Story

আদরের আড়ালে ৫

September 29, 2026

6 views

ঝড়ের পূর্বাভাস

 

ডিজিটাল জগৎ থেকে রিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার পর প্রথম কয়েকটা দিন খুব কঠিন ছিল। ফোনের জন্য মেয়েটা কান্নাকাটি করত, জেদ করত। কিন্তু শাইলা আর রাশেদ এবার কঠোর ছিল। তারা রিয়াকে নিয়ে বাইরে খেলতে যাওয়া, পার্কে ঘুরতে যাওয়া আর গল্পের বই পড়ে শোনানোর মতো পুরনো কিন্তু কার্যকর উপায়গুলো বেছে নিল। ধীরে ধীরে রিয়া স্বাভাবিক হতে শুরু করল। তার মুখে আবার হাসি ফুটল, তার চঞ্চলতা ফিরে এলো। শাইলা আর রাশেদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তাদের মনে হলো, তারা ঠিক সময়েই 'দানব'টাকে চিনতে পেরে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের কাঁচের ঘরটা আবার আগের মতোই সুরক্ষিত।

কিন্তু তারা জানত না, ঝড়ের আসল উৎস ঘরের বাইরে নয়, ভেতরেই রয়ে গেছে।

একদিন বিকেলে শাইলা রিয়াকে নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরের খেলার মাঠে গেল। সেখানে আরও কয়েকটা বাচ্চা খেলছিল। রিয়া তার বয়সী একটা মেয়ে, নাম টিয়া, তার সাথে বন্ধুত্ব জমিয়ে ফেলল। শাইলা মাঠের এক কোণায় বেঞ্চে বসে অন্য মায়েদের সাথে গল্প করতে করতে মেয়ের দিকে নজর রাখছিল।

বাচ্চা দুটো ছোটাছুটি করার পর একসময় খেলার একটা খালি কোণায় গিয়ে বসল। তারা কী নিয়ে যেন ফিসফিস করছিল। শাইলা দূর থেকে দেখে হাসল। ভাবল, নিশ্চয়ই নিজেদের মধ্যে কোনো গোপন কথা বলছে। সে আবার গল্পে মন দিল।

কিছুক্ষণ পরেই একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। টিয়ার মা, মিসেস জামান, হঠাৎ উত্তেজিতভাবে চিৎকার করে উঠলেন, "টিয়া! কী হচ্ছে এসব? উঠে এসো বলছি!"

শাইলা চমকে সেদিকে তাকাল। সে দেখল, টিয়া ভয়ে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। আর রিয়া মাটিতে একা বসে আছে, তার চোখেমুখে রাজ্যের বিস্ময় আর ভয়। মিসেস জামান রাগী চোখে একবার রিয়ার দিকে তাকিয়ে নিজের মেয়েকে নিয়ে প্রায় টানতে টানতে সেখান থেকে চলে গেলেন।

শাইলা কিছুই বুঝতে পারল না। সে রিয়ার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে মা? টিয়ার মা ওভাবে চিৎকার করল কেন? তোমরা কী করছিলে?"

রিয়া ভয়ে ভয়ে বলল, "আমরা তো ডাক্তার-ডাক্তার খেলছিলাম।"

"ডাক্তার-ডাক্তার খেলছিলে, তাতে কী হয়েছে?" শাইলার গলায় কিছুটা বিরক্তি।

রিয়া চুপ করে রইল, তার মুখটা ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সে আর একটাও কথা বলল না। শাইলা ভাবল, বাচ্চাদের খেলার মধ্যে হয়তো কোনো ঝগড়া হয়েছে। সে আর বিষয়টা নিয়ে মাথা ঘামাল না। কিন্তু আসল ধাক্কাটা অপেক্ষা করছিল সন্ধ্যায়।

কলিংবেল বাজতেই শাইলা দরজা খুলে দেখল, বাইরে মিসেস জামান দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখ থমথমে। শাইলাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তিনি প্রায় ঘরে ঢুকে এসে বললেন, "ভাবি, আপনার সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।"

