Article

কথার ভেতর কথা ১২

September 28, 2026

13 views

একটা দেশের ভবিষ্যৎ সংসদ ভবনে যতটা তৈরি হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি তৈরি হয় একটা ছোট্ট শ্রেণিকক্ষে।

ইভান: সংসদে যারা বসবে, তারাও কোনো একদিন ওই শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে বসেছিল।

এস্তেজা: ঠিক। তাই স্কুলকে আমরা শুধু পড়াশোনার জায়গা ভাবলে ভুল করব। স্কুল আসলে মানুষের জীবনের প্রথম বড় উৎক্ষেপণ মঞ্চ।

ইভান: উৎক্ষেপণ মঞ্চ?

এস্তেজা: হ্যাঁ। একটা রকেটকে মহাকাশে পাঠাতে হলে যেমন শক্তিশালী, নিরাপদ ও পরিকল্পিত উৎক্ষেপণ মঞ্চ দরকার হয়, তেমনি একটা শিশুকে তার সম্ভাবনার সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে দিতে দরকার শক্তিশালী পরিবার, দক্ষ শিক্ষক এবং সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা।

ইভান: কিন্তু আমাদের সমস্যা হলো, আমরা উৎক্ষেপণ মঞ্চ বানানোর বদলে অনেক সময় শিশুর সামনে হোঁচটের পাথর রেখে দিই।

এস্তেজা: আর সেই পাথরের নাম শুধু দুর্বল পাঠ্যক্রম নয়। এর মধ্যে আছে ভয়, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, পরীক্ষার চাপ, শিক্ষকের মর্যাদাহীনতা, অবকাঠামোর সংকট এবং অভিভাবকের অস্বাস্থ্যকর প্রত্যাশা।

ইভান: আমরা শিশুকে জিজ্ঞেস করি—কত নম্বর পেয়েছ?

এস্তেজা: খুব কমই জিজ্ঞেস করি—কী শিখলে?

ইভান: আরও কম জিজ্ঞেস করি—কী ভাবছ?

এস্তেজা: আর প্রায় ভুলেই যাই—তুমি বড় হয়ে কেমন মানুষ হতে চাও?

ইভান: অথচ বিদ্যালয়ের প্রথম কাজ তো মানুষ তৈরি করা।

এস্তেজা: শুধু পরীক্ষায় প্রথম হওয়া মানুষ নয়। প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারে, অন্যকে সম্মান করতে পারে, ব্যর্থ হলে আবার দাঁড়াতে পারে—এমন মানুষ।

ইভান: তাহলে বিদ্যালয়ের শিক্ষা আসলে তিনটি জিনিস তৈরি করবে—জ্ঞান, চরিত্র আর সক্ষমতা।

এস্তেজা: এর সঙ্গে আমি আরেকটি যোগ করব—কৌতূহল।

ইভান: কেন?

এস্তেজা: কারণ যে শিশু প্রশ্ন করতে শেখে না, সে একদিন উত্তর মুখস্থ করতে পারে; কিন্তু নতুন উত্তর তৈরি করতে পারে না।

ইভান: আর যে শিশু ভুল করতে ভয় পায়?

এস্তেজা: সে নতুন কিছু করার সাহসও হারিয়ে ফেলে।

ইভান: এখানেই শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এস্তেজা: শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়াবেন না। তিনি শিশুর আত্মবিশ্বাস তৈরি করবেন। একটি দুর্বল ছাত্রকে বলবেন, “তুমি পারবে।” একটি অতিরিক্ত কৌতূহলী শিশুকে বলবেন, “প্রশ্ন করো।” আর যে শিশু ভুল করেছে তাকে বলবেন, “ভুল হয়েছে, আবার চেষ্টা করো।”

ইভান: কিন্তু আমরা শিক্ষকের মর্যাদা কোথায় রেখেছি?

এস্তেজা: সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যে পেশার হাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, সেই পেশাকে যদি এমনভাবে পরিচালনা করা হয় যে মেধাবী তরুণেরা সেখানে যেতে অনাগ্রহী হয়, তাহলে সমস্যাটা শুধু শিক্ষকের নয়—রাষ্ট্রের।

ইভান: কারণ শিক্ষকতার মান নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের মান।

এস্তেজা: ঠিক। একজন অসাধারণ শিক্ষক হয়তো এক বছরে কয়েকশ শিশুকে পড়াবেন। কিন্তু তাঁর প্রভাব তাদের জীবনে কয়েক দশক থাকবে।

ইভান: তাহলে শিক্ষককে শুধু চাকরিজীবী হিসেবে দেখলে চলবে না।

এস্তেজা: কখনোই না। শিক্ষক একজন জাতি নির্মাতা।

ইভান: অথচ আমাদের অনেক শিক্ষককে কাগজপত্র, পরিদর্শন, প্রশাসনিক চাপ আর নানা অপ্রয়োজনীয় কাজে এমনভাবে ব্যস্ত রাখা হয় যে শ্রেণিকক্ষই কখনো কখনো তাদের কাছে দ্বিতীয় হয়ে যায়।

এস্তেজা: এটাই বিপজ্জনক। একজন শিক্ষকের হাতে যদি চক থাকে, তাহলে তার সময় শিশুর জন্য থাকা উচিত। ফাইলের বোঝা, অযথা প্রশাসনিক ভয় আর অপমান দিয়ে একজন শিক্ষককে ক্লান্ত করে দিলে তার সৃজনশীলতা কমবে।

ইভান: আর ভীত শিক্ষক কখনো আত্মবিশ্বাসী ছাত্র তৈরি করতে পারবেন না।

এস্তেজা: একদম।

ইভান: তুমি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউরোপের উদাহরণ দিলে কী দেখো?

