পৃথিবীর ইতিহাসে যত সভ্যতার উত্থান ঘটেছে, তার প্রতিটির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষ। তবে মানুষকে নিয়ে সবচেয়ে বড় বিস্ময় এই যে, সে নিজের আচরণের কারণ নিজেই সবসময় জানে না। আমরা মনে করি আমরা যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিই। অথচ বহু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়ে যায় আগে, যুক্তি আসে পরে। মানুষের ভেতর একই সঙ্গে বাস করে বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা, ভয়, সম্মান পাওয়ার বাসনা, দখল করার ইচ্ছা, সহযোগিতার ক্ষমতা এবং ধ্বংসের সম্ভাবনা। এই সবগুলো শক্তি মিলেই মানুষের আচরণ গড়ে ওঠে।
•
একটি নবজাতক পৃথিবীতে আসে কোনো ভাষা ছাড়া, কোনো ধর্ম ছাড়া, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া। কিন্তু সে একেবারে শূন্য নিয়েও আসে না। লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তন তার স্নায়ুতন্ত্রে কিছু প্রবণতা রেখে গেছে। ক্ষুধা পেলে সে কাঁদে, বিপদ অনুভব করলে আঁকড়ে ধরে, পরিচিত মুখের দিকে আকৃষ্ট হয়। এগুলো শেখানো হয় না। এগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জৈবিক বৈশিষ্ট্য। তারপর শুরু হয় সমাজের কাজ। পরিবার তাকে ভাষা শেখায়, সংস্কৃতি শেখায়, কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ-তার মানদণ্ড শেখায়। ফলে মানুষের আচরণ কখনোই কেবল জন্মগত নয়, আবার কেবল পরিবেশের ফলও নয়। মানুষের জীবন হলো উত্তরাধিকার ও অভিজ্ঞতার দীর্ঘ সংলাপ।
•
মানুষের মস্তিষ্ক পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল পরিচিত প্রাকৃতিক কাঠামোগুলোর একটি। স্নায়ুকোষের অগণিত সংযোগ প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে সাজায়। তাই একই ঘটনায় দুইজন মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। যে শিশু নিরাপদ পরিবেশে বড় হয়, তার পৃথিবী সম্পর্কে বিশ্বাস এক রকম হয়। যে শিশু প্রতারণা, সহিংসতা কিংবা অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠে, তার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে। এই পার্থক্য চরিত্রের দুর্বলতা নয়। এটি অভিজ্ঞতার ছাপ।
•
বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান দেখায়, মানুষের বহু আচরণের শিকড় প্রাগৈতিহাসিক সময়ে। ছোট ছোট দলে বসবাসকারী মানুষকে একই সঙ্গে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা-দুটোই করতে হতো। সহযোগিতা ছাড়া শিকার, সন্তান পালন বা নিরাপত্তা সম্ভব ছিল না। আবার সীমিত সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতাও ছিল অনিবার্য। আজকের সমাজে আমরা অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্র কিংবা বাজারে সেই পুরোনো প্রবণতার নতুন রূপ দেখি। বাহ্যিক পরিবেশ বদলেছে, তবুও মানুষের মস্তিষ্কের বিবর্তন তুলনামূলক ধীর।
•
মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ নিজের সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ধারণা ধরে রাখতে চায়। তাই নিজের ভুলকে আমরা প্রায়ই পরিস্থিতির ওপর চাপাই, অন্যের ভুলকে তার চরিত্রের দোষ বলে মনে করি। এই প্রবণতা বিচারকে প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে মানুষ এমন তথ্য খুঁজতে আগ্রহী হয়, যা তার আগের বিশ্বাসকে সমর্থন করে। ফলে সত্যের অনুসন্ধানের চেয়ে বিশ্বাসের নিরাপত্তা অনেক সময় বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
•
সমাজবিজ্ঞান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো মানুষ একা গড়ে ওঠে না। ভাষা, শিক্ষা, অর্থনীতি, ধর্ম, আইন, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি-সব মিলিয়ে সমাজ মানুষের চিন্তার সীমানা তৈরি করে। একজন মানুষের কাছে যা স্বাভাবিক, অন্য সমাজে তা অস্বাভাবিক হতে পারে। এই কারণেই সংস্কৃতি মানুষের আচরণের অন্যতম শক্তিশালী নির্মাতা।
