Article

কথার ভেতর কথা ১৩

September 28, 2026

12 views

ইভান: এস্তেজা, একটা বিষয় আমাকে অনেক দিন ধরেই ভাবায়। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক নিয়োগ পাওয়ার পর তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্নটা কী হওয়া উচিত?

এস্তেজা: ভালো শিক্ষক হওয়া। ভালো গবেষক হওয়া। নিজের বিষয়ে নতুন জ্ঞান তৈরি করা। শিক্ষার্থীদের এমন কিছু দেওয়া, যা তারা বই পড়ে একা পাবে না।

ইভান: কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় অন্যরকম। শিক্ষকতা শুরু করার পরই যেন আরেকটা দৌঁড় শুরু হয়—হল বা আবাসিক দায়িত্ব, প্রশাসনিক পদ, ডিন, প্রভোস্ট, বিভিন্ন কমিটি... তারপর উপাচার্য হওয়ার স্বপ্ন।

এস্তেজা: সমস্যা প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ায় নয়। বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে প্রশাসনিক দায়িত্ব অবশ্যই প্রয়োজন। সমস্যা তখনই, যখন প্রশাসনিক পদটাই একজন শিক্ষকের পেশাগত সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।

ইভান: ঠিক। একজন শিক্ষককে আমরা কেন মূল্যায়ন করব না তাঁর গবেষণা, প্রকাশনা, পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব, নতুন জ্ঞান সৃষ্টির ক্ষমতা দিয়ে?

এস্তেজা: সেটাই তো মূল প্রশ্ন। একজন পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক যদি অসাধারণ গবেষক হন, তাঁর সাফল্যের জন্য কি তাঁকে অবশ্যই কোনো প্রশাসনিক পদে যেতে হবে?

ইভান: বরং উল্টোটা হওয়া উচিত। তিনি যত ভালো গবেষক হবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তাঁর মর্যাদা তত বাড়বে।

এস্তেজা: আর একজন প্রশাসক ভালো প্রশাসক হলেই তিনি ভালো গবেষক হয়ে যান না। আবার একজন অসাধারণ গবেষকও যে দক্ষ প্রশাসক হবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।

ইভান: এখানেই আমাদের ব্যবস্থার একটা মৌলিক দুর্বলতা আছে বলে আমার মনে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ক্ষমতা আর একাডেমিক কর্তৃত্বকে আমরা অনেক সময় একই জায়গায় এনে ফেলি।

এস্তেজা: বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধরো, একজন উপাচার্য ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধান। তাহলে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান কিংবা প্রকৌশলের মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগে তাঁর ভূমিকা কতটুকু হওয়া উচিত?

ইভান: আমার প্রশ্নও সেটাই। তিনি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটা তদারক করতে পারেন কিন্তু একজন বিষয়ের বিশেষজ্ঞের একাডেমিক মূল্যায়নের জায়গায় তাঁর ব্যক্তিগত মত কতটা প্রভাব ফেলবে—এটা পরিষ্কারভাবে সীমাবদ্ধ করা দরকার।

এস্তেজা: কারণ শিক্ষক নিয়োগ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক নিয়োগ নয়। একজন শিক্ষক নিয়োগ মানে আগামী বিশ-পঁচিশ বছরের জন্য একটি বিভাগের একাডেমিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা।

ইভান: এবং সেখানেই সবচেয়ে বেশি দরকার স্বচ্ছতা ও বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন।

এস্তেজা: শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, পদোন্নতির ক্ষেত্রেও একই কথা। একজন শিক্ষকের পদোন্নতি যদি গবেষণার মান, প্রকাশনার গুণমান, পাঠদানের দক্ষতা, গবেষণা প্রকল্প, শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধান—এসবের বদলে প্রশাসনিক সম্পর্ক বা ক্ষমতার সমীকরণের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে, তাহলে শিক্ষকতা ধীরে ধীরে একাডেমিক পেশা না থেকে ক্ষমতার পেশায় পরিণত হয়।

ইভান: তখন একজন শিক্ষক ভাবেন—আমি কতটা ভালো গবেষণা করছি, সেটা নয়; বরং ভাবেন, কার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো, কোন কমিটিতে আমি আছি, কোন প্রশাসনিক পদে যেতে পারি।

এস্তেজা: আর সেখান থেকেই শিক্ষক রাজনীতির একটা বড় অংশের জন্ম হতে পারে।

ইভান: তাহলে কি প্রশাসনিক পদ তুলে দিতে হবে?

