Article

কথার ভেতর কথা ৩১

November 4, 2026

3 views

নিজের মানুষ হও, সবার প্রয়োজন মেটানোর যন্ত্র নয়

ইভান:
জানো এস্তেজা, একটা কথা আজকাল খুব মনে হয়—মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অন্যায়টা অনেক সময় অন্য কেউ করে না, মানুষ নিজেই নিজের সঙ্গে করে। সবাইকে ভালো রাখতে গিয়ে নিজের ভালো থাকাটুকু বিসর্জন দেয়।

এস্তেজা:
কথাটা সত্যি। বিশেষ করে যারা একটু বেশি দায়িত্বশীল, একটু বেশি সংবেদনশীল, আর অন্যের কষ্ট দেখলে নিজেকে সামলাতে পারে না—তাদের জীবনটা যেন অন্যের প্রয়োজন মেটানোর একটা কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

ইভান:
অথচ একটা কথা আমাদের খুব ভালোভাবে বোঝা দরকার—You are not anyone’s ATM. তুমি কারও টাকা তোলার যন্ত্র নও। তোমার সামর্থ্য আছে বলেই যে সবাই তোমার কাছে অর্থ চাইবে, আর তোমাকে দিতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।

এস্তেজা:
শুধু অর্থের ক্ষেত্রেই নয়, সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটে। কারও বিপদে পাশে দাঁড়ানো আর কারও কাছে স্থায়ী আর্থিক আশ্রয় হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। তুমি একবার সাহায্য করলে, কেউ কেউ সেটাকে তোমার মানবিকতা হিসেবে দেখে। কিন্তু বারবার সাহায্য করতে না পারলে সেই মানুষটাই তোমাকে স্বার্থপর ভাবতে শুরু করে।

ইভান:
সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটা জানো কোথায়? তুমি যখন সাহায্য করো, তখন তুমি খুব ভালো মানুষ। কিন্তু কোনো একদিন নিজের প্রয়োজনের কারণে সাহায্য করতে না পারলে, তখন তোমার আগের সব ভালো কাজ যেন অর্থহীন হয়ে যায়।

এস্তেজা:
কারণ কিছু মানুষ সাহায্যকে ভালোবাসা ভাবে না, অধিকার ভাবে। তারা ভুলে যায়, তোমারও সংসার আছে, স্বপ্ন আছে, নিজের প্রয়োজন আছে, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করার প্রয়োজন আছে। তোমার উপার্জনের প্রতিটি টাকার পেছনে পরিশ্রম আছে, সময় আছে, ত্যাগ আছে।

ইভান:
ঠিক। কাউকে সাহায্য করার আগে নিজের অবস্থানটাও বুঝতে হবে। নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নষ্ট করে অন্যের দায়িত্ব নেওয়া মহত্ত্ব নয়। নিজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে অন্যের বর্তমানকে স্বস্তি দেওয়ার নামও সব সময় মানবিকতা নয়।

এস্তেজা:
তবে একটা প্রশ্ন আছে, ইভান। আমরা যখন কাউকে না বলতে শিখি, তখন কি ধীরে ধীরে স্বার্থপর হয়ে যাই না?

ইভান:
না। বরং তখনই বুঝতে শিখি, কোন দায়িত্বটা আমার, আর কোনটা অন্যের। প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু ব্যক্তিগত দায়িত্ব থাকে। অন্যের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার আগে নিজের দায়িত্বগুলো ঠিকভাবে পালন করা জরুরি।

এস্তেজা:
মানে, সাহায্য করব, কিন্তু নিজের সামর্থ্যের সীমার মধ্যে?

ইভান:
অবশ্যই। সাহায্য তখনই সুন্দর, যখন সেটা তোমার সামর্থ্য থেকে আসে; অপরাধবোধ, ভয় কিংবা সামাজিক চাপ থেকে নয়।

এস্তেজা:
জানো, অর্থের বাইরেও মানুষ আরেকভাবে অন্যের এটিএম হয়ে যায়। কেউ তার কাছে সব সময় মানসিক সাপোর্ট চায়, কেউ নিজের সমস্যা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে, কেউ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না বলে তার ওপর নির্ভর করে। অথচ সেই মানুষটার মন খারাপ হলে, তার কথা শোনার মতো কেউ থাকে না।

