গ্রাম থেকে মা জাহানারা চৌধুরী এসেছেন আরাফাত চৌধুরীর বাসায়।তিনি আমেরিকান স্টাইলে বছরে ছয় মাস ঢাকা ছয় মাস বরিশাল থাকেন। মূলত বর্ষা ও শীত মৌসুমে রাজধানীতে ছেলের বাসায় আবাস গড়েন।এবার ও এসেছেন।সঙ্গে দুই বস্তা জিনিস পত্র ও ছেলের বউয়ের জন্য কাজের মেয়ে।আরাফাত চৌধুরীর ড্রাইভার কুদ্দুস শুধু সদরঘাট গিয়ে খালাম্মাকে রিসিভ করে ক্ষান্ত হয়নি।এখন গ্রাম থেকে নিয়ে আসা খালাম্মার বস্তার মুখ খুলে ফিনিশিং দিচ্ছে। আরাফাত চৌধুরী, স্ত্রী এডভোকেট রেবেকা ইয়াসমিন খুব আগ্রহ নিয়ে বস্তার মুখ খোলা দেখছে।কুদ্দুস বস্তার মুখ খুলতে নারিকেল,লেবু, চালতা,পেঁপে,বিভিন্ন তরকারি এক এক করে বেরিয়ে পড়ে। বাদ যায়নি আরাফাত চৌধুরীর কলার মোচা ও চিকন লতি । খুশিতে তার মুখ দিয়ে কথা বেরোলো- "মা আপনি এতো কিছু এনেছেন!"
জাহানারা চৌধুরী বলল,"বাবা এখনো শেষ হয়নি।ওই ব্যাগে তোর জন্য মুড়িমোয়া আর নারিকেল নাড়ু আছে।"
রেবেকা ইয়াসমিন এতক্ষণ চুপ করে মা ছেলের কথা শুনছিলেন।এবার তিনি বলেন,"আম্মা আমার জন্য কি এনেছেন।"
"তোমার পছন্দের পুলি পিঠা ,গুরের শন্দেশ। আর এনেছি এই রোজিনারে।" জাহানারা চৌধুরী পাশে ঘুটি শুটি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জমিলা কে দেখিয়ে বলে।
এতক্ষণ সবাই গ্রাম থেকে নিয়ে আসা জিনিস পত্র নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। জাহানারা চৌধুরীর কথায় মেয়েটির দিকে রেবেকা ইয়াসমিনের চোখে পড়ে। চোদ্দ কি পনেরো বছর বয়সী উঠতি এক কিশোরী। ফর্সা এক হারা গড়ন।যে কোনো পুরুষ একবার দেখলে দৃষ্টি এড়াতে পারবে না।এডভোকেট রেবেকা মেয়েটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে শাশুড়ির উদ্দেশে বলে, "আম্মা আপনি কাকে নিয়ে এসেছেন?"
"তোমার পছন্দ হয় নি।ওর মা ও চৌধুরী বাড়িতে কাজ করতো।আমি তোমার কথা বললাম।আমার বৌমার জন্য একটা ছোট মেয়ে দরকার। ওর মা রাজি হয়ে গেলো।"
"আম্মা ঠিক তা না..। পড়ে আপনাকে বলব।"
বৌ শাশুড়ির কথার মাঝে আরাফাত চৌধুরী বলে, মা ও রাজিয়ার মেয়ে না!"
"হ্যাঁ। তুই দেখি চিনতে পারছস।
"চেহারা তো মায়ের মতো পেয়েছে। "
আসলে আরাফাত চৌধুরী বলতে চেয়েছিল, মেয়েটা দেখতে মায়ের মতো সুন্দর হয়েছে। কিন্তু স্ত্রী রেবেকা ও ড্রাইভার সামনে থাকায় বলা হয়না। এমনিতে রেবেকার কিছুটা সন্দেহ বাতিক আছে।গত বছর ইউনিভার্সিটির পৌষ মেলায় ও এক ছাত্রীর হাত ধরেছিল। রেবেকা সেটা দুর থেকে দেখে মেয়েটিকে খুঁজে বের করে জিজ্ঞেস করেছিল,আরাফাত চৌধুরী,মানে তোমার টিচার হাত ধরে কি বলেছে।ছাত্রী ও কম যায় না।রেবেকা ইয়াসমিন এর প্রশ্নের উত্তরে বলেছে, ম্যাম আরাফাত স্যার হাত ধরে সুনীলের কবিতা আবৃত্তি করেছে। আপনি শুনবেন সেই কবিতা!