তার গলার স্বরে শাইলার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ড্রয়িং রুমে বসে মিসেস জামান যা বললেন, তা শোনার জন্য শাইলা একেবারেই প্রস্তুত ছিল না।

"আপনার মেয়ে আজ খেলার সময় আমার মেয়ের সাথে কী করেছে আপনি জানেন?" তিনি উত্তেজিত গলায় বলতে শুরু করলেন। "ওরা ডাক্তার-ডাক্তার খেলার নামে আমার মেয়ের ফ্রক তুলে ওর শরীরের প্রাইভেট পার্টে হাত দেওয়ার চেষ্টা করছিল। বলছিল, 'এখানে ইনজেকশন দিতে হবে, এটা ব্যাড প্লেস'।"

প্রত্যেকটা শব্দ শাইলার কানে গরম সিসার মতো প্রবেশ করছিল। তার মাথা ঘুরছিল, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় তার পৃথিবীটা দুলছিল। সে ফিসফিস করে বলল, "না... না, আমার মেয়ে এমন করতেই পারে না। ও নিশ্চয়ই কিছু না বুঝে..."

"না বুঝেই করেছে?" মিসেস জামানের গলা আরও চড়ল। "একটা ছয় বছরের বাচ্চা 'ব্যাড প্লেস' কথাটা কোথা থেকে শেখে? প্রাইভেট পার্টে হাত দেওয়াটা কোথা থেকে শেখে? ভাবি, আপনার মেয়ের কাউন্সেলিং করানো দরকার। ও অন্য বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ নয়।"

কথাগুলো শেলের মতো বিঁধল শাইলার বুকে। অপমানে, লজ্জায় তার কান গরম হয়ে গেল। সে কোনোমতে মিসেস জামানকে শান্ত করে বাড়ি পাঠাল। দরজা বন্ধ করে সে সেখানেই বসে পড়ল। তার কাঁদতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু কান্না আসছিল না।

সেদিন রাতে রাশেদ বাড়ি ফেরার পর পুরো ঘটনাটা শুনল। শুনে সেও স্তব্ধ হয়ে গেল। রাগের মাথায় সে রিয়াকে কড়া ধমক দিল। "কোথা থেকে শিখছিস এসব নোংরামি? কে শিখিয়েছে তোকে?"

বাবার চিৎকারে রিয়া ভয়ে কাঁদতে শুরু করল। সে ভাঙা ভাঙা গলায় শুধু বলতে পারল, "সগির মামা... সগির মামা বলেছে, এটা একটা সিক্রেট গেম।"

রাশেদ আর শাইলা একে অপরের দিকে তাকাল। রিয়ার মুখে সগিরের নাম শুনে তারা আরও বিভ্রান্ত হলো। শাইলা বলল, "সগির কেন এসব শেখাবে? ও নিশ্চয়ই টিভিতে কোনো কার্টুন দেখে শিখেছে আর সগিরের নাম বলছে। তুমি তো জানোই, সগিরকে ও কতটা ভয় পায় আজকাল।"

রাশেদও এই যুক্তিতে সায় দিল। তাদের কাছে এটাই মনে হলো। সগির, তাদের এত কাছের বন্ধু, সে এমন কাজ করতেই পারে না। নিশ্চয়ই ইন্টারনেটের সেই 'দানব'টাই মেয়ের মাথায় এসব ঢুকিয়ে দিয়েছে, আর মেয়েটা ভয়ে সগিরের নাম বলছে।

তারা মেয়েকে কড়া শাসন করল। তাকে বোঝানো হলো, এই ধরনের খেলা 'খুব খারাপ'। কিন্তু তারা একবারও গভীরে গিয়ে খোঁজার চেষ্টা করল না, একটা শিশুর মুখে 'সিক্রেট গেম' কথাটা কতটা ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত বহন করে। কেন সে নির্দিষ্টভাবে সগিরের নামটাই বলল?

(চলবে)

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login