Written By Asadullah Galib Al Sadi
বান্দরবানের পাহাড়ে যাওয়ার পরিকল্পনাটা হঠাৎ করেই হয়েছিল। আমি সাংবাদিক আসাদুল্লাহ গালিভ আল সাদি। স্ত্রী জেনিয়া জয়ার সঙ্গে কয়েকদিনের জন্য পাহাড়ে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল কিছু ছবি তোলা এবং শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে থাকা।
সকালে স্থানীয় একজন বৃদ্ধের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হলো। কথা বলতে বলতে তিনি জানালেন, পাহাড়ের অনেক ভেতরে একটি পুরোনো ব্রিটিশ আমলের পথ রয়েছে, যেটি এখন প্রায় কেউ ব্যবহার করে না।
আমি স্বভাবতই আগ্রহী হয়ে গেলাম।
পরদিন সকালে আমরা একজন স্থানীয় গাইডকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম।
পাহাড়ি পথ ধীরে ধীরে কঠিন হতে লাগল। মোবাইলের নেটওয়ার্ক অনেক আগেই চলে গেছে। চারপাশে শুধু পাহাড় আর বন।
দুপুরের দিকে আমরা একটি পুরোনো পাথরের দেয়ালের কাছে পৌঁছালাম। দেয়ালের নিচে মাটির মধ্যে অর্ধেক চাপা একটি ধাতব বাক্স দেখতে পেলাম।
বাক্সটি খুলতেই পাওয়া গেল পুরোনো একটি কাগজ।
কাগজটি আসলে একটি মানচিত্র।
জেনিয়া অবাক হয়ে বলল, তুমি কি বুঝতে পারছ এটা কী?
আমি মানচিত্রটি হাতে নিয়ে দেখলাম। সেখানে পাহাড়ের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় লাল চিহ্ন দেওয়া।
আমাদের সাংবাদিকসুলভ কৌতূহল এবার আর থামল না।
মানচিত্র অনুসরণ করে আমরা আরও ভেতরে গেলাম। কিছুক্ষণ পর গাইড বলল, এই পথ ঠিক নয়।
কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
আকাশ হঠাৎ কালো হয়ে এল। পাহাড়ে বৃষ্টি শুরু হলো। পাথর পিচ্ছিল হয়ে গেল। আমাদের গাইড পিছলে পড়ে আহত হলো।
আমরা তাকে নিয়ে আশ্রয়ের জায়গা খুঁজতে গিয়ে একটি ছোট গুহা দেখতে পেলাম।
গুহার ভেতরে ঢুকতেই দেয়ালে অদ্ভুত কিছু চিহ্ন চোখে পড়ল।
টর্চের আলো ফেলতেই বুঝলাম, এগুলো আসলে পুরোনো পথচিহ্ন।
আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, গুহার শেষ প্রান্তে একটি কাঠের বাক্স রাখা ছিল।
বাক্সের ভেতরে কোনো সোনা বা মূল্যবান জিনিস ছিল না।
ছিল কয়েকটি পুরোনো ডায়েরি।
ডায়েরিগুলো পড়তে গিয়ে বুঝলাম, বহু বছর আগে পাহাড়ি এলাকায় কাজ করা একজন ব্রিটিশ জরিপ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথি এগুলো। সেখানে পাহাড়, নদী, বন এবং স্থানীয় মানুষের জীবন নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা ছিল।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম, আমরা কোনো গুপ্তধন পাইনি। তার চেয়েও মূল্যবান কিছু পেয়েছি।
একটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস।
ঢাকায় ফিরে আমি ডায়েরির তথ্য নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম। পরে স্থানীয় ইতিহাসবিদদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম এবং সেই নথিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে দেওয়া হলো।
জেনিয়া একদিন আমাকে বলল, তুমি কি জানো, সেদিন পাহাড়ে আমরা আসলে কী খুঁজতে গিয়েছিলাম?
আমি বললাম, কী?
সে হেসে বলল, তুমি ভেবেছিলে গুপ্তধন খুঁজছ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুমি ইতিহাস খুঁজে পেয়েছ।
আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলাম, সাংবাদিকতার সবচেয়ে সুন্দর দিকটাও হয়তো এটাই। কখনো কখনো খবর খুঁজতে গিয়ে এমন একটি গল্প পাওয়া যায়, যার মূল্য কোনো গুপ্তধনের চেয়েও বেশি।