Story

জাগতিক (পর্ব ২)

September 26, 2026

24 views

ঢাকার সিদ্ধেশ্বরি এলাকা। মৌচাক মার্কেটের পেছনে চারটা বাসা পরেই তিনতলা বাড়ি। গেটের পাশে একটা নামফলক আছে। সেখানে লেখা আছে সুরাইয়া ভিলা। আশেপাশের সব বিল্ডিং নতুন নতুন বহুতল হয়ে গেছে। এই একটা বাড়িই এখানে এখনো পুরনো। দোতলায় ডাইনিং টেবিলে বসে আছেন বাড়ির মালিক সুরাইয়া আক্তার। মাঝবয়েসী, বয়স এখন পঁয়তাল্লিশ ছেচল্লিশ চলছে। তার সামনে বসে আছে তার একমাত্র সন্তান রিমি। ডাক্তারি পাশ করে এখন তার ইন্টার্নি চলছে। রিমি খেতে খেতে একটানা কথা বলেই যাচ্ছে। আজ যে ঘটনাটা বলল রিমি, সেটা শুনে তিনি ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে গেছেন। হাসপাতাল হতে বেরিয়ে গাড়িতে উঠার সময় কয়েকটা ছেলে তাকে উদ্যেশ্য করে আজেবাজে কথা বলছিল। গাড়িতে উঠার সময় একটা খুব অশ্লীল কথা কানে যেতেই সে থেমে গিয়ে তাদের দিকে তাকালো। তখন ওরা বিশ্রীভংগীতে হাসছিল। সে ভেবেছিলো ওদের কিছু বলি আবার মনে হলো, এসব ছেলেরা খারাপ শ্রেণীর হয়। ওদের দিকে এক কদম এগিয়েও থেমে যাওয়াতে তাদের হাসি যেন থামছিলোই না। সে সময়টাতেই একটা আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটেছে। ভোজবাজীর মতো চারজন ষন্ডামার্কা লোক তার পেছন হতে ঐ তিনটা ছেলের দিকে এগিয়ে গেছে, ঐ ছেলেরা ভাবতেই পারেনি যে এরা তাদের দিকেই আসছে। ওদের কাছাকাছি গিয়েই ওরা বেমক্কায় তিনজনকে মারধোর করা শুরু করল। একটা লোক পকেট হতে একটা ক্ষুর বের করে ঐ তিনজনের গায়ে সমানে পোঁচ দেয়া শুরু করেছে। মূহুর্তের মধ্যে ওই তিন বখাটে মাটিতে পড়ে কাতরাতে লাগলো। কি এক রক্তারক্তি কান্ড। এটা দেখেই রিমির নিজেরই হাত পা কাঁপতে শুরু করেছে। সেসময় ক্ষুর হাতের লোকটা ওই রক্তমাখা ক্ষুরসহই তার দিকে এগিয়ে এসে একটা অদ্ভুত কথা বলেছে। সে নাকি বলেছে, 
-আম্মাজান, আপনি বাসায় যান। আইজকা থেইকা এই এলাকায় না শুধু, পুরা বাংলাদেশে আপনের দিকে কেউ চোখ তুইল্লা তাকাইবো না। 
সব শুনে সুরাইয়া বেগমের শুধু মনে হলো, মেয়ের ইন্টার্ণি শেষ হলেই তাকে তিনি দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেবেন। মনটা খারাপ হয়ে গেলো তার। ঐ বখাটেগুলোই বা কারা আর এই লোকগুলোই বা কারা, টেনশন শুরু হয়েছে তার মধ্যে। নতুন কোন ঝামেলায় পড়ে যাচ্ছে না তো মেয়েটা? 

