Story

রুম নম্বর ১৩

September 28, 2026

46 views

সাথীর এনগেজমেন্টের ছবিটা রেহান প্রথম দেখেছিল রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে। ফেসবুকে আপলোড করা ছবির নিচে শত শত শুভেচ্ছা।

“Congratulations!”
“Made for each other!”
“Finally!”
“Best wishes for your new journey!”

আর ছবির মাঝখানে সাথী। লাল শাড়ি। কপালে ছোট্ট টিপ। ঠোঁটে সেই চেনা হাসি। যে হাসিটা একসময় রেহানকে পাগল করে দিত। ছবির পাশে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ। চশমা পরা, লম্বা, পরিপাটি। ক্যাপশনে লেখা—

“A new beginning. Alhamdulillah.”

নিচে একজন লিখেছে—

“Our engineer from America is finally coming home!”

রেহান ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল। তারপর ফেসবুক বন্ধ করল। আবার খুলল। আবার ছবিটা দেখল। তারপর ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলল। ঘরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকল।

দশ দিন। মাত্র দশ দিন পর সাথীর বিয়ে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো— সাথীর এতে কোনো আপত্তি নেই। সে নিজেই এনগেজমেন্টের ছবি পোস্ট করেছে।

রেহানের বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা লাগছিল।

তাদের সম্পর্ক ছিল প্রায় তিন বছরের।

তিন বছর ধরে যে মেয়েটাকে সে নিজের ভবিষ্যতের অংশ ভেবেছে, সে এখন অন্য কারও ভবিষ্যৎ।

রেহান ফোনটা আবার হাতে নিল।

সাথীর চ্যাট খুলল। শেষ মেসেজ চার দিন আগে।

সাথী: ভালো থেকো। আশা করি তুমি আমাকে বুঝবে।

রেহান তখন কোনো উত্তর দেয়নি।

আজও দিল না। বরং বাবুকে ফোন করল। দুইবার রিং হওয়ার পর বাবু ধরল।

“কী হয়েছে?”

“তুই ফ্রি?”

“রাত বারোটায় মানুষ ফ্রি থাকে না?”

“আমার আজকে একটা মেয়ে দরকার।”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর বাবু বলল,

"বাসায় ঘুমের ওষুধ আছে?”

“সুইসাইড করতে বলছিস?”

“থাকলে একটা খা, একটা ভাল ঘুম আসলে…”

“তোর কাছে উপদেশ চাইনি।"

“আগে কখনো গেছিস?”

রেহান বিরক্ত হয়ে বলল,

“যাইনি তো কি হয়েছে?”

“কিছু হয়নি।”

“তুই দিবি?”

“তুই সিরিয়াস?”

“হ্যাঁ।”

বাবু এবার গম্ভীর হলো।

“ওকে। 'ডে ড্রিম' নামে একটা হোটেল আছে।”

“কোথায়?”

“ঠিকানা পাঠাচ্ছি।”

“গিয়ে কি সরাসরি বলব?”

“না। যারা ওখানে যায়, তারা এই কাজেই যায়। ওদের অ্যারেঞ্জ করাই থাকে। প্রতিটা রুমে একজন মেয়ে থাকে। যে রুমগুলো ফাঁকা আছে সেখান থেকে একটা রুম পছন্দ করবি।”

রেহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। এরপরে চোখ বন্ধ করল।

“ঠিক আছে।”

রাত একটা পনেরো।

ডে ড্রিম হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে রেহানের মনে হলো, সে জীবনের সবচেয়ে বোকামি সিদ্ধান্তটা নিতে যাচ্ছে। হোটেলটা বাইরে থেকে খুব সাধারণ। সামনে নীল সাইনবোর্ড।

DAY DREAM

রিসেপশনে বসা লোকটা রেহানের দিকে একবার তাকাল।

“রুম?”

