ইভান: এস্তেজা, একটা প্রশ্ন করি? আমাদের শিশুরা যখন কথা বলতে শেখে, তখন আমরা তাদের প্রথম কী শেখাই?
এস্তেজা: মা, বাবা, পানি, ভাত, খেলনা—এই তো! কেন?
ইভান: শুধু শব্দ শেখাই? নাকি অজান্তেই শেখাই কোন আচরণে হাসতে হয়, কোন অন্যায়কে স্বাভাবিক ভাবতে হয়, আর কোন মিথ্যাকে চালাকি বলে মেনে নিতে হয়?
এস্তেজা: তুমি কি ছোটদের ছড়া আর গল্পের কথা বলছ?
ইভান: হ্যাঁ। বিশেষ করে সেই পরিচিত ইংরেজি ছড়াটা—‘জনি, জনি, ইয়েস পাপা’। ছোটবেলায় কত শিশু এই ছড়া শুনে হাসে, হাততালি দেয়, অভিনয় করে। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছ, ছড়াটির ভেতরে কী ঘটছে?
এস্তেজা: বাবা জিজ্ঞেস করছেন, জনি চিনি খাচ্ছে কি না। জনি বলছে, না। বাবা আবার জানতে চাইছেন, সে মিথ্যা বলছে কি না। জনি বলছে, না। তারপর মুখ খুলতে বলতেই সত্য প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। তাই তো?
ইভান: ঠিক। আর এখানেই আমার প্রশ্ন। জনি চুরি করে চিনি খেয়েছে কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সে মিথ্যা বলেছে, কিন্তু সেই মিথ্যার প্রতি তার কোনো অনুশোচনা দেখানো হলো কি? সে কি নিজের ভুল স্বীকার করল? বাবার কাছে ক্ষমা চাইল? নাকি পুরো ঘটনাটা শেষ হলো হাসিতে?
এস্তেজা: তুমি বলতে চাইছ, ছড়াটি শিশুদের মিথ্যা বলতে শেখায়?
ইভান: আমি এত সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই না। একটি ছড়া শুনেই শিশু মিথ্যাবাদী হয়ে যাবে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু শিশুদের শেখার প্রক্রিয়ায় বারবার যে আচরণগুলো দেখানো হয়, সেগুলো কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। এই ছড়ায় মিথ্যা বলা, ধরা পড়া এবং শেষে হাসাহাসি—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে আছে। কিন্তু ভুল স্বীকার করা বা সত্য বলার নৈতিক গুরুত্বটি স্পষ্ট নয়।
এস্তেজা: অর্থাৎ সমস্যা শুধু ছড়ার কথায় নয়, আমরা কীভাবে ছড়াটি শেখাচ্ছি, সেখানেও?
ইভান: একদম। আমরা যখন শিশুদের কোনো ছড়া শেখাই, তখন শুধু শব্দ শেখাই না। কণ্ঠের ওঠানামা, মুখের অভিব্যক্তি, অভিনয়, হাসি—সবকিছুর মধ্য দিয়ে একটি আচরণকে কেমনভাবে দেখতে হবে, তারও ইঙ্গিত দিই। জনি যখন অস্বীকার করে, তখন যদি সবাই মজা পায়, শিশুটি অন্তত এটুকু বুঝতে পারে যে এমন পরিস্থিতি হাসিরও বিষয় হতে পারে।
এস্তেজা: কিন্তু শিশুরা তো সবকিছু আক্ষরিক অর্থে নেয় না। তারা ছড়াকে ছড়া হিসেবেই উপভোগ করে। বড়দের মতো নৈতিক বিশ্লেষণ করে না।
