Article

এসএসসির ফল পতনের আড়ালে ভয়াল বাস্তবতা

September 26, 2026

23 views

এসএসসিতে পাশের হার কমে যাওয়াটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা "শিক্ষার্থীদের না পড়ে পাশ করা" মনোভাবের ফলাফল। বেশ কয়েকবার অটো পাশ, শর্ট সিলেবাসে পরীক্ষা, কোভিডকাল ইত্যাদি শিক্ষার্থীদের পুস্তক বিমুখ করে রেখেছে। তাদের ঘরবন্দি জীবন থেকেই মূলত মোবাইল আসক্তির সূত্রপাত। যেটা এখন ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে।

যে ছেলেরা একটা সময় রাস্তায়, মাঠে খেলে বেড়াতো, পুকুরে উদ্যম বেগে সাঁতরাতো, সাইকেল চালাতো তারা এখন বাবা-মাকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে একটা ফোন কিনে ঘরের দরজা আটকে গেমস, রিলস, বাজি ও পর্ণের মতো জঘণ্য কর্মকান্ডে লিপ্ত হচ্ছে। যে মেয়েদের কখনও ঘরের কাজ, কখনো বাইরে খেলাধুলা, কিংবা সেলাই, কখনো মায়ের রান্নায় হাত বাটাতে দেখা যেতো সেই মেয়েরা আজকাল ফোন হাতে একইভাবে গেমস, রিলস, নেশাখোর, বখাটে ছেলেদের সাথে অবৈধ সম্পর্ক এবং পর্ণে লিপ্ত হচ্ছে।

এইযে সামাজিক অবক্ষয়- এর জন্য অবশ্যই একটা সময় দায়ী, এর সাথে দায়ী আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং অভিভাবকব্ৃন্দ। আমাদের দেশে এখন শিক্ষার্থীদের শাসন করার অভ্যাসটা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। প্রায়ই খবরে আসে, ছাত্রকে শাসন করায় শিক্ষককে শাসাতে এলো এলাকাবাসী। সেই এলাকার শিক্ষার্থীরা কিশোর গ্যাং তৈরি করবে না তো কারা করবে? এটাই চরিত্র বিভ্রাটের প্রথম স্টেপ, এর পরে তারাই বড় হয়ে এলাকার ভয়ানক চাঁদাবাজে রূপান্তরিত হবে। তখন সর্বপ্রথম ভোগান্তির শিকার হবে সেই এলাকাবাসীই।

একটা শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো তার পরিবার; পরিবার থেকে কিছু না শিখেই যখন কেউ স্কুলে ভর্তি হয় তখন একজন শিক্ষককেই সেই পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দায়িত্বটা গ্রহণ করতে হয়। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রসেস। এখানে অভিভাবকদের উচিত ধৈর্যের সহিত শিক্ষকদের সেই স্পেসটা দেওয়া। পাশাপাশি, নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো। অনিয়মিত স্কুল-কলেজে উপস্থিতি, বাল্যকালীন আয়মুখী চিন্তা-ভাবনা, অসৎ সঙ্গ ইত্যাদি শিক্ষার্থীদের আরও বেশি বই থেকে দূরত্বটাকে সুগম করছে।

ইদানীং একটি কমন চিত্র প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখা যাচ্ছে- শিক্ষক রয়েছে কিন্তু শিক্ষার্থী নেই। একশত জন শিক্ষার্থীর ক্লাসে মাত্র ৪-৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস করতে হচ্ছে শিক্ষককে, কখনও একজনকেও পাওয়া যায় না।