“জি।”

“নম্বর পছন্দ করেন।”

রেহান একটু থমকাল।

“যেকোনো একটা।”

লোকটা একটা তালিকা এগিয়ে দিল। রুম নম্বরগুলো দেখে রেহানের চোখ আটকে গেল। দেখতে থাকল। ৭, ৯, ১১, ১৩... আরও অনেকগুলো ছিল।  সে জানে না কেন, কিন্তু বলল—

“১৩।”

রিসেপশনিস্ট চাবি এগিয়ে দিল।

“থার্ড ফ্লোর।”

রেহান চাবিটা নিল। লিফটে ঢুকে আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকাল। চোখ লাল। চুল এলোমেলো। মুখে অদ্ভুত একটা কঠিন ভাব আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু নিজেকেই অপরিচিত লাগছে। লিফট থামল।

১৩ নম্বর রুম।

এতক্ষণ রেহানের ভেতরে, রাগ, কষ্ট, অপমান সব মিলেমিশে ছিল। একটা বিশ্রী রকমের অনুভূতি কাজ করছিল। সেই অনুভূতির কারণেই হোক, আর বাবুর সন্দেহ প্রকাশের কারণেই হোক, জেদ করে চলে এসেছিল রেহান। আর এখন, যখন সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, টের পেল তার বুক ধড়ফড় করছে। গলা শুকিয়ে আসছে। “এখনো ফিরে যাওয়া যায়।” সে নিজেকে বলল।

কেন যেন একটা অমোঘ টান অনুভব করল। 

ধীরে ধীরে দরজায় নক করল। ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। সে চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলল। ঘরে হালকা হলুদ আলো। এক পাশে সোফা। টেবিলে পানির বোতল। আর সোফায় বসে আছে একটি মেয়ে।

রেহান দরজা বন্ধ না করেই থেমে গেল। কি করবে বুঝতে পারছে না। দরজা বন্ধ করা মানেই, ফেরার পথ বন্ধ।

মেয়েটি তার দিকে তাকাল। অপূর্ব সুন্দরী। এই মেয়ে কেন এই প্রফেশানে?

সাদা-কালো প্রিন্টের শাড়ি। খোলা চুল। মুখে খুব হালকা মেকআপ। কিন্তু সৌন্দর্যের চেয়েও তার চোখ দুটো বেশি চোখে পড়ল। শান্ত। অদ্ভুত শান্ত। মেয়েটি বলল,

“বসুন।”

রেহান দাঁড়িয়ে রইল।

“জি?”

“বসুন।”

রেহান ধীরে ধীরে সোফার অপর প্রান্তে বসল। তার হাত ঘামছে। মেয়েটি কিছুক্ষণ তাকে দেখল।তারপর জিজ্ঞেস করল,

“কিছু খাবেন?”

“না।”

“পানি?”

“না।”

“চা কিংবা কফি?”

“না।”

মেয়েটি ভ্রু তুলল।

“আপনি তাহলে এখানে কী খাবেন?”

রেহান হকচকিয়ে গেল।

“আমি…”

মেয়েটি হেসে ফেলল।

“রিল্যাক্স।”

রেহান আরও অস্বস্তিতে পড়ে গেল।

মেয়েটি বলল,

“আপনার নাম কী?”

“রেহান।”

“আমি মায়া।”

“মায়া?”

“হ্যাঁ।”

“আসল নাম?”

“আপনার?”

রেহান চুপ।

মায়া বলল,

“আমিও প্রশ্নের উত্তর দিই, যদি আপনিও দেন।”

রেহান একটু হেসে ফেলল।

“ঠিক আছে।”

কিছুক্ষণ দুজন চুপ করে রইল।

মায়া আবার বলল,

“প্রথমবার?”

রেহান মাথা নিচু করল।

মায়া মৃদু হাসল।

“বোঝা যাচ্ছে।”

রেহান লজ্জায় পড়ে গেল।

“বোঝা যাচ্ছে?”

মায়া ধীরে ধীরে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। এরপরে আঙুল দিয়ে রেহানের হাতের দিকে দেখাল।

“আপনি গত পাঁচ মিনিট ধরে একই আঙুলটা ঘষছেন।”

রেহান হাতটা সরিয়ে নিল।

মায়া বলল,

“আর আপনি ঘরে ঢোকার পর থেকে তিনবার দরজার দিকে তাকিয়েছেন।”

রেহান চুপ।

“আপনি ভয় পাচ্ছেন?”