ইভান: অবশ্যই করে না। আর সেটাই তো বড়দের দায়িত্ব। শিশুকে প্রতিটি ছড়ার পর বক্তৃতা দিতে হবে, এমন নয়। কিন্তু আমরা যদি আনন্দের সঙ্গে গল্প বলি, তাহলে গল্পের মধ্য দিয়ে সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধও শেখাতে পারি।
একটা শিশু যখন ভুল করে, তখন তার সামনে দুটি পথ থাকে—ভুল লুকানো, অথবা ভুল স্বীকার করে সংশোধন করা। আমরা কোন পথটাকে সহজ ও নিরাপদ করে তুলছি, সেটিই আসল প্রশ্ন।
এস্তেজা: আমাদের পরিবারগুলোতে তো প্রায়ই উল্টোটা ঘটে। শিশু কিছু ভেঙে ফেললে প্রথম প্রশ্ন, ‘কে ভেঙেছে?’ তারপর শুরু হয় বকাঝকা। শিশুটি ভয় পেয়ে অস্বীকার করে। আমরা তখন তার মিথ্যাকে শাস্তি দিই, কিন্তু এমন পরিবেশ তৈরি করার জন্য নিজেদের ভূমিকা দেখি না।
ইভান: চমৎকার বলেছ। ধরো, একটা শিশু ভুল করে গ্লাস ভেঙে ফেলেছে। সে জানে সত্য বললে বকুনি খাবে। তাই বলে, ‘আমি ভাঙিনি।’ এখানে মিথ্যা বলাটা ভুল। কিন্তু কেন সে সত্য বলার সাহস পেল না, সেটাও বুঝতে হবে। শিশুকে দায়িত্বশীল হতে শেখানো আর শিশুকে ভীতু করে তোলা এক বিষয় নয়।
এস্তেজা: তাহলে কি ভুল করলেও তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে না?
ইভান: কেন যাবে না? তবে শাস্তি আর সংশোধনের মধ্যে পার্থক্য আছে। শাস্তি যদি অপমান, ভয় কিংবা মারধরের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাহলে শিশু নিজের কাজের ভুলের চেয়ে ধরা পড়ার ভয়টাই বেশি শিখতে পারে। আর যদি তাকে বোঝানো হয়, তার কাজের ফলে কী ক্ষতি হয়েছে এবং কীভাবে তা ঠিক করা যায়, তাহলে সে দায়িত্ব নিতে শিখতে পারে। ধরো, সে বন্ধুর খেলনা ভেঙেছে। তাকে শুধু বকা না দিয়ে বলতে পারি, ‘তুমি খেলনাটা ভেঙেছ, এতে তোমার বন্ধুর কষ্ট হয়েছে। এখন কীভাবে আমরা বিষয়টা ঠিক করতে পারি?’ এখানে শিশু শিখছে—ভুলের দায় স্বীকার করতে হয়, অন্যের অনুভূতি বুঝতে হয় এবং সম্ভব হলে ক্ষতি পূরণ করতে হয়।
এস্তেজা: অর্থাৎ সততা শুধু ‘মিথ্যা বলবে না’—এই নির্দেশ নয়। সততা এমন একটা পরিবেশও, যেখানে সত্য বললে শিশুকে অপমানিত হতে হয় না।
ইভান: ঠিক তাই। যে বাড়িতে সত্য বলার জন্য শিশুকে নিয়মিত হেনস্তা করা হয়, সেই বাড়িতে শুধু উপদেশ দিয়ে সততা তৈরি করা কঠিন। আরেকটা বিষয় লক্ষ করো। আমরা অনেক সময় শিশুদের বলি, ‘সত্য কথা বলবে।’ কিন্তু নিজেদের সুবিধার জন্য ফোনে মিথ্যা বলতে বলি—‘বাবা বাসায় নেই, বলো।’ অতিথি এলে বলি, ‘বলবে, আমি খাইনি’, যদিও খেয়েছি। কখনো পরীক্ষার ফল খারাপ হলে আত্মীয়দের কাছে লুকাতে বলি। তারপর আবার আশা করি, আমাদের সন্তান সত্যবাদী হবে!
