১
সুখেন্দুর মনটা ভালো নেই। আর কদিন পরেই এপ্রিল মাস শুরু হবে। এসময় হতেই তার মন ভার ভার হয়ে যায়। এপ্রিল মাস আসতে আসতে তার মাথাটা পুরোপুরি মাথাটা খারাপ হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে তাঁকে অনেকেই পাগল বলে। এ মাসে মাঝে মাঝে এ জন্যে তাকে বেঁধে রাখা হয়। সুখেন্দু অবশ্য খুব ক্ষতিকর কোন পাগল নয়। কাউকে তাড়া করে না, কাউকে মারতে যায় না। একা একা মাটিতে শুয়ে শুয়ে গড়ায় আর কান্না করে, বিলাপের সময় রক্ত, আহারে রক্ত বলে চিৎকার করে।
সুখেন্দু গাইঘাটায় একটা হাইস্কুলে অংকের মাষ্টার। মানুষটা সারা বছর ভালো থাকে। শুধু এপ্রিল মাস এলেই তাঁকে নিয়ে শুরু হয় রাজ্যের ঝামেলা। পুরো বনগাঁ মহকুমায় অংকের শিক্ষক হিসাবে তার নাম ডাক আছে। যে স্কুলে সুখেন্দু শিক্ষকতা করে, এপ্রিল মাস এলেই তার জায়গায় বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। এটা একটা অলিখিত রীতি হয়ে গেছে।
আর সাতদিন পরেই এপ্রিল মাস শুরু হতে যাচ্ছে। এবারে সুখেন্দুকে আগের বছরগুলোর চেয়ে একটু অন্যরকম দেখাচ্ছে। গাইঘাটা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিত্যানন্দ বিশ্বাস তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন।
-সুখেন্দু, কেমন আছেন আপনি?
-আমি স্যার ভালো আছি।
-কাগজ কলমে আপনার রিটায়ারের সময় হয়ে গেছে, সেটাতো জানেন।
-জ্বী, সে আমি জানি। এখনো আমাকে চাকুরীতে রেখে আপনি মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন।
-না, তা ঠিক নয়। আপনি আমাকের স্কুলের গর্ব। অত্র অঞ্চলে আপনার চেয়ে ভালো কোন অংক শিক্ষক নাই। আপনাকে আমরা ছাড়তেও চাইনা। আমি জেলা শিক্ষা অধিকারিকের সাথে কথা বলেছি। আপনি রিটায়ারমেন্তে যাবেন না।
সুখেন্দু কিছু বললো না। চুপ করে বসে রইলো।
-আপনি কিছু বলছেন না যে? নিত্যানন্দ বাবু জিজ্ঞেস করলেন।
-স্যার আমাকে এক মাসের জন্য ছুটি দেবেন? এ স্কুলে যোগ দেয়ার দিন হতে আজ অব্দি আমি কোনদিন ছুটি যাইনি।
নিত্যানন্দবাবু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন সুখেন্দুর দিকে।
-আপনি আবার কোথায় যাবেন ছুটিতে?
-স্যার, দেশের বাইরে যাবো। আমি একবার বাংলাদেশে যেতে চাই।
নিত্যানন্দ বিশ্বাস কিছুই বললেন না। চুপ করে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ সুখেন্দুর দিকে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললেন, এপ্রিল মাসটা এখানেই থাকুন। মে মাসে যান।
-স্যার, প্রতি বছর এপ্রিল মাসে আপনাদের কষ্ট দেই। এ বছর আমি এই মাসটা আমি আমার নিজের মতো থাকি?
নিত্যানন্দ বাবু খুব ভালো করে জানেন, সুখেন্দুকে বুঝিয়ে লাভ নেই, খুব জেদি একজন মানুষ। পাশাপাশি তার নিজেরও দুশ্চিন্তা হতে লাগলো সুখেন্দুর জন্য। মানুষটা কিভাবে থাকবে সামনের কটা দিন! এপ্রিল মাস এলেই মানুষটা অসুস্থ হয়ে পড়ে।
সুখেন্দু বিয়ে থা করেননি। চিরকুমার। স্কুল কম্পাউন্ডে একটা রুমে থাকেন। নিত্যানন্দ বাবু শুধু ভাবছেন, মানুষটা বাংলাদেশে যেতে চাচ্ছে কেন?
