Story

ঘড়িঘরের ঘটনাটা বলছি

September 28, 2026

5 views

এক অদ্ভুত শহর। শহরটা যে কোন দেশে অবস্থিত বা সেটি আদতেই কোনো দেশের মধ্যে কীনা, সেটি হয়ত কেউই জানতো না বা দেশ নিয়ে তারা কখনোই কথা বলতো না। শহরটার নাম আমার নিজেরও মনে নেই, যদিও আমি সেই শহরেরই বাসিন্দা। এ শহরের মানুষগুলো সবাই মিলেই অন্যরকম। কারো দিকে কারো নজর নেই। নেহায়েত প্রয়োজন না হলে কেউ কারো সাথে কথাও বলতো না। সেই অদ্ভুত শহরে একদিন সকাল থেকেই আকাশের রং অস্বাভাবিক ধূসর হয়ে গেল। বৃষ্টি হচ্ছিল না, অথচ বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ।
দূরের বাড়িগুলো কুয়াশার ভেতর এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন তারা কাল্পনিক বাড়িঘর বা শিশুদের আঁকা ছবি। শহরটার ঠিক মাঝখানে একটা লম্বা দালান। সেটি শুধুই দালান ছিল, সেটির একেবারে মাথায় একটা ঘড়ি। প্রতিদিন একজন বৃদ্ধ লোক একটা মই বেয়ে সেটিতে উঠে ঘড়িটাতে দম দেয়। ওই ঘড়ির স্তম্ভটাকে কোন কারণ ছাড়াই বৃদ্ধ লোকটি ঘড়িঘর বলত। প্রথম প্রথম হয়ত লোকজন ঘড়িঘর শব্দে অবাক হয়েছিল বা অবাক হলেও কেউ জানে না। কারণ শহরের সবচেয়ে বৃদ্ধ লোকটিও তার শিশুকাল থেকে ওই একই বৃদ্ধকে ঘড়িটাতে দম দিতে দেখে আসছে। কিন্তু ওই যে বললাম, শহরে আদতে কেউ কারো সাথে কথাও বলে না। তাই বৃদ্ধ লোকটির বয়স নিয়েও কারো ভাবনা নেই। সেই অস্বাভাবিক ধূসর দিনটার দুপুরে ঘড়িঘরের নিচে প্রতিদিনের মতো বসে ছিল লোকটি। তার নাম লজুতা।
শহরের কেউ জানত না সে কোথায় থাকে। দিনের বেলা এই ঘড়িঘরের নিচেই বসে থাকে। শহরের লোকজন শুধু জানত লজুতা জাপানি ভাষা জানে। সন্ধ্যা নামলেই সে ঘড়িঘরের দিকে তাকিয়ে অদৃশ্য কারও সঙ্গে জাপানিতে কথা বলত।
ঘড়িঘরের কাছেই আমার বাড়ি। এ শহরে সম্ভবত আমিই তাকে সবচেয়ে বেশি দেখি। ধূসর দিনটা কেন যেন আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। আমি সাহস করে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
আপনি কার সঙ্গে কথা বলেন?
লজুতা আমার দিকে না তাকিয়েই বলল,
দারেকা গা ইমাসু।
এ কথার মানে কি? আমি জিজ্ঞেস করলাম। কেউ একজন আছে। লজুতা আনমনে অন্য দিকে তাকিয়ে জবাব দিল।
কোথায়?
এবার লজুতা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল,
সোরা নো মুকো দেসু।
এ কথাটাওতো বুঝিয়ে বলতে হবে আমাকে, আমি বললাম।
আকাশের ওপারে।খুব গম্ভীর স্বরে জবাব দিল লজুতা।
সেদিনই দুপুরের কিছুক্ষণ পর হঠাৎ বাতাস থেমে গেল। ঘড়ির কাঁটা আটকে গেল ৩টা ১৭ মিনিটে, চারদিকে অন্ধকার নেমে এল। শহরের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করল।একদফা কথা বলে আমি আমার বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। চারদিকে অন্ধকার দেখে আমি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঘড়িঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম। তার দিকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি হচ্ছে আমাদের শহরে?
লজুতা আমাকে কথাটা শুনে গলা নামিয়ে বলল,
শিজুকা নি শিতে কুদাসাই। জাপানি ভাষায় শব্দগুলো বলেই আমার দিকে তাকিয়ে ফের বলল, দয়া করে চুপ করুন।
আমি চারদিকে তাকালাম। শহরটা সত্যিই চুপ হয়ে গেছে। রাস্তার কুকুরগুলো কোথায় যেন গা ঢাকা দিয়েছে। আকাশে একটা পাখিও নেই। চারপাশে ছোটাছুটি করা মানুষগুলোর মুখেও কোনো শব্দ নেই।