এস্তেজা: শিশুরা উপদেশের চেয়ে আচরণ থেকে বেশি শেখে—এই কথাটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ইভান: হ্যাঁ। বাবা-মা যদি নিজেদের ভুল স্বীকার করতে পারেন, শিশুর কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন, কথা দিয়ে কথা রাখতে পারেন, তাহলে সততা তার কাছে বাস্তব আচরণ হয়ে ওঠে। নৈতিকতা তখন আর বইয়ের পাতায় আটকে থাকে না।
এস্তেজা: কিন্তু শুধু এই ছড়া কেন? শিশুদের অনেক গল্পেই তো মিথ্যা, দুষ্টুমি, প্রতারণা কিংবা ভুল আচরণ থাকে। তাহলে কি সেগুলো বাদ দিতে হবে?
ইভান: মোটেও না। শিশুদের সাহিত্য থেকে ভুল করা চরিত্র বাদ দিলে গল্পই থাকবে না। বরং ভুল করা চরিত্রের মধ্য দিয়েই শিশু জীবনের জটিলতা বুঝতে শেখে। প্রশ্ন হলো, গল্পটি ভুল আচরণকে কীভাবে উপস্থাপন করছে। চরিত্রটি মিথ্যা বলল, তারপর কী হলো? তার কাজের পরিণতি কী? সে কি অন্যের ক্ষতি বুঝল? নিজের ভুল থেকে কিছু শিখল? একটি গল্পে দুষ্টুমি থাকতে পারে, প্রতারণাও থাকতে পারে। কিন্তু গল্পটি যদি প্রতারণাকে বুদ্ধিমত্তার একমাত্র পরিচয় বানিয়ে ফেলে, আর সততাকে বোকামি হিসেবে দেখায়, তাহলে সেখানে চিন্তার অবকাশ আছে।
এস্তেজা: আবার এমনও হতে পারে, মিথ্যা বলা চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত ধরা পড়বে না। তবু গল্পটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, যদি শিশু বুঝতে পারে যে তার কাজ অন্যের বিশ্বাস নষ্ট করেছে।
ইভান: একদম। নৈতিক শিক্ষা মানেই প্রতিটি গল্পের শেষে অপরাধীর শাস্তি আর ভালো মানুষের পুরস্কার নয়। জীবন এত সরল নয়। কখনো মানুষ অন্যায় করেও পার পেয়ে যায়। কখনো সত্য বলেও কষ্ট পায়। শিশুকে সেই বাস্তবতা বোঝানোর পাশাপাশি এটাও শেখাতে হবে—কোনো কাজের নৈতিকতা শুধু তার ফল দেখে নির্ধারিত হয় না। মিথ্যা বলে লাভ হলো কি না, সেটাই একমাত্র প্রশ্ন নয়; মিথ্যাটি কেন বলা হলো, কার ক্ষতি হলো, বিশ্বাসের ওপর তার কী প্রভাব পড়ল—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
এস্তেজা: তা হলে জনির ছড়াটিকেও নতুনভাবে ব্যবহার করা যায়। ছড়া শেষ হওয়ার পর শিশুকে জিজ্ঞেস করা যায়, ‘জনি কেন অস্বীকার করল? সত্য বললে কী হতে পারত? তুমি হলে কী করতে?’
ইভান: ঠিক। এতে ছড়াটি নিষিদ্ধ করতে হবে না। বরং শিশুর চিন্তার দরজা খুলে দেওয়া যায়। তবে শিশুর বয়স অনুযায়ী প্রশ্ন করতে হবে। তিন বছরের শিশুর সঙ্গে যে আলোচনা সম্ভব, আট বছরের শিশুর সঙ্গে তার চেয়ে গভীর আলোচনা সম্ভব। ছোটদের ক্ষেত্রে সহজ ভাষা, বড়দের ক্ষেত্রে কারণ ও পরিণতি নিয়ে আলোচনা—এটাই যুক্তিসংগত।
এস্তেজা: একটা বিষয় আমাকে ভাবায়, ইভান। আমরা শিশুদের অঙ্ক শেখাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করি। হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য খাতা ভরিয়ে দিই। ইংরেজি শব্দ মুখস্থ করাই। কিন্তু সত্য বলা, নিজের আবেগ বোঝা, অন্যের কষ্ট অনুভব করা—এসব শেখানোর জন্য আমাদের নির্দিষ্ট সময় কোথায়?
ইভান: আমাদের শিক্ষা ও লালন-পালনের বড় দুর্বলতা সেখানেই। আমরা অনেক সময় সাফল্যকে নম্বর, পদক, ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তি, ভালো চাকরি কিংবা প্রতিযোগিতায় জেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। শিশুটি প্রথম হলো কি না, সেটা জানতে চাই। কিন্তু সে বন্ধুর সাফল্যে আনন্দিত হতে পারে কি না, নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে কি না, দুর্বল কাউকে অপমান না করে পাশে দাঁড়াতে পারে কি না—এসব প্রশ্ন খুব কম করি।
এস্তেজা: অথচ একজন মানুষ বড় হয়ে কতটা ভালো পেশাজীবী হবে, তার পাশাপাশি সে কতটা নির্ভরযোগ্য মানুষ হবে, সেটাও তো গুরুত্বপূর্ণ।
ইভান: অবশ্যই। একজন চিকিৎসক দক্ষ হলেই যথেষ্ট নয়, তাঁর সততাও দরকার। একজন প্রকৌশলী হিসাব জানলেই যথেষ্ট নয়, তাঁর দায়িত্ববোধও দরকার। একজন সরকারি কর্মকর্তা আইন জানলেই যথেষ্ট নয়, তাঁকে ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। সততা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ কোনো পেশার বাড়তি অলংকার নয়। এগুলো মানুষের চরিত্রের মৌলিক ভিত্তি।
এস্তেজা: আর এই ভিত্তি এক দিনে তৈরি হয় না। ছোটবেলার অভিজ্ঞতা, পরিবারের আচরণ, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, বন্ধুদের প্রভাব—সব মিলিয়ে তৈরি হয়।
ইভান: ঠিক। তাই একটি ছড়াকে কেন্দ্র করে আলোচনাটা আসলে অনেক বড়। আমরা শিশুদের কী শেখাচ্ছি, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—আমরা তাদের কোন আচরণকে স্বাভাবিক করে দেখাচ্ছি।
এস্তেজা: তা হলে জনির ছড়াটার জন্য তোমার বিকল্প কী? আমরা কি নতুন কথা বসিয়ে ছড়াটা বদলে দেব?
ইভান: চাইলে নতুন সংস্করণ তৈরি করা যায়। যেমন—
এস্তেজা: বলো শুনি।
ইভান:
—জনি, জনি!
—জি বাবা।
—চিনি খেয়েছ?
—জি বাবা, খেয়েছি।
—আগে বলোনি কেন?
—ভয় পেয়েছিলাম, বাবা।
—সত্য বললে কী হয়?
—ভুল বুঝে শুধরে নেওয়া যায়।
—আবার এমন হলে?
—আগেই সত্য বলব, বাবা।
এস্তেজা: বেশ। এখানে শিশুকে শুধু মিথ্যা না বলতে বলা হচ্ছে না; তাকে সত্য বলার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে। তবে বাবা যদি সত্য শোনার পরেই চিৎকার করেন, তাহলে ছড়া দিয়ে লাভ কী?