ইভান:
এটাই তো অদ্ভুত! যে মানুষটা সবার বিপদের সময় ফোন পায়, তার নিজের বিপদের সময় ফোন করার মতো মানুষ থাকে না। সবাই তার কাছে আশ্রয় খোঁজে, কিন্তু সে কোথায় আশ্রয় নেবে, সেটা কেউ জানতে চায় না।

এস্তেজা:
কারণ সবাই ধরে নেয়, সে শক্ত। সে সব সামলে নিতে পারে। তার মন খারাপ হয় না, তার ক্লান্তি আসে না, তারও কখনো কারও কাঁধে মাথা রাখার প্রয়োজন হয় না।

ইভান:
মানুষের একটা ভুল ধারণা আছে—যে মানুষ সব সময় অন্যের পাশে দাঁড়ায়, তার নিজের পাশে কাউকে দাঁড়ানোর দরকার নেই। অথচ শক্ত মানুষেরও দুর্বল হওয়ার অধিকার আছে।

এস্তেজা:
আরেকটা কথা আছে—You are not anyone’s Nanny. তুমি কারও আয়া নও, যে সব সময় অন্যের জীবন গুছিয়ে দেবে, ভুলগুলো সামলাবে, দায়িত্ব মনে করিয়ে দেবে, আবেগের যত্ন নেবে, আর নিজের জীবনটাকে এক পাশে রেখে অন্যের জীবন চালাবে।

ইভান:
একদম। বড় মানুষদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের দায়িত্ব তাদের নিজেদের। তুমি কাউকে পরামর্শ দিতে পারো, সহযোগিতা করতে পারো, ভুল করলে সতর্ক করতে পারো। কিন্তু তার হয়ে বারবার সিদ্ধান্ত নিতে পারো না। তার দায়িত্বহীনতার ক্ষতিপূরণও সারাজীবন তোমাকে দিতে হবে না।

এস্তেজা:
সম্পর্কের মধ্যে এই ব্যাপারটা খুব বেশি দেখা যায়। একজন সব সময় মনে করিয়ে দেয়—সময়মতো খাও, নিজের যত্ন নাও, কাজটা শেষ করো, দায়িত্ব পালন করো, এমন করো না, তেমন করো না। আর অন্যজন ধীরে ধীরে এমন অভ্যস্ত হয়ে যায় যে, তাকে আর নিজের জীবনের দায়িত্ব নিতে হয় না।

ইভান:
তারপর যে মানুষটা এত দিন যত্ন করেছে, সে একদিন ক্লান্ত হয়ে যায়। তখন তাকে বলা হয়—তুমি আগের মতো নেই, তোমার মধ্যে ভালোবাসা কমে গেছে।

এস্তেজা:
অথচ ভালোবাসা কমে যায়নি। কমে গেছে সবকিছু একা সামলানোর শক্তি।

ইভান:
ঠিক তাই। যত্ন নেওয়া আর কাউকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা এক বিষয় নয়। ভালোবাসার কাজ কাউকে অসহায় বানানো নয়; বরং তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করা।

এস্তেজা:
তাহলে কি ভালোবাসার মধ্যেও একটা দূরত্ব থাকা প্রয়োজন?

ইভান:
দূরত্ব নয়, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। দুজন মানুষ কাছাকাছি থাকবে, কিন্তু একজন আরেকজনের ব্যক্তিগত অস্তিত্ব মুছে ফেলবে না। ভালোবাসবে, কিন্তু একে অপরের স্বাধীনতা কেড়ে নেবে না। পাশে থাকবে, কিন্তু একজনের পুরো জীবন আরেকজনের কাঁধে চাপিয়ে দেবে না।

এস্তেজা:
তুমি বলতে চাইছ, সম্পর্ক মানে একে অপরের জীবনের দায়িত্ব নেওয়া নয়, বরং দায়িত্বগুলো পালনে একে অপরকে সহযোগিতা করা?