মানুষের জীবন নদীর মতো। কখনো সে নদীতে বিশাল বিশাল ঢেউ আসে, সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আবার সময়ের ফেরে সে নদী একসময় ঢেউহীন শান্ত স্থির হয়ে যায়। জীবনের এক পর্যায়ে সুরাইয়া বেগম বাস্তবিক অর্থেই বড় বড় ঢেউ এর কবলে পড়েছেন। সেই ঢেউ তার জীবনের অনেক কিছুই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। রিমিকে পেটে নিয়েই বাবার বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। স্বামীবিহীন জীবনে একমাত্র কন্যা সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে তাকে পদে পদে প্রচুর  ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। তবে নিজের বাবার বেঁচে থাকায় অনেক ঝামেলা হলেও তিনি অন্তত সন্তানকে নিয়ে নির্ভার থেকেছেন।  রিমি কখনো তার বাবাকে দেখেনি। বাবার মৃত্যুর ঘটনা সে তার মায়ের কাছে, নানার কাছে অনেকবার শুনেছে। বাবা এবং বাবার স্নেহ; এ দুটো বিষয় নিয়ে তার কোন কৌতূহল ছিলোনা এবং সেটা যে জীবনে একটা অবিচ্ছেদ্য ব্যাপার, সে ব্যাপারটাই সে জানে না। সুরাইয়া বেগমের বাবা কম চেষ্টা করেন নি মেয়েকে আবার বিয়ে দেয়ার জন্য। ভালো ভালো কয়েকটা সম্বন্ধ এনেছিলেন তিনি। কিন্তু সুরাইয়া বেগম ততদিনে জীবনের তিক্ত রূপ দেখে ফেলেছিলেন। এর পাশাপাশি আবার বিয়ে করলে রিমির ভবিষ্যৎ কি হবে, সে ভাবনা হতেই তিনি আর বিয়ে করেননি। সিদ্ধেশ্বরির এ বাসাটা পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। বাবার অপত্য স্নেহের জোরেই তিনি রিমিকে আজ এত বড় করেছেন। রিমিকে ডাক্তার বানানোর কোন ভাবনাই ছিলো না তার। তবে রিমির নানার খুব ইচ্ছা ছিলো রিমি যেন ডাক্তারি পড়ে। এত বছর তো সব ঠিক ছিলো। আজ এরকম একটা ঘটনার কথা শোনার পর মনের ভেতর একটা অচেনা কু ডাক শুনতে পাচ্ছেন তিনি। পরবর্তী কয়েকদিন রিমিকে হাসপাতালে যেতে দেবেন না বলে ঠিক করলেন এই মাত্র সুরাইয়া বেগম। 
পরদিন সকালে ঘুম হতে উঠেই দেখলেন রিমি রেডি হচ্ছে। সুরাইয়া বেগমের তখনি মনে হলো, রিমিকে তো বলাই হয়নি এ কদিন হাসপাতালে না যাবার জন্য। রিমিকে ডেকে বললেন, 
-আজ হাসপাতালে না গেলে হয়না? 
-কি বলো মা, হাসপাতালে যাবনা কেন? রিমি অবাক হয়ে বলল।  
-এই যে কত বড় ঘটনা ঘটে গেল গতকালেই, সে জন্যে বললাম। যাসনে মা।  
-তুমি কিছু ভেবোনা, মা। আমার কিচ্ছু হবে না। বলেই বেরিয়ে পড়ল রিমি। 
মেয়ে বড় হতে হতে আজকাল মাঝে মাঝেই কথা শোনে না, ভাবলেন সুরাইয়া বেগম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। 