“না।”

“মিথ্যা।”

রেহান এবার হাসল।

“আসলে... একটু।”

মায়া মাথা নেড়ে বলল,

“ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”

“আমি জানি।”

“তাহলে?”

রেহান জানালার দিকে তাকাল।

“জানি না।”

মায়া তাকে কিছুক্ষণ দেখল।তারপর বলল,

“আজকের দিনটা খুব খারাপ গেছে?”

রেহান চমকে তাকাল।

“কীভাবে বুঝলেন?”

“আপনার চোখ দেখে গেস করলাম।”

“চোখ দেখে এসব বোঝা যায়?”

“অনেকদিন ধরে মানুষ দেখি। বলতে পারেন এই ক্ষমতাটা আয়ত্ত করে ফেলেছি”

কথাটা খুব সাধারণ। তবু রেহানের বুকের ভেতর কোথাও একটা শব্দ হলো।

“আমার ফিয়ঁসের আজকে এনগেজমেন্ট।”

মায়া চুপ করে গেল। রেহান নিজেই অবাক হয়ে গেল। সে কেন এই কথাটা বলল? এই মেয়েটাকে? যাকে সে জীবনে প্রথম দেখছে?

মায়া খুব শান্ত গলায় বলল,

“সেজন্য এখানে এসেছেন?”

রেহান মাথা নেড়ে বলল,

“হ্যাঁ।”

“ওকে ভুলতে?”

“হয়তো।”

“ভুলতে পেরেছেন?”

“না।”

মায়া একটু হাসল।

“তাহলে আমার একটা প্রশ্ন।”

“করুন।”

“যে মানুষটাকে ভুলতে চান, তার ছবি কি এখনো ফোনে আছে?”

রেহান ফোনটা বের করল।কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আছে।”

“ডিলিট করেননি?”

“না।”

“তার সাথে শেষ কথা কবে?”

“চার দিন আগে।”

“তখন কী বলেছিল?”

রেহান স্ক্রিন বন্ধ করল।

“বলেছিল, ভালো থেকো।”

মায়া বলল,

“খুব নিষ্ঠুর কথা।”

রেহান অবাক হয়ে তাকাল।

“কেন?”

“কারণ ‘ভালো থেকো’ কথাটা অনেক সময় মানুষ তখনই বলে, যখন সে জানে আর কখনো খোঁজ নেবে না।”

রেহান চুপ করে থাকল। তারপর বলল,

“প্রেম করেছেন?”

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“হয়েছিল।”

“তারপর?”

“শেষ হয়ে গেছে।”

“কেন?”

“মানুষটা চলে গেছে।”

“চলে গেছে মানে? আপনাকে ছেড়ে গেছে? না মরে গেছে?”

মায়া মাথা নেড়ে বলল,

“না। অন্য কাউকে বিয়ে করেছে।”

রেহান তাকিয়ে রইল।

“আপনি তাকে ভালোবাসতেন?”

“খুব।”

“এখন?”

মায়া জানালার দিকে তাকাল।

“ভালোবাসা সবসময় মরে যায় না।”

ঘরের বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

রেহান বুঝতে পারছিল না, কেন সে এখনও উঠে যাচ্ছে না। তার এখানে আসার উদ্দেশ্য ছিল অন্যরকম। কিন্তু এখন সে শুধু কথা বলতে চাইছে।

মায়া জিজ্ঞেস করল,

“আপনি কী করেন?”

“ছোটখাট একটা চাকরী।”

“তাহলে?”

“তাহলে কি?”

“বিয়েটা করে ফেলেননি কেন?”

“করার কথা ছিল।”

“সাথীর সাথে?”

রেহান চমকে উঠল।

“আপনি নামটাও জানেন?”

“আপনি নিজেই বললেন।”

“ওহ।”

মায়া হাসল।

“আপনি খুব অমনোযোগী।”

“আজ মাথা কাজ করছে না।”

“বুঝতে পারছি।”

রেহান বলল,

“আপনি?”

“আমি?”