ইভান:
হ্যাঁ। কারণ একটা সম্পর্কের মধ্যে দুজন মানুষ থাকে, দুটো আলাদা ব্যক্তিত্ব থাকে, দুটো আলাদা স্বপ্ন থাকে। সম্পর্কের কারণে সেই স্বপ্নগুলোকে মেরে ফেলা উচিত নয়।

এস্তেজা:
You are your own person. কথাটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে অনেক বড় একটা দর্শন আছে। তুমি সবার বন্ধু হতে পারো, কারও সন্তান, কারও ভাইবোন, কারও জীবনসঙ্গী, কারও সহকর্মী হতে পারো। কিন্তু এসব পরিচয়ের বাইরে তোমার একটা নিজস্ব পরিচয় আছে।

ইভান:
সেই পরিচয়টাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তুমি কী চাও, কী ভালোবাসো, কী তোমাকে আনন্দ দেয়, কী তোমাকে কষ্ট দেয়—এসব জানার অধিকার তোমার আছে। নিজের সময়, নিজের পছন্দ, নিজের সিদ্ধান্ত এবং নিজের ভবিষ্যতের ওপর তোমারও অধিকার আছে।

এস্তেজা:
কিন্তু বাস্তবে আমরা নিজেদের মানুষ হয়ে উঠতে পারি না। সব সময় ভাবি, কে কী মনে করবে! কাউকে না বললে সে কষ্ট পাবে কি না, নিজের জন্য কিছু করলে কেউ স্বার্থপর বলবে কি না, নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দিলে সম্পর্ক নষ্ট হবে কি না!

ইভান:
এই ভয়টাই মানুষকে ধীরে ধীরে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অন্যের অনুমোদন পেতে পেতে একসময় নিজের ইচ্ছাটাই চিনতে পারে না।

এস্তেজা:
কখনো কখনো মনে হয়, আমরা যেন নিজের জীবনের প্রধান চরিত্র হয়েও অন্যের গল্পে পার্শ্বচরিত্র হয়ে থাকি।

ইভান:
সুন্দর বলেছ। অথচ নিজের জীবনের গল্পে নিজের জায়গাটা কাউকে দিয়ে দেওয়া উচিত নয়। অন্যের গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হতে গিয়ে নিজের গল্পটা অসমাপ্ত রেখে দেওয়ার কোনো মানে হয় না।

এস্তেজা:
কিন্তু নিজের কথা ভাবতে গেলেই তো একটা অপরাধবোধ কাজ করে। বিশেষ করে কাছের মানুষের ক্ষেত্রে। মনে হয়, আমি যদি নিজের জন্য সময় নিই, তাহলে হয়তো তাকে অবহেলা করছি।

ইভান:
নিজের যত্ন নেওয়া কাউকে অবহেলা করা নয়। তুমি বিশ্রাম নিলে, নিজের স্বপ্নের পেছনে সময় দিলে, নিজের উপার্জন নিজের ভবিষ্যতের জন্য রাখলে—তাতে অন্য কারও প্রতি তোমার ভালোবাসা কমে যায় না।

এস্তেজা:
তাহলে কি নিজের জন্য কিছুটা স্বার্থপর হওয়া প্রয়োজন?

ইভান:
আমি বলব, নিজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। স্বার্থপরতা হলো অন্যের অধিকার অস্বীকার করে শুধু নিজের সুবিধা দেখা। আর আত্মসম্মান হলো অন্যের সুবিধার জন্য নিজের অধিকার বিসর্জন না দেওয়া। দুটো এক নয়।

এস্তেজা:
এই পার্থক্যটা সবাই বুঝতে পারে না। বিশেষ করে যারা তোমার কাছ থেকে সব সময় কিছু পেতে অভ্যস্ত, তারা তোমার সীমারেখাকে স্বার্থপরতা বলে চালিয়ে দিতে পারে।

ইভান:
কারণ তারা তোমার পরিবর্তনকে নিজেদের সুবিধা হারানোর দৃষ্টিতে দেখে। তুমি আগে সব অনুরোধে রাজি হতে, এখন কিছু বিষয়ে না বলছ। তাদের কাছে তুমি বদলে গেছ। কিন্তু তোমার কাছে এটা হয়তো নিজের অস্তিত্ব ফিরে পাওয়ার শুরু।

এস্তেজা:
আর এই জায়গাতেই তোমার কথাটা মনে পড়ে—Your kindness must have an edge.

ইভান:
হ্যাঁ। তোমার দয়া, তোমার উদারতা, তোমার ভালোবাসা—এসবের একটা ধার থাকা দরকার। এমন ধার, যা তোমার সীমারেখা রক্ষা করবে। তুমি ভালো মানুষ হবে কিন্তু কাউকে তোমার ভালোত্বের সুযোগ নিতে দেবে না।

এস্তেজা:
কথাটা একটু কঠিন শোনায়। ভালোবাসার সঙ্গে ধার বা কঠোরতা কীভাবে যায়?

ইভান:
কঠোরতা আর নিষ্ঠুরতা এক নয়। তুমি কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করেও তাকে না বলতে পারো। কারও অপমান না করেও তার অন্যায় দাবি প্রত্যাখ্যান করতে পারো। কারও প্রতি মমতা রেখেও তার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে অস্বীকার করতে পারো।

এস্তেজা:
অর্থাৎ, ভালো মানুষ হওয়া মানে সবকিছু মেনে নেওয়া নয়।

ইভান:
ঠিক। যে মানুষ তোমার ভদ্রতাকে দুর্বলতা ভাবে, তাকে বোঝাতে হবে—তুমি শান্ত বলে অসহায় নও। তুমি ক্ষমা করো বলে ভুলে যাও না। তুমি সাহায্য করো বলে তোমাকে ব্যবহার করার অধিকার কেউ পায় না।

এস্তেজা:
জানো, অনেক সময় মানুষ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের সীমারেখা ভেঙে ফেলে। ভাবে, আজ একটু মানিয়ে নিই, কাল হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।

ইভান:
সেখানেই আসে আরেকটা কথা—Your compromise needs a limit. তোমার আপসেরও একটা সীমা থাকা দরকার।

এস্তেজা:
সম্পর্কে তো আপস করতেই হয়। দুজন মানুষের পছন্দ, অভ্যাস, চিন্তা—সব এক হবে না। তাহলে সীমাটা কোথায়?

ইভান:
সীমাটা খুব সহজে বোঝা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। যেখানে আপস করতে গিয়ে তোমার ব্যক্তিত্ব হারিয়ে যায়, যেখানে নিজের মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যেতে হয়, যেখানে বারবার অপমান সহ্য করতে হয়, যেখানে তোমার নীরবতাকে সম্মতি ধরে নেওয়া হয়—সেখানে আপস আর সম্পর্ক রক্ষার উপায় থাকে না। সেটা আত্মসমর্পণ হয়ে যায়।

এস্তেজা:
মানে, ছোটখাটো বিষয়ে ছাড় দেওয়া যায়, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান নিয়ে নয়?

ইভান:
হ্যাঁ। তুমি হয়তো কারও পছন্দের খাবার খেতে পারো, নিজের ছুটির পরিকল্পনা বদলাতে পারো, মতের অমিল মেনে নিতে পারো। এগুলো সম্পর্কের স্বাভাবিক সমঝোতা। কিন্তু কেউ যদি তোমাকে নিয়মিত অসম্মান করে, তোমার কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয়, তোমার স্বপ্নকে তুচ্ছ করে, তোমার ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে—তাহলে সেটাকে আপস বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না।

এস্তেজা:
আমরা অনেক সময় বলি, মানুষটাকে ভালোবাসি বলেই সব সহ্য করি।

ইভান:
কিন্তু একটা প্রশ্ন করা দরকার—তুমি যাকে ভালোবাসছ, সেই মানুষটা কি তোমার কষ্টটাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে? নাকি শুধু তোমার সহ্য করার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে আছে?

এস্তেজা:
প্রশ্নটা খুব কঠিন। কারণ কখনো কখনো আমরা কাউকে হারানোর ভয়ে নিজের ভেতরটাকেই হারিয়ে ফেলি।

ইভান:
আর সেই হারিয়ে ফেলার নাম দিয়ে দিই ভালোবাসা। অথচ ভালোবাসা কখনো তোমাকে প্রতিনিয়ত ছোট করবে না। মতের অমিল থাকবে, রাগ থাকবে, অভিমান থাকবে, কিন্তু সম্মানটা থাকবে।

এস্তেজা:
তবে একটা বিষয় আছে, ইভান। সব সম্পর্ক তো সমানভাবে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারে না। কখনো একজন অসুস্থ হয়, কখনো একজন আর্থিক সংকটে পড়ে, কখনো একজন মানসিকভাবে ভেঙে যায়। তখন অন্যজনকে বেশি দায়িত্ব নিতে হয়। সেটা কি সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া নয়?

