শাহিনের বড় আপা জেসমিন ফোন করে তাকে বাসায় যেতে বলেছে। আপার বাসায় যাওয়ার একটাই সমস্যা।ঘুরে ফিরে শাহিনের বিয়ের প্রসঙ্গ। ভাইগ্না দুটো আরেক ধাপ এগিয়ে। গেলেই বলবে, মামা.. মামী আসবে কবে।শাহীন তখন বলে, তোরা যেভাবে বলিস যেনো মামী হচ্ছে বাজার থেকে লাউ কুমড়ো কিনে আনার মতো।পছন্দ হলো আর দর দাম করে কিনে নিয়ে আসলাম।
শাহীন ভাবে,জেসমিন আপা যখন ডেকেছে না গেলে বাসা মাথায় তুলবে।গ্রামে মায়ের কাছে ফোন করবে। মা আপনার ঘুণধার ছেলেকে বাসায় ডেকেছিলাম।তার নাকি সময় হয়না।
শাহীন অবশ্য ওর বোনের কাছে কৃতজ্ঞ। এই ঢাকা শহরে টাকা থাকলে ও বাড়িওয়ালা কোনো ব্যাচেলর কে ফ্ল্যাট ভাড়া দেয় না। সঙ্গে একজন বৈধ মেয়ে মানুষ লাগে। সে জায়গায় ওর জেসমিন আপা মিরপুরে তাদের ছয় তলা বিল্ডিং এর নিচ তলা পুরোটা ওকে ছেড়ে দিয়েছে। বড় বড় তিন রুম নিয়ে শাহীন একা থাকে।দারোয়ানের জন্য আলাদা থাকার জায়গা আছে। শাহিনের রান্নাটা অবশ্য দারোয়ানের বৌ করে দেয়। মহিলার হাতে জাদু আছে।যা রান্না করে সেটাই অমৃত। সব চে ভালো রান্না করে ইলিশ পোলাও।যাকে বলে অসাধারণ!
জেসমিন আপার লালমাটিয়ার ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখে আপা বাসায় নেই।নিউ মার্কেট গেছে। ভাইগ্না বড়টা ভরা সন্ধায় নাকডেকে ঘুমাচ্ছে।শাহীন বলে, কিরে জাহীন এই অবেলায় ঘুমাচ্ছিস। জাহিন ঘুম চোখে বলে,মামু সেকেণ্ড সেমিস্টার চলছে।গতকাল সারারাত পড়েছি। শাহিনের এই ভাইগ্না টা এনএসইউ তে সিসি করছে। ছোট টা এবার ইন্টার পরীক্ষা দিয়েছে।মেডিকেল কোচিং নিয়ে ব্যস্ত।
জেসমিন আপা ব্যাগভর্তি কাঁচা বাজার, মাছ, মুদি বাজার নিয়ে বাসায় ফিরেছে। শাহীন কে দেখে বলল,রাতে খেয়ে যাবি। তোর পছন্দের বুনা খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজা হবে।শাহীন মাথা নারায়। জেসমিন আপা বুয়াকে চা দিতে বলে।তারপর এভাবে বলা শুরু করে - মা তোর জন্য এবার যে মেয়েটা দেখেছে,ওর ছবি দেখেছি।মেয়েটা খুব সুন্দর।বাবা সরকারি চাকরি করে।মা স্কুল টিচার।আর মেয়েটা বরিশাল বি এম কলেজে বি এ অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে। একটি মাত্র ভাই।ক্লাস নাইন বা টেনে পড়ে।ছোটো ফ্যামিলি। তুই রাজি হয়ে যা।
জেসমিন আপা এক নিঃশ্বাসে বলে। শাহীন আস্তে করে বলে,দেখি। একটু সময় দাও।
জেসমি আপা এবার রেগে যান।
তোর সময় কবে হবে। মা মরলে? নিজের বয়স,চেহারা আয়নায় দেখিস।কদিন পর তোর ভাইগ্না বড়টা বিয়া করবে। আর তুই আইবুড়ো হয়ে থাকিস।
শাহীন বলে,আপা যে কি বলো।তাছাড়া যে মেয়েটার কথা বলছ সে আমার অর্ধেক বয়সী।
জেসমিন আপা এবার একটু শান্ত স্বরে বলে, শোন মা ওদের সাথে ফাইনালি কথা বলবে,তুই রাজি হয়ে যা। তোর দুলাভাইর সাথে আমার বয়সের ব্যবধান বারো তেরো বছর।আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে?
