস্পতিবার কে যেন আমার কানে কানে বলল, স্বপন বাবু আর অফিসে আসতে পারবে না। বিষয় টা আমি শুধু সজলদাকে বলেছি মাত্র ।
জি এম বলেন,মনে এরকম নেগেটিভ চিন্তা আসলে ও অফিসে কারো সাথে শেয়ার করা যাবে না।অফিসের ডেকোরাম নষ্ট হয়। মনে থাকে যেনো। যান।
(চলবে)
(পুরো লেখা লেখকের উর্বর মস্তিষ্ক প্রসূত। বাস্তবের সাথে কোনো মিল থাকলে নিতান্ত কাকতলীয়।)