২
হরিণছড়ায় এসে ঢুকতেই সুখেন্দুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। পঞ্চাশ বছরে তেমন কিছুই পাল্টায়নি। আগের রাস্তাগুলো এখনো আছে। সাথে নতুন কিছু রাস্তা দেখতে পেলো। হরিণছড়া এসে রিকশা হতে নেমে হাঁটা শুরু করলো সুখেন্দু। হাঁটতে হাঁটতে একটু গ্রামের দিকে এসেই উবু হয়ে রাস্তা হতে এক চিমটি মাতি তুলে নাকের কাছে এনে শুঁকলো সুখেন্দু। পৃথিবীর সব মাটির ঘ্রাণ একই। তবে এই হরিণছড়ার মাটিতে অন্যরকম কিছু একটা আছে। একবার শুঁকে মন ভরলো না, মাটিটুকু নাকের কাছে নিয়ে লম্বা করে একটা শ্বাস নিলো। বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা অদৃশ্য হারানো কিছুর সন্ধান পেলো সুখেন্দু। হাঁটতে হাঁটতে আরো কিছুদূর এগিয়ে একটা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তার খুব মন চাইছে বাড়িটার ভেতর যেতে । মন সায় দিলোনা। তবুও ওখানেই দাঁড়িয়ে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলো। কি মনে করে তবু বাড়িটার দিকে এগোল সুখেন্দু। বাড়িটার দিকে কয়েক পা এগোতেই দেখল, বাড়ির ভেতর হতে একজন বয়স্ক লোক বেরিয়ে আসছেন। সুখেন্দুর এখন বয়স চলছে পঁয়ষট্টি, আর এ লোকটি সম্ভবত সত্তরের উপর বয়স। বৃদ্ধ মানুষটিই এগিয়ে এসে সুখেন্দুকে দেখে বলল, আসসালামু আলাইকুম। আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?
চট করে সুখেন্দু কোন জবাব খুঁজে পেলোনা। কিছুটা থতমত খেয়ে আমতা আমতা করে বলল,
-না মানে ইয়ে, আপনাদের এই এলাকায় আমি বেড়াতে এসেছিলাম। রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে আপনাদের এখানে চলে এলাম। কথাটা বলে সুখেন্দু নিজেই অবাক হয়ে গেলো নিখুঁত ভাবে বানিয়ে বানিয়ে কথাটা বলতে পারায়।
বৃদ্ধ লোকটি বললেন,
-অসুবিধা নাই ভাই। আপনি এসেছেন, ভালোই হলো। আজ আমার নাতনীর বিয়ের কথাবার্তা পাকা করতে আসবে। আপনি যেহেতু নিজে পরিকল্পনা করে আসেননি, এর মানে হলো, আপনাকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। আজ আপনি আমাদের মেহমান। আজ আপনি আমার ভাই।
কথাটা শুনে সুখেন্দু মনে মনে একটা ধাক্কা খেলো। সে কোনওরকমে জিজ্ঞেস করলো,
-ভাই, আপনার নামটা তো জানা হলো না!