ইভান:
না, সব সময় নয়। কারণ জীবনের কঠিন সময়ে দায়িত্বের ভার সমান নাও হতে পারে। কখনো একজন বেশি দেবে, অন্যজন কম দেবে। কিন্তু পার্থক্যটা হলো—সেই অসমতা সাময়িক প্রয়োজন থেকে আসছে, নাকি একজনের স্থায়ী সুবিধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এস্তেজা:
অর্থাৎ, একজন দুর্বল সময়ে অন্যজনের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে, কিন্তু সেই নির্ভরতাকে স্থায়ী অধিকার মনে করতে পারে না।

ইভান:
একদম। সম্পর্কের মধ্যে সহযোগিতা থাকবে, কৃতজ্ঞতা থাকবে, দায়িত্ববোধ থাকবে। কিন্তু একতরফা ব্যবহার থাকবে না। দুজনের সামর্থ্য এক রকম না হলেও দুজনের সম্মান সমান হওয়া দরকার।

এস্তেজা:
তাহলে কাউকে সাহায্য করার পর তার কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা আশা করাও কি ভুল?

ইভান:
কৃতজ্ঞতা আশা করা আর প্রতিদান দাবি করা এক বিষয় নয়। তুমি সাহায্য করে বিনিময়ে কিছু চাইবে না, সেটা মহৎ হতে পারে। কিন্তু কেউ তোমার সাহায্যকে নিজের অধিকার মনে করবে, তোমাকে অসম্মান করবে, কিংবা তোমার সীমারেখা অস্বীকার করবে—এটা মেনে নেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

এস্তেজা:
কখনো কখনো একটা সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, একজন সব সময় দেয় আর অন্যজন শুধু নিতে শেখে। একসময় যে দেয়, তার ভেতরেও শূন্যতা তৈরি হয়।

ইভান:
কারণ মানুষ শুধু দিতে দিতে বাঁচতে পারে না। তারও যত্ন দরকার, স্বীকৃতি দরকার, একটু মনোযোগ দরকার। তুমি কারও জীবনে সব সময় আলো জ্বালিয়ে রাখছ, অথচ তোমার নিজের ঘরটা অন্ধকার—এভাবে বেশিদিন চলা সম্ভব নয়।

এস্তেজা:
তাহলে নিজের জন্য কিছু নিয়ম তৈরি করা দরকার?

ইভান:
অবশ্যই। যেমন—সামর্থ্যের বাইরে আর্থিক সাহায্য করব না। নিজের প্রয়োজনকে সব সময় পিছিয়ে রাখব না। অন্যের দায়িত্ব নিজের দায়িত্ব বানাব না। অসম্মানকে ভালোবাসা ভেবে সহ্য করব না। আর কোনো সম্পর্কের জন্য নিজের স্বপ্ন, আত্মসম্মান ও মানসিক শান্তি পুরোপুরি বিসর্জন দেব না।

এস্তেজা:
শুনতে খুব বাস্তবসম্মত। কিন্তু এসব নিয়ম মেনে চলতে গেলে অনেক মানুষ হয়তো দূরে সরে যাবে।

ইভান:
সরে যেতে পারে। তবে একটা বিষয় মনে রেখো—যে সম্পর্ক শুধু তোমার সীমাহীন ছাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেই সম্পর্কের ভিত কখনোই খুব শক্ত ছিল না। তুমি সীমারেখা টানলে যদি সম্পর্ক ভেঙে যায়, তাহলে হয়তো সম্পর্কটা তোমার মানুষটাকে নয়, তোমার সুবিধা দেওয়ার ক্ষমতাটাকেই বেশি ভালোবাসত।

এস্তেজা:
কথাটা শুনে একটু ভয়ও লাগছে। কারণ আমরা সবাই চাই, কাছের মানুষগুলো আমাদের সঙ্গে থাকুক।

ইভান:
সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু কাউকে পাশে রাখার জন্য নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব দুজনের। একজন শুধু ছাড় দেবে, আর অন্যজন শুধু সুবিধা নেবে—এটা সম্পর্ক নয়, এটা এক ধরনের নির্ভরতার ব্যবস্থা।

এস্তেজা:
জানো ইভান, আমার মনে হয়, মানুষকে একটা বয়সের পর নিজের কাছে ফিরে আসা শিখতে হয়। এত দিন সবাইকে বুঝেছি, সবাইকে সময় দিয়েছি, সবার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েছি। এবার নিজেকেও একটু বুঝতে হবে।

ইভান:
হ্যাঁ। নিজের সঙ্গে বসতে হবে। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—আমি আসলে কী চাই? কোন সম্পর্ক আমাকে শান্তি দেয়? কোন মানুষটির কাছে গেলে আমি নিজের মতো থাকতে পারি? আর কোথায় আমাকে প্রতিনিয়ত নিজের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দিতে হয়?

