এখন কিন্তু দেশে বিচিত্র মবোক্রিসিকে প্যাট্রোনাইজ করা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসীন না। একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার দেশ চালাচ্ছে। কিন্তু প্রফেসর সরকারের সেট করে দিয়ে যাওয়া লোকেরা এই সরকারকে ভীষণভাবে জ্বালাচ্ছে। পথেঘাটে বিব্রত করছে।
আপনি ভাবেন তো দেশে ঘটা করে বইমেলায় প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে উগ্রবাদী চিন্তা ও চেতনার বই। আবার ফলাও করে বলা হচ্ছে উগ্রবাদ দমনে কার্যকর আছে কড়া আইন। হাউ রিডিকুলাস? আপনি গোড়ায় গাছ কেটে আগায় জল ঢাললে তো হবে না।
একজন স্বীকৃত অ্যাথলেট প্রশিক্ষণ শেষে হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে উঠতে গিয়ে পুলিশি বাধার মুখে পড়েছেন। খেলাধুলা, অ্যাথলেটিক্স ও শরীরচর্চার সাথে যারা সম্পৃক্ত থাকবেন -নারীপুরুষ নির্বিশেষে তারা হাফপ্যান্ট পরবেন -এটাই তো স্বাভাবিক। পুলিশ আর্মিসহ যারা ডিফেন্সে কাজ করেন তারাও সকাল বেলার এক্সারসাইজ ও বিকেলবেলার গেমসে হাফপ্যান্ট পরেন। সবজায়গাতেই ধর্মীয় অনুভূতি টেনে আনলে সমাজ-সংসার বা বিশ্বসভায় তাল মিলিয়ে চলতে পারবেন?
আপনাকে যদি তাকওয়া অর্জন করতে হয় -এক নিমিষেই সমাজবিরোধী সোশ্যাল মিডিয়া, নষ্ট ইন্টারনেট এবং মগজ ধ্বংসকারী স্মার্টফোন সবার আগে বাদ দিতে হবে -পারবেন? যতটা জানি বাংলাদেশের মৌলভিরাই সবচেয়ে বেশি ফেসবুক ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে।
এবার শাহজালাল বিমানবন্দরে ঘটেছে আরেক ঘটনা। যেটি নিয়ে রীতিমতো তুলকালাম কাণ্ডকারখানা চলছে। অথচ সামান্য বিষয়টি অঙ্কুরেই সলভ করা যেত -যদি দায়িত্বশীল অধিকর্তাদের মধ্যে মানবিক বোধ ও সদিচ্ছা থাকত।
রিফা তামান্না, সোহানি ইসলাম সমাপ্তি ও নাজনীনের নেপাল সফর নিয়ে যা হয়েছে সেটা একবারে অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। সভ্য সমাজে এমনটা হয় না। হওয়া উচিত না।
তিন প্রাপ্তবয়স্ক বান্ধবী একসঙ্গে নেপাল ঘুরতে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে যান। স্বাভাবিকভাবেই ডকুমেন্টস টিকিট সবই ঠিকঠাক। কিন্তু তারপরও ইমিগ্রেশন তাদের আটকে দেয়। যেতে দেয়নি। না, এরা কেউ রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলার আসামি না। তিন অবিবাহিত মেয়ে একসঙ্গে যাচ্ছে, এটাই নাকি কারণ। বিয়ে না করে তারা বিদেশ যেতে পারবে না। কী জঘন্য চিন্তা এদের।
লেখক মোজাফ্ফর হোসেন তাঁর সোশ্যাল হ্যান্ডেলে লিখেছেন, বাংলাদেশে এয়ারপোর্টে নাকি একা নারী ট্রাভেল করতে গেলেই ইমিগ্রেশনে কিছু উদ্ভট জেরার মুখে পড়েন। এটা কি কোনোভাবে একটা সভ্য দেশে চিন্তা করা যায়? অবশ্য দেশ যে সভ্য না, সেটা নিয়ে আর তর্ক চলে না।
তবে ঐ ঘটনার ওখানেই শেষ না। ওই তিন নারী বিদেশ যেতে না দেওয়ায় তাদের টিকেট, বুকিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ এবং ঘটনার তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিপূরণ চেয়ে গত ৩১ অগাস্ট পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখার অতিরিক্ত আইজিপির কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছেন।
অথচ সেই আইজিপি নাকি অভিযোগের বিষয়ে কোনো সাড়া দেওয়ারও দরকার মনে করেনি!
গত ৬ সেপ্টেম্বর বিবাদীদের কাছে আইনি নোটিস পাঠানো হয়। তারও কোনো জবাব আসেনি!
তাই গত ১৫ সেপ্টেম্বর তারা রিট করেন হাই কোর্টে।
তিন নারীকে বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে অবশেষে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক নারী নাগরিকদের বৈধ বিদেশযাত্রায় শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ বা অনুরূপ লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনায় বাধা না দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ নির্দেশনা প্রণয়ন ও জারির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না -এ বিষয়েও রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে।
এখন বলেন তো -একটা সুস্থ্য সমাজব্যবস্থা কিংবা সভ্য রাষ্ট্রে এমনটা চলতে পারে? সবখানে আদালতকে কেন সিদ্ধান্ত দিতে হবে? রুল জারি করতে হবে? ওই আইজিপিই তো বিষয়টি আমলে নিয়ে তিন নারীর কাছে দুঃখপ্রকাশ তাদের নিরাপদ ভ্রমণে শুভকামনা জানিয়ে দিতে পারতেন। করেননি কারণ অধস্তন প্রতিক্রিয়াশীল কর্মীদের মতো তিনিও একই মনোভাবাপন্ন। বস্তুত ইন্টেরিম গভমেন্ট সরকারি ব্যবস্থাপনায় এমনকিছু উদ্ভট গলদ তৈরি করে দিয়ে গেছে যাতে দেশটার বোধ ও বিবেক কয়েক শ বছর পিছিয়ে গেছে।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস নিজে ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত আধুনিক ও সেক্যুলার মানুষ। ধর্ম দিয়ে নিজের জীবন পরিমাপ করেন না। কিন্তু দেশটার ওপর অজ্ঞাত কারণে রিলিজিয়াস এক্সট্রিমিজমের বোঝা চাপিয়ে গেছেন। সেই বোঝা বহন করতে হচ্ছে বিএনপি সরকারকে।
আমরা আশা করব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আদালতের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত করবে এবং ওই তিন নারীর ন্যায্য অধিকার ফিরায়ে দিয়ে দুঃখপ্রকাশ করবে।
▪️
লেখক: সাংবাদিক
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