শিল্পী নাকি ক্ষমতার কেরাণী? বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিপর্যয়ের এক নীরব গল্প
বাংলাদেশে শিল্পীর পরিচয় এক সময় ছিল মানবতার মুখপাত্র হিসেবে। গান, কবিতা, নাটক ও আবৃত্তি—সবই ছিল মানুষের মুক্তি ও সত্য প্রকাশের হাতিয়ার। শিল্পীরা ছিলেন সমাজের বিবেক, নৈতিকতার কণ্ঠস্বর। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই শিল্পী সমাজের একটি অংশ হয়ে উঠেছে ক্ষমতার চাকর-বাকর— তারা আর সত্যের মুখপাত্র নয়, বরং ক্ষমতাবানদের মুখরক্ষা করার যন্ত্র। এই অবস্থাই আজ বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সবচেয়ে বড় সংকটে ফেলেছে।
শিল্প ও রাজনীতির ঐতিহাসিক সম্পর্ক
বাংলাদেশের জন্মলগ্নে শিল্প ও রাজনীতি ছিল একে অপরের সহযোগী। মুক্তিযুদ্ধের সময় শিল্পীরা গান, নাটক ও কবিতায় মানুষকে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তখন শিল্প ছিল আন্দোলনের অগ্রভাগে—এমনকি অনেকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধও করেছেন। রাজনীতি তখন ছিল আদর্শনির্ভর, আর শিল্প ছিল সেই আদর্শের প্রচারক।
কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই সম্পর্ক আর সমান তালে এগোয়নি। রাজনীতি ধীরে ধীরে দলীয় স্বার্থের কেন্দ্রে গিয়ে দাঁড়ায়, আর শিল্পকলা হয়ে পড়ে সেই ক্ষমতার অলঙ্কার।
ক্ষমতার কেরাণীগিরি: শিল্পের আত্মসমর্পণ
আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক শিল্পী রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় বাঁচতে শিখেছেন। তারা ক্ষমতার সমালোচনা না করে বরং প্রশংসা করতে শিখেছেন। টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়—সব জায়গায় এক ধরনের “দলীয় সংস্কৃতি” প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে প্রতিভার মূল্যায়ন নয়, বরং আনুগত্যই মূল যোগ্যতা।
কেউ মন্ত্রীর গুণকীর্তন করে পদ পান,
কেউ টেন্ডার বা অনুদানের আশায় চুপ থাকেন। ফলাফল—শিল্প হয়ে উঠেছে তোষামোদের বাজার, যেখানে সত্য বলা মানে ‘অসুবিধাজনক’, আর চুপ থাকা মানে ‘বুদ্ধিমত্তা’।
এভাবেই শিল্পীরা ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়েছেন ক্ষমতার কেরাণীতে, যাদের কাজ শুধু ক্ষমতাসীনদের মুখ রক্ষা করা।
সংস্কৃতির পচন
যখন শিল্প সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তার মৃত্যু শুরু হয়। আজকের বাংলাদেশে সেই মৃত্যু দৃশ্যমান। গান ও নাটকে সমাজের বাস্তবতা অনুপস্থিত, সিনেমায় নেই প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের ভাষা, কবিতা হয়ে গেছে আড়ম্বরের সাজসজ্জা, আর আবৃত্তি—যা একদিন ছিল জাগরণের প্রতীক— এখন অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা।
ফলে শিল্পের যে শক্তি মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগাত, যে শক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিত, সেই শক্তি আজ হারিয়ে গেছে।
জনগণের আস্থা ভেঙে পড়েছে, শিল্পীকে আর মানুষ বিশ্বাস করে না— কারণ তিনি আজ রাজনীতির ভাড়াটে মুখপাত্রে পরিণত।
নীরব প্রতিরোধ ও নতুন প্রজন্ম
তবুও এই অন্ধকারের মধ্যে কিছু আলো এখনো জ্বলছে। নতুন প্রজন্মের কিছু শিল্পী আছেন, যারা দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে
সত্য, প্রতিবাদ ও মানবতার পক্ষে কথা বলছেন। তারা জানেন, শিল্প মানে কেবল বিনোদন নয়—এটি দায়বদ্ধতা, এটি নৈতিক অবস্থান।
তাদের কাজ হয়তো বড় পরিসরে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু এই সততার আগুনই একদিন পুরো সংস্কৃতিকে শুদ্ধ করবে। কারণ শিল্পকে বাঁচাতে হলে তাকে দলীয় করালগ্রাস থেকে মুক্ত করতে হবে।
উপসংহার
রাজনীতি ও শিল্প কখনোই একে অপরের শত্রু নয়। কিন্তু যখন রাজনীতি শিল্পকে বন্দি করে ফেলে, তখন সমাজ হারায় তার সৌন্দর্য ও বিবেক।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক সংকট হলো— শিল্পীরা নিজেদের বিবেক বিক্রি করেছেন ক্ষমতার কাছে। তারা হয়ে গেছেন ক্ষমতার কেরাণী, যারা সত্য বলেন না, বরং সত্যকে ঢেকে রাখেন।
“যে শিল্পী ক্ষমতার প্রশংসায় গান গায়, সে নিজের কণ্ঠ হারায়; আর যে শিল্পী সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, সে জাতির আত্মাকে রক্ষা করে।”
বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হলে এখনই দরকার— সৎ, সাহসী ও আদর্শবাদী শিল্পীর উত্থান, যিনি কোনো দলের নয়, মানুষের, সত্যের, ও দেশের শিল্পী।
Comments
Be this story’s first reader
+40 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.