সত্যকে সবচেয়ে বেশি ভয় পায় তারা, যারা মিথ্যার সিংহাসনে বসে নিজেদের অমর ভাবতে শুরু করে।
এস্তেজা:
ইভান, জানো… আমি একটা জিনিস খুব গভীরভাবে অনুভব করি। এই দেশে মানুষ এখন সত্য বলার চেয়ে সত্যকে ভয় পেতে বেশি শিখে গেছে। কারণ সত্য বললে তোমাকে কোনো না কোনো খাঁচায় ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। তোমাকে কোনো দলের, কোনো গোষ্ঠীর, কোনো ষড়যন্ত্রের মানুষ বানিয়ে দেওয়া হবে।
ইভান:
কারণ তারা চায় না কেউ স্বাধীন বিবেক নিয়ে দাঁড়াক। এই সমাজ অভ্যস্ত— হয় সম্পূর্ণ সমর্থন করবে, না হয় সম্পূর্ণ শত্রু হয়ে যাবে। মাঝখানে যে “বিবেক” বলে একটা জায়গা আছে, সেটা তারা মানতেই চায় না।
এস্তেজা:
আমি যখন রাজপথে নেমেছিলাম, তখন তো কোনো পদ-পদবির জন্য নামিনি। আমি নেমেছিলাম কারণ অন্যায় দেখেছিলাম। কারণ ছাত্রদের রক্ত দেখেছিলাম। কারণ মানুষের চোখে ভয় দেখেছিলাম। কারণ নীরব থাকা তখন নিজের আত্মাকে হত্যা করার মতো মনে হয়েছিল।
ইভান:
আর আজও তুমি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছো। এটাই অনেকের সহ্য হচ্ছে না। কারণ তারা ভেবেছিল— ক্ষমতা বদলালেই তুমি বদলে যাবে। তুমি হয়তো কোনো পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে চুপ হয়ে যাবে।
এস্তেজা:
কিন্তু আমি তো কখনো পতাকার রাজনীতি করিনি, ইভান। আমি মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছি। আজও দাঁড়াই। ভালো কাজ হলে আমি প্রশংসা করি। অন্যায় হলে প্রশ্ন তুলি। আমার কাছে ন্যায়বিচারের কোনো দল নেই।
ইভান:
এই কথাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে যায় ক্ষমতালোভীদের কাছে। কারণ তারা আনুগত্য চায়, সততা না। তারা চায়— তুমি চোখ বন্ধ করে হাততালি দাও। প্রশ্ন কোরো না। জবাবদিহিতা চেয়ো না। অতীত মনে করিয়ে দিও না।
এস্তেজা:
তাই এখন পুরোনো ভিডিও টেনে আনে।পুরোনো বক্তব্য কেটে ছেঁটে ছড়িয়ে দেয়। মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়। কিন্তু একটা কথা তারা বোঝে না— মানুষের অবস্থান যদি বিবেক থেকে তৈরি হয়, তাহলে তাকে ভয় দেখিয়ে বদলানো যায় না।
ইভান:
কারণ সত্যিকারের অবস্থান সময় দেখে বদলায় না। ক্ষমতা দেখে বদলায় না। ভাইরাল দেখে বদলায় না।
এস্তেজা:
আমার প্রশ্ন খুব সহজ, ইভান। যারা এতদিন ক্ষমতায় ছিল—েতারা কি বলতে পারবে দুর্নীতি ছিল না? ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল না? অন্ধ আনুগত্য ছিল না? মানুষের কণ্ঠরোধ ছিল না? যদি এসব না-ই থাকে, তাহলে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল কেন?
ইভান:
কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো— ক্ষমতাবানরা ভাবে মানুষ সব ভুলে যায়। মানুষ হয়তো চুপ থাকে, কিন্তু মনে রাখে। ক্ষোভ জমায়। অপমান জমায়। অবশেষে একদিন বিস্ফোরিত হয়।
এস্তেজা:
সবচেয়ে কষ্ট লাগে জানো কখন? যখন কেউ সত্য বললেই তাকে চরিত্রহননের শিকার হতে হয়। এই সমাজে প্রশ্ন তোলা অপরাধ হয়ে গেছে।
ইভান:
কারণ প্রশ্ন হলো ক্ষমতার আয়না। আর আয়নায় নিজেদের মুখ দেখতে ভয় পায় অনেকেই।
এস্তেজা:
আমি নিখুঁত মানুষ না। আমার ভুল থাকতে পারে। কিন্তু একটা জিনিস নিয়ে আমি কখনো আপস করবো না— সত্য। আমি যা বিশ্বাস করি, সেটা বলবো। যেখানে অন্যায় দেখবো, সেখানে দাঁড়াবো। মানুষ রাগ করুক, আক্রমণ করুক, ভুল বুঝুক— তবুও বলবো।
ইভান:
কারণ নীরব মানুষ দিয়ে সভ্যতা বদলায় না। ইতিহাস বদলায় তারা, যারা একা হয়েও সত্য উচ্চারণের সাহস রাখে।
এস্তেজা:
রাজনীতি যদি মানুষের জন্য না হয়, তাহলে সেটা ক্ষমতার ব্যবসা ছাড়া আর কিছু না। ক্ষমতা যদি জবাবদিহিতা হারায়, তাহলে সেটা ধীরে ধীরে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। আর ভয়ংকর বিষয় হলো— আমরা এমন একটা সংস্কৃতি তৈরি করেছি, যেখানে সমালোচনা শুনলেই মানুষ শত্রু হয়ে যায়।
ইভান:
কারণ তারা ভেবেছে আনুগত্যই ভালোবাসা। আসলে না। সত্য বলা মানুষই সবচেয়ে বেশি দায়বদ্ধ হয়। যে মানুষ ভুল দেখেও চুপ থাকে, সে বন্ধু না— সে বিপদের নীরব অংশীদার।
এস্তেজা:
একটা জাতি তখনই ধ্বংসের দিকে যায়, যখন সত্য বলা মানুষ কমে যায়। যখন সবাই নিরাপদ মিথ্যার ভেতরে আশ্রয় নেয়। কিন্তু আমি এখনও বিশ্বাস করি—সত্যকে সাময়িকভাবে থামানো যায় কিন্তু হত্যা করা যায় না।
ইভান:
কারণ সত্য নদীর মতো। তাকে আটকানো যায় কিছু সময় কিন্তু চিরকাল না। একদিন সে নিজের পথ বানিয়েই বেরিয়ে আসে।
এস্তেজা:
আর তাই আমি এখনও দাঁড়িয়ে আছি। মানবতার পক্ষে। ন্যায়ের পক্ষে। বিবেকের পক্ষে। কারও ক্ষমতার জন্য না। কারও পতাকার জন্য না। শুধু নিজের দেশের প্রতি দায়বোধ থেকে।
ইভান:
তোমার কণ্ঠ থামাতে চাইবে অনেকে। কিন্তু মনে রেখো— সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দ অস্ত্রের না, একজন নির্ভীক মানুষের বিবেকের শব্দ।
এস্তেজা:
আর সেই শব্দ একবার জেগে উঠলে, কোনো অপপ্রচার, কোনো ভয়, কোনো চাপ তাকে আর স্তব্ধ করতে পারে না।