বিয়াল্লিশ বছরে এসে শাহীন ভাবছে বিয়েটা করবে কি করবে না। বড় আপা,মা যেভাবে চেপে ধরছে, এবার পালিয়ে পাড় পাওয়া যাবে না।ওদের 'ত্রী মাত্রিক' এর দুই ব্যবসায়িক বন্ধু পারভেজ ও সুমন বিয়ে করে সংসারী।ছেলে মেয়েরা স্কুল,কলেজে পড়ছে।শাহীন অবসরে ভাবে,বাবার দ্বিতীয় বিয়ে কি ওর বিয়ে না করার বড় কারণ?হয়তো।এর সাথে যোগ হতে পারে নিজের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জার্নি।এটা ঠিক আট দশ বছর লেগেছে তিন বন্ধুর ইন্টেরিয়র ডিজাইনের ফার্মটাকে একটা জায়গায় দার করতে। কতো রাত নির্ঘুম কেটেছে।
আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে প্রথম পাঁচ ছয় বছর দুইটা প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি করে শাহিনের উপলব্ধি হয়েছে,চাকরি ওর জন্য নয়।তারচেয়ে নিজে সৃষ্টিশীল কিছু করতে পারলে ভালো।স্বাধীনতা আছে। 'ত্রিমাত্রিক' এর শুরুটা প্রথমে শাহিনের মাথায় আসে। বন্ধু সুমনের সাথে শেয়ার করে।দু বছর পর পারভেজ এসে যোগ দেয়।
মিরপুর সাড়ে এগারো বাস থেকে নেমে বাসায় যেতে যেতে শাহীন এসব ভাবছিল।এরমাঝে জেসমিন আপার ফোন-
"কিরে ফোন ধরিস না কেনো।"
"বাস থেকে নেমে বাসায় যাচ্ছিলাম,বলো।"
"আচ্ছা বাসায় যা। পরে বলি।"
"বলতে পারো,হাঁটছি।"
"মেয়ের মা ফোন দিয়েছিল।আমাদের দিকটা জানতে চেয়েছে।"
"তুমি কি বললে।"
"আমি বললাম আমদের ভাই তো আপনার মেয়ের দ্বিগুণ বয়সী। মানিয়ে নিতে পারবে?"
"হবু শাশুড়ি কি বলল।"শাহীন মজা করে বলে।
"বললো মেয়ে তোকে পছন্দ করেছে। কদিন আগে যখন বাড়িতে গেলি তোকে এক সন্ধায় নাকি নদীর পাড়ে বসে থাকতে দেখেছে।"
"একা?"
"হ্যাঁ তাইতো বললো।"
"যাক বাঁচা গেলো।" শাহীন অস্পষ্ট সুরে বলে।
"কি বললি,কি বাঁচা গেলো?"
"না কিছু না।"
"শোন, আমি তিন দিনের সময় নিয়েছি। তুই তো বাসা থেকে যাওয়ার পর কিছু জানালি না। দেখ মাকে আর কষ্ট দিস না।মায়ের জীবন এমনিতে দুঃখ কষ্টের।"
"বুবু আমি তোমাকে তিন দিনের মধ্যেই জানিয়ে দিবো।"শাহীন মাঝে মাঝে জেসমিন আপাকে বুবু বলে ডাকে।
"শোন তিন দিনের মধ্যে রাজি হয়ে যা। আর না হয় তোর মতো ব্যাচেলর আমার বাড়িতে রাখবো না। বৌ ছাড়া তুমি একা একা তিন রুম নিয়া থাকবা। তা হবে না।"
"বুবু তোকে ভাড়া দিয়ে দিব।"
"ভাড়া দিলে ও না।"জেসমিন আপার চূড়ান্ত থ্রেট!