ইভান: সেটাই তো। কোনো ছড়া একা শিশুর চরিত্র তৈরি করতে পারে না। আমাদের আচরণ দিয়ে তার শিক্ষাকে সত্যি করে তুলতে হবে। আর ছড়াটিকে আরও আনন্দময় করা যায়। শিশুকে বোঝানো যায়, চিনি খাওয়ার বিষয়টি যদি ভুলও হয়, তাহলে পরিমাণ মেনে চলা এবং বড়দের সঙ্গে সত্য কথা বলা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সত্য বলেছে বলে সব আচরণ ঠিক হয়ে গেল, এমনও নয়।
এস্তেজা: অর্থাৎ সততা শেখানোর নামে আমরা যেন অন্য নিয়মগুলো ভুলে না যাই। সত্য বলার পাশাপাশি নিয়ম মানা, নিজের কাজের দায় নেওয়া এবং অন্যের কথা শোনাও শিখতে হবে।
ইভান: একদম। নৈতিক শিক্ষা কোনো একটিমাত্র বাক্য মুখস্থ করার নাম নয়। এটি চিন্তা ও আচরণের অভ্যাস।
এস্তেজা: একটা কথা বলি? আমাদের সমাজে বড়দের মিথ্যাকে অনেক সময় বুদ্ধি বলা হয়। কর ফাঁকি দেওয়া, পরিচিতির জোরে সুবিধা নেওয়া, অন্যের অধিকার মেরে দেওয়া—এসবের পরেও মানুষ গর্ব করে বলে, ‘কাজটা ঠিক বের করে নিয়েছি।’
ইভান: কারণ আমরা অনেক সময় সততার চেয়ে সাফল্যকে বেশি মূল্য দিই। যে অসৎ উপায়ে টাকা উপার্জন করে, তাকে সফল বলি। যে অন্যায় করে ক্ষমতা পায়, তাকে প্রভাবশালী বলি। আর যে সৎ থাকার কারণে সুবিধা হারায়, তাকে বোকা বলি। শিশু যখন এসব দেখে, তখন সে বুঝতে শেখে—বইয়ে এক কথা লেখা থাকলেও বাস্তব জীবনে অন্য নিয়ম চলে।
এস্তেজা: তাহলে শিশুর নৈতিক শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের বড়দের জীবনও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ইভান: পড়তেই হবে। আমরা চাই সন্তান সত্য বলুক, কিন্তু নিজেরা সুবিধামতো সত্য গোপন করি। চাই সে অন্যের অধিকার সম্মান করুক, কিন্তু নিজের স্বার্থে অন্যের অধিকার নষ্ট করি। চাই সে দুর্বলকে সাহায্য করুক, অথচ দুর্বল মানুষকে অপমান করে আনন্দ পাই। তারপর সন্তানের হাতে নীতিশিক্ষার বই ধরিয়ে দিয়ে ভাবি, দায়িত্ব শেষ!
এস্তেজা: কিন্তু শিশুরা তো আমাদের দ্বিচারিতা বুঝতে পারে। হয়তো সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করতে পারে না, কিন্তু তারা দেখে—কথা আর কাজের মধ্যে কতটা ব্যবধান।
ইভান: আর সেই ব্যবধানই নৈতিক শিক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। শিশুদের সামনে নিখুঁত মানুষ হওয়ার অভিনয় করতে হবে না। বরং ভুল করলে স্বীকার করতে হবে। বলতে হবে, ‘আমি অন্যায় করেছি, আমার এটা করা উচিত হয়নি।’ একজন বাবা যখন সন্তানের কাছে নিজের ভুল স্বীকার করেন, তখন তাঁর সম্মান কমে না। বরং সন্তান শেখে, ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; এটি সাহস।
এস্তেজা: তা হলে প্রশ্নটা দাঁড়ায়—আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য প্রস্তুত করছি, নাকি জীবনের জন্য প্রস্তুত করছি?
ইভান: আরেকটু গভীরে গেলে প্রশ্নটা হবে—আমরা কি এমন মানুষ তৈরি করতে চাই, যারা ধরা না পড়া পর্যন্ত অন্যায় করবে, নাকি এমন মানুষ তৈরি করতে চাই, যারা কেউ না দেখলেও অন্যায় করতে দ্বিধা করবে?