এস্তেজা:
আর যদি দেখি, আমি অনেক দিন ধরে এমন একটা জীবন কাটাচ্ছি, যেখানে সবাই আমার কাছ থেকে কিছু না কিছু আশা করে, কিন্তু আমার নিজের চাওয়াগুলো কেউ জানে না?

ইভান:
তাহলে সেখান থেকেই শুরু করো। প্রথমে নিজেকে জানাও, তোমারও প্রয়োজন আছে। তোমারও বিশ্রাম দরকার। তোমারও না বলার অধিকার আছে। তোমারও এমন একটা জীবন দরকার, যেখানে শুধু অন্যের জন্য নয়, নিজের জন্যও কিছু করা যায়।

এস্তেজা:
কিন্তু সবাই কি সেটা মেনে নেবে?

ইভান:
সবাইকে মানাতে হবে কেন? তোমার জীবন কোনো গণভোট নয় যে, প্রত্যেকের অনুমোদন নিয়ে বাঁচতে হবে।

এস্তেজা:
(হালকা হেসে) আজ তোমার কথাগুলো বেশ কঠিন হয়ে উঠছে।

ইভান:
কঠিন নয়, প্রয়োজনীয়। আমরা ছোটবেলা থেকে শিখেছি—বড়দের কথা শুনতে হয়, আত্মীয়দের সাহায্য করতে হয়, বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়াতে হয়, সম্পর্কের জন্য ছাড় দিতে হয়। এগুলো সবই ভালো শিক্ষা। কিন্তু কেউ শেখায়নি, কখন থামতে হয়। কেউ বলেনি, নিজের অধিকার রক্ষা করাটাও একটা দায়িত্ব।

এস্তেজা:
সত্যি। আমাদের শেখানো হয়েছে ভালো মানুষ হতে, কিন্তু নিজের প্রতি ভালো মানুষ হতে শেখানো হয়নি।

ইভান:
আর তাই অনেকে সারাজীবন অন্যের চোখে ভালো মানুষ হয়ে থাকতে গিয়ে নিজের চোখে ছোট হয়ে যায়।

এস্তেজা:
তাহলে আজ থেকে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। আমি কাউকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বদলাব না, কিন্তু কাউকে খুশি রাখার জন্য নিজেকে কষ্ট দেওয়াও বন্ধ করব।

ইভান:
এটাই তো। তুমি সহানুভূতিশীল থাকবে, কিন্তু নিজের সীমা জানবে। তুমি সাহায্য করবে, কিন্তু নিজের সামর্থ্য বুঝে। তুমি ভালোবাসবে, কিন্তু নিজের পরিচয় হারাবে না। তুমি আপস করবে, কিন্তু আত্মসম্মান বিক্রি করবে না।

এস্তেজা:
আর কেউ যদি বলে, আমি আগের মতো নেই?

ইভান:
তাকে বলবে—হ্যাঁ, আগের মতো নেই। আগে নিজের প্রয়োজন বুঝতাম না, এখন বুঝি। আগে সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজেকে ভুলে যেতাম, এখন নিজেকেও গুরুত্ব দিই। আগে না বলতে ভয় পেতাম, এখন প্রয়োজন হলে বলি।

এস্তেজা:
আর কেউ যদি বলে, তুমি খুব স্বার্থপর হয়ে গেছ?