শাহীন বাসায় গিয়ে বাথরুমে শাওয়ার নেয়। রাতে গোসল ওর পুরোনো অভ্যাস। দারোয়ানের বৌ লায়লা জিজ্ঞেস করে চা খাবে কিনা। বলে,দিলে মন্দ হয় না। রাতে কি রেধেছে জিজ্ঞেস করে। লায়লা পান চিবোতে চিবোতে বলে,ভাইজান বাইলা মাছ ঘন জোল করে রান্না করছি। সঙ্গে ডালের চরচরি।মহিলার রান্নর হাত ভালো, কিন্তু অল্প বয়সে বুড়ীদের মতো পান চিবানোর অভ্যাস শাহিনের একদম অপছন্দ।আজ অবশ্য লায়লার পান চিবানো দেখে শাহিনের দীপান্বিতার কথা মনে পড়ে।আশ্চর্য্য পান চিবানোর সাথে দীপাকে মনে পড়ার কি সম্পর্কে?দীপার সাথে কদিন হয় কথা হয়না। আচ্ছা দীপান্বিতা কি পান খায়? জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে। দূর কি ভাবছি! দীপা পান খাবে কোন দুঃখে।সেদিন সন্ধ্যার আধো আলো ছায়ায় স্পষ্ট দীপার শুভ্র সুন্দর দাঁতের হাঁসি দেখেছে।
শাহীন চা খেতে খেতে দীপাকে ফোন করে। রিং হয়ে কেটে যায়। এক মিনিট পর দিপার ম্যাসেজ- বাসায় মেহমান। পড়ে কথা হবে।
শাহিনের মন খারাপ লাগে।কেনো লাগে নিজে ও জানে না। অন্য একটা মেয়ের সাথে বিয়ের কথা চলছে।এই মুহূর্তে দীপা ফোন ধরছে না বলে মন খারাপ বোধ কেমন যেন বেমানান।
আধাঘণ্টা পর দীপা লিখে, 'আপনার বিয়ের খবর কি।'
শাহীন ম্যাসেজ রিপ্লাই না দিয়ে সরাসরি ফোন করে।বলে,"মেয়ে নাকি এই বুড়োকে পছন্দ করে বসে আছে।মেয়ের মা ফোন করে আমার বোনকে বলেছে।"
"আপনাকে দেখেছে।"
"দুবার। একবার আমার খালাতো বোনের বাসায়।আরেকবার সেদিন মাসকাটা নদীর পাড়ে।"
"কোনদিন।ঐযে ওদিন নদীর পাড়ে আপনার সাথে দেখা হলো।"
"দেখা হলো না বলে বলো তোমাকে দেখতে নদীর পারে ছুটে গেলাম।"
"এখন হবু বউকে দেখতে ছুটে যাবেন। দীপা বলল। তারপর আবার বলল, মেয়ের কি নাম বলেন।বাবা কি করে।বাসা কোথায়..
"থামো থামো.. বলছি।মেয়ের নাম রিদিতা। বাবা সরকারি জব করে। পোস্টিং বরিশাল শহরে।"
"আর মা।"
"মা সদর গার্লস এর হেড মিস্ট্রেস।"
"নাম কি।"
"নাম মনে নেই। আরে এত নাম মনে থাকে।' শাহীন বলে।
"দাঁড়ান আমি বের করে ফেলবো। আমার বোন সিপাকে কে তো চিনেন। ওর বর ওখানকার সাইন্স এর টিচার।"
"তোমাকে কি আমি ঘটকালি করার মহান দায়িত্ব দিয়েছি। "শাহীন কিছুটা বিরক্ত মেশানো কণ্ঠে বলে।
দীপা হেসে বলে,"ধরেন স্বেচ্ছায় কাঁধে নিয়েছি।"
"তোমাকে কি খুব জ্বালাই।অপদ বিদায় করছো।"
"ছি !কি বলেন।আমার ভালো লাগে আপনার সাথে কথা বলতে।বিশেষ করে যখন বোর লাগে আপনার সাথে কথা বললে মন ভালো হয়ে যায়।"
"তাহলে এই ভাবে চলুক না শফিক রেহমানের মঈন মিলার মতো!"শাহীন বলে।
দীপা বলে, "একটু বুঝিয়ে বলেন।"
"কেনো তুমি যায় যায় দিনে কখনও পড় নি মঈন মিলার গল্প।সেটা অবশ্য নব্বই দশকের।আমি ও পরে পেয়েছি।আর্ট কলেজ পড়ার সময় প্রায়ই পুরানো পল্টনে ডু মেরে যাযাদি পুরানো সংখ্যা খুঁজতাম।মোবাইল কথোপকোথন তখনও সেইভাবে চালু হয়নি। গল্পের নায়ক নায়িকা মঈন মিলা টেলিফোনে প্রেমালাপ, সমাজ, সংস্কৃতি,রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করত।"
দীপা অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শাহিনের কথা শুনে।এরপর রাগত স্বরে বলে, "আমি কি আপনার মিলা। আপনার সাথে প্রেম করছি।কথা বলতে ভালো লাগা মানে কি প্রেম!"
" তুমি রেগে যাচ্ছ,আমি ওই ভাবে মিন করে কথাটা বলিনি।জাস্ট একটা এক্সাম্পল দিয়েছি।"শাহীন আত্মপক্ষ সমর্থন করে।
দীপা বলে,"আমি আপনার একজন ভালো বন্ধু হতে চাই। প্রথম থেকে আপনাকে শিল্পমনা ও একজন সুন্দর মনের মানুষ মনে হয়েছে। প্লিজ আমার ধারণা ভেঙে দিবেন না।এটা ধরে রাখলে খুশি হবো।আর শুনেন আপনার হুবু বৌ এর নাম কি যেনো বললেন?"
"রিদিতা।"
"ওকে খুঁজে বের করতে আমার সময় লাগবে না।আজ থেকে আপনার মা বোনের সাথে আমি ও লেগে গেলাম। রিদিতার সাথে বিয়ে দিয়ে আপনার আমার বন্ধুত্ব পাকা করব।"
শাহীন অনেকক্ষণ হেসে বলল," আচ্ছা তাই করো।"
(শেষ)
🏵️এই সিরিজের পরবর্তী এপিসোড "দীপান্বিতার কাছে" নিয়ে শীঘ্র ফিরব।শুভ কামনা সবার জন্য।(লেখক)