কাঁচের ঘর যখন ভাঙে
রাশেদের প্রমোশন উপলক্ষে ফ্ল্যাটটা আজ লোকে লোকারণ্য। মৃদুস্বরে বাজতে থাকা গান, অতিথিদের হাসির শব্দ আর খাবারের সুগন্ধে চারপাশ ম ম করছে। রাশেদ আর শাইলা দক্ষ হোস্টের মতো সবাইকে আপ্যায়ন করছে। তাদের মুখে উজ্জ্বল হাসি, চোখে তৃপ্তির আবেশ। দেখে মনে হচ্ছে, তাদের সুখী জীবনের ক্যানভাসে আজ আরও একটি সাফল্যের রঙ যোগ হলো।
এই উৎসবের আবহেও রিয়া ছিল কিছুটা গুটিয়ে থাকা। সে মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল, বাইরের কোলাহল থেকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টায় রত। সগির যখন পার্টিতে ঢুকল, তার সেই স্বভাবসুলভ উচ্চকিত হাসি আর সবার সাথে আলাপচারিতায় মুহূর্তেই সে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল। রিয়ার ছোট্ট মুখটা সগিরের আগমনে আরও বেশি ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সগির রিয়ার কাছে এসে তার মাথায় হাত রেখে বলল, "কী ব্যাপার মামণি, একা একা দাঁড়িয়ে আছো কেন? চলো, তোমার জন্য একটা স্পেশাল গিফট এনেছি, তোমার ঘরে রেখে এসেছি।"
শাইলা তখন অন্য একজন অতিথির সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। সে পাশ থেকে বলল, "যাও না সোনা, মামার সাথে যাও। মা তো একটু বিজি।" এই সাধারণ, নিরীহ কথাটাই যে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হতে চলেছে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি।
রিয়া যেতে না চাইলেও, মায়ের কথায় আর সগিরের মৃদু পীড়াপীড়িতে এক প্রকার বাধ্য হয়েই তার হাত ধরে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। শাইলার চোখ মেয়ের অনিচ্ছুক গমনপথের দিকে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হলো, বুকের ভেতরটা খচ করে উঠল কিন্তু অতিথিদের ভিড়ে সেই অনুভূতিটা হারিয়ে গেল।
প্রায় মিনিট পনেরো পর, একজন অতিথির বাচ্চা কান্নাকাটি শুরু করায় শাইলা তাকে শান্ত করার জন্য রিয়ার ঘরের দিকে এগোল। ভেবেছিল, ঘরটা খালিই আছে, ওখানে বাচ্চাটাকে একটু শোয়াতে পারবে। ঘরের দরজাটা অল্প ভেজানো ছিল। কোনো শব্দ আসছিল না। শাইলা দরজাটা আলতো করে ঠেলতেই ভেতরের দৃশ্যটা তার চোখে পড়ল।
আর সেই এক মুহূর্তেই সময় যেন থেমে গেল।
ঘরের ভেতর মিউজিকের শব্দ নেই, অতিথিদের কোলাহল নেই। আছে শুধু এক জমাট বাঁধা, ভয়ঙ্কর নীরবতা। শাইলা দেখল, সগির বিছানার উপর বসে আছে আর তার সামনে রিয়া দাঁড়িয়ে। রিয়ার ফ্রকটা কোমর থেকে উপরে তোলা এবং সগির তার ছোট্ট শরীরের উপর ঝুঁকে আছে। তার কণ্ঠস্বর সাপের মতো হিসহিসে, "এই তো... এটাই তো আমাদের সিক্রেট গেম... কাউকে বলতে নেই..."
শাইলার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। তার চোখের সামনে পৃথিবীটা ঘুরতে শুরু করল। তার সাজানো-গোছানো, নিখুঁত জীবনের ক্যানভাসটা যেন কেউ এক ঝটকায় এসিড ঢেলে পুড়িয়ে দিল। যে দৃশ্য সে দেখছে, তা তার মস্তিষ্ক মেনে নিতে পারছিল না।
তার এতদিনের বিশ্বাস, এতদিনের বন্ধুত্ব, তার আধুনিকতার ধারণা— সবকিছু এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কাঁচের ঘরটা শুধু ভাঙল না, তার হাজার হাজার ধারালো টুকরো এসে শাইলার হৃৎপিণ্ডে বিঁধল।
একটা তীব্র, জান্তব চিৎকার তার গলা চিরে বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু পারল না। তার জায়গায় বেরিয়ে এলো একটা অস্ফুট গোঙানির মতো শব্দ।
শব্দ শুনে সগির চমকে তাকাল। শাইলাকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি করে রিয়ার জামা ঠিক করে দিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, "ভাবি! তুমি... তুমি ভুল বুঝছ! আমরা তো... আমরা তো খেলছিলাম!"
কিন্তু সেই মুহূর্তে শাইলার কানে কোনো কথাই ঢুকছিল না। তার চোখের সামনে পর পর ভেসে উঠছিল অতীতের একেকটা দৃশ্য। সগিরের সেই বিষাক্ত রসিকতা, "রিয়া আমার বউ হবে", আর তাতে রাশেদের অট্টহাসি। রিয়ার সগিরকে দেখে গুটিয়ে যাওয়া, তার কোলে বসতে অস্বীকার করা। 'ডাক্তার-ডাক্তার' খেলার পর রিয়ার মুখে শোনা 'সিক্রেট গেম' আর সগিরের নাম।
প্রত্যেকটা স্মৃতি, প্রত্যেকটা এড়িয়ে যাওয়া বিপদ সংকেত আজ তার গালে সপাটে চড় মারছিল। "ও তো বাচ্চা, কী বোঝে?", "আরে ও তো বন্ধুর মতোই"—এই ভাবনাগুলো যে কত বড় আত্মঘাতী ভুল ছিল, তা সে আজ অনুশোচনার আগুনে পুড়তে পুড়তে বুঝতে পারল।
শাইলা ছুটে গিয়ে রিয়াকে নিজের বুকের মধ্যে জাপটে ধরল। তার ছোট্ট শরীরটা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই পার্টির কোলাহল ভেদ করে সেখানে এসে পৌঁছাল রাশেদ। শাইলার অদ্ভুত নীরবতা বা অনুপস্থিতিই তাকে এখানে টেনে এনেছিল।ঘরের ভেতরের পরিবেশ আর স্ত্রীর পাথর হয়ে যাওয়া মুখ দেখে তার বুঝতে বাকি রইল না যে, এমন কিছু একটা ঘটেছে যা তাদের জীবনকে চিরদিনের জন্য বদলে দেবে।সগিরের ফ্যাকাসে মুখ আর মেয়ের আতঙ্কিত চোখের দিকে তাকিয়ে সে যখন জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে এখানে?", তখন তার কণ্ঠস্বর ছিল আসন্ন ঝড়ের আগের শান্ত আকাশের মতোই শীতল, আর ভয়ঙ্কর।
(চলবে)