মানুষ আসলে কী খোঁজে?
Written By Asadullah Galib Al Sadi
মানুষের জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, এটি সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি দীর্ঘ যাত্রা। ছোটবেলায় মানুষ ভালো ফলাফল চায়, বড় হয়ে ভালো চাকরি চায়, তারপর অর্থ, সম্মান, একটি সুন্দর সংসার, সামাজিক অবস্থান এবং নিরাপত্তা চায়। কিন্তু জীবনের একটি পর্যায়ে এসে মানুষ বুঝতে পারে, এতদিন সে যা কিছু অর্জন করেছে, তার বাইরেও আরও একটি জিনিস সে খুঁজছিল।
সেটি হলো শান্তি।
অদ্ভুত বিষয় হলো, মানুষ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই জিনিসটির মূল্য অনেক সময় বুঝতে পারে তখনই, যখন সেটি হারিয়ে ফেলে।
শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার গল্প
শৈশবে আমাদের পৃথিবী ছিল ছোট। কয়েকজন বন্ধু, পরিবারের মানুষ, স্কুলের মাঠ আর কিছু ছোট ছোট স্বপ্নই ছিল পুরো জীবন।
তখন মনে হতো, বড় হলেই স্বাধীন হওয়া যাবে। কেউ আর বকবে না, নিজের মতো করে জীবন চালানো যাবে।
কিন্তু বড় হওয়ার পর বোঝা যায়, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও আসে।
শৈশবে যে মানুষটি বড় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছিল, বড় হয়ে সেই মানুষটিই আবার শৈশবের নিশ্চিন্ত দিনগুলোর কথা মনে করে।
জীবনের এই জায়গাতেই মানুষ প্রথমবার বুঝতে শেখে, সময় কখনো শুধু সামনে নিয়ে যায় না, কিছু জিনিস পেছনেও ফেলে যায়।
অর্থ মানুষকে কী দেয়?
অর্থ প্রয়োজন। অর্থ ছাড়া জীবন পরিচালনা করা কঠিন। একটি নিরাপদ বাসস্থান, পরিবারের প্রয়োজন, চিকিৎসা, শিক্ষা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সবকিছুর সঙ্গেই অর্থের সম্পর্ক আছে।
কিন্তু অর্থের একটি সীমা আছে।
অর্থ দিয়ে একটি ভালো বিছানা কেনা যায়, কিন্তু ঘুম কেনা যায় না।
দামি খাবার কেনা যায়, কিন্তু ক্ষুধা নয়।
বড় বাড়ি তৈরি করা যায়, কিন্তু সেখানে ভালোবাসা তৈরি করা যায় না।
মানুষ তাই একসময় বুঝতে পারে, জীবনের প্রয়োজন মেটাতে অর্থ অপরিহার্য হলেও, জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে শুধু অর্থ যথেষ্ট নয়।
সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন সত্য
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে।
কেউ আসে, জীবনকে সুন্দর করে। কেউ চলে যায়, জীবনকে অন্যরকম করে দিয়ে যায়।
কিছু মানুষ আমাদের সঙ্গে সারাজীবন থাকে। আবার কেউ কেউ খুব অল্প সময়ের জন্য আসে, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া স্মৃতি বহু বছর থেকে যায়।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় কাছের মানুষটির মূল্য বুঝতে পারি তার অনুপস্থিতির পরে।
একসঙ্গে থাকার সময় আমরা অভ্যাসকে ভালোবাসা ভেবে নিই। আর দূরে চলে যাওয়ার পর বুঝতে পারি, সেই মানুষটি আমাদের জীবনের কত বড় অংশ ছিল।
তাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হলো, যে মানুষটি পাশে আছে তাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া।
কারণ পৃথিবীতে কোনো উপস্থিতিই চিরস্থায়ী নয়।
মানুষ কেন এত একা?
আজ মানুষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত।
হাতে মোবাইল আছে, শত শত পরিচিত মানুষ আছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার অনুসারী আছে।
তবু মানুষের ভেতরের একাকীত্ব কমেনি।
কারণ যোগাযোগ আর সংযোগ এক জিনিস নয়।
কারও পোস্টে প্রতিদিন মন্তব্য করা যায়, কিন্তু তার মনের খবর জানা যায় না।
প্রতিদিন কথা বলা যায়, কিন্তু একজন মানুষের নীরবতার অর্থ বোঝা যায় না।
মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অনেক সময় কথা বলার মানুষ নয়, বোঝার মতো একজন মানুষ।
যার সামনে নিজের দুর্বলতা লুকাতে হয় না।
যার কাছে সফল হওয়ার অভিনয় করতে হয় না।
যার সামনে মানুষ শুধু মানুষ হয়েই থাকতে পারে।
আমরা কেন অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করি?
মানুষের অশান্তির একটি বড় কারণ হলো তুলনা।
অন্যের বাড়ি দেখে নিজের বাড়িকে ছোট মনে হয়।
অন্যের গাড়ি দেখে নিজের গাড়িকে পুরোনো মনে হয়।
অন্যের সাফল্য দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে হয়।
কিন্তু আমরা ভুলে যাই, আমরা অন্যের জীবনের দৃশ্যমান অংশের সঙ্গে নিজের জীবনের অদৃশ্য অংশের তুলনা করছি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত মানুষের আনন্দ দেখি, সংগ্রাম দেখি না।
আমরা তার সাফল্য দেখি, ব্যর্থতার বছরগুলো দেখি না।
আমরা তার হাসি দেখি, রাতের কান্না দেখি না।
তাই অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করা অনেক সময় নিজের প্রতি অন্যায়।
শেষ পর্যন্ত মানুষ কী রেখে যায়?
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সম্ভবত নিজের ব্যাংক ব্যালান্সের হিসাব করে না।
সে মনে করে মানুষগুলোর কথা।
কে পাশে ছিল।
কাকে কষ্ট দিয়েছে।
কার হাত ধরেছিল।
কাকে সময় দিতে পারেনি।
কোন কথাটি বলা উচিত ছিল কিন্তু বলা হয়নি।
তখন হয়তো বোঝা যায়, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ছিল সময়।
যে সময় আমরা টাকা উপার্জনের জন্য দিয়েছি, সেটি আর ফিরে আসেনি।
যে মানুষটিকে বলেছিলাম, “পরে কথা বলব”, সেই ‘পরে’ হয়তো আর আসেনি।
জীবন আসলে খুব দীর্ঘ মনে হয়, যতক্ষণ না আমরা পেছনে ফিরে তাকাই।
তখন বোঝা যায়, জীবন দীর্ঘ ছিল না।
জীবন ছিল কিছু মুহূর্তের সমষ্টি।
কিছু হাসি।
কিছু কান্না।
কিছু মানুষ।
কিছু বিচ্ছেদ।
কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন।
আর অসংখ্য না-বলা কথা।
শেষ কথা
মানুষ সারাজীবন কিছু না কিছু পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চাওয়ার তালিকা ছোট হতে থাকে।
একসময় সে শুধু চায়, কাছের মানুষগুলো ভালো থাকুক।
নিজের মানুষগুলো পাশে থাকুক।
মনের ভেতর অকারণ ভার না থাকুক।
আর রাতের শেষে নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে না হোক।
সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া নয়।
বরং এতদূর এসে এমনভাবে বেঁচে থাকা, যাতে একদিন পেছনে তাকিয়ে বলা যায়—
“আমি সবকিছু পাইনি, কিন্তু যা পেয়েছিলাম, তার মূল্য বুঝেছিলাম।”
আর হয়তো সেখানেই জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য।
Written By Asadullah Galib Al Sadi