Story

দেবী দুর্গা আসছেন মানুষের মাঝে

September 24, 2026

22 views

দেবী দুর্গা আসছেন মানুষের মাঝে

লেখক: আদিত্য ভৌমিক

তারিখ: ২২/৯/২০২৬

শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। কাশফুলের দোলায় প্রকৃতি যেন নতুন করে সেজেছে। ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাস আর শিউলির মিষ্টি গন্ধে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে এক অদ্ভুত আনন্দ। ঢাকের মৃদু শব্দ যেন দূর আকাশ থেকে বলে দিচ্ছে, মা আসছেন।

শহরের পূজামণ্ডপগুলোতে তখন ব্যস্ততা। কেউ প্রতিমা সাজাচ্ছে, কেউ আলোকসজ্জা করছে, কেউ ফুল দিয়ে মণ্ডপ সাজাচ্ছে। ছোট্ট শিশুরা নতুন জামাকাপড় হাতে নিয়ে আনন্দে ছুটে বেড়াচ্ছে। সবার চোখে অপেক্ষা, সবার মনে একটাই আকাঙ্ক্ষা, কখন আসবেন মা দুর্গা।

কিন্তু সেই আনন্দের ভিড়ের বাইরে শহরের এক কোণে থাকত রতন নামের একটি ছোট ছেলে। তার বাবা অনেক দিন ধরে অসুস্থ। সংসারে অভাব। পূজার নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্যও তাদের ছিল না। অন্য শিশুরা যখন নতুন জামা পরে মণ্ডপে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, রতন তখন জানালার পাশে বসে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত।

তার মা একদিন মৃদু হেসে বললেন, “মন খারাপ করিস না বাবা। মা দুর্গা সবার ঘরে আনন্দ নিয়ে আসেন।”

রতন মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা কি আমাদের ঘরেও আসবেন?”

মা কিছু বলতে পারলেন না। শুধু ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল লুকিয়ে রাখলেন।

সেদিন সপ্তমীর সকাল। ঢাকের শব্দে চারদিক মুখরিত। রতন দূর থেকে পূজামণ্ডপের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ মণ্ডপের কয়েকজন তরুণ তাকে দেখতে পেল। তারা কাছে এসে তার কথা জানতে চাইল। রতনের মুখে হাসি ছিল, কিন্তু চোখের ভেতর লুকিয়ে ছিল অনেক না বলা কষ্ট।

তরুণেরা তার পরিবারের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিল, এবারের পূজায় শুধু প্রতিমার সামনে প্রদীপ জ্বালালেই হবে না, মানুষের ঘরেও আলো জ্বালাতে হবে।

তারা রতনের জন্য নতুন পোশাক নিয়ে এল। তার বাবার চিকিৎসার জন্য সাহায্যের ব্যবস্থা করল। শুধু রতন নয়, আশপাশের আরও কয়েকটি অসহায় পরিবারের হাতে তুলে দিল প্রয়োজনীয় সামগ্রী।

রতন নতুন পোশাক পরে মণ্ডপে এসে দেবী দুর্গার দিকে তাকিয়ে রইল। প্রতিমার চোখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, মা যেন সত্যিই তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন।

তার চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

সে মনে মনে বলল, “মা, তুমি সত্যিই এসেছ। শুধু মণ্ডপে নও, তুমি মানুষের হৃদয়ে এসেছ।”

সেদিন পূজামণ্ডপে ধূপের গন্ধ, ঢাকের শব্দ আর উলুধ্বনির সঙ্গে মিশে গেল মানুষের ভালোবাসা। কেউ কারও ধর্ম, পরিচয় কিংবা সামর্থ্য দেখল না। সবাই শুধু মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখল।

একজন বৃদ্ধ বললেন, “দেবী দুর্গার আগমন শুধু প্রতিমার আগমন নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস, দুঃখের মাঝে আশার আলো এবং মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার আগমন।”

সন্ধ্যায় যখন মণ্ডপের হাজারো প্রদীপ জ্বলে উঠল, রতন তার মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। মায়ের চোখেও তখন আনন্দের জল।

শরতের আকাশে পূর্ণিমার আলো ছড়িয়ে পড়ছিল। দূরে ঢাক বাজছিল। শিউলির গন্ধে ভরে উঠছিল বাতাস।

মনে হচ্ছিল, দেবী দুর্গা শুধু কৈলাস থেকে মর্ত্যে আসেননি। তিনি এসেছেন মানুষের ভালোবাসায়, অসহায়ের মুখের হাসিতে, মায়ের চোখের আনন্দাশ্রুতে, একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মানবিকতায়।

কারণ মা দুর্গা যেখানে মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা জাগিয়ে দেন, সেখানেই সৃষ্টি হয় সত্যিকারের পূজা।

এই শরতে তাই আবারও ধ্বনিত হোক মঙ্গলশঙ্খ।

মা আসছেন।

মা আসছেন মানুষের মাঝে।

মা আসছেন ভালোবাসা হয়ে, আশার আলো হয়ে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস হয়ে।

শুভ শারদীয়া।

ঠিকানা চট্টগ্রাম বাংলাদেশ

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login