আঁধার পেরিয়ে আলো: এ তো শুধু গল্প নয়, এ আমাদের চেনা সমাজের প্রতিচ্ছবি
লেখক: সালাম খোকন
প্রকাশনী: শিল্পৈষী
পৃষ্ঠা: ১৪৪
মূল্য: ৪০০ টাকা
প্রাপ্তিস্থান: রকমারি.কম
সালাম খোকনের ‘আঁধার পেরিয়ে আলো’ এমন একটি উপন্যাস, যার গল্প পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়—এ ঘটনা কি সত্যিই শুধু উপন্যাসের পাতায়? শান্তিপুর ও সোনাঝুরির মতো কাল্পনিক জনপদের আড়ালে লেখক এঁকেছেন আমাদের চেনা সমাজেরই এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি। কিশোরী লতার ওপর নির্যাতন এবং ব্যবসায়ী আলীমের হত্যাকাণ্ড তাই নিছক দুটি অপরাধ নয়; এগুলো ক্ষমতা, ভয় ও অন্যায়ের একটি বৃহত্তর কাঠামোর প্রতীক।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র তরুণ সাংবাদিক আরিফ চৌধুরী। সত্য অনুসন্ধানের দায়িত্ব থেকে সে যখন এই দুটি ঘটনার গভীরে প্রবেশ করে, তখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় ক্ষমতার এক অদৃশ্য জাল। প্রভাবশালী মন্ত্রী শফিকুর রহমান সেই ক্ষমতার প্রতীক—যার প্রভাব প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যম পর্যন্ত বিস্তৃত। সত্যকে চাপা দিতে প্রমাণ নষ্ট করা, মিথ্যা সাক্ষ্য তৈরি, চরিত্রহনন এবং ভয় দেখানোর যে কৌশলগুলো উপন্যাসে উঠে এসেছে, সেগুলো পাঠকের মনে অস্বস্তিকর বাস্তবতার অনুভূতি তৈরি করে।
তবে ‘আঁধার পেরিয়ে আলো’ কেবল অন্ধকারের গল্প নয়। বরং অন্ধকারের বিপরীতে লেখক দাঁড় করিয়েছেন কিছু সাহসী মানুষকে। প্রবীণ সাংবাদিক তাসনিম, প্রযুক্তিবিদ রাহাত, মানবাধিকারকর্মী নাজিবা, ইন্সপেক্টর জামান এবং ব্যারিস্টার সজল—প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। আর জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা ঐশী, নিজের নিরাপদ ও পরিচিত জগত ছেড়ে সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে গল্পে যোগ করেন ভিন্ন মাত্রা।
উপন্যাসটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলোর একটি হলো সাধারণ মানুষের জেগে ওঠার চিত্র। যে লতা একসময় ভয় ও অপমানের কাছে ভেঙে পড়তে বসেছিল, সেই লতার মধ্যেই একসময় প্রতিবাদের শক্তি জন্ম নেয়। ভীতসন্ত্রস্ত গ্রামের মানুষও ধীরে ধীরে নিজেদের ভয়কে অতিক্রম করে। একটি ব্যক্তিগত অন্যায়ের প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় বৃহত্তর গণপ্রতিরোধে। এখানেই উপন্যাসটি ব্যক্তিগত গল্পের সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক আখ্যান হয়ে ওঠে।
আরিফ ও ঐশীর সম্পর্কও গল্পে একটি মানবিক আবহ তৈরি করেছে। ক্ষমতা ও ষড়যন্ত্রের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও তাদের মধ্যে জন্ম নেওয়া না-বলা ভালোবাসা উপন্যাসের উত্তেজনার ভেতর কোমলতার জায়গা তৈরি করে। ফলে গল্পটি কেবল অপরাধ, রাজনীতি ও প্রতিরোধের নয়; এর ভেতরে রয়েছে মানুষে মানুষে বিশ্বাস, সাহস এবং ভালোবাসার গল্পও।
তবে এই উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত—অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজন মানুষ কতদূর যেতে পারে? আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—একজনের সাহস কি অন্যদের সাহসী করে তুলতে পারে? সালাম খোকনের উত্তরটি আশাবাদী। একজন মানুষ কলম ধরলে আর তার পাশে যদি আরও কিছু মানুষ দাঁড়ায়, তাহলে ক্ষমতার সবচেয়ে শক্ত দেয়ালেও ফাটল ধরতে পারে।
‘আঁধার পেরিয়ে আলো’ তাই শুধু একটি অনুসন্ধানী বা রাজনৈতিক থ্রিলার নয়; এটি সত্য, ন্যায়, সাহস এবং সম্মিলিত প্রতিরোধের গল্প। কোথাও কোথাও এর বর্ণনা ও ঘটনাপ্রবাহ সরল রেখায় এগোলেও, উপন্যাসটির মূল শক্তি তার বক্তব্যে—অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যাবে না।
বইটি পড়তে পড়তে হয়তো পাঠকের মনে বারবার প্রশ্ন জাগবে—“আরে, এই দৃশ্যটা তো আমরা আগেও দেখেছি!” আর সেখানেই এই উপন্যাসের সার্থকতা। কারণ ভালো গল্প শুধু বিনোদন দেয় না; কখনো কখনো আমাদের চারপাশের বাস্তবতাকে নতুন করে দেখতে বাধ্য করে।
অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলো জ্বালানোর জন্য কখনো কখনো একজন মানুষের সাহসই যথেষ্ট। আর সেই আলো যখন একে একে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে, তখনই জন্ম নেয় পরিবর্তনের সম্ভাবনা। ‘আঁধার পেরিয়ে আলো’ সেই সম্ভাবনারই এক রুদ্ধশ্বাস সাহিত্যিক যাত্রা।