“আপনার বয়স।”

“ব্যাড ম্যানার্স।”

“ঠিক সেকারণে না। আসলে আপনাকে দেখে যতটা কমবয়সী মনে হয়, আপনার কথাবার্তা সেই তুলনায় বেস ম্যাচিওর্ড।”

"থ্যাংকস"

“বাড়ি?”

মায়া একটু থামল।

“কুমিল্লা।”

“আপনি এখানে…”

রেহান বাকিটা বলতে পারল না। মায়া বুঝে গেল।

“কাজ করি।”

রেহান মাথা নিচু করল।

“সরি।”

“কিসের জন্য?”

“প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি।”

“কেন? আমার কাজ আমাকে ছোট করে না।”

রেহান তার দিকে তাকাল।মায়া বলল,

“মানুষকে কাজ দিয়ে বিচার করা খুব সহজ। মানুষ হিসেবে দেখা কঠিন।”

কথাটা রেহানকে থামিয়ে দিল। মায়া উঠে দাঁড়াল।

“আপনি চাইলে চলে যেতে পারেন।”

রেহান অবাক হয়ে বলল,

“কেন?”

“কারণ আপনি প্রস্তুত না।”

রেহান কিছু বলল না।

মায়া আবার বলল,

“আপনার এখানে আসার কারণটা আমার বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না। আপনি কষ্ট পেয়েছেন। হয়তো পুরো নারীজাতিকেই বিশ্বাসঘাতক ভাবছেন। আর হয়তো আরেকজন মেয়ের সাথে সেক্স করাকে সেই বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ ভেবেছিলেন। কিন্তু এখানে এসে, আপনার প্ল্যানের এতো কাছে এসেও আপনি আর এগোতে পারছেন না।”

রেহান মাথা নিচু করল। এরপরে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল

“ঠিকই বলেছেন।”

“মানে আপনি এখন আর চাইছেন না।”

“হ্যাঁ।”

“আসলে আপনি এই মুহূর্তে খুব একা। মানসিকভাবে একা। কষ্ট শেয়ার করার মত কেউ নেই, কিংবা শেয়ার করতে আত্মসম্মানে লাগছে।”

রেহান এবার আর কথা বলতে পারল না। মায়ার দিকে এবার অন্য চোখে তাকাল। মেয়েটা সাইকোলজি বেশ ভালোই বোঝে।

“কাঁদতে পারেন।”

চোখটা ঝাপসা লাগছিল। কারণটা এবার বুঝল। রেহান হেসে ফেলল।

“আমি কাঁদছি না।”

“পুরুষরা সবসময় এই ব্যাপারটা অস্বীকার করে।”

“আমি দুর্বল না।”

“কাঁদা দুর্বলতা না।”

রেহান মুখ ফিরিয়ে নিল। এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। মায়া কিছু বলল না।

প্রায় আধঘণ্টা তারা শুধু কথা বলল। সাথীর কথা। তাদের প্রথম দেখা। প্রথম সিনেমা। প্রথম ঝগড়া। সাথীর রাগ। সাথীর হাসি। শেষদিকে কীভাবে সম্পর্কটা ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল।মায়া কোনো মতামত জানাল না। শুধু শুনল। শেষে বলল,

“আপনি কি তাকে সত্যিই ভালোবাসতেন?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তাকে ঘৃণা করেন কেন?”

রেহান থমকে গেল।

“আমি ঘৃণা করি না।”

“আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে করেন।”

“আমি শুধু চাই ও আমার মতো কষ্ট পাক।”

মায়া মৃদু হাসল।

“এটা ঘৃণা না?”

রেহান উত্তর দিল না।

“আপনি জানেন,” মায়া বলল, “কখনো কখনো মানুষ আমাদের ছেড়ে যায় কারণ তারা খারাপ। আবার কখনো তারা চলে যায় কারণ তারা আমাদের মতো করে ভালোবাসে না।”

“তাহলে?”

“তাহলে আমাদের কষ্ট হয় ঠিকই, কিন্তু আমাদের ছেড়ে যাওয়াটা তাদের অপরাধ নয়।”

রেহান অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,

“আপনি বেশ বিজ্ঞের মত কথা বলেন।”

মায়া হাসল।

“জীবন অনেক কিছু শেখায়।”

“আপনাকেও কেউ কষ্ট দিয়েছে?”

মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল

“একজন।”

“এখন কোথায়?”

“সম্ভবত আমেরিকায়।”

রেহান হেসে ফেলল। হোয়াট অ্যা কো ইন্সিডেন্স! তাকাল মায়ার দিকে। মায়া বলল,

“ইঞ্জিনিয়ার।”

দুজনেই কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর রেহান হেসে ফেলল।

“বানিয়ে বলছেন?”

“কেন?"

“আমার সাথে কেমন যেন মিলে যাচ্ছে। ব্যাপারটাকে কি কাকতাল বলবেন?”

“বলা যায়।”

“আপনার প্রেমিকও আমেরিকায়?”

“হ্যাঁ।”

“বিয়ে করেছে?”

“করেছে।”

“আপনি তাকে ঘৃণা করেন?”

মায়া মাথা নেড়ে বলল,

“না।”

“কেন?”

“কারণ আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম। ভালোবাসা শেষ হয়ে গেলে মানুষটা শত্রু হয়ে যায় না।”

রেহান চুপ হয়ে গেল।

এই একটা বাক্য যেন তার ভেতরে কোথাও গিয়ে বসে গেল।

রাত প্রায় তিনটা। রেহান উঠে দাঁড়াল। মায়াও উঠে দাঁড়াল।

“আমি যাব।”

“সিওর।”

দরজার কাছে গিয়ে রেহান থামল।

“মায়া?”

“জি?”

“আজ যদি আমি এখানে না আসতাম…”

“তাহলে?”

“তাহলে হয়তো একটা ভুল করতাম।”

মায়া কিছু বলল না। রেহান বলল,

“থ্যাংকস।”

“কেন”

“আমাকে মানুষ হিসেবে দেখার জন্য।”

মায়ার চোখে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটল।

“সেটা কিন্তু আপনিও করেছেন। আমাকে মানুষ হিসেবে দেখেছেন।”

রেহান দরজা খুলল। তারপর আবার ফিরে তাকাল।

“মায়া?”

“বলুন”

“আপনার আসল নামটা কি জানতে পারি?”

মায়া একটু হাসল।

“মায়াই।”

“সত্যি?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আজ থেকে আপনাকে মায়া বলেই ডাকব।”

“আবার আসবেন?”

রেহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“জানি না।”

মায়া বলল,

“আসার দরকার নেই।”

রেহান অবাক।

“কেন?”

“আজ আপনি যে কারণে এসেছিলেন, সেই কারণ তো আর থাকছে না।”

রেহান হেসে ফেলল।

“তা ঠিক। তাহলে?”

“বন্ধু হয়ে আসতে পারেন।”

রেহান থমকে গেল।

“আপনি আমার বন্ধু হবেন?”

“আপনি খুব বেশি কথা বলেন।”

“আমি তো ভাবতাম আপনি বলবেন আমি কম কথা বলি।”

“আজকে বেশি বলেছেন।”

রেহান দরজার বাইরে পা রাখল।

“গুড নাইট।”

“গুড নাইট।”

দরজা বন্ধ হয়ে গেল। মায়া কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে সোফায় গিয়ে বসল।

পরদিন দুপুরে রেহানের ফোনে একটা মেসেজ আসল। অচেনা নম্বর।

ঃঘুম থেকে উঠেছেন?

রেহান অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর লিখল—

রেহানঃ মায়া?

মায়াঃ হ্যাঁ।

রেহান: জাস্ট উঠলাম।

কিছুক্ষণ পর—

মায়া: সাথীর ছবি ডিলিট করেছেন?

রেহান হেসে ফেলল। তারপর লিখল

রেহান: না।

মায়া: করবেন না।

রেহান: কেন?

