তারপর কেটে গেছে কয়েক দিন।রোজিনা গ্রামে মায়ের কাছে কিছু টাকা ও পাঠিয়েছে।বড় ম্যাডাম ফোনে টাকা পাঠিয়ে ওর মায়ের সাথে কথা বলিয়ে দিছে।মা রাজিয়া বেগম টাকা পেয়ে খুব খুশি।চৌধুরী দাদী বলেছে,এখানে দুই বছর থাকলে তুই টাকা জমাইতে পারবি। বৌমা এর মন যোগাইয়া চলিশ। রাগ একটু বেশি তয় মন ভালো।
একরাতে রোজিনা ঘুমাচ্ছিল।ওর জন্য ছোট্ট একটা খাট পাতা হয়েছে স্টোর রুমে।রোজিনা এটাকে বলে গোডাউন।প্রথম দিকে মাল সামালের মাঝে ঘুমোতে দম আটক যেতো।এখন অভ্যাস হয়ে গেছে।তো সেই রাতে ঘুমের মধ্যে রোজিনার মনে হয়েছিল একটা ছায়ামূর্তি ওর মাথার পাশে দাঁড়িয়ে।ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।ওর গালে ছুঁয়ে দিচ্ছে। রোজিনা সজাগ হয়ে দেখে বড় স্যার মাথার পাশে দাঁড়িয়ে।ও কিছু বলার আগে স্যার বলে,পুরানো বই নিতে আসছি।তুই মাথায় কি তেল দিয়েছিস। গন্ধটা বেশ !আমার দাদীমা এই রকম গন্ধযুক্ত তেল দিতো।রোজিনা স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কি বলবে কোনো কথা খুঁজে পায় না।ওর কাঁচা ঘুম ভেংগে গেছে। স্যার আবার বলেন, আচ্ছা ঘুমা।রোজিনা শুয়ে পড়ে।
আরাফাত চৌধুরী ভেবে পায়না হঠাৎ আজকে তার কি হলো।একটা রেফারেন্স বই খুঁজতে স্টোর রুমে গিয়েছেন।বই নিয়ে পাশে নিজের লাইব্রেরিতে গিয়ে আবার স্টোর রুমে, যেখানটায় রোজিনা শুয়ে ঘুমাচ্ছিল সেখানটায় ফিরে আসেন।এটা কিসের আকর্ষণে।এটা কি শৈশবে হারিয়ে যাওয়া দাদীমার বাঁশ তেলের গন্ধের টানে না এর সাথে যোগ হয়েছে ঘুমকাতুরে কিশোরী এক মেয়ের প্রতি আদিম দুনির্বার আকর্ষণ?তিনি বুঝতে পারছেন না মেয়েটার মাথায় হাত বুলানো কতটা স্নেহের ছিলো।কতটা জৈবিক তাড়না থেকে।আরাফাত চৌধুরী আর ভাবতে চাচ্ছেন না।
আজকে আর লাইব্রেরীতে মন বসছে না।তিনি অন্যমনস্ক ভাবে স্ত্রী রেবেকা ইয়াসমিনের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়েন।মিসেস ইয়াসমিন জেগে ছিলেন।আস্তে করে বলেনা, "ওই মেয়েটার কাছ থেকে বাঁশ তেলের গন্ধ নিয়ে আসছো।"আরফাত চৌধুরী বৌয়ের কথায় অপ্রস্তুত হয়ে বলেন,কি আজে বাজে বকছ।
"তুমি রোজিনার ঘর থেকে আসোনি?"
"পুরানো একটা রেফারেন্স বই খুঁজতে গিয়েছিলাম।"
"তোমার রেফারেন্স বইতে কি রোজিনার মাথার তেল মাখানো ছিল।শিক্ষক হয়ে এই মধ্য বয়সে অসভ্যতামি করছো, খারাপ লাগে না!"
আরাফাত চৌধুরী এই মুহূর্তে চুপ থাকা শ্রেয় মনে করছেন।তিনি রেবেকা ইয়াসমিনের আরও দু একটা কথা হজম করে ঘুমিয়ে পড়েন।
পরদিন রেবেকা ইয়াসমিনের ঘরে রোজিনার ডাক পড়ে। রোজিনা ভেবেছে ম্যাডাম চা দিতে বলবে। ম্যাডাম ওকে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন, তোর স্যার কোথায়?