তখনই ঘড়িঘরের একেবারে উপরে ঘড়িটার গা ঘেঁষে টুপটাপ করে পানি পড়তে লাগল। অথচ চারপাশ খটখটে শুকনো, বৃষ্টির নামগন্ধ নাই কোথাও।
ঘড়ির ধার ঘেঁষে পানি পড়তে দেখেই লজুতা উঠে দাঁড়াল। তার মুখে এই প্রথমবার ভয় দেখলাম। সে বলল,
আমাকে ফিরে যেতে হবে।
এবারে সে নিজে নিজেই বাংলা বলা শুরু করেছে।
কোথায়? আমি জিজ্ঞেস করলাম। আতঙ্কে আমার নিজের কণ্ঠ নিজের কাছেই অপরিচিত শোনাল।
সে পকেট থেকে একটি পুরোনো চাবি বের করল।
যেখান থেকে আমি আসিনি।
লজুতার কথাটা হেঁয়ালির মতো শোনাল। ওর এ কথার জবাবে আমি হয়ত কিছু বলতাম, কিন্তু আমার আরো অবাক হবার মতো একটি ঘটনা ঠিক তখনই ঘটতে লাগল।
ঘড়িঘরটি মাটি ছেড়ে ধীরে ধীরে আকাশের দিকে, ওপরে উঠতে শুরু করল।
লজুতা আমার হাতে চাবিটি দিয়ে বলল,
সায়োনারা। বিদায়।
তারপর সে দ্রুতপায়ে শহরের পশ্চিমের বড় রাস্তার দিকে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। এক মূহুর্ত পর আমি লজুতার গমনপথের দিকে তাকিয়ে তাকে আর দেখতে পেলাম না। ভিড়ের মধ্যে সে অদৃশ্য হয়ে গেছে।কি মনে করে তখনই আমি ঘড়িঘরটির দিকে তাকালাম। সেটিও নেই। ভোজবাজীর মত অদৃশ্য হয়ে গেছে।
শুধু আকাশে একটি কালো বিন্দু দেখা গেল। মনে হলো, সেটিই হয়ত আমাদের শহরের ঘড়িঘরটা।
পরদিন থেকে শহরের সবাই জাপানি বলতে শুরু করল।শুধু আমি পারি না। মাঝে মাঝেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঘড়িঘরটা যেখানে ছিল, সেখানে এসে দাঁড়াই। যেখানে লজুতা বসে থাকত, সেখানে আমিও বসে থাকি।
প্রতিদিন ভোরে আমি লজুতার দেয়া চাবিটা নেড়েচেড়ে দেখি। আমার কেন যেন মনে হয়, এ চাবিটা কোন একটা অদৃশ্য দরজার চাবি। একদিন আমি নিশ্চয়ই সে দরজার অস্তিত্ব টের পাব, মাঝে মাঝেই আমার মনে হয়। সে সময়টাতে লজুতার কথা খুব মনে পড়ে আমার।
আজ সকালেও ঘুম থেকে উঠেই ইদানিংকার অভ্যাসসূলভ লজুতার দেয়া চাবিটা হাতে নিয়ে ঘরের ভেতর পায়চারি করছিলাম, তখন একটি অবাক করা ঘটনা ঘটল। ঘরের ভেতর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে চাবিটা নিয়ে দরজার তালা খোলার মতো ভঙ্গী করতেই আমার মনে হলো, সত্যিই কোন দরজা আমি খুলেছি। সে দরজা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস এসে আমার গায়ে লাগছে, আমার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
সেই অদৃশ্য বা কাল্পনিক দরজার অন্য পাশ থেকে লজুতার কণ্ঠ ভেসে এল,
ওকায়েরিনাসাই।
বুঝিয়ে বলো। আমি বললাম।
ফিরে আসার জন্য স্বাগতম। লজুতা এবার বলল। তুমি আমাকে এ চাবি দিয়ে গিয়েছিলে কেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
আমাদের যেন আবার সাক্ষাৎ হয়, সে জন্যে। লজুতা জবাব দিল।
আমার কেন যেন মন খারাপ হয়ে গেল লজুতার জন্য। মানুষটা অদৃশ্য হয়ে গেল কেন! পরক্ষণেই মনে হলো, লজুতা আসলে কে ছিল? সে কি মানুষ ছিল নাকি অন্যকিছু!

Picked up where you left off

Comments

robin ahmed was this story’s first reader

+20 XP

    Please login to post comment. Login

  • robin ahmed 2 hours ago First reader

    গল্পটা অদ্ভুত। ভালো লেগেছে। খানিকটা রহস্য, কেমন যেন একটা অতিবাস্তবতার ছাপ গল্পটিতে। দারুণ।