মায়া: স্মৃতি মুছে ফেললে মানুষ মুক্ত হয় না। স্মৃতির পাশে নতুন স্মৃতি বসাতে হয়।

রেহান অনেকক্ষণ কিছু লিখল না।

তারপর লিখল—

রেহান: আপনি কি আমার সাথে দেখা করবেন?

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর নেই।

তারপর—

মায়া: কোথায়?

রেহান লিখল—

রেহান: ডে ড্রিমে না। অন্য কোথাও।

মায়া উত্তর দিল—

মায়া: ঠিক আছে।

দুই সপ্তাহ পর। বিকেলের বৃষ্টি থেমেছে। ঢাকার এক ছোট্ট ক্যাফের জানালার পাশে বসে রেহান আর মায়া কফি খাচ্ছে। মায়ার সামনে বই। রেহানের সামনে ল্যাপটপ। কিন্তু দুজনের কেউই নিজের কাজ করছে না।

রেহান বলল,

“আপনি জানেন, আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল রুম ১৩-তে।”

মায়া বলল,

“জানি।”

“১৩ আমার লাকি নম্বর হয়ে গেছে।”

“কীভাবে?”

“সেদিন আমি প্রথমবার বুঝেছিলাম, আমি সাথীকে হারিয়েছি।”

মায়া চুপ করে রইল।

“আর প্রথমবার বুঝেছিলাম,” রেহান বলল, “কাউকে পাওয়া মানেই তাকে নিজের করে পাওয়া না।”

মায়া কোণ উত্তর দিল না। শুধু তাকিয়ে থাকল। রেহান আবার বলল

“আপনি?”

“আমি কী?”

“আপনি সেদিন কী পেয়েছিলেন?”

মায়া একটু ভেবে বলল,

“একজন মানুষ।”

“আচ্ছা।”

“ঠিক মানুষ না। বলা যায়, একজন ভীতু ছেলে।”

রেহান প্রতিবাদ করল,

“আমি ভীতু?”

“ছিলেন।”

“এখন?”

মায়া মৃদু হাসল।

“এখন একটু সাহসী।”

রেহান হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখল। মায়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের হাতটা তার হাতের ওপর রাখল। কোনো নাটকীয়তা নেই। কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। শুধু দুটো মানুষের হাত।

যারা দুজনেই একসময় ভেবেছিল, তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি হয়তো তাদের ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু জীবন কখনো কখনো অদ্ভুতভাবে নতুন দরজা খুলে দেয়। যে দরজার নম্বর হয়তো আগে কখনো বেছে নেওয়া হয়নি।

১৩।

রেহান মৃদু হেসে বলল,

“মায়া?”

“বল?”

“তোমার কি মনে হয়, মানুষ দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়তে পারে?”

মায়া জানালার বাইরে তাকাল। বৃষ্টির পানি কাচ বেয়ে নিচে নামছে। সে ধীরে ধীরে বলল,

“মানুষ দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়ে না।”

রেহানের মুখ একটু মলিন হয়ে গেল। মায়া তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।

“মানুষ প্রতিবার নতুন করে প্রেমে পড়ে।”

রেহান কিছু বলল না। শুধু হাসল। আর বহুদিন পর সেই হাসিতে কোনো অভিমান ছিল না।কোনো প্রতিশোধ ছিল না। ছিল না সাথীকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা। ছিল শুধু একজন নতুন মানুষকে জানার ইচ্ছা। আর মায়ার চোখে তখনও সেই শান্ত দৃষ্টি। যে দৃষ্টি প্রথম রাতেই বুঝে গিয়েছিল— রেহান কোনো মেয়েকে খুঁজতে রুম নম্বর ১৩-তে ঢোকেনি। 

সে আসলে খুঁজছিল এমন একজন মানুষকে, যার সামনে নিজের ভাঙা হৃদয়টা লুকাতে হবে না। আর অদ্ভুতভাবে, সেই মানুষটিই বসে ছিল সোফার এক কোণে, অপেক্ষা করছিল তার জন্য।

রুম নম্বর ১৩-এর দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেদিন রাতেই। কিন্তু সেই দরজার ওপাশে শুরু হয়েছিল দুজন মানুষের নতুন গল্প।

শেষ

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login