এস্তেজা: এই পার্থক্যটাই তো সভ্যতার পার্থক্য।
ইভান: হ্যাঁ। সততা মানে শুধু পুলিশের ভয়ে চুরি না করা নয়। সততা মানে সুযোগ থাকলেও অন্যের অধিকার কেড়ে না নেওয়া। মিথ্যা বলে লাভ করা সম্ভব হলেও সত্যকে বেছে নেওয়া। ভুল করলে তা ঢাকার বদলে সংশোধন করা। আর এসব শেখার শুরু কোনো বড় বক্তৃতা দিয়ে হয় না। শুরু হয় পরিবারের ছোট ছোট ঘটনায়, বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন আচরণে, গল্পে, ছড়ায়, খেলায় এবং বড়দের উদাহরণে।
এস্তেজা: তাহলে আগামীবার কোনো শিশু যখন ‘জনি, জনি, ইয়েস পাপা’ গাইবে, আমরা তাকে থামিয়ে দেব না। বরং হাসিমুখে জিজ্ঞেস করব, ‘জনি যদি সত্যি কথা বলত, তাহলে কী হতে পারত?’
ইভান: ঠিক। আর নিজেরাও ভাবব, আমাদের সন্তান সত্য কথা বললে আমরা কি তা শোনার মতো মানুষ হতে পেরেছি?
এস্তেজা: কারণ শিশুকে সত্য বলার নির্দেশ দেওয়া সহজ। সত্য বলার সাহস জোগায়, এমন পরিবেশ তৈরি করা কঠিন।
ইভান: আর সেই কঠিন কাজটাই বাবা-মা, শিক্ষক ও সমাজের দায়িত্ব। শৈশব শুধু বর্ণমালা শেখার সময় নয়, শুধু ছড়া মুখস্থ করার সময় নয়। শৈশব হলো মানুষ হয়ে ওঠার প্রস্তুতি। সেখানে আমরা যদি কৌতূহলের সঙ্গে সততা, আনন্দের সঙ্গে সহমর্মিতা এবং শাসনের সঙ্গে ন্যায়বোধের চর্চা যোগ করতে পারি, তাহলে শিশুরা শুধু ভালো শিক্ষার্থী হবে না—ভালো মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগও পাবে।
এস্তেজা: শেষ পর্যন্ত আমাদের সন্তান কী মুখস্থ করল, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—সে কী শিখল?
ইভান: সে কি শিখল, সত্য বললে নিজের ভুল শুধরে নেওয়া যায়? সে কি শিখল, অন্যের বিশ্বাস ভাঙা সহজ, ফিরিয়ে আনা কঠিন? সে কি শিখল, ভুল করা মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা কিন্তু ভুল ঢাকতে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া একটি বেছে নেওয়া আচরণ?
এস্তেজা: আর আমরা কি শিখলাম, শিশুদের নৈতিকতা শেখানোর আগে নিজেদের আচরণটাও একবার পরীক্ষা করা দরকার?
ইভান: কারণ শিশুদের হাতে আমরা শুধু খেলনা তুলে দিই না, গল্পও তুলে দিই। শুধু ছড়া শেখাই না, পৃথিবীকে দেখার চোখও তৈরি করি।
এস্তেজা: তাই ছড়া থাকুক, হাসি থাকুক, দুষ্টুমিও থাকুক। কিন্তু তার সঙ্গে থাকুক সত্য স্বীকার করার সাহস, ভুল সংশোধনের সুযোগ এবং অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান।
ইভান: একদম। আমরা এমন শৈশব চাই, যেখানে শিশু ভুল করলে ভয়ে মিথ্যা বলতে বাধ্য হবে না, আবার মিথ্যা বলাকে নির্দোষ কৌতুক ভেবেও বড় হবে না। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা কেমন সমাজ পাব, তা শুধু আমাদের সংসদ, আদালত কিংবা বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম দিয়ে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় সেই ছোট্ট ঘরগুলোতেও, যেখানে একজন শিশু প্রথমবার ভুল করে, প্রথমবার অস্বীকার করে, আর প্রথমবার শেখে—সত্য বলার পর তার পাশে কে দাঁড়ায়।
এস্তেজা: জনির মুখ খোলার অপেক্ষায় না থেকে, আমরা কি আমাদের সন্তানদের সত্য বলার সাহস জোগাতে পারি না?
ইভান: পারি। যদি আমরা সত্যকে শুধু ধরার বিষয় না বানিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে বেছে নেওয়ার অভ্যাসে পরিণত করি।