শাহীন বলে, আপু আমাকে একটু সময় দাও।আমি তোমাকে কয়েকদিনের মধ্যে জানিয়ে দিবো।
জেসমিন আপা বলে,মা বলেছে এবার ই শেষ। এরপর তোর জন্য আর মেয়ে দেখবে না।তুই একটা কলা গাছকে বিয়ে করিস।
জেসমিন আপা একথা বলে ফিক করে হাসে। বোনের কথায় শাহীন ও হাসে।
শাহীন বোনের বাসা থেকে মিরপুর আসতে আসতে দশটা বেজে গেছে।মাথা ঝিম ঝিম করছে।একটু চা খেলে হয়। মোড়ের দোকানে যেতে ইচ্ছে করছে না।হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে মোবাইল হাতে নেয়।ফেসবুক ওপেন করে। অনেক ম্যাসেজ জমে আছে।শাহীন আগে ইনবক্স দেখে। দীপান্বিতা লিখেছে, দেবুদা কে আপনার কথা বলেছি। আপনার ফোন নম্বর চেয়েছে।
দ্বিতীয় ম্যাসেজ,ওদিন কথা শেষ না হতে কেটে দিলেন কেনো।
দীপান্বিতার ম্যাসেজ দেখে শাহিনের মাথা ব্যথা সেরে যায়।দীপা যেনো শাহিনের মাথা ব্যথার প্যারাসিটামল! শাহীন রিপ্লাই দেয়, বাড়ী থেকে এসে আমাদের তিন বন্ধুর ফার্ম নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম। সেদিন রাস্তায় ছিলাম।কথা কেটে কেটে আসছিলো।
শাহীন আবার লিখলো, দেবকে কি বলে আমার কথা বললে।
দু মিনিট পর দীপান্বিতার উত্তর স্কিনে ভেসে উঠলো।' বললাম আপনার একটা মুসলমান বন্ধু ছিল না ওপারে।ওই যে গল্পের বই নেয়া দেয়া করতেন..
তারপর।
দেবুদা বলল,ও শাহীন?ঢাকার চারুকলায় পড়ত। ওর সাথে অনেক আগে চারুকলায় একবার দেখা হয়েছিল।এর পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ।
দেবু এখন কি করছে।তোমাকে কিভাবে চিনেছি বা পরিচয় জিজ্ঞেস করেনি। শাহীন লিখলো।
দীপা শাহিনের এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টায়।লিখে,আমার ছেলের বাবা আমাদের সম্পর্ক টা জেনে গেছে। সেদিন সেটাই বলছিলাম।আপনি তো ব্যস্ত মানুষ,শুনেন নি।
শাহীন লিখলো, সরি। কিন্তু কীভাবে জানলো বলো।
অর্ণব,মানে আমার ছেলে ওদিন খাবার টেবিলে বলে দিয়েছে।
কিভাবে উপস্থাপন করলো।
বলল, জানো বাবা এবার ছোটো খালামনির ওখানটায় যাওয়ার পথে লঞ্চে মায়ের এক বন্ধুর সাথে দেখা।
তোমার হাজবেন্ড কি বলল।
সে এতো সিরিয়াসলী নেয়নি।বলল, যাক তোমার মার কপালে অবশেষে একটা বন্ধু ঝুটলো।
তুমি কি বললে। শাহীন লিখলো
আমি বিষয়টা বুঝিয়ে বলি। বলছি যে দেবুদার ক্লোজ মুসলিম ফ্রেন্ড। আমাদের বাড়ি আসতো।স্কুল জীবন থেকে চিনি।
শাহীন লিখে,পুরোটা কি সত্যি!
দীপা লিখে,স্বামীর কাছে বিব্রত হওয়ার চেয়ে কিছুটা মিথ্যা বলা শ্রেয়।
এখন তবে টেনশন ফ্রি। তোমার সাথে যখন তখন কথা বলা যাবে।
তাই বলে রাত বিরাতে নয়।
এখন কত রাত দেখেছ। দশটা পয়ত্রিশ।আমার কথা বলছি।
দীপা লিখে, হা তাইতো? অর্ণবের বাবা চলে আসবে এক্ষুনি।
শাহীন লিখে, দীপা আমার জন্য মেয়ে দেখছে।ওই যে তোমাকে বললাম না। আমার বোন আজ বাসায় ডেকেছিল। খুব চেপে ধরেছে।এবার মনে হয় এড়ানো যাবে না।
দীপা লিখে, বিয়ে করে ফেলেন। আমাকে নিমন্ত্রণ দিয়েন।
কিন্তু আমি বিয়েতে বিশ্বাসী নই।
কেনো।
তখন আমার বয়স চোদ্দ। ক্লাস নাইন এ পড়ি।আমার চোখের সামনে বাবা মায়ের সংসার ভেঙে যেতে দেখেছি।পাশে নানা বাড়িতে আমাদের আশ্রয় হয়েছে। চাচারা অবশ্য হেল্প করেছে।
দীপা লিখে, আপনার জীবনে তো এমনটা না ও হতে পারে।তাই বলে বিয়েকে অস্বীকার করা যায় না।পজিটিভ ভাবেন দেখেন।
শাহীন লিখে, তুমি সাহস দিও।
আপনার নামের অর্থ সাদা বাজপাখি। প্রতীকী অর্থে সাহসী। একজন সাহসী মানুষকে আমি কিভাবে সাহস জোগাব।
শাহীন লিখে ,দারুণলিখেছো।কিন্তু তুমি তো প্রদীপে আলোকিত করো।
দীপা লিখে,অনেক রাত হয়েছে।সাহসী মানুষ, আজ এখানেই দারুণ আলাপ থমকে যাক।
(চলবে)