Article

অপরাধ করে কে, আর সাজা লেখা হয় কার নামে!

September 25, 2026

47 views

ঘটনা গত মঙ্গলবার বিকেলে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জনের এক নম্বর সড়কে। ২৪ বছর বয়সী মেহেদী হাসান যার পেশা নিমাংসমীক তিনি ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এ সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কার উঠে যায় সেই ফুটপাতে। গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান মেহেদী। দুর্ঘটনার পর গাড়ির চালকের আশায় থাকা এক কিশোরকে আটক করে পুলিশে দেয় উপস্থিত লোকজন। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রথমে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেয়। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে ওই কিশোরকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

এ ঘটনায় নিহত মেহেদী হাসানের ভাই মুক্তাদের ইসলাম একটি মামলা দায়ের করে গুলশান থানায়। কিন্তু কোন একটি পক্ষের প্ররোচনায় তার মামলায় ওই কিশোরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। গাড়ি চালক হিসেবে আকাশ মারক নামের এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমে নিউজ হলে পুলিশ তাদের ভুল স্বীকার করে জানায়, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ওই কিশোরের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। পরে গুলশানে বাসা থেকে তাকে থানায় এনে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। ওই কিশোর ঢাকার গুলশান এলাকার একটি ইংরেজির মাধ্যম স্কুলের ও লেভেলের শিক্ষার্থী। বয়স ১৭ বছর। তার বাবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন ক্যাপ্টেন। আর দুর্ঘটনা কবলিত প্রাইভেট কাটি তার মায়ের নামে নিবন্ধিত।

দুঃখজনক সত্যিটা প্রথম আলো জানিয়েছে, গাড়িচাপায় নিহত মেহেদী হাসান বাক প্রতিবন্ধী। ইশারায় কথা বললেও পরিবারের জন্য কিছু করার স্বপ্ন ছিল তার। পড়াশোনার পাশাপাশি নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতেন। অবসরে কাগজের ফুল বানাতেন বিক্রি করতেন মেলায়। তিনি ডোমার সরকারি কলেজের বিএ (পাস) দ্বিতীয় বর্ষে ছাত্র ছিলেন।

সোশ্যাল মিডিয়া আজ খবর বেরিয়েছে নিহত মেহেদীর পরিবার বিবাদী পক্ষের সাথে ৯ লাখ টাকার সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। স্ট্যাম্পে লেখা ডিডে দেখা যায় নগদ দুই লাখ টাকা পাবেন নিহতের পরিবার, পরে বাকি ৭ লাখ পে অর্ডারে পরিশোধ করা হবে। বিনিময়ে ভবিষ্যতে নিহতের পরিবার কোথাও কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না।

এখন প্রশ্ন হলো নিহত মেহেদী হাসানের পরিবারের এই শর্তে রাজি হওয়াটা কি নৈতিক বা ন্যায্য হলো? অথবা এমনভাবেও তো ভাবা যায় -মানুষের জীবনের মূল্য কি মাত্র ৯ লাখ টাকা? ১৭ বছরের শিশুটি এই অপরাধ থেকে যদি পিতার অর্থের গরমে পার পেয়ে -ভবিষ্যতে ওর তরফে অন্যবিধ আরও বড় অপরাধপ্রবণতা কি ঠেকিয়ে রাখা যাবে? ওর মতো অপরাপর ছেলেদেরকে দেশের প্রচলিত আইন মানতে বাধ্য করা যাবে?

বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে তা একটি অ-আপোষযোগ্য (Non-compoundable) অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং মোটর দুর্ঘটনা দাবি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষতিপূরণের দাবি করার স্পষ্ট আইনি সুযোগ রয়েছে।

তার মানে আইনগতভাবেই মেহেদীর পরিবার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবিদার। এবং এটি অপরাধীর শাস্তি পাওয়ার সাথে সম্পর্কিত নয়। আইন স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে সমঝোতার কোনো সুযোগ নাই।

কিন্তু বারিধারায় গাড়িচাপায় মারা যাওয়া লোকটার পরিবার নাকি ৯ লাখ টাকায় আপোষ করতে রাজি হয়েছে।

বিচারব্যবস্থা নিয়ে কথা বলা যায় না। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে। কিন্তু আমাদের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসুত্রতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়ার অহরহ উদাহরণ আছে। প্রাইভেট কারের কিশোর ছেলেটিকে যেকোনো মূল্যে বাঁচাতে সবখানে কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালবার সামর্থ্য তার পরিবারের আছে। পক্ষান্তরে মামলা চালিয়ে নিতে এক পয়সা খরচ করার সক্ষমতা থাকা দূরের কথা উকিল খরচ দিতে দিতেই পরিবারটি পথে বসে যাবে।

তারচেয়ে এই ভালো সমঝোতায় যদি ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় পরিবারটি অন্তত পথে দাঁড়িয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচবে। কিন্তু তাই বলে ৯ লাখ টাকা জীবনের মূল্য? এটা কখনোই হতে পারে না।

পুলিশ প্রশাসনের উচিৎ নিজেরা বাদি হয়ে মামলা দায়ের করা এবং ছেলেটির শাস্তি নিশ্চিত করা। সেইসাথে অন্তত ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ যাতে মেহেদীর পরিবার পায় সেটির সুরাহাও পুলিশকেই করতে হবে।

যে ছেলেটি এখনো প্রপারলি ড্রাইভিং শেখেনি তাকে কেন স্টিয়ারিংয়ে বসানো হলো সেজন্য গাড়িক মালিক ও চালককেও শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। এর অন্যথা মানেই দেশের প্রচলিত আইনের ব্যত্যয়। হতে পারে মেহেদীর পরিবার কিশোর ছেলেটিকে মাফ করে দিতে পারে। সেটিও হতে হবে প্রচলিত আইনের বেসিসে। বড়লোকের পক্ষ নেয়া পুলিশ বা আইনের লোকের কাজ নয়। এমন উদাহরণ তৈরি করা হলে ভবিষ্যতে যেকোনো বড়লোক যেকোনো গরীবের ওপর খামখেয়ালিপনায় গাড়ি উঠিয়ে দিয়ে বিকৃত মজা লুটতে পারে।

আগেই বলা হলো সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুজনিত অপরাধ ফৌজদারি আইনের আওতায় অ-আপোষযোগ্য (Non-compoundable) হলেও বাস্তবে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার ভোগান্তি, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক চাপের কারণে ভুক্তভোগী ও দরিদ্র পরিবারগুলো আপোষ মীমাংসা করতে বাধ্য হয়।

কিন্তু ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার পর দেশের দুর্বল বিচারব্যবস্থা এবং সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের নিরুপায় হয়ে কম টাকায় আপস করবার বাধ্যবাধকতা নিয়ে অধিকারসচেতন গণমানুষের ক্ষোভ ও সমালোচনা তো তাতে থামানো যাবে না।

লেখক: সাংবাদিক

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login

  • দুর্বল বিচারব্যবস্থা

    • ফারদিন ফেরদৌস 1 day ago

      আপনার সাথে সহমত। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানবেন।