যে উঠানে একসময় সবাই ছিল
Written By Asadullah Galib Al Sadi
গ্রামের নাম চরবাড়িয়া। গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি। বাড়িটির সামনে বিশাল একটি আমগাছ। গাছটির বয়স কত, তা কেউ ঠিক করে বলতে পারে না। গ্রামের বয়স্করা শুধু জানে, তারা ছোটবেলায়ও এই গাছটিকে এমনই বড় দেখেছে।
এই বাড়িতেই একসময় থাকতেন আবদুল হাকিম। স্ত্রী রহিমা বেগম, দুই ছেলে রফিক ও সেলিম এবং এক মেয়ে মায়া। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না।
হাকিম সাহেব সারাজীবন কৃষিকাজ করেছেন। নিজের বলতে ছিল কয়েক বিঘা জমি, বাড়ির পাশে পুকুর আর সেই পুরোনো দোতলা বাড়ি।
ছেলেদের তিনি সবসময় বলতেন, জমি ভাগ হয়ে গেলে আবার কেনা যায়, কিন্তু ভাই ভাগ হয়ে গেলে আর আগের মতো পাওয়া যায় না।
তখন দুই ভাই হাসত।
রফিক বলত, আমরা কোনোদিন আলাদা হব না।
সেলিম বলত, বাবা এসব কথা কেন বলেন?
হাকিম সাহেব তখন চুপ করে যেতেন।
তিনি হয়তো বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন নিজের মানুষও নিজের থাকে না।
বছর কেটে গেল।
রফিক শহরে গিয়ে ব্যবসা শুরু করল। সেলিম গ্রামেই থেকে বাবার সঙ্গে জমি দেখাশোনা করতে লাগল। মায়ার বিয়ে হয়ে গেল পাশের উপজেলায়।
বাবা মারা যাওয়ার পর প্রথম কয়েক বছর সবকিছু ঠিকই ছিল।
কিন্তু সমস্যা শুরু হলো একটি জমি নিয়ে।
বাড়ির পেছনে প্রায় তিন বিঘা জমি ছিল। জমিটির বাজারমূল্য হঠাৎ অনেক বেড়ে গেল। গ্রামের পাশ দিয়ে নতুন সড়ক হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছিল।
রফিক একদিন শহর থেকে বাড়িতে এসে বলল, জমিটা বিক্রি করে দিলে ভালো হয়।
সেলিম সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলো না।
সে বলল, বাবা এই জমি বিক্রি করতে নিষেধ করেছিলেন।
রফিক হেসে বলল, বাবা যখন বলেছিলেন তখন পরিস্থিতি আলাদা ছিল। এখন সময় বদলেছে।
সেলিম চুপ করে রইল।
সেদিন রাতের খাবারের টেবিলে দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো তর্ক হলো।
মা রহিমা বেগম পাশে বসে শুধু বলছিলেন, তোরা ঝগড়া করিস না বাবা।
কিন্তু কারও কথা কেউ শুনল না।
রফিক বলল, আমি আমার অংশ চাই।
সেলিম বলল, তোর অংশ কেউ আটকে রাখেনি। কিন্তু বাবার শেষ ইচ্ছাটাও তো কিছু একটা।
রফিক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, বাবার কথা বলে সবসময় আমাকে থামাতে পারবি না।
ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
মায়া দূর থেকে সব শুনছিল।
সে বুঝতে পারল, আজকের ঝগড়া শুধু একটি জমি নিয়ে নয়।
এর পেছনে আরও কিছু আছে।
অনেক দিনের জমে থাকা অভিমান।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর রহিমা বেগম একা উঠানে এসে বসলেন। আমগাছের দিকে তাকিয়ে তার চোখে পানি চলে এলো।
এই উঠানেই একসময় তার দুই ছেলে দৌড়াত।
একজন আরেকজনকে ধরে মারামারি করত।
আবার কিছুক্ষণ পর একই থালায় ভাত খেত।
আজ সেই দুই ছেলে একই বাড়িতে থেকেও যেন একে অপরের কাছে অচেনা।
ঠিক তখন বাইরে থেকে কারও ডাক শোনা গেল।
রহিমা বেগম চমকে উঠলেন।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল গ্রামের পুরোনো দলিল লেখক কাদের মিয়া।
তার হাতে একটি পুরোনো ফাইল।
কাদের মিয়া নিচু গলায় বললেন, খালা, একটা কথা ছিল। এই কাগজটা আজ না দেখালে হয়তো পরে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
রহিমা বেগম ফাইলটির দিকে তাকালেন।
তারপর কাঁপা হাতে সেটি নিলেন।
ফাইলের ওপর লেখা ছিল তাদের পরিবারের জমির পুরোনো দলিল।
কিন্তু কাদের মিয়া যে কথাটি বললেন, সেটিই পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
তিনি বললেন, খালা, এই জমির মালিকানা নিয়ে একটা বড় সমস্যা আছে।
রহিমা বেগমের মুখ শুকিয়ে গেল।
আর দূরে আমগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তখনও চাঁদের আলো উঠানের ওপর পড়ে ছিল।
যে উঠানে একসময় সবাই ছিল।