এস্তেজা: না। এটা কোনোভাবেই বলছি না। বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন লাগবেই। উপাচার্যও লাগবেন। ডিন, প্রভোস্ট, বিভাগীয় চেয়ারম্যান—সবই লাগবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্ষমতার কাঠামোটা কেমন হবে?

ইভান: অর্থাৎ একজনের হাতে যত বেশি ক্ষমতা, তত বেশি তাঁকে ঘিরে প্রতিযোগিতা।

এস্তেজা: ঠিক। তুমি যদি একটা পদকে এমন ক্ষমতাবান করে দাও যে সেই পদ থেকে নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসন, অর্থ, কমিটি—সবকিছুর ওপর বড় প্রভাব বিস্তার করা যায়, তাহলে সেই পদকে ঘিরে প্রতিযোগিতা তৈরি হবেই।

ইভান: আর সেই প্রতিযোগিতা যদি একাডেমিক যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত আনুগত্যের দিকে চলে যায়?

এস্তেজা: তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইভান: একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কি এতটা ক্ষমতাবান হওয়া উচিত যে তাঁকে ঘিরে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি আবর্তিত হবে?

এস্তেজা: আমার মনে হয় এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করতে হবে। উপাচার্য অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী ও একাডেমিক নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কিন্তু তিনি যেন একই সঙ্গে নিয়োগদাতা, পদোন্নতির চূড়ান্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি, আর্থিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্র এবং সব একাডেমিক বিষয়ের শেষ কথা হয়ে না যান—সেটা নিশ্চিত করা জরুরি।

ইভান: অর্থাৎ ক্ষমতার ভারসাম্য।

এস্তেজা: হ্যাঁ। ক্ষমতা ভাগ করতে হবে। একাডেমিক সিদ্ধান্তে একাডেমিক কাউন্সিল ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা শক্তিশালী করতে হবে। নিয়োগে স্বাধীন ও স্বচ্ছ বিশেষজ্ঞ প্যানেল থাকতে পারে। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে আলাদা জবাবদিহি থাকতে হবে। আর উপাচার্যের সিদ্ধান্তের ওপর কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা থাকতে হবে।

ইভান: তাহলে একজন উপাচার্য হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিষয়ে একক সিদ্ধান্তদাতা নন।

এস্তেজা: এটাই স্বাস্থ্যকর কাঠামোর দিকে যাওয়ার একটি পথ।

ইভান: আরেকটা বিষয়—আমাদের দেশে উপাচার্যকে ঘিরে যে প্রচার, সেটাও অদ্ভুত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধানের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড কেন এত বেশি সংবাদে আসে?

এস্তেজা: এখানে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। কোনো উপাচার্যের কর্মকাণ্ড সংবাদে আসা নিজে খারাপ কিছু নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় সিদ্ধান্ত, অনিয়ম, সংকট, গবেষণা অর্জন বা নীতিগত পরিবর্তন হলে সংবাদ হওয়াটাই স্বাভাবিক।

ইভান: কিন্তু যদি উপাচার্য নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত হন?

এস্তেজা: তখন সমস্যা হতে পারে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চা—একজন ব্যক্তির প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব নয়।

ইভান: তুমি কি মনে করো বিদেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যরা একেবারেই দৃশ্যমান নন?

এস্তেজা: তা নয়। এখানেও একটু বাস্তবতা দরকার। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড, এমআইটির মতো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যায় না। তাদের শাসনব্যবস্থা, অর্থায়ন, ঐতিহাসিক কাঠামো, বোর্ড ও একাডেমিক স্বাধীনতা আলাদা।

ইভান: কিন্তু মূল নীতিটা কি একই নয়?

