Article

কথার ভেতর কথা ১১

September 27, 2026

20 views

এস্তেজা:
ইভান, একটা বিষয় নিয়ে আমি খুব চিন্তিত।বাংলা আর ইংরেজির পাশাপাশি এখন তৃতীয় ভাষা শেখানোর কথা বলা হচ্ছে। শুনতে আধুনিক মনে হয়, কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই তার জন্য প্রস্তুত?

ইভান:
প্রশ্নটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো শিক্ষানীতি মূল্যায়ন করতে হলে আগে দেখতে হয়, বর্তমান ভিত্তিটা কতটা শক্ত।আমি সবসময় একটা বিষয় বলি— নতুন তলা তোলার আগে ভিত্তি মজবুত করতে হয়।

এস্তেজা:
আমাদের ভিত্তির সমস্যা কোথায়?

ইভান:
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দক্ষতা আর পাঠ্যসূচির মধ্যে ব্যবধান। একজন শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ইংরেজি পড়ে। ব্যাকরণ পড়ে। গদ্য পড়ে। পদ্য পড়ে। পরীক্ষা দেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, অনেকেই ইংরেজিতে একটি আবেদনপত্র বা একটি অনুচ্ছেদ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লিখতে পারে না। কথা বলা তো আরও কঠিন।

এস্তেজা:
তাহলে কি সমস্যাটা ভাষার না, শিক্ষাদানের?

ইভান:
অনেকাংশে তাই। ভাষা শেখার মূল বিষয় হলো ব্যবহার। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ভাষাকে যোগাযোগের মাধ্যম না বানিয়ে পরীক্ষার বিষয় বানিয়ে ফেলেছে।ফলে শিক্ষার্থী নম্বর পায়, কিন্তু দক্ষতা অর্জন করে না।

এস্তেজা:
তাহলে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করলে কী সমস্যা হতে পারে?

ইভান:
সমস্যা হতে পারে কয়েকটি জায়গায়।
প্রথমত, শিক্ষক সংকট। একটি ভাষা শেখাতে হলে শুধু বই থাকলেই হয় না। দক্ষ শিক্ষক লাগে।
উচ্চারণ শেখানোর মানুষ লাগে।
অনুশীলনের পরিবেশ লাগে।
প্রশ্ন হলো— দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ে কি সেই পরিমাণ প্রশিক্ষিত শিক্ষক আছে?

এস্তেজা:
আমার তো মনে হয় অনেক স্কুলে এখনও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকেরই ঘাটতি আছে।

ইভান:
ঠিক তাই। অনেক জায়গায় বিজ্ঞান শিক্ষক কম। গণিত শিক্ষক কম। ইংরেজি শিক্ষক কম। প্রযুক্তি শিক্ষার শিক্ষকও পর্যাপ্ত নয়।সেখানে নতুন করে সবার জন্য তৃতীয় ভাষা চালু করতে গেলে বিশাল মানবসম্পদ দরকার হবে।

এস্তেজা:
কিন্তু অনেকে বলবে, পৃথিবী তো বহুভাষিক হচ্ছে। তৃতীয় ভাষা জানা খারাপ কী?

ইভান:
ভাষা জানা অবশ্যই ভালো। যত বেশি ভাষা জানা যায়, তত বেশি সংস্কৃতি, জ্ঞান আর কর্মক্ষেত্রের দরজা খোলে।
সমস্যা ভাষা শেখায় না। সমস্যা বাধ্যতামূলক করার আগে বাস্তবতা বিবেচনায়। ধরো, একজন শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজিতেই দক্ষ হতে পারছে না। তারপর তাকে আরেকটি ভাষা শেখানো হলো। তাহলে সে কি তিনটি ভাষাতেই দুর্বল হয়ে যাবে না?

এস্তেজা:
মানে গভীরতা না বাড়িয়ে বিস্তার বাড়ালে লাভ নাও হতে পারে?

ইভান:
একদম। অনেক সময় আমরা পাঠ্যক্রমে নতুন নতুন বিষয় যোগ করি।
কিন্তু প্রশ্ন করি না—
শিক্ষার্থীরা কি আসলেই শিখছে?
নাকি শুধু বইয়ের ওজন বাড়ছে?

এস্তেজা:
কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রেও কি একই কথা?

ইভান:
কারিগরি শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে দক্ষ কারিগরি কর্মী দরকার।
প্রকৌশলী দরকার।
প্রযুক্তিবিদ দরকার।
গবেষক দরকার।
ডাক্তার দরকার।
বিজ্ঞানী দরকার।
সবাইকে একই ছাঁচে ফেলা যায় না। সমস্যা তখনই হয়, যখন কারিগরি শিক্ষাকে এমনভাবে প্রয়োগ করা হয় যে মৌলিক শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এস্তেজা:
তোমার মতে সবচেয়ে জরুরি কী?

ইভান:
আমি যদি অগ্রাধিকার ঠিক করি, তাহলে প্রথমে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতাম।
প্রথমত, বাংলা ভাষায় দক্ষতা। যে নিজের ভাষায় পরিষ্কারভাবে লিখতে পারে না, সে অন্য ভাষাতেও সীমাবদ্ধ থাকবে।
দ্বিতীয়ত, কার্যকর ইংরেজি শিক্ষা। শুধু ব্যাকরণ নয়, যোগাযোগ দক্ষতা।
তৃতীয়ত, গণিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাশক্তি।
চতুর্থত, দক্ষ শিক্ষক তৈরি।
কারণ ভালো শিক্ষক ছাড়া কোনো সংস্কারই সফল হয় না।

এস্তেজা:
তাহলে তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ থাকা উচিত কিন্তু সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা উচিত কি না, সেটা নিয়ে আলোচনা দরকার?

ইভান:
হ্যাঁ। কেউ যদি চীনা, আরবি, ফরাসি, জার্মান, জাপানি বা অন্য কোনো ভাষা শিখতে চায়, তার সুযোগ অবশ্যই থাকা উচিত। কিন্তু সুযোগ আর বাধ্যবাধকতা এক জিনিস নয়।
শিক্ষানীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—
“আমরা কী পড়াচ্ছি?”
তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—
“শিক্ষার্থীরা আসলে কী শিখছে?”

এস্তেজা:
তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আমাদের অনেক সময় নীতির চেয়ে বাস্তবায়নের দিকে বেশি নজর দেওয়া দরকার।

ইভান:
সেটাই। কারণ একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার শক্তি নতুন বিষয় যোগ করার মধ্যে নয়। বরং শিক্ষার্থীকে সত্যিকার অর্থে দক্ষ করে তোলার মধ্যে। যেদিন বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী দ্বাদশ শ্রেণী শেষ করে শুদ্ধ বাংলায় ভাবতে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে, যুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে এবং নিজের পছন্দের বিষয়ে গভীর দক্ষতা অর্জন করতে পারবে— সেদিন তৃতীয় ভাষা তার জন্য অতিরিক্ত শক্তি হবে।কিন্তু যদি ভিত্তিই দুর্বল থাকে, তাহলে নতুন ভাষা, নতুন বিষয়, নতুন প্রকল্প—সবকিছুই শিক্ষার্থীর কাঁধে আরেকটি বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে। আর শিক্ষা তখন জ্ঞান অর্জনের পথ না হয়ে, শুধু বিষয় আর পরীক্ষার ভারে নুয়ে পড়া এক দীর্ঘ যাত্রায় পরিণত হবে।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+35 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login