Article

কথার ভেতর কথা ৬

September 23, 2026

51 views

ফোনটা বেজে উঠলো।
বাইরে অক্টোবরের সন্ধ্যা, বিদ্যুতের ওঠানামায় মাঝে মাঝে ঘর অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। ইভান ফোনটা হাতে নিতেই ওদিক থেকে এস্তেজার কণ্ঠ—
এস্তেজা: হ্যালো, শুনছো ইভান?
ইভান: শুনছি। আজ একটু দেরি হলো, অফিস থেকে বের হতে গিয়ে লোডশেডিং—লিফট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
এস্তেজা: আহা, এখনকার লিফটও বুঝি সরকারের মতো—চলবে কি না, তা নিয়তি নির্ভর!
ইভান: তুমি তো আজ ব্যঙ্গ দিয়ে শুরু করলে!
এস্তেজা: না, ব্যঙ্গ না ইভান—বাস্তবতা। শহরে এখন হাসতেও টাকা লাগে। বাজারে গেলে মনে হয় সবজিও এমনি এমনি তাকিয়ে আছে, “তুমি কিনতে পারবে?”
ইভান: সত্যি বলেছো। গতকাল এক কেজি পেঁয়াজে এত দাম শুনে মনে হলো যেন এটি অর্থনীতির সূচক।
এস্তেজা: কিন্তু জানো ইভান, মানুষ এখন শুধু পেঁয়াজের দাম নিয়ে নয়—নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভয় পাচ্ছে।
ইভান: হুম। আমি দেখছি অফিসে তরুণরা কথা কম বলে। একসময় চায়ের টেবিলে রাজনীতি, সংস্কৃতি নিয়ে তর্ক হতো—এখন সবাই চুপচাপ, চোখ ফোনে।
এস্তেজা: কারণ তারা বিশ্বাস হারিয়েছে। ভোট নেই, স্বপ্ন নেই, চাকরি নেই, তবুও বিজ্ঞাপনে “সমৃদ্ধ বাংলাদেশ”!
ইভান: সমৃদ্ধি যখন কাগজে হয়, তখন বাস্তবটা হয় কষ্টের পরিসংখ্যান।
এস্তেজা: তুমি আবার দার্শনিক হচ্ছো! কিন্তু বলো, তুমি কি হতাশ?
ইভান: হতাশ না, ক্ষুব্ধ। কারণ আমরা এক প্রজন্মকে নিরুপায় বানিয়ে ফেলেছি। আমরা তাদের বলতে শিখিয়েছি—“চুপ থাকলে নিরাপদে থাকবে।”
এস্তেজা: অথচ আমাদের বাবা-মায়েরা শিখিয়েছিলেন—“সত্য বললে মর্যাদা থাকবে।”
ইভান: ঠিক তাই। এখন সত্য বলা মানে ‘বিপদে পড়া’। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি—বিপদে পড়েও কেউ কেউ থাকবে, যারা কথা বলবে।
এস্তেজা: তারা কারা হবে, ইভান?
ইভান: তারা হবে তুমি, আমি, আর যেকোনো তরুণ-তরুণী, যারা এখনও রাতে ঘুমানোর আগে নিজের বিবেককে বোঝায় না—“সব ঠিক আছে।”
এস্তেজা: কিন্তু ইভান, এভাবে তো দেশ চলে না।
ইভান: ঠিক, কিন্তু দেশের চেয়ে মানুষ বড়। মানুষ জেগে উঠলে দেশ জেগে ওঠে।
এস্তেজা: তুমি জানো, আজ অফিসে এক মেয়েকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হলো। কারণ সে অফিসের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিল।
ইভান: তবুও সে হেরেনি, এস্তেজা। যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, সে বরখাস্ত হয়, কিন্তু হারায় না—বরং মুক্ত হয়।
এস্তেজা: তুমি হয়তো ঠিক বলছো, কিন্তু মানুষ এখন ভয় পায়—ভয় তার সন্তানকে নিয়ে, পরিবার নিয়ে।
ইভান: ভয়টা স্বাভাবিক। কিন্তু ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, ভয় যেন আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে।
এস্তেজা: তোমার কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে—তুমি আবার কলামে ফিরছো।
ইভান: লিখছি, তবে কলাম নয়—মানুষের মনে। আজ যারা নিরব, কাল তারাই উচ্চারণ করবে।
এস্তেজা: তুমি বুঝি এখনও বিশ্বাস করো—এই দেশটা বদলাবে?
ইভান: বদলাবে—যেদিন একজন মা তার সন্তানের কাছে মিথ্যা আশার বদলে সাহস শেখাবে, সেদিন থেকেই শুরু হবে পরিবর্তন।
এস্তেজা: তোমার এই কথাগুলো মনে রাখব।
ইভান: রাখো, কারণ সময় এখনও শেষ হয়নি। আমরা যারা হতাশ হয়ে যাচ্ছি, তাদের জন্য একটা বাক্যই যথেষ্ট—
“দেশ মানে শুধু মাটি নয়, যারা মাটির গন্ধে বাঁচে তারাই দেশ।”
এস্তেজা: ইভান... তোমার কণ্ঠে আজ আশার গন্ধ পাচ্ছি।
ইভান: আশা মরে না, এস্তেজা। কখনো লুকিয়ে থাকে, কখনো রূপ বদলায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, ওটাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

ফোনটা নিঃশব্দ হয়ে যায়।
বাইরে আবার বিদ্যুৎ আসে। ঘরের আলো জ্বলে ওঠে।
আর কোথাও, হয়তো এই আলোয়, কেউ একজন নোটবুকে লিখে রাখে—
“অন্ধকার কখনো শেষ হয় না,
কিন্তু আলোও হার মানে না।”

Picked up where you left off

Comments

Abdul Khaiyam আবদুল খৈয়াম was this story’s first reader

+40 XP

    Please login to post comment. Login

  • রাজা যায় রাজা আসে প্রজার দুর্দশা হয়না শেষ।তবু ও আশায় স্বপ্ন বাঁধি ভালোবাসি প্রিয় স্বদেশ।

    • Salam Khokon 3 weeks ago

      সেই সেই ভাই। ভালো থাকবেন।