•
ক্ষমতার প্রশ্নও মানুষের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে অপরিহার্য। ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রের হাতে থাকে না। পরিবারে, বিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রে, এমনকি ভাষার মধ্যেও ক্ষমতার উপস্থিতি থাকে। যে মানুষ দীর্ঘদিন অপমানের শিকার হয়েছে, সুযোগ পেলে সে কখনো কখনো সেই একই আচরণ অন্যের ওপর প্রয়োগ করে। আবার কেউ কেউ একই অভিজ্ঞতা থেকে সহমর্মিতা শেখে। অর্থাৎ একই বাস্তবতা থেকেও ভিন্ন নৈতিক পরিণতি জন্ম নিতে পারে।
•
নৈতিকতার উৎপত্তি নিয়ে বহু মত রয়েছে। একদিকে জীববিজ্ঞান বলছে, সহযোগিতা ও পারস্পরিক আস্থা মানুষের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে দর্শন বলছে, নৈতিকতা কেবল উপযোগিতা নয়। এটি ন্যায়, মর্যাদা ও দায়িত্বের প্রশ্ন। বাস্তব জীবনে এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়ই পাশাপাশি কাজ করে। আমরা যেমন আত্মীয়কে সাহায্য করি আবেগ থেকে, তেমনি অচেনা মানুষের অধিকার রক্ষার দাবিও তুলতে পারি নৈতিক বিশ্বাস থেকে।
•
ধর্ম মানুষের ইতিহাসে গভীর ভূমিকা রেখেছে। এটি বহু মানুষের কাছে অর্থ, আশা, পরিচয় এবং নৈতিক অনুপ্রেরণার উৎস। একই সঙ্গে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে ধর্মকে কখনো কখনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারও করা হয়েছে। ফলে ধর্মকে বোঝার জন্য বিশ্বাসের পাশাপাশি ইতিহাস, সমাজ ও ক্ষমতার সম্পর্কও বিশ্লেষণ করতে হয়।
রাষ্ট্র মানুষের নিরাপত্তা, আইন ও জনকল্যাণের জন্য গড়ে ওঠে। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রও মানুষের তৈরি প্রতিষ্ঠান। তাই রাষ্ট্রের শক্তি যেমন ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তেমনি জবাবদিহি না থাকলে অন্যায়ের হাতিয়ারও হতে পারে। ইতিহাসে গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, সাম্রাজ্য কিংবা বিপ্লব-সব ক্ষেত্রেই মানুষের আচরণ ও ক্ষমতার সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
•
তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের আচরণকে নতুনভাবে বদলে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মত প্রকাশের সুযোগ বাড়িয়েছে, আবার একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকর তথ্য, আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়া এবং বিভাজনও দ্রুত ছড়াতে সাহায্য করছে। মানুষের মনোযোগ আজ একটি মূল্যবান সম্পদ। যে প্রতিষ্ঠান মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, সে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবও বিস্তার করতে পারে। ফলে প্রযুক্তির প্রশ্ন কেবল যন্ত্রের প্রশ্ন নয়। এটি মানবমনের প্রশ্নও।
সবশেষে, মানুষ কেন যেমন আচরণ করে-এর একক কোনো উত্তর নেই। জীববিজ্ঞান আমাদের শরীরের ইতিহাস বলে, মনোবিজ্ঞান আমাদের অভিজ্ঞতার ইতিহাস বলে, সমাজবিজ্ঞান আমাদের সম্পর্কের ইতিহাস বলে, আর দর্শন আমাদের মূল্যবোধের ইতিহাস বলে। এই চারটি ইতিহাস একত্রে না বুঝলে মানুষকে বোঝা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
•
মানুষ একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার বাহক। তার ভেতরে যেমন নিষ্ঠুরতার ক্ষমতা আছে, তেমনি আছে অসাধারণ সহমর্মিতার শক্তি। ইতিহাসে যুদ্ধ যেমন মানুষের সৃষ্টি, তেমনি চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ধারণাও মানুষেরই সৃষ্টি। তাই মানুষকে বোঝার সবচেয়ে সৎ উপায় হলো তাকে একরঙা না দেখা। মানুষ কখনো সম্পূর্ণ দেবতা নয়, কখনো সম্পূর্ণ দানবও নয়। সে তার পরিবেশ, ইতিহাস, শিক্ষা, প্রবৃত্তি, বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা এবং প্রতিদিনের সিদ্ধান্তের সমন্বয়ে ক্রমাগত নিজেকে তৈরি করে চলা একটি জীবন্ত সত্তা।