Story

বৃষ্টির দিনে তোমাকে হারিয়েছিলাম

October 1, 2026

9 views

সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল। শহরের রাস্তাগুলো পানিতে ভেসে যাচ্ছিল। বাসস্ট্যান্ডের টিনের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে মেঘলা বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল। হাতে একটি ছোট নীল ছাতা। চোখে অস্থিরতা। অর্ণব আসবে বলেছিল। বিকেল পাঁচটায়। এখন বাজে ছয়টা পঁচিশ। মেঘলা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। অর্ণবের শেষ মেসেজটা এখনও সেখানে আছে। আমি আসছি।

তুমি অপেক্ষা করো। মেসেজটা দুপুর চারটা বিয়াল্লিশ মিনিটে এসেছিল। তারপর আর কোনো খবর নেই। মেঘলা আবার ফোন করল। ফোন বন্ধ। বৃষ্টির পানি তার পায়ের কাছে জমে ছিল। ভিজে যাওয়া স্যান্ডেলের ভেতর কাদা ঢুকে গেছে। তবু সে জায়গা ছাড়ল না। কারণ অর্ণব তাকে কখনো অপেক্ষা করিয়ে রাখত না। তাদের পরিচয় হয়েছিল তিন বছর আগে, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে। মেঘলা একটা বই খুঁজছিল। অনেকক্ষণ তাকিয়েও বইটা পাচ্ছিল না। অর্ণব পাশ থেকে বইটা এগিয়ে দিয়েছিল। আপনি এই বইটাই খুঁজছেন? মেঘলা মাথা নেড়ে বইটা নিয়েছিল।

সেদিন তাদের মধ্যে আর কোনো কথা হয়নি। কিন্তু পরের দিন অর্ণব আবার একই টেবিলে বসেছিল। তারপর প্রায় প্রতিদিন। কেউ কাউকে ভালোবাসি বলেনি। তবু ভালোবাসা কখন যে তাদের জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অংশ হয়ে উঠেছিল, তারা নিজেরাও বুঝতে পারেনি। অর্ণব জানত মেঘলা চায়ে বেশি চিনি পছন্দ করে না। মেঘলা জানত অর্ণব মন খারাপ করলে একা হয়ে যায়। অর্ণব জানত, মেঘলা রাগ করলে চুপ করে থাকে। মেঘলা জানত, অর্ণব বিদায় বলার সময় সবসময় একবার পেছনে তাকায়। তাদের ভালোবাসা ছিল খুব সাধারণ। কোনো দামি উপহার ছিল না। ছিল একসঙ্গে হাঁটা, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়া, পরীক্ষার আগের রাতে ফোনে কথা বলা, হঠাৎ বৃষ্টি এলে একই ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা। আর ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে ছোট ছোট স্বপ্ন।

একদিন অর্ণব বলেছিল, চাকরি হলে আমরা একটা ছোট বাসা নেব। মেঘলা হেসে বলেছিল, বাসাটা ছোট হলেও জানালাটা বড় হতে হবে। কেন? জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখা যাবে। অর্ণব বলেছিল, তাহলে জানালার পাশে তোমার জন্য একটা চেয়ার থাকবে। মেঘলা বলেছিল, আর তোমার জন্য? আমি তো তোমার পাশেই থাকব। সেই কথাটা মনে পড়তেই মেঘলার চোখ ভিজে উঠল। বৃষ্টি আর চোখের পানি আলাদা করা গেল না। সেদিন অর্ণব তাকে শেষবার দেখা করার জন্য ডেকেছিল। বলেছিল, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা আছে। মেঘলা ভেবেছিল, হয়তো আজ অর্ণব তাকে বিয়ের কথা বলবে। হয়তো তিন বছরের অপেক্ষার শেষ হবে। হয়তো তাদের ছোট বাসার স্বপ্নটা সত্যি হতে চলেছে। কিন্তু অর্ণব এল না। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলো। বাসস্ট্যান্ড প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল। মেঘলা শেষবার ফোন করল। ফোন বন্ধ। সে ধীরে ধীরে বাসায় ফিরে গেল। পরদিন সকালে খবরটা এল।