এস্তেজা: অবশ্যই—প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা যেন একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ক্ষমতায় পরিণত না হয়।

ইভান: এই জায়গাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এস্তেজা: আরেকটা বিষয়ও আছে—উপাচার্যের বাসভবন বা সুযোগ-সুবিধা। রাষ্ট্র যদি কোনো পদে প্রয়োজনীয় সরকারি বাসভবন দেয়, সেটা প্রশাসনিক সুবিধা হিসেবে বোঝা যায়। কিন্তু সেটাকে যদি মর্যাদা প্রদর্শনের প্রতীক বানানো হয়, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে।

ইভান: বিশেষ করে দরিদ্র দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এস্তেজা: হ্যাঁ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের প্রতিটি টাকা নিয়ে ভাবতে হবে—এটা কি গবেষণাগারে যাচ্ছে? শিক্ষার্থীদের জন্য যাচ্ছে? গ্রন্থাগারে যাচ্ছে? শিক্ষক উন্নয়নে যাচ্ছে? নাকি অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল ও সুবিধায় যাচ্ছে?

ইভান: কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল সম্পদ তো ভবন বা গাড়ি নয়—মানুষ।

এস্তেজা: শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, জ্ঞানভাণ্ডার—এসবই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ।

ইভান: তাহলে শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় পুরস্কার কী হওয়া উচিত?

এস্তেজা: একজন শিক্ষক যেন বলতে পারেন—“আমি আমার বিষয়ে এমন কিছু করেছি, যা আমার আগে কেউ করেনি।” একজন শিক্ষার্থী যেন বিশ বছর পরও বলেন—“এই শিক্ষক আমার চিন্তার জগৎ বদলে দিয়েছিলেন।”

ইভান: আর আমাদের শিক্ষক যেন বলেন—“আমি উপাচার্য হতে পারিনি”—এটা ব্যর্থতা নয়।

এস্তেজা: বরং তিনি বলতে পারেন—“আমি কোনো প্রশাসনিক পদে যাইনি কিন্তু ত্রিশ বছর ধরে ভালো শিক্ষকতা করেছি, গবেষণা করেছি, একশো গবেষক তৈরি করেছি।”

ইভান: সেটাই তো প্রকৃত গৌরব।

এস্তেজা: আর একজন উপাচার্যও যদি বলেন—“আমার সাফল্য হলো আমার মেয়াদ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়টি আমার চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে”—তাহলে সেটাই হবে নেতৃত্বের সাফল্য।

ইভান: অর্থাৎ ভালো উপাচার্যের পরিচয় তাঁর কত ক্ষমতা ছিল, সেটা নয়; বরং তাঁর পরে প্রতিষ্ঠান কতটা শক্তিশালী হয়ে গেছে, সেটা।

এস্তেজা: একদম।

ইভান: তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কারের প্রথম প্রশ্নটা হয়তো হওয়া উচিত—“কে উপাচার্য হবেন?” নয়।

এস্তেজা: বরং—“কীভাবে এমন ব্যবস্থা তৈরি করব, যেখানে উপাচার্য হওয়া কোনো শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে হবে না?”

ইভান: আর দ্বিতীয় প্রশ্ন?

এস্তেজা: “কীভাবে একজন শিক্ষককে প্রশাসনিক ক্ষমতার জন্য নয়, জ্ঞান সৃষ্টির জন্য প্রতিযোগিতা করতে উৎসাহিত করব?”

ইভান: কারণ যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে ব্যস্ত থাকেন, সেখানে একসময় শ্রেণিকক্ষ নিচে নেমে যায়।

এস্তেজা: আর যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা জ্ঞান, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিযোগিতা করেন, সেখানে প্রতিষ্ঠানটাই ওপরে ওঠে।

ইভান: শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় পদ উপাচার্যের পদ নয়।

এস্তেজা: তাহলে?

ইভান: জ্ঞান সৃষ্টি করার ক্ষমতা।

এস্তেজা: আর সেই ক্ষমতার কোনো সরকারি বাংলো লাগে না, কোনো প্রটোকল লাগে না, কোনো পদমর্যাদার ফলকও লাগে না। তার প্রয়োজন শুধু—স্বাধীন চিন্তা, সৎ গবেষণা আর একজন শিক্ষকের আজীবন শেখার ইচ্ছা।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login