Story

পুকুরে ডোবা সিগারেট ও একটি চিঠি

September 29, 2026

19 views

সেদিন সন্ধ্যায় অফিস শেষে ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে কলনির এক কোনায় গিয়ে বসলাম। পকেট থেকে বের করা সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চোখ আটকে গেল এক অদ্ভুত দৃশ্যে। কলনির ওয়াকওয়ে জুড়ে তখন 'উন্নয়নশীল সুশীল সমাজ'-এর তরুণ-তরুণীদের মেলা।

এখন আর সেই পুরোনো যুগের ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকোচুরি প্রেম নেই—সবই এখন 'ওপেন সোর্স'! বিকেল হতেই পার্কিং আর ওয়াকওয়েতে কাপলদের আগমন ঘটতে থাকে। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে সেই প্রেম জমে ওঠে একদম জাঁকজমকভাবে। এক জোড়া শালিকের সাথে অন্য জোড়ার দূরত্ব বড়জোর দুই হাত। কে কী করছে বা ভাবছে, তা নিয়ে কারও বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। কারণ, আমরা তো এখন চরম 'আধুনিক ও সুশীল'! সুযোগ পেলে অবশ্য আমিও যে কোনো দিন একদম 'পরম সুশীল' হয়ে যাব, সেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।

এখন পাঠকদের মনে বড় একটা প্রশ্ন আসতে পারে—বাপু, তুমি ওই পরোপকারী সুশীলদের আড্ডায় বসে বসে পাহারাদারি করছ কেন?

সহজ উত্তর: চাকরির সুবাদে এই কলনিতেই আমার আস্তানা। আর সত্যি বলতে—কপালে যখন নিজের কোনো প্রেম জোটে না, তখন অপরের প্রেম চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর করারই বা কী আছে!

তবে সেখানে বহু কিসিমের প্রেমচর্চা দেখলেও একটা বিশেষ 'পদ্ধতি' আমার চোখ কেড়ে নিল। আমার ঠিক ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে—মানে একটু কান খাড়া করলেই স্পষ্ট শোনা যায় এমন জায়গায় এক তরুণী তার প্রেমিকের কাঁধে পরম শান্তিতে মাথা এলিয়ে দিয়েছে। প্রেমিকের এক হাতে ফোনের ফ্ল্যাশলাইট, অন্য হাতে ধরা বই। তরুণী পড়ছেন, আর 'প্রেমিক শিক্ষক' অত্যন্ত সিরিয়াস ভঙ্গিতে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছেন। না বুঝলে আবার সোহাগী রাগে গালে আলতো টুকাও দিচ্ছেন!

একে বলে 'নেক্সট জেনারেশন স্টাডি মেথড'! তবে শুধু এরাই নয়, কলনিতে আরও অনেকেই এমন যুগল-পড়াশোনায় মগ্ন। অবশ্য এদের পাশাপাশি কিছু রিয়েল পরীক্ষার্থীও আছে—দু-তিনজন বান্ধবী মিলে সত্যি সত্যি পড়তে আসে। তারা অবশ্য সন্ধ্যার আলো মেলাতেই সটান যার যার ঘরে সটকে পড়ে। এদের মধ্যে অন্যতম আবার মেডিকেলের পরীক্ষার্থীরা। আল্লাহ যে এদের কী দিয়ে বানিয়েছেন! সারাদিন ধরাধাম ভুলে শুধু কেতাব গিলে যাচ্ছে!

যাই হোক, ফিরে আসি সেই কাঁধে-মাথা-রাখা 'পড়ুয়া' জোড়ার কাছে।

হঠাৎ প্রেমিকা মিহি গলায় শুধাল, "আচ্ছা, এবার ফিজিক্স বইটা বের করি?"

শিক্ষকরূপী প্রেমিক গম্ভীর মুখে জবাব দিল, "ফিজিক্স কি আর এই খোলা জায়গায় পড়া যায়?"

ব্যস! এই গভীর জ্ঞানগর্ভ বাক্যটি শোনার পর তারা দুজন যেভাবে হঠাৎ হেসে গলে পড়ল, তার রসায়ন আমি অনেক ভেবেও উদ্ধার করতে পারলাম না।

সবাই এত কিছু বুঝে হাসে, আর আমি মাঝখান থেকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম! তা অবশ্য থাকবেই বা না কেন—সংসারের অত সব জটিল রসায়ন আর ফিজিক্সের জ্ঞান কি আর আমার মতো নিষ্পাপ শিশুর মাথায় ধরে?

ভাবলাম, দুনিয়ার জটিল ফিজিক্স না বুঝলেও নিরাকার নিষ্পাপ শিশু হয়েই জীবনটা পার করে দেব। কিন্তু বিধাতা হয়তো আমার কপালে অন্য কোনো মহাজাগতিক থ্রিলার লিখে রেখেছিলেন।

আমার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল ঠিক তখনই, যখন হুট করে এক অচেনা মেয়ে এসে হাজির। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার হাত থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা টান মেরে ছিনিয়ে নিয়ে সোজা পাশের পুকুরে ছুড়ে মারল! ধোঁয়া ওঠা সিগারেটটা পানিতে ছাঁৎ করে নিভে যাওয়ার সাথে সাথেই আমার হৃদপিণ্ডটাও যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।

আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি, আর মেয়েটি অতি সহাস্যে বলল, "ভাইয়া, আর কতকাল অন্য জোড়া শালিকের প্রেম দেখে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন?"

কথাটা বলেই আমার হাতে ধমাদম একটা জিনিস গুঁজে দিল। ভালো করে তাকিয়ে দেখি—একখানা চিঠি! এই টু-জি, থ্রি-জি পেরিয়ে ফাইভ-জির যুগে, যেখানে ইনস্টাগ্রামের রিলস আর হোয়াটসঅ্যাপের 'লাস্ট সিন' দেখে প্রেমের ফয়সালা হয়, সেখানে হাতে আস্ত একখানা খামের চিঠি! মেয়েটি এরপর আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, মিচকে হাসতে হাসতে বন্ধুদের ভিড়ে মিলিয়ে গেল।

আমি হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে জমানো বরফের মতো জমে দাঁড়িয়ে রইলাম। পকেটের ফুরিয়ে যাওয়া সিগারেট আর হাতের 'অ্যানালগ যুগের খাম'টার দিকে পর্যায়ক্রমে তাকাতে তাকাতে আমার একটাই চিন্তা—

হায় খোদা! এখন কি তবে আমাকেও সব কাজকাম ছেড়ে এই ওয়াকওয়েতে এসে খাতা-কলম আর ফিজিক্স বই নিয়ে 'সুশীল সমাজের' রেজিস্টার্ড মেম্বার হতে হবে? আর সবচেয়ে বড় কথা, চিঠির ভেতরে কী লেখা আছে—পড়াশোনার কোনো কড়া রুটিন, নাকি কোনো নতুন বিজ্ঞানের থিওরি?

#Nill T-Shirt

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login