আরেকটা প্রেক্ষাপট রয়েছে সেটা হলো- ক্লাসে শিক্ষার্থীরা এলেও এদের কথা বলার টপিকে পড়াশোনা কিংবা ইনোভেশনের জায়গাটা ভীষণ সংকীর্ণ। এরা নিজেদের মধ্যে আলোচনাও করে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টিকটিক, থ্রেড ইত্যাদি প্লাটফর্মে কে কত লাইক পেলো, কার কত ভিউ হলো, কতগুলো শেয়ার বাড়লো, কে কোন গেমসে পারদর্শী, কে কোন গেমসের কোন লেভেলে আছে, কোন ছেলেটা কয়টা মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়েছে, কিংবা কোন মেয়েটা কয়টা ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়তে পেরেছে ইত্যাদি তাদের আগ্রহ-দম্ভ-এচিভমেন্টের বিষয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও এই ব্যাপার আসলে কিছু দায় এড়াতে পারে না। এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার আগে বিভিন্ন ধাপে শিক্ষার্থীদের প্রি-টেস্ট, টেস্ট পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। সেই পরীক্ষাগুলোয় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কেন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ প্রদান করা হয়?

এইযে দুর্বল মাপের শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো উপর্যুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই ভেড়ার পালের মতো সকলেই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে; অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কোনো জায়গায় আটকে থাকতে হচ্ছে না, তাদের পানিশমেন্ট এর কোনো ব্যবস্থা নেই, মূলত এসবও আমাদের দেশের পাশের হার হ্রাসের অন্যতম কারণ।

তাহলে, করণীয় কি? শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য অন্তত একবার (যেমনটা এবার হয়েছে) পাশের একচুয়াল প্রাপ্যতার হার জানানো প্রয়োজন ছিল। পরীক্ষার রুমে শিক্ষার্থীদের অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ না দেওয়ার ব্যাপারটাও অবশ্যই এখানে গুরুত্ব পাবে। এতে করে যেটা হবে- শিক্ষার্থীরা একটা মেসেজ পেলো "পড়াশোনা ছাড়া পরীক্ষায় পাশ করা যায় না"; ফলে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক দুই পক্ষই এলার্ট হবে, পড়াশোনার ব্যাপারে সচেতন হবে, নিয়মিত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে আসবে, স্কুল-কলেজের টেস্ট, প্রি-টেস্ট পরীক্ষাগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া শুরু হবে।

নির্বাচনী, প্রাক নির্বাচনী পরীক্ষাগুলোয় যারা অকৃতকার্য থাকলো তাদের আলাদা করে ক্লাসের এবং নিবিড় পরিচর্যা নেওয়ার নির্দেশনা যদি মাউশি থেকে প্রদান করা হয়, এবং অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য সামান্য হলেও শিক্ষকদের সম্মানি প্রদান করা হয়, আশা করি পাশের মানে অগ্রগতি আসবে।

এইযে নিবিড় যত্ন নেওয়ার কথা বললাম এসব বিষয়ে অবশ্যই একজন শিক্ষককে আন্তরিক থাকতে হবে। দরকার হলে শিক্ষকদের জবাবদিহিতার আওয়ায় আনতে হবে। দেশের আনাচে কানাচে যেসব স্কুলে এইবার এসএসসি পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাশ করেনি, সেইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রাথমিকভাবে শোকজ করা হয়েছে। যথাযথ উদ্যোগ বলে মনে করি।

এছাড়াও সনাতন পদ্ধতিতে ক্লাস না নিয়ে ক্লাসে আধুনিকায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ, ব্যবহারিক ক্লাসে প্রয়োজনীয় উপকরণ সামগ্রীর প্রাপ্যতা ও হাতে কলমে শিক্ষাদান, শিক্ষার্থীদের নানান সৃজনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রম ক্লাসমুখী করে রাখতে অনন্য ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছি।

শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য একজন দক্ষ শিক্ষকের প্রয়োজন। এই কারণে, শিক্ষক নিয়োগে অবশ্যই স্বজ্জনপ্রীতিহীন, দলহীন, সাধারণ-মেধাবী ক্যান্ডিডেটদের সুযোগ দিতে হবে, তবেই আশা করা যায় একটি উন্নত মানের শিক্ষিত সমাজ আমরা পাওয়ার যোগ্যতা রাখি।

#হাবিব_রহমান #মনের_বাক্যমালা #Thoughts

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login