মানুষ মূলত একা।
জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে এই একাকীত্বটাকে কোনো না কোনোভাবে ঢেকে রাখে। কখনো মানুষের ভিড়ে, কখনো সম্পর্কের নামে, কখনো ব্যস্ততার অজুহাতে। পাশে থাকা মানুষগুলোকে আঁকড়ে ধরে সে নিজেকে বোঝায়—সে একা নয়।
কিন্তু রাত গভীর হলে, চারপাশের শব্দগুলো একে একে থেমে গেলে, নিজের সঙ্গে নিজের দেখা হয়।সেই সময় বোঝা যায়, ভিড় আর সঙ্গ এক জিনিস নয়।একাকীত্ব খুব অদ্ভুত একটা জিনিস।এটা দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে না। ধীরে ধীরে ঢোকে। প্রথমে একটু অভ্যাস বদলে দেয়, তারপর কথাবার্তা কমিয়ে দেয়, তারপর আনন্দের জায়গাগুলো ফাঁকা করে দেয়। একসময় এমন একটা সকাল আসে, যেদিন ঘুম থেকে উঠে মনে হয়—আজকের দিনটা আসলে কেন শুরু হলো?কেউ বুঝতে পারে না।
কারণ একাকীত্বের কোনো শব্দ নেই।এটা চোখের নিচে কালি হয়ে থাকে, দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকে, অকারণে চুপ করে থাকা হয়ে থাকে। কখনো হাজার মানুষের মাঝেও মুখের ওপর একটা অদৃশ্য দরজা এঁকে দেয়।সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, একসময় মানুষ নিজের কষ্টকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করে।কাঁদতে ইচ্ছে করে না।কথা বলতে ইচ্ছে করে না।কাউকে নিজের ভেতরের অন্ধকার দেখাতেও ইচ্ছে করে না।শুধু মনে হয়, সবকিছু থেমে গেলেই বোধহয় শান্তি।সেখান থেকেই আসে সেই ভয়ঙ্কর চিন্তা,পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার চিন্তা।
মানুষ তখন আসলে মৃত্যুকে ভালোবেসে ফেলে না। সে শুধু তার অসহ্য একাকীত্ব থেকে মুক্তি চায়। সে চায় মাথার ভেতরের অবিরাম শব্দগুলো এক মুহূর্তের জন্য থেমে যাক। সে চায় বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা আর বহন করতে না হয়।কিন্তু মানুষ ভুলে যায়, অনুভূতি কখনো স্থির থাকে না।আজ যে রাতটাকে পৃথিবীর শেষ রাত মনে হচ্ছে, কাল সেই রাতের অর্থ বদলে যেতে পারে।
আজ যে শূন্যতাকে চিরস্থায়ী মনে হচ্ছে, সেটাও একদিন অন্য কোনো অনুভূতির কাছে জায়গা ছেড়ে দিতে পারে।
জীবন সবসময় সুন্দর নয়।কখনো জীবন অসহ্য।কখনো নিজের অস্তিত্বকেই নিজের কাছে বোঝা মনে হয়।তবু অদ্ভুতভাবে মানুষ বেঁচে থাকে।একটা ভোরের জন্য।একটা অপ্রত্যাশিত ফোনের জন্য।একটা ছোট্ট ভালো লাগার জন্য।কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই।হয়তো বেঁচে থাকার জন্য সবসময় বড় কোনো কারণ লাগে না।কখনো শুধু আজকের দিনটা পার করে দেওয়াই যথেষ্ট।তারপর আরেকটা দিন।তারপর আরেকটা।একদিন হয়তো পেছনে তাকিয়ে দেখা যাবে,যে রাতটাকে শেষ মনে হয়েছিল, সেটাই আসলে শেষ ছিল না।মানুষ সত্যিই একা।কিন্তু একাকীত্ব মানুষকে গ্রাস করতে চাইলেই তাকে তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয় না।
কারণ অন্ধকার যত গভীর হোক, তার অর্থ এই নয় যে আলো আর কোথাও নেই।কখনো কখনো আলো শুধু চোখে পড়ার মতো কাছে থাকে না।তবু থাকে।আর বেঁচে থাকা মানে হয়তো সেই আলোটুকু খুঁজে পাওয়ার জন্য আরেকটা সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা।