রাত ২ টা ১৭ মিনিট
ঢাকার অভিজাত এলাকার এক আবাসিক ভবনের তৃতীয় তলার দক্ষিণমুখী ফ্ল্যাটে তখন সম্পূর্ণ নীরবতা বিরাজমান।শুধু একটি ঘরে মিটমিট করে জ্বলছিল মোমবাতি। সেই আলো আঁধারের মাঝে দাঁড়িয়ে বনলতা।নিজের হাতের দিকে আতঙ্কে নিয়ে তাকিয়ে ছিল।কারন হাতের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে লেগে আছে গাঢ় লাল রক্ত।তার সামনে মেঝেতে পড়ে আছে একজন পুরুষের নিথর দেহ।মুখটা দেখা যাচ্ছে না পুরোপুরি।বনলতা ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।তারপর হঠাৎ আয়নায় নিজেকে নিজে দেখেই থমকে দাঁড়াল।আয়নার বনলতা যেন তাকে দেখছে না।বরং তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে দেখছে।বনলতা ঘুরে পিছনে তাকাল। কিন্তু কেউ নেই।ঠিক তখনই তার ফোনে একটি কল এলো।স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে একটি অচেনা নম্বর।সে কল ধরল না।আবার কল এলো।এবারেও সে কল ধরেনি।এবার স্ক্রিনে একটি মেসেজ ভেসে উঠল,
“তুমি ভেবেছ, মোস্তাকিমকে মেরে সব শেষ?”
বনলতার বুকের ভেতরে ধক করে উঠলো।
কারণ মোস্তাকিম তো নেই।সে ছয় মাস আগে মারা গেছে।
বনলতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মেধাবী ছাত্রী।পঁচিশ বছর বয়সে সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক মোস্তাকিম এর সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল একাডেমিক একটি অনুষ্ঠানে। মোস্তাকিম তার সরাসরি শিক্ষক ছিল না।কিন্তু একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় বনলতার সঙ্গে তার নিয়মিত দেখা হতো।শান্ত স্বভাবের মানুষ।বয়সে বনলতার চেয়ে প্রায় দশ বছরের বড়।বিশ্ববিদ্যালয়ে তার যথেষ্ট সম্মানও ছিল।কিন্তু বনলতার জীবনে তখন অন্য একজন মানুষ ছিল।মোস্তাকিম এর সহকর্মী রাশেদ।রাশেদের সঙ্গে বনলতার সম্পর্ক বহু বছরের।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তাদের প্রেম।রাশেদ ও আইন বিভাগের শিক্ষক।
রাশেদ বনলতাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
বলেছিল,
“আমার একটা সমস্যা আছে। একটু সময় দাও। তারপর তোমাকেই বিয়ে করব।”
বনলতা অপেক্ষা করেছিল।তারপর একদিন সে জানতে পারল।রাশেদ বিবাহিত।শুধু বিবাহিতই নয়।তার একটি ছেলেও আছে।খবরটা জানার পর বনলতা তিন দিন কারও সঙ্গে কথা বলেনি।চতুর্থ দিন রাশেদ দেখা করতে এলো।বনলতা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,
“তুমি আমাকে এত বছর মিথ্যা বলেছ?”রাশেদ কোনো উত্তর দেয়নি।
শুধু বলেছিল,
“আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না।”
বনলতা সেদিন তাকে ক্ষমা করেনি।কিন্তু মানুষ কখনো কখনো ভালোবাসার চেয়ে প্রতিশোধকে বেশি শক্তিশালী মনে করে।বনলতা ঠিক সেটাই করেছিল।দুই মাস পর সে মোস্তাকিমকে বিয়ে করল।রাশেদকে দেখানোর জন্য।নিজেকে বোঝানোর জন্য।আর হয়তো রাশেদকে শাস্তি দেওয়ার জন্য।কিন্তু বিয়ের মাত্র দুই মাস পরেই সংসার ভেঙে গেল।কারণ মোস্তাকিম জানতে পারল,তার স্ত্রী এখনো রাশেদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।তালাকের দিন মোস্তাকিম শুধু একটি কথাই বলেছিল,
“বনলতা, তুমি আমাকে ব্যবহার করেছ।”
বনলতা কোনো উত্তর দেয়নি।
কিন্তু যাওয়ার সময় মোস্তাকিম তার হাতে একটি ছোট কালো ডায়েরি দিয়ে বলেছিল,
“একদিন এটা পড়বে।”
বনলতা ডায়েরিটা নেয়নি।
মোস্তাকিম সেটা নিজের ব্যাগে রেখে চলে গিয়েছিল।
ছয় মাস পরে,মোস্তাকিম মারা গেল।
পুলিশের রিপোর্ট দেখা গেল আত্মহত্যা করেছে মোস্তাকিম।তার পরিবার বলেছিল, তালাকের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই ও সেটাই বিশ্বাস করেছিল।শুধু বনলতা এটা মেনে নেয়নি।কারণ মোস্তাকিম আত্মহত্যা করার আগে তাকে একটি মেসেজ পাঠিয়েছিল।মাত্র চারটি শব্দ।“তুমি আসল সত্য জানো না।” বনলতা মেসেজটি দেখেছিল।কিন্তু উত্তর দেয়নি।
কারণ সে ভেবেছিল, মোস্তাকিম তাকে অপরাধবোধে ভোগাতে চাইছে।তারপর ছয় মাস কেটে গেছে।
আজ রাত।
রাত ২টা ১৭ মিনিট।
বনলতা আবার সেই অচেনা নম্বরের মেসেজটির দিকে তাকাল। “তুমি ভেবেছ, মোস্তাকিমকে মেরে সব শেষ?”তারপর আরেকটি মেসেজ এল।“রাশেদ তোমাকে সব বলেনি।”বনলতার হাত থেকে ফোন পড়ে গেল।
রাশেদ?
সে কি বেঁচে আছে?
হ্যাঁ।
রাশেদ বেঁচে আছে।
তাহলে মেঝেতে পড়ে থাকা মানুষটি কে?বনলতা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।
তারপর কাঁপতে কাঁপতে মৃতদেহটির মুখের দিকে হাত বাড়াল। ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।বনলতা জানালার দিকে তাকাল।দূরে নীল-লাল আলো।
পুলিশ আসছে।কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টা তখনও সে জানত না।মেঝেতে পড়ে থাকা মানুষটির ডান হাতের মুঠোয় একটি কাগজ ছিল।পুলিশ এসে কাগজটি খুলল।সেখানে মাত্র একটি বাক্য লেখা,
“বনলতা নির্দোষ নয়। কিন্তু সে খুনি নয়।”
আর কাগজের নিচে ছিল একটি তারিখ।
১৭ই জৈষ্ঠ্য
বনলতা তারিখটা দেখে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল।
কারণ
এটা তার জন্মদিন।
কিন্তু সে জানত না,
এই তারিখের সঙ্গে তার জন্মের থেকেও পুরোনো একটি হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক আছে।
আর সেই হত্যাকাণ্ডের একমাত্র জীবিত সাক্ষী তার প্রাক্তন প্রেমিক
রাশেদ।