ইভান:
তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারো। তবে মনে রেখো, নিজের সীমারেখা ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু প্রত্যেকের কাছে তার বৈধতা প্রমাণ করতে হয় না।

এস্তেজা:
জানো, আজ একটা বিষয় খুব পরিষ্কার হলো। ভালো মানুষ হওয়া মানে সবার জন্য সহজলভ্য হয়ে থাকা নয়। ভালোবাসা মানে সব সময় নিজেকে উজাড় করে দেওয়া নয়। আর সম্পর্ক মানে নিজের জীবনটাকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া নয়।

ইভান:
ঠিক বলেছ। তোমার জীবন তোমার। তোমার সময় তোমার। তোমার উপার্জন, তোমার স্বপ্ন, তোমার শান্তি—এসবের ওপর তোমার অধিকার আছে। অন্যের জীবনে জায়গা দাও, কিন্তু নিজের জীবনের দরজাটা বন্ধ করে দিও না।

এস্তেজা:
তাহলে শেষ কথাটা কী হবে, ইভান?

ইভান:
শেষ কথা খুব সহজ—

কারও প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াও কিন্তু কারও স্থায়ী ভরসার যন্ত্র হয়ে যেয়ো না।
কারও যত্ন নাও কিন্তু তার হয়ে জীবনটা বাঁচতে যেয়ো না।
ভালোবাসো কিন্তু নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে নয়।
ক্ষমা করো কিন্তু একই অন্যায়ের পুনরাবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিয়ে নয়।
আপস করো কিন্তু নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়।

এস্তেজা:
আর নিজের জন্য?

ইভান:
নিজের জন্য বাঁচতে শেখো। কারণ দিন শেষে তোমার জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে তোমাকেই থাকতে হবে। অন্যরা হয়তো তোমার কাছে তাদের প্রয়োজনের হিসাব নিয়ে আসবে, কিন্তু তোমার অসমাপ্ত স্বপ্নগুলোর হিসাব কেউ দেবে না।

এস্তেজা:
একটা কথা বলি? আমি চাই না, জীবনের শেষ দিকে গিয়ে মনে হোক—সবার জন্য এত কিছু করলাম, অথচ নিজের জন্য কিছুই করা হলো না।

ইভান:
তাহলে আজ থেকেই শুরু করো। নিজের প্রতি একটু সদয় হও। নিজের সময়কে মূল্য দাও। নিজের শান্তিকে গুরুত্ব দাও। আর মনে রেখো, তুমি কারও এটিএম নও, কারও সার্বক্ষণিক পরিচর্যাকারী নও। তুমি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ। তোমারও নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

এস্তেজা:
হয়তো জীবনের সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা এটাই—অন্যকে ভালো রাখতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেললে, শেষ পর্যন্ত কাউকেই ঠিকভাবে ভালো রাখা যায় না।

ইভান:
একদম। নিজের ভেতরটা শূন্য করে কাউকে পূর্ণ করা যায় না, এস্তেজা।

এস্তেজা:
তাহলে এবার থেকে একটু নিজের দিকেও তাকাব। সবাইকে জায়গা দেব, কিন্তু নিজের জায়গাটা কাউকে দখল করতে দেব না।

ইভান:
এই তো! মনে রেখো, নিজের জীবনে নিজের জায়গাটা ধরে রাখা অহংকার নয়, আত্মসম্মান।

এস্তেজা:
আর নিজের প্রতি সেই সম্মানটুকু না থাকলে, পৃথিবীর কেউ এসে সেটা আমাদের হাতে তুলে দিতে পারবে না।

ইভান:
ঠিক। কারণ দিন শেষে নিজের মানুষ হয়ে ওঠার দায়িত্বটা নিজেরই।

এস্তেজা:
তাহলে আজ থেকে একটা কথা মনে রাখব—আমি সবার পাশে থাকতে পারি, কিন্তু সবার ভার বহন করতে বাধ্য নই। আমি সবাইকে ভালোবাসতে পারি, কিন্তু নিজেকে ভুলে গিয়ে নয়।

ইভান:
আর এটাই হলো সীমারেখাসহ ভালোবাসা। যেখানে মমতা আছে, দায়িত্ব আছে, কিন্তু নিজের অস্তিত্বেরও সম্মান আছে।

এস্তেজা:
হয়তো আমাদের সবারই এই কথাগুলো একবার নিজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলা দরকার।

ইভান:
হ্যাঁ। কারণ পৃথিবীর সবাইকে খুশি করার দায়িত্ব তোমার নয়। কিন্তু নিজের জীবনটাকে অর্থপূর্ণ করে তোলার দায়িত্ব তোমারই।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login