অর্ণব আগের রাতেই দুর্ঘটনায় মারা গেছে। রাত সাড়ে পাঁচটার দিকে অফিস থেকে বের হওয়ার পর তার মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। মেঘলা খবরটা বিশ্বাস করতে পারেনি। তার মনে হয়েছিল কেউ ভুল করেছে। অর্ণব মরতে পারে না। কারণ অর্ণব তাকে কথা দিয়েছিল। বড় জানালাওয়ালা একটা ছোট বাসা হবে তাদের। সেদিন দুপুরে মেঘলা অর্ণবের বাড়িতে গেল। অর্ণবের মা তাকে দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর একটি ছোট খাম মেঘলার হাতে দিলেন। অর্ণব এটা তোমার জন্য রেখে গিয়েছিল। মেঘলা কাঁপা হাতে খামটা খুলল। ভেতরে একটি ছোট কাগজ।

কাগজে অর্ণবের হাতের লেখা। মেঘলা, তোমাকে একটা কথা আজ বলব ভেবেছিলাম। আমি জানি না তুমি আমার সঙ্গে কতদূর যেতে চাও। কিন্তু আমি জানি, আমি তোমার সঙ্গে পুরো জীবনটা যেতে চাই। তোমার জন্য একটা ছোট বাসা দেখেছি। খুব বড় নয়। তবে একটা বড় জানালা আছে। জানালার পাশে একটা চেয়ারও থাকবে। তুমি বৃষ্টি দেখবে। আমি তোমাকে দেখব। কাগজের নিচে আরেকটি লাইন ছিল। আজ বিকেল পাঁচটায় তোমাকে সেই বাসাটা দেখাতে নিয়ে যাব। মেঘলা কাগজটা বুকে চেপে ধরে কাঁদতে লাগল। মানুষ কখনো কখনো খুব কাছে থেকেও ভবিষ্যৎ দেখতে পারে না। অর্ণব দেখেছিল। কিন্তু সেই ভবিষ্যতে পৌঁছাতে পারেনি। তারপর পাঁচ বছর কেটে গেল। মেঘলা শহর ছেড়ে অন্য শহরে চলে গেল। চাকরি নিল। নিজেকে কাজে ডুবিয়ে রাখল। মানুষ তাকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে, বিয়ে করছ না কেন? সে কোনো উত্তর দেয়নি। কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষ জানে না। শুধু জানে, তার ভেতরে কোথাও একজন মানুষ এখনও বেঁচে আছে। পাঁচ বছর পর এক বর্ষার দিনে মেঘলা আবার সেই শহরে ফিরল। পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের সামনে এসে দাঁড়াল। সবকিছু বদলে গেছে। নতুন দোকান হয়েছে। রাস্তা বড় হয়েছে।

বাসস্ট্যান্ডের ছাউনিটাও বদলে গেছে। শুধু বৃষ্টি একই রকম আছে। মেঘলা ছাতা বন্ধ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ তার চোখ গেল রাস্তার ওপারের একটি পুরোনো বাড়ির দিকে। বাড়িটা সে চিনতে পারল। সেই বাড়ি। যে বাড়ির একটি ছোট ঘরে অর্ণব তাদের ভবিষ্যৎ খুঁজে পেয়েছিল। মেঘলা ধীরে ধীরে বাড়িটার সামনে গেল। দরজায় তালা। কিন্তু জানালার পাশে একটা চেয়ার এখনও আছে। ঠিক যেমন অর্ণব বলেছিল। মেঘলা জানালার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছিল কাঁচের ওপর। সে চোখ বন্ধ করল। মনে হলো, পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ যেন বলছে, তুমি বৃষ্টি দেখতে চেয়েছিলে না? মেঘলা চোখ খুলল। কেউ নেই। শুধু বৃষ্টি। শুধু একটা খালি চেয়ার। আর পাঁচ বছর আগের অসমাপ্ত একটা ভালোবাসা। মেঘলা হাসল। চোখের পানি মুছে ফেলল। তারপর খুব আস্তে করে বলল, আমি এখনও বৃষ্টি দেখি অর্ণব। শুধু তুমি পাশে নেই। সেদিন মেঘলা বাড়ি ফিরে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগে জানালার নিচে একটি ছোট কাগজ রেখে গেল। সেখানে শুধু একটি লাইন লেখা ছিল। তুমি যে জানালাটা আমার জন্য রেখে গিয়েছিলে, সেখানে আজও বৃষ্টি পড়ে।

Picked up where you left off

Comments

Borhan mahmud was this story’s first reader

+20 XP

    Please login to post comment. Login

  • Borhan mahmud 22 hours ago First reader

    এন্ডিং সেন্টেন্সটা দারুণ লিখেছেন। খুব ভালো লিখেছেন। অজ্ঞাতে মৃত্যু ভালোবাসার মানুষের কাছে কতো প্রতিজ্ঞা রেখে যায়! আহা, কান্নার জীবন।