Written By Asadullah Galib Al Sadi
সেদিন কুয়াকাটায় সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখার কথা ছিল। আমি সাংবাদিক আসাদুল্লাহ গালিভ আল সাদি। সঙ্গে স্ত্রী জেনিয়া জয়া। বিকেলে সমুদ্রের পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে একজন বৃদ্ধ জেলের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হলো।
কথার একপর্যায়ে তিনি বললেন, সমুদ্রের অনেক ভেতরে একটি পুরোনো বাতিঘরের ধ্বংসাবশেষ আছে। সেখানে নাকি বহু বছর আগে একটি ট্রলার নিখোঁজ হয়েছিল।
গল্পটা শুনেই আমার কৌতূহল তৈরি হলো।
সন্ধ্যার একটু আগে আমরা একটি ছোট ট্রলারে উঠলাম। উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রের কাছাকাছি গিয়ে সূর্যাস্ত দেখা।
কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ আবহাওয়া বদলে গেল।
আকাশ কালো হয়ে গেল। বাতাস বেড়ে গেল। ঢেউও দ্রুত বড় হতে শুরু করল।
নৌকার মাঝি বলল, আমাদের এখনই ফিরে যেতে হবে।
কিন্তু ফেরার পথেই ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল।
চারপাশে শুধু পানি।
মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই।
জেনিয়া আমার পাশে বসে চুপ করে ছিল। তার চোখে ভয় স্পষ্ট।
কিছুক্ষণ পর দূরে একটি ক্ষীণ আলো দেখা গেল।
মাঝি বলল, ওটা হয়তো পুরোনো বাতিঘরের আলো।
কিন্তু বাতিঘর তো বহু বছর ধরে বন্ধ।
আলোটি আমাদের দিকে আসছিল না। একই জায়গায় স্থির ছিল।
আমরা নৌকাটি সেই দিকে ঘোরালাম।
কিছুক্ষণ পর একটি পুরোনো কাঠের কাঠামো চোখে পড়ল। সেটি আসলে একটি পরিত্যক্ত ছোট ঘাট।
ঘাটের পাশে একটি মরচে ধরা লোহার বাক্স ছিল।
বাক্সটি খুলে পাওয়া গেল একটি পুরোনো ডায়েরি এবং কয়েকটি ছবি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা ছিল একটি ট্রলারের নাম এবং একটি তারিখ।
আমরা বুঝতে পারলাম, এটি সেই নিখোঁজ ট্রলারের নথি।
ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল, ঝড়ের রাতে ট্রলারটি কোথায় আশ্রয় নিয়েছিল তার বর্ণনা।
কিন্তু গল্পের সবচেয়ে অদ্ভুত অংশ ছিল শেষ পাতার একটি লাইন।
সেখানে লেখা ছিল, যদি কেউ এই ডায়েরি খুঁজে পায়, তাহলে বুঝবেন আমরা সমুদ্রে হারিয়ে যাইনি। আমরা ফিরে আসার পথ খুঁজে পেয়েছিলাম।
এরপর আর কোনো লেখা নেই।
পরদিন সকালে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় আমরা তীরে ফিরলাম।
আমি ডায়েরি ও ছবিগুলো নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলাম। পরে জানা গেল, বহু বছর আগে নিখোঁজ হওয়া সেই ট্রলারের কয়েকজন যাত্রী শেষ পর্যন্ত অন্য একটি উপকূলীয় এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনাটি কখনো সঠিকভাবে নথিবদ্ধ হয়নি।
একটি পুরোনো ডায়েরি সেই ভুলে যাওয়া গল্পটিকে আবার সামনে নিয়ে এলো।
জেনিয়া আমাকে বলল, সমুদ্রের সবচেয়ে রহস্যময় বিষয় কী জানো?
আমি বললাম, কী?
সে বলল, সমুদ্র অনেক কিছু নিয়ে যায়, কিন্তু সব গল্প মুছে ফেলতে পারে না।
আমি ক্যামেরাটা বন্ধ করে সমুদ্রের দিকে তাকালাম।
সূর্য তখন উঠছে।
গত রাতের ঝড়ের কোনো চিহ্ন নেই।
কিন্তু আমি জানতাম, সেই সমুদ্রের নিচে কিংবা কোনো পুরোনো ঘাটের পাশে আরও কত গল্প হয়তো অপেক্ষা করছে, শুধু একজন মানুষের ফিরে তাকানোর অপেক্ষায়।