হাসপাতাল গেটে গাড়ি হতে নেমেই রিমি সতর্ক চোখে চারদিকে তাকাল একবার। নাহ, গতকালের বখাটেগুলোর দেখা নেই। অবশ্য যে পরিমাণ ক্ষুরের পোঁচ খেয়েছে, ওরা আগামী দশ বার দিনের মধ্যে ওরা বিছানা ছাড়তে পারবে না। একটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচার অনুভূতি এলো তার ভেতর। সেটা ভেবেই তার মনে হলো, সে কি আসলে ভেতরে ভেতরে ওদের দিক হতে কিছু আশংকা করছিল? হয়ত করেছিল, ভেবেই পা বাড়ালো সামনের বিল্ডিং এর দিকে। কয়েক কদম এগোতেই তার মনে হলো, কেউ একজন ঠিক তার পেছনে পেছনে হাঁটছে। মনের ভেতর একটা ভীষণ আতংকের ঢেউ এসে বাড়ি খেলো তার। ভয়ে ভয়ে পিছনে ফিরে তাকাতেই তার পেছনে পেছনে আসা মানুষটার চোখে চোখ পড়ল। হাসিমুখের এক তরুণ। রিমি  যেন লজ্জা পেয়ে গেলো। শুধু শুধু ভয় পেয়েছিল সে, নির্ভার মনে যুবকটার হাসির জবাবে একটা হাসি দিয়ে সামনে ঘুরে হাসপাতাল বিল্ডিং এ ঢুকে গেলো রিমি। 
দিনভর রিমির মাথায় গতকালের ঘটনাটার কিছুই ছিলো না। বরং রোগী নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে সময় কেটে গেছে। তবে অন্যদিনগুলোর চেয়ে আজ মা বেশি সংখ্যকবার ফোন করেছিলো। মা’কে বোঝানোর জন্য একবার ভিডিও কল দিয়েও কথা বলেছে রিমি। সারাদিনে সত্যি সত্যি কোন সমস্যাও ছিল না। বিকেলে হাসপাতাল হতে বেরোবার সময় রিমির কোন কারণ ছাড়াই মনের মধ্যে খটকা লাগলো। তার মনে হলো, সে কোন নতুন সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে। হাসপাতালের গেটে সকালের সেই যুবক একটা মটর সাইকেলে বসে আছে। তাকে দেখেই একটা মুচকি হাসি দিলো। এবারে রিমি সেই হাসির কোন সাড়া দিলো না। বরং ছেলেটার হাসি তার ভেতরে আতংক ছড়িয়ে দিয়েছে। খুব সতর্ক ভঙ্গীতে গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি বাসার দিকে রওনা হবার পড় পেছন ফিরে দেখল যা ভেবেছিল, ঠিক তাই হচ্ছে। সে যুবক মটর সাইকেলে তার পেছনে পেছনে আসছে। রিমির মনে হলো, সকালে মা যে বলেছিল আজ না আসার জন্যে, না আসলেই ভালো হতো। মায়ের কথা শোনা উচিত ছিলো। ড্রাইভারকে বাসার দিকে যেতে বারণ করে অন্য দিকে গাড়ি ঘুরাতে বলল। পাশাপাশি এও বলল, যেন পেছনে ফলো করা মটর সাইকেলওয়ালাকে ফাঁকি দিয়ে বাসায় যেন চলে যায়। বাসার পুরাতন ড্রাইভার, সাত্তার এটুকুতেই যা বুঝার বুঝে ফেলেছে। সে তার মতো গাড়ি ঘুরিয়ে দিলো অন্য দিকে। 
ঢাকা শহরে মটর সাইকেলকে ফাঁকি দেয়া প্রায় অসম্ভব। তারপরেও সাত্তার যেভাবে যেভাবে পারে, সম্ভাব্য সকল সাইড রোড, মেইন রোড দিয়ে প্রায় ঘন্টাখানেক এদিক ওদিক চালানোর পর  একসময় রিমি নিশ্চিত হতে পারলো, পেছনে আর ঐ মটর সাইকেলওয়ালা আর নেই। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল যেন। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে এদিকে। মা দুবার ফোন করেছিলো। এক বান্ধবীর বাসার অজুহাত বলেছে মাকে। বাসার সামনে এসে গাড়ি হতে নাম্বার সময় রিমির জন্য দিনের সর্বশেষ চমকটা অপেক্ষা করছিলো। বাসার উল্টোদিকে রাস্তার ওপাশে ঐ যুবক মটর সাইকেলে বসে বসে বাদাম খাচ্ছে। তাকে দেখেই বুকটা ধ্বক করে উঠলো রিমির। এর মানে এরা অলরেডি তার বাসা চেনে!
(চলবে)

এ গল্পটি আমার ছায়া গল্পগ্রন্থে (২০২১) প্রকাশিত হয়েছিল।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login