এস্তেজা: দেশভেদে ব্যবস্থা আলাদা। কিন্তু উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর একটি সাধারণ শিক্ষা আছে—প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা। শিক্ষক নির্বাচন, প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং সামাজিক মর্যাদায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ইভান: অর্থাৎ শুধু নতুন ভবন বানালেই স্কুল ভালো হয় না।

এস্তেজা: বরং ভালো বিদ্যালয়ের কেন্দ্রবিন্দু হলো ভালো শিক্ষক এবং ভালো নেতৃত্ব।

ইভান: তাহলে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণদের কীভাবে শিক্ষকতায় আনা যায়?

এস্তেজা: শুধু বেতন বাড়িয়ে নয়। মর্যাদা, স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নতির সুযোগ এবং কাজের পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় করতে হবে।

ইভান: কারণ একজন মেধাবী মানুষ যদি মনে করেন শিক্ষকতা তাঁর শেষ বিকল্প, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থা শুরুতেই হেরে গেল।

এস্তেজা: আর যদি তিনি মনে করেন, “আমি দেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করছি”—তাহলে সেই পেশার শক্তিই বদলে যাবে।

ইভান: কিন্তু বাবা-মায়ের ভূমিকা?

এস্তেজা: সরকারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল শিশুর উৎক্ষেপণ মঞ্চ তৈরি করে, পরিবার সেখানে জ্বালানি দেয়।

ইভান: সুন্দর বলেছ।

এস্তেজা: কিন্তু সেই জ্বালানি যদি হয় শুধু নম্বরের চাপ, তুলনা, অপমান আর ভয়—তাহলে রকেট ওপরে উঠবে না। বিস্ফোরিত হবে।

ইভান: তাই শিশুকে শুধু গণিত শেখালে হবে না।

এস্তেজা: তাকে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শেখাতে হবে। ব্যর্থ হতে শেখাতে হবে। বই পড়তে শেখাতে হবে। প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখাতে হবে। নিজের মত প্রকাশ করতে শেখাতে হবে। অন্যের মত শুনতে শেখাতে হবে।

ইভান: আর সবচেয়ে বড় কথা?

এস্তেজা: তাকে বিশ্বাস করতে শেখাতে হবে যে সে মূল্যবান।

ইভান: তাহলে একটা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করলে আমাদের প্রথমে কোথায় তাকানো উচিত?

এস্তেজা: বিদ্যালয়ের দিকে।

ইভান: আর দ্বিতীয়বার?

এস্তেজা: শিক্ষকের দিকে।

ইভান: তৃতীয়বার?

এস্তেজা: শিশুর চোখের দিকে।

ইভান: যদি সেখানে কৌতূহল থাকে?

এস্তেজা: দেশ বেঁচে আছে।

ইভান: যদি সেখানে ভয় থাকে?

এস্তেজা: শিক্ষা ব্যবস্থা অসুস্থ।

ইভান: আর যদি সেখানে স্বপ্ন থাকে?

এস্তেজা: তাহলে সেই স্বপ্নের জন্য একটি শক্তিশালী উৎক্ষেপণ মঞ্চ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

ইভান: কারণ আজকের শ্রেণিকক্ষের শিশুটিই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, শিল্পী, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রনায়ক।

এস্তেজা: এবং হয়তো এমন একজন মানুষ, যে আমাদের চেয়ে ভালো একটি দেশ তৈরি করবে।

ইভান: তাই স্কুলকে অবহেলা করা মানে ভবিষ্যৎকে অবহেলা করা।

এস্তেজা: আর শিক্ষককে অপমান করা মানে ভবিষ্যৎ নির্মাতাকে দুর্বল করা।

ইভান: তাহলে আমাদের সিদ্ধান্তটা পরিষ্কার।

এস্তেজা: স্কুলকে শুধু ভবন বানানো যাবে না।

ইভান: শিক্ষককে শুধু কর্মচারী বানানো যাবে না।

এস্তেজা: শিশুকে শুধু পরীক্ষার্থী বানানো যাবে না।

ইভান: কারণ একটি জাতি কেবল পরীক্ষায় পাস করা মানুষ দিয়ে তৈরি হয় না।

এস্তেজা: জাতি তৈরি হয় এমন মানুষ দিয়ে, যারা জ্ঞানী, সাহসী, মানবিক এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।

ইভান: আর সেই মানুষ তৈরির প্রথম কারখানা?

এস্তেজা: কারখানা নয়, ইভান—একটি শ্রেণিকক্ষ।

ইভান: আর সেই শ্রেণিকক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ?

এস্তেজা: শিক্ষক।

ইভান: তাহলে শিক্ষককে মর্যাদা দাও।

এস্তেজা: বিদ্যালয়কে শক্তিশালী করো।

ইভান: শিশুকে প্রশ্ন করতে দাও।

এস্তেজা: স্বপ্ন দেখতে দাও।

ইভান: কারণ উৎক্ষেপণ মঞ্চ দুর্বল হলে—

এস্তেজা: কোনো রকেটই তার পূর্ণ উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে না।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login