ঝগড়া হলে এখনো আরাফাত চৌধুরীকে সেই হাতধরার খোটা শুনতে হয়।
রেবেকা ইয়াসমিন শাশুড়ির রুমে প্রবেশ করে।জাহানারা চৌধুরী সবে ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বের হয়েছেন।গ্রাম থেকে নিয়ে আসা মেয়েটা বারান্দায় দাঁড়িয়ে।ইয়াসমিন কে দেখে শাশুড়ি বললো,বৌমা কিছু বলবা।
রেবেকা ইয়াসমিন উকিল মানুষ। মূল কথা বলার আগে সামান্য ভূমিকা টানেন। জিজ্ঞেস করেন রহিমা বুয়া নাস্তা দিয়েছে কিনা।পায়ের ব্যাথাটা কেমন। লঞ্চ থেকে নামতে কষ্ট হয়েছে কিনা। এরপর আসল কথা পাড়েন-
আম্মা এই মেয়েটার নাম যেনো কি।
রোজিনা।
আম্মা আপনি গ্রাম থেকে নায়িকা নিয়ে আসলেন। বাসায় আমার ধামরা একটা ছেলে।ও লেভেলে পড়ছে। আর আপনার ছেলে ও তো কম যায় না।এই বয়সে এসে ভার্সিটির ছাত্রীর হাত ধরে কবিতা আবৃত্তি করে।
তুমি আমার আদরের নাতি নিয়া খারাপ কথা বলবা না।ওর কোনো মেয়েলি দোষ পাইছো?আর আমার ছেলে আরফাত।চৌধুরী বংশের সবচে ভালো ছেলে।
কিভাবে নাতির দোষ পাবেন। আমি কোনো বন্ধু বান্ধবী কে বাসায় ঘেঁষতে দিয়েছি! আর এখন চোখের সামনে দেখবে হরিণ শাবক।
তোমার মুখে দেখছি কিছু আটকায় না।জাহানারা চৌধুরী বলে।
কেনো আটকাবে। আপনাদের বংশের রেকর্ড তো একদম বাজে। কাজের মেয়ে কে প্রেগন্যান্ট করে বিয়ে করার নজির আছে।
রেবেকা ইয়াসমিনের এই কথায় জাহানরা চৌধুরী মহা বিরক্ত হয়। তবে বিরক্ত প্রকাশ না করে বলে, মেয়েটা অভাবী। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা। মা অন্যের বাড়ী কাজ করে রোজিনা সহ চার জনের পেট চালায়।তুমি চিন্তা করো না।বছর দুই থাকবে। কিছু টাকা পয়সা সঞ্চয় হলে ওর মা গ্রামে নিয়ে বিয়ে দিয়ে দিবে।মেয়েটার স্বভাব চরিত্র ও ভালো।
শাশুড়ির এই কথায় রেবেকা ইয়াসমিন অসন্তুষ্ট মনে বসা থেকে উঠে নিজের রুমে চলে যায়। এটা ঠিক গ্রাম থেকে একটা কাজের মেয়ে আনার কথা শাশুড়ি কে সে বলেছিলো। রহিমা বুয়া কে হেল্প করবে। একটু চা করে দেয়া,শপিং মল,মাছের বাজার কাঁচা বাজারে সবজি কেনার সময় তার সাথে যাওয়া।সে ভেবেছে শাশুড়ি সাধারণ একটা গ্রাম্য মেয়ে নিয়ে আসবে। এখন দেখছে সাক্ষাৎ নায়িকা নিয়ে হাজির।
🍂