-আমার নাম শফিউল।
-ভাইজান, আপনার নামটা খুব সুন্দর।
কথাটা বলেই সুখেন্দু অপেক্ষা করতে লাগলো, মানুষটা এবার তার নাম জিজ্ঞেস করলে সে কি বলবে? আজ তার নাতনীর বিয়ের কথা পাকা করতে আসবে। এরকম একটা সময়ে তার নাম জানলে এরা যদি সংকুচিত হয়ে পড়ে বা তাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করবে তো? শফিউল সাহেব এবার আচমকা বলে বসলেন,
-ভাই, আপনার নাম যাই হোক না কেন, আমি আপনাকে রবিউল বলে ডাকবো।
সুখেন্দু মুচকি হেসে মাথা নেড়ে বলল,
-জ্বী ভাই।
আকর্ণ হাসি দিয়ে এবার শফিউল বললেন, আসেন ভাই। বাড়ির ভেতরে আসেন। হাত মুখ ধুবেন। কিছু খাবেন। কিছুক্ষণ পরেই মেহমানরা এসে পড়বে। বাড়ির ভেতরে গিয়ে উঠোনে দাঁড়াতেই কেন যেন সুখেন্দুর মনটা ভালো হয়ে গেলো। এরকম একটা বাড়ি সব সময় তার মনের ভেতর ঘুরপাক খায়। বুকের ভেতর একটা সুখ সুখ হাওয়া বইতে লাগলো সুখেন্দুর।
৩
সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। শফিউল সাহেবের নাতনীর বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয়ে গেলো। পরের মাসেই বিয়ের তারিখ ঠিক করা হয়েছে। সুখেন্দু সবার কাছে তাঁকে তার একজন ভাই হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
সুখেন্দু উঠে দাঁড়ালো। তাঁকে যেতে হবে। শফিউল সাহেবও জানেন, সে এক জায়গায় বেড়াতে এসেছে। ঘুরতে ঘুরতে এখানে চলে এসেছিলেন। সুখেন্দুকে এবার যেতে হবে।
শফিউল সাহেব একবার বললেন, রাতে খেয়ে গেলে ভালো হতো।
সুখেন্দু বারণ করল। তাঁকে চলে যেতে হবে। বাড়ির সামনে একটা রিকশা আনিয়ে রাখা হয়েছে। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে রিকশাটার দিকে এগোলেন। রিকশায় উঠার আগমূহুর্তে শফিউল সাহেব সুখেন্দুর দু হাত নিজের হাতে নিয়ে বললেন,
-আমি জানিনা কেন, কিন্তু আপনাকে দেখে আমার একজন ভাই এর কথা মনে পড়ে গেছে। আমার সেই ভাইটার নাম ছিলো রবিউল।
-আপনার সেই ভাই এর নাম কি ছিল?
-ভাই, তার নামই ছিলো রবিউল। যুদ্ধের সময় আমার মা বাবা আর সেই ভাইটা মারা গেছে।
কথাটা শুনে সুখেন্দু কিছুই বলল না। মনটা ভার হয়ে গেলো। কোন মৃত্যুর সংবাদ সে মন থেকে নিতে পারে না। সুখেন্দু শফিউল সাহেবের দিকে তাকালো। বলল,
-আপনার ভাইটার কোন স্মৃতি কি নেই আপনার কাছে?
-আছে। অনেক কিছুই ভুলে গিয়েছিলাম, আজ আপনাকে দেখে ওর নামে ডাকার পর থেকে ভাইটার অনেক কিছু মনে পড়ে গেলো। আশ্চর্য ব্যপার কি জানেন, আপনার ভাইজান বলার ধরণটা অনেকটা সেই রকম। আরো একটা ঘটনা আছে।
-কি সেটা? সুখেন্দু জিজ্ঞেস করলো।
-আপনার ডান গালে তিলটা দেখেই আমি আপনাকে আমার সাথে কিছুক্ষণ রাখার অজুহাতে আমার নাতনির বিয়ের কথার জন্য থাকতে বলেছিলাম। আমার ভাইটারও একই জায়গায় একটা তিল ছিলো।
সুখেন্দুর মন ভার হয়ে গেলো। সে শফিউল সাহেবের দিকে ফিরে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-আমি আবার আসবো ভাইজান, আগামী বছর এপ্রিলে। অন্তত এক ঝলক তো আপনার ভাই এর কথা মনে পড়বে আমায় দেখে।
সুখেন্দুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন শফিউল সাহেব। কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
-ভাইটারে একদম ভুলতে পারিনা আমি। বাবার সম্পত্তি আমি ভাগ করে রেখেছি ভাই এর জন্য সমান সমান। আমার বিশ্বাস, আমার ভাই একদিন ফিরে আসবে। আজ পঞ্চাশ বছর হয়ে গেলো, ভাইটা ফেরেনি। কিন্তু যদি ফিরে আসে, সে যেন তার সবকিছু পায়। সে যেন ভাবে, তার ভাই তার সব সয় সম্পত্তি ঈমানের সাথে হেফাজত করে রেখেছে; বলেই কাঁদতে লাগলেন। সুখেন্দুর দুচোখ ভিজে গেল। আহারে ভাই এর জন্য মায়া!
৪
সুখেন্দু গাইঘাটায় ফিরে এসেছে। এবারে সবাই অবাক হয়ে দেখলো, এবার এপ্রিল মাসে সুখেন্দু কোন কান্নাকাটি করেনি, বিলাপ করেনি। এক মাসের ছুটি নিয়ে বাংলাদেশ গিয়েছিলো। সপ্তাহখানেক পরেই ফিরে এসেছে। ফিরে এসেই আবার স্কুলে ক্লাস নেয়া শুরু করেছে। নিত্যানন্দ বাবু খুব খুশি হলেন, সুখেন্দুকে পরিপূর্ণ সুস্থ দেখে। প্রতিবছর এপ্রিলে সুখেন্দুকে দেখাশোনার জন্য একজন মহিলা ঠিক করা হয়। এটি করেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তার নাম আমেনা বেগম। বশিরহাটে বাড়ি। আমেনা এবারেও এসেছে। দুবেলা রান্না করে খাইয়ে দেয় সুখেন্দুকে। সারাবছর সুখেন্দুর খাবার আসে প্রধান শিক্ষকের কোয়ার্টার হতে। আমেনা রাতের বেলা প্রধান শিক্ষকের বাসাতেই থাকে, আর সারাদিন সুখেন্দুর বাসাতেই থাকে। সুখেন্দু যদিও দিনের বেশিরভাগ সময় স্কুলেই কাটায়।
দুপুরে খেতে বসে আমেনাকে জিজ্ঞেস করলো,
-আমেনা, তুমি কি মনে করতে পারো, আমার ব্যাপারে তোমার আব্বা কি বলেছিল?
-এইটা আপনি আমাকে প্রতি বছর এই মাসেই জিজ্ঞাস করেন। সারাবছর জিজ্ঞেস করেন না, সারাবছর খোঁজও নেন না। আমেনার কণ্ঠে অনুযোগ। আমেনা সুখেন্দুর চেয়ে সাত/আট বছরের ছোট।
-এই বছরই শেষবার। এরপরে আর জিজ্ঞেস করবো না।
-এই বছর শেষবার কেন?
-এমনিই। আর বলবো না।
-এপ্রিল মাসের শেষদিকে ঘটছিলো। আপনে আপনের মা বাবা আর বড় ভাই সহ যুদ্ধের সময় ডোমার দিয়ে আসার সময় পাকিস্তানিরা গুলি করেছিলো। আনুমানিক নয়শত লোক মারা গিয়েছিলো। আপনের বাবা মা ভাই সবাই মারা গেছিলো। আপনেরে শরণার্থী ক্যাম্প থেইকা আমার আব্বায় নিয়া আসছিলো। আপনের আসল নাম রবিউল। এই দেশেই আপনেরে পড়ালেখা করাইলো। আপনের নাম বদলে সুখেন্দু করে দিয়েছিলো। আমরা মুসলমান হইলে আপনেরে কীজন্যে সুখেন্দু নাম দিয়েছিলো, তা আমি আজও বুঝিনাই।
আমেনা যখন কথাগুলো বলছে, তখন সুখেন্দু তার টেবিলের ড্রয়ার হতে পুরনো একটা খবরের কাগজ বের করলো। ৩০ই এপ্রিল, ১৯৭১ এর অমৃতবাজার পত্রিকা। শিরোনামটা দেখেই ছলছলে চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলো- "ভারত যাবার পথে ৯০০ শরণার্থী নিহত"।
নোট- ৩০ই এপ্রিল,১৯৭১ অমৃতবাজার পত্রিকায় একটা শিরোনাম ছিলঃ
"ভারত যাবার পথে ৯০০ শরণার্থী নিহত"
বাংলাদেশের ডোমার পুলিশ স্টেশন এলাকা থেকে মানুষগুলো সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিলো। প্রায় আটহাজার মানুষ। পথে বাধা পায় পাকিদের। ব্রাশ ফায়ার করে। ৯০০ মানুষ সেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। তাদের আর যাওয়া হয় না নিরাপদ আশ্রয়ে!