সকালে হাঁটতে বের হইছে,রোজিনা বলে।তারপর ম্যাডাম বলে ,সত্যি বলবি গতকাল রাতে স্যার তোর রুমে গিয়েছিল?রোজিনা মাথা নিচু করে হ্যাঁ বলে। যেনো ও অপরাধ করেছে।ম্যাডাম আবার বলে, তোর গায়ে হাত দিছে?সত্য বলবি কিচ্ছু লুকাবি না।
রোজিনা গতকাল রাতের বিষয়ে যতটুকু মনে পড়ে ম্যাডাম কে বলে। ম্যাডাম আবার বলে,যা..যখন যা হবে আমাকে জানাবি। কাউকে বলার দরকার নাই। রোজিনা অপরাধীর মতো মুখ করে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়।হা গতকাল রাতে ও যখন ঘুমিয়ে ছিলো বড় স্যারের আচরণ ওর নিকট কেমন যেন অন্যরকম লেগেছিল। স্যার এর আগে ও বই নিতে এই রুমে আসছিলো।কিন্তু ঘুমের মধ্যে কখনও মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় নি।স্যার খারাপ মানুষ হইতে পারে না। ম্যাডাম যা ভাবে ভাবুক।
সেদিনের ঘটনার পড়ে দুই মাস কেটে গেছে।সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। আগের মত। তবে একদিন ছোটো সাহেব মানে রাহাত ভাইয়া ,তার রুমে সকালের চা নিয়ে গেলে রোজিনার হাত ধরে কি যেনো ইংরাজীতে বলেছিল।রোজিনা লজ্জা অবনত মুখে বলেছিল, ভাইয়া যে কি বলেন!
"বলছি রোজি তুই খুব সুন্দর।আমার মেয়ে বন্ধুরা তোর মতো সুন্দর না।"
রোজিনা চায়ের কাপ রেখে মুচকি হাসি দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে পড়ে।
এর কদিন পর। এক শুক্রবারের শীতের সকাল।বাসার সবাই যে যার রুমে। রাহিমা খালা বলল ছোটো সাহেবের চা টা রুমে দিয়ে আসতে।গতকাল রাতে বড় সাহেবের বিশ্রী আচরণ রোজিনার মনে এখনো দগ্ধ হয়ে জ্বলছে। কাউকে কে বলতে ও পারছে না।বড় ম্যাডাম কে বলা যায়।ম্যাডাম বলছিলো কোনো সমস্যা হলে তাকে জানাতে। কিন্তু স্যারের অস্বাভাবিক আচরণ ম্যাডাম কি বিশ্বাস করবেন? উল্টো ওকে দোষারূপ করবে নাতো!এখন ছোটো সাহেবের রুমে যেতে ইচ্ছে করছে না।রহিমা খালা আবার বলে,"আজ আবার তোর কোন ডং হইছে?"
অনিচ্ছা সত্ত্বেও রোজিনা চায়ের কাপ নিয়ে ছোট সাহেবের রুমে যায়। রাহাত ভাইয়া চা। রোজিনা চায়ের কাপ টেবিলে রাখতে রাখতে বলে।কিছু বুঝে উঠার আগে রাহাত ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে।রোজিনা দুর্বল হাতে রাহাতের বাঁধন ছিঁড়ে পালাতে চেষ্টা করে বিফল হয়। হাতের চায়ের কাপ মাটিতে পরে ভেঙে যায়।চিৎকার করে বেরিয়ে যায়।
রেবেকা ইয়াসমিন তার রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। জিজ্ঞেস করেন ,কি হয়েছে। চিৎকার কিসের?চায়ের কাপ কে ভেঙেছে।"ছেলে রাহাত আঙুল দিয়ে রোজিনাকে দেখিয়ে বলে, ওর হাত থেকে পড়ে গেছে।
রেবেকা ইয়াসমিন আবার জিজ্ঞেস করেন ,তবে চিৎকার করলি যে।রোজিনা চুপ থাকে। রাহাত বলে, আম্মু ভয়ে। রেবেকা ইয়াসমিন বলেন,তুমি চুপ থাকো।তিনি উকিল মানুষ।রোজিনার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে মনের ভাষা বুঝে নেন।
দুপুরে বাপ বেটা জুমার পড়তে গেলে রোজিনা রেবেকা ইয়াসমিনের রুমে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।গত রাতে ঘুমের ঘোরে বড় স্যারের ওর রুমে প্রবেশ। শরীরে হাত দেয়া।সকালে ছোটো সাহেব কে চা দিতে গেলে ওকে জড়িয়ে ধরা ও বাদ যায়না।শেষে ম্যাডামকে বলে: "ওই বাঁশ তেলই আমার কাল হইছে ম্যাডাম। বড় স্যার জড়িয়ে ধরে কইছিলো তোর শরীর থেকে দাদির তেলের গন্ধ নেই।"
এইবার জাহানারা চৌধুরীর ঢাকায় ছেলের বাসার ছয় মাস থাকা হলোনা। রোজিনাকে নিয়ে একটু আগে আগেই গ্রামে ছুটেন।
👥