Written By Asadullah Galib Al Sadi
রহিমা বেগম অনেকক্ষণ ফাইলটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। কাদের মিয়া উঠানের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাত তখন অনেক গভীর। চারপাশের বাড়িগুলোতে আলো নিভে গেছে। শুধু রহিমা বেগমের ঘরের জানালা দিয়ে হলুদ আলো বের হচ্ছিল।
রহিমা বেগম ধীরে বললেন, কাদের, কী আছে এই কাগজে?
কাদের মিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, এই বাড়ির পেছনের তিন বিঘা জমির পুরো মালিকানা আপনার পরিবারের নামে নেই।
রহিমা বেগম যেন কথাটা বুঝতে পারলেন না।
তিনি বললেন, কী বলছ তুমি? জমিটা তো হাকিমের বাবার সময় থেকেই আমাদের।
কাদের মিয়া মাথা নিচু করে বললেন, জানি। কিন্তু প্রায় ত্রিশ বছর আগে একটা দলিল করা হয়েছিল। তখন আপনার স্বামী কিছু টাকা ধার নিয়েছিলেন।
রহিমা বেগমের বুকটা ধক করে উঠল।
হাকিম সাহেব জীবিত থাকতে তিনি কখনো এমন কোনো কথা শোনেননি।
কাদের মিয়া বললেন, ঋণের টাকা পরিশোধ করা হয়েছিল কি না, তার প্রমাণ নেই। আর সেই পুরোনো দলিলেই একটা শর্ত ছিল।
কী শর্ত?
জমি বিক্রি করলে পাওনাদারের পরিবারের অনুমতি লাগবে।
রহিমা বেগম চুপ হয়ে গেলেন।
তারপর বললেন, এত বছর পর তারা আবার কেন আসবে?
কাদের মিয়া এবার রহিমার দিকে তাকালেন।
কারণ জমির দাম এখন অনেক বেড়েছে।
এই কথাটাই যেন সবকিছু পরিষ্কার করে দিল।
রফিক কেন জমি বিক্রি করতে চাইছে, সেটাও রহিমা বেগমের মনে প্রশ্ন তৈরি করল।
কাদের মিয়া চলে যাওয়ার আগে শুধু বললেন, কাউকে এখনই কিছু বলবেন না। আগে কাগজগুলো ভালো করে দেখুন।
রাতটা রহিমা বেগমের আর ঘুম হলো না।
সকালে রফিক নাস্তার টেবিলে বসে বলল, মা, আমি আজ শহরে ফিরে যাব। জমির ব্যাপারটা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।
সেলিম সঙ্গে সঙ্গে বলল, এত তাড়া কিসের?
রফিক বিরক্ত হয়ে তাকাল।
বললাম তো, জমিটা বিক্রি করতে হবে।
সেলিম বলল, আমি বিক্রি করব না।
রফিক এবার গলা উঁচু করল।
তুই একা সিদ্ধান্ত নেওয়ার কে?
সেলিমও চুপ থাকল না।
আর তুই শহরে থাকিস বলে সবকিছুর মালিক হয়ে গেলি?
মা দুজনকে থামানোর চেষ্টা করলেন।
কিন্তু তখন আর কেউ কারও কথা শুনছিল না।
মায়া রান্নাঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। সে এগিয়ে এসে বলল, তোমরা বাবার কথা অন্তত একবার মনে করো।
রফিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বাবা নেই। এখন আমাদের নিজেদের জীবন দেখতে হবে।
কথাটা বলেই সে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
সেলিমও অন্যদিকে চলে গেল।
রহিমা বেগম একা বসে রইলেন।
তার চোখের সামনে বারবার স্বামীর মুখ ভেসে উঠছিল।
হাকিম সাহেব মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তাকে একটি কথা বলেছিলেন।
আমি না থাকলে ছেলেদের মধ্যে যেন জমি নিয়ে ঝগড়া না হয়।
তখন রহিমা বেগম হেসে বলেছিলেন, ওরা কখনো ঝগড়া করবে না।
আজ মনে হলো, মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যত নিশ্চিন্ত থাকে, সময় তাকে তত বেশি ভুল প্রমাণ করে।
সেদিন দুপুরে রফিক শহরে চলে গেল।
কিন্তু যাওয়ার আগে সে মাকে বলল, মা, একটা কথা মনে রেখো। এই জমি নিয়ে আমি কাউকে ঠকাতে চাই না। কিন্তু আমার অংশ আমি ছাড়ব না।
রহিমা বেগম কোনো উত্তর দিলেন না।
রফিক চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর বাড়ির সামনে একটি সাদা গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নামলেন মধ্যবয়সী একজন লোক।
তার হাতে একটি কালো ব্যাগ।
তিনি সরাসরি বাড়ির উঠানে এসে বললেন, এটা কি হাকিম সাহেবের বাড়ি?
রহিমা বেগম দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন।
লোকটি বলল, আমার নাম মাহবুব। আপনার স্বামীর সঙ্গে আমার বাবার একটা পুরোনো হিসাব ছিল।
রহিমা বেগমের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
মাহবুব ব্যাগ থেকে একটি কাগজ বের করলেন।
আমি সেই হিসাব মিটাতে এসেছি।
কিন্তু কাগজটি হাতে নিয়ে রহিমা বেগম দেখলেন, এটি কোনো সাধারণ হিসাবের কাগজ নয়।
এটি ছিল জমি বিক্রির একটি পুরোনো চুক্তিপত্র।
আর সেখানে সাক্ষী হিসেবে যে নামটি লেখা ছিল, সেটি দেখে রহিমা বেগমের হাত কাঁপতে শুরু করল।
কারণ সাক্ষী ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাকে তিনি আজও নিজের পরিবারের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মানুষ বলে মনে করেন।