"দারিদ্র হলো সবচেয়ে নিকৃষ্টতম হিংস্রতা - গান্ধী। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ভিডিওতে দেখলাম, চুরির অভিযোগে বাবার হাত বাঁধা।আর তার কিশোরী মেয়ে দোকান থেকে রুটি - চা এনে নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছে।ঘটনাটি বরিশালের উজিরপুরে একটি বাজারে। চোর সন্দেহে লোকটাকে কিছু উত্তম-মধ্যম দিয়ে রাতভর খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়। সকালে খবর পেয়ে ছোট্ট কিশোরী মেয়েটি বাবার কাছে ছুটে আসে।বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে,বাবা সারারাত না খেয়ে আছে।সে পাশের টং দোকান থেকে চা রুটি কিনে বাবার পাশে বসে পরম মমতায় খাইয়ে দিচ্ছে। আশপাশের উৎসাহী জনতার প্রতি তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।মা যেমন সন্তান কে রুটি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে চায়ের কাপে ডুবিয়ে সন্তানের মুখে তুলে দেয়। অনেকটা সেরকম।এই দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা দেখেছে তাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।উপস্থিত লোকজন কে ও ভাবিয়েছে। তাইতো শুধু মুচলেখা দিয়ে লোকটি এই যাত্রায় বেঁচে গেছে।
আসলে বাবা তো বাবাই।চুরির অপরাধে তাকে শিকল দিয়ে বাঁধা যায়।কিন্তু বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসা শিকল দিয়ে বাঁধা যায় না।সমাজের চোখে সে চোর বা অপরাধী হোক একজন কিশোরী মেয়ের কাছে বাবা।সারারাত না খেয়ে থাকা অভুক্ত,ক্লান্ত এক বাবা। যে নিজে না খেয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেয়।
এই ঘটনা সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সুখবর হচ্ছে ' রাজকন্যার ' বদৌলতে বাবার জন্য একটি ভ্যান গাড়ির ব্যবস্থা করবে স্থানীয় একটি সংস্থা।উপজেলা প্রশাসন পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি মেয়েটির পড়াশুনার দায়িত্ব নিয়েছে।
কয়েক দিন আগে একটি স্বনামধন্য জাতীয় দৈনিকে খবর বেরিয়েছে: 28 বছর পর বাবার ঋণ শোধ করতে পাওনাদারের খোঁজে সন্তান।"
বাবা পিরোজপুর থেকে কাঁচা পাকা ফল এনে ঢাকার পাইকারি বাজারে বিক্রি করতো।ব্যবসায়িক পরিচয় সূত্রে পুরানো ঢাকার ওয়াইজঘাটে এক হিন্দু আড়ৎদার এর নিকট থেকে বাবা দশ হাজার টাকা দাদন নিয়েছিল। সেটা 1998 সালে। কিন্তু ব্যবসায়ে লোকসান খেয়ে লোকটি(বাবা) টাকা পরিশোধ না করে 2011 সালে মারা যান। মৃত্যুর সময় সে তার বড় ছেলেকে ঋণের কথা বলে যায়।আর্থিক সংকটের কারণে ছেলে এতদিন বাবার ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি। গরুর খামারে ভাগ্য পরিবর্তনে বর্তমানে আর্থিক সচ্ছলতা ফিরে পাওয়ায় বাবার সেই পাওনাদার কে খুঁজছে। ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট দিয়েছে। সরোজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখে,সেই আড়ৎদার দশ বছর আগে ব্যবসা গুটিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। কোথায় গেছে আশ পাশের কেও বলতে পারে না।
ঘটনাটি মনে দাগ কাটে বাবার ঋণ পরিশোধে ছেলের হন্যে হয়ে পাওনাদার কে খোঁজা। বাবার প্রতি তার দায়বদ্ধতা দেখে। দশ হাজার টাকা আজকাল কোনো টাকা না। সেই ব্যবসায়ী ও হয়তো কিছুকাল অপেক্ষায় থেকে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু বাবার ঋণের দায়মুক্তির ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা আজকাল কয়জন পুত্র সন্তানের আছে?
আজ বিকেলে আমার এক কলিগের হন্তদন্ত হয়ে ছুটে চলা দেখে প্রশ্ন করি। বললেন ভাবি অসুস্থ। বসুন্ধরা থেকে সে মিরপুর দুই নম্বর কমার্স কলেজে যাচ্ছে সদ্য ইন্টারে ক্লাস শুরু করা মেয়েকে বাসায় পৌছে দিতে।বললেন তিনমাস এইভাবে চলবে।ডিসেম্বরে মেয়ে যখন কলেজে একলা যেতে সাহস করবে তখন একা ছাড়া হবে।
বাবা মেয়ে বা বাবা ছেলের রক্তের এই সম্পর্ক, উদ্বিগ্নতা বা টান চিরন্তন।মেয়েটি যেমন বলেছিল বাবাকে সে ভালোবাসে।তেমনি ছেলেটি বাবাকে ভালোবেসে ঋণ থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছে।সভ্যতা একদিন ধ্বংস হবে কিন্তু রক্তের সম্পর্ক ও ভালোবাসা বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।