দেখতে দেখতে এই শহরে রোজিনার বেশ কিছুদিন কেটে যায়। প্রথম দিন সকালে যখন এ বাসায় আসে বারান্দায় খাঁচায় একটা ময়না পাখি দেখে। তখন তার নিজেকে ও মনে হয়েছে নিজের গ্রাম,মাঠ প্রান্তর ছেড়ে এই শহরে পাখিটার মতো নিজেকে খাঁচায় বন্দি করেছে।চোখ বেয়ে কান্না পেয়েছে।ইচ্ছে করতো বাসার কাউকে কিছু না বলে সদরঘাটে লঞ্চে উঠে বাড়ী চলে যায়।কিন্তু তখনই গ্রামে থাকা অভাবী মা ও ভাই বোনদের করুন মুখগুলো মনে পড়েছে।ওর মনে হতো এই বন্দি জীবন ও খারাপ না। দুই বেলা খাবারের চিন্তা তো করতে হয়না।
প্রথম দিকে বাড়ির বড় ম্যাডাম কে রাগী মনে হয়েছিলো।সামনে গেলে কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে ভয় পেতো। এখন ঝরতা কমে গেছে।ম্যাডাম প্রথম দিনই বলে দিয়েছে ছেলের রুমে যখন তখন না যেতে। গেলে অনুমতি নিয়ে যেতে।আর কোনো সমস্যা হলে তাকে বলতে।
রোজিনা এ বাসায় কোনো সমস্যা দেখে না। সকালে উঠে যে যার যার কাজে চলে যায়। ছোট ভাইজান রাহাত না কি নাম..। সকালে পাওয়ারুটির সাথে বয়ুম থেকে ছুরি দিয়ে কি একটু বের করে নাকেমুখে খেয়ে কলেজে ছুটে। এর পর ম্যাডাম গাড়ি নিয়ে বের হয়। তারপর স্যারের জন্য গাড়ি আসে। স্যার মানুষটা খুব ভালো। যাওয়ার সময় ভারি ব্যাগটা আগায়া দিলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।বলে তোর কিছু লাগলে আমাকে বলিস।সবাই চলে গেলে বাসা একেবারে খালি। রহিমা খালা রান্না নিয়া ব্যস্ত।ও এটা ওটা এগিয়ে দেয়। দাদীমা জাহানারা চৌধুরী কতক্ষণ পর পর ডাকে। গ্লাসে পানি ঢেলে দে।পান বানিয়ে নিয়ে আয়। ওশদের বক্স কই। টিভি ছেড়ে দে। আরও কত কী।রোজিনার কাজ করতে খারাপ লাগে না।তবে ভালো লাগে খালাম্মা যখন বলে টিভিটা অন কর,সিরিয়াল দেখি।এই কয়দিনে দুই তিনটা বাংলা সিরিয়াল ও মুখস্ত করে ফেলেছে। কোন দৃশ্যের পরে কি দেখাবে বলে দিতে পারে।
একদিন রেবেকা ম্যাডাম ডেকে বলল,কাজ কর্ম কেমন চলছে। ও মাথা নেড়ে বলেছে,ভালো।এরপর জিজ্ঞেস করেছে জামা কাপড় তো তেমন নেই আমার সাথে একদিন মার্কেটে চল।তারপর এক শুক্রবার ম্যাডামের বন্ধের দিনে মার্কেটে নিয়ে গিয়ে তিনটা নূতন জামা,সাবান,দাঁত মাজার ব্রাশ,চুলের ক্লিপ, পাউডার আরও কত কি কিনে দিয়েছে। এগুলো কেনার পর জিজ্ঞেস করেছে আর কিছু লাগবে কি না। ও আস্তে করে বলেছে, বাঁশ তেল লাগবে। কিন্তু ম্যাডাম ভিড়ের মাঝে শুনতে পায়নি। আবার জিজ্ঞেস করে কি লাগবে জোরে বল?
জোরিনা জোরে বলে,"বাঁশ তেল।"
(চলবে)