কিছু মানুষকে জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু মন থেকে সরিয়ে দেওয়া যায় না।
সময় চলে যায়। সম্পর্কের নাম বদলে যায়। পরিচিত মানুষগুলো অপরিচিত হয়ে ওঠে। অথচ কিছু স্মৃতি ঠিক আগের মতোই থেকে যায়—একটা বন্ধ ঘরের ভেতর আটকে থাকা পুরোনো গন্ধের মতো। দরজা খুলে দিলে আবার ফিরে আসে।
আমি জানি, তাকে আমার ভুলে যাওয়া উচিত।
কিন্তু “ভুলে যাওয়া” শব্দটা যত সহজ, তার ভেতরের পথটা ততটাই কঠিন।
সে আমার জীবনের একটা অধ্যায় ছিল। সেই অধ্যায়টা সুন্দর ছিল কি না, তার উত্তর আজও আমি ঠিক জানি না। সেখানে ভালোবাসা ছিল, স্বপ্ন ছিল, কিছু সুন্দর মুহূর্ত ছিল। আবার ছিল কষ্ট, অভিমান, অপমান, ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস আর এমন কিছু রাত—যেগুলো মনে পড়লে এখনও বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আসে।
তবু সবকিছুর পরেও সে ছিল আমার জীবনের অংশ।
একটা সময় আমি ভেবেছিলাম, এই মানুষটার সঙ্গেই আমার জীবনের বাকিটা কেটে যাবে। ভবিষ্যৎ বলতে যে ছবিটা কল্পনা করতাম, সেখানে তার উপস্থিতি ছিল অবিচ্ছেদ্য। তারপর হঠাৎ একদিন বুঝলাম, কিছু সম্পর্ক শেষ হওয়ার আগে কোনো শব্দ করে না। নিঃশব্দে ভেঙে যায়। আর ভাঙার শব্দটা শোনা যায় অনেক পরে—নিজের ভেতরে।
আমার জীবনটা তছনছ হয়ে গেল।
আমি বদলে গেলাম।
আমার ভেতরের অনেক বিশ্বাস ভেঙে গেল। অনেক স্বপ্ন আর আগের মতো রঙিন রইল না। মানুষের ওপর বিশ্বাস করতে গেলেও কোথাও একটা ভয় এসে দাঁড়ায়। নতুন করে কাউকে আপন ভাবতে গেলেও পুরোনো স্মৃতিগুলো প্রশ্ন করে—
“আবার যদি সবকিছু ভেঙে যায়?”
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, যার কারণে আমার পৃথিবীটা একসময় এতটা এলোমেলো হয়ে গেল, তার পৃথিবী থেমে থাকেনি।
সে হয়তো আবার নতুন করে সংসার সাজিয়েছে। তার জীবনে নতুন মানুষ এসেছে। নতুন সম্পর্ক, নতুন ঘর, নতুন স্বপ্ন—সবকিছু হয়তো আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
আর আমার ভাগে?
একটা দীর্ঘ একাকীত্ব।
কখনো কখনো মনে হয়, জীবন যেন খুব অদ্ভুতভাবে হিসাব করে। একজন সবকিছু হারিয়ে আবার নতুন করে শুরু করার সুযোগ পায়, আর অন্যজন হারানোর পর শুধু নিজের ভাঙা অংশগুলো কুড়িয়ে বেড়ায়।
তবু আজ একটা কথা বুঝি—তার জীবনে কী হলো, সেটা আমার জীবনের মূল্য নির্ধারণ করে না।
সে আমাকে ভুলে গেছে কি না, আমার কথা মনে পড়ে কি না, তার জীবনে আমি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলাম—এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনোদিন পাব না।
কিন্তু আমার জীবনের যে অধ্যায়টা তার সঙ্গে শেষ হয়েছে, সেটাকে অস্বীকারও করতে পারি না।
কারণ সেই অধ্যায়ের ভেতরেই তো আমার একটা পুরোনো আমি ছিল।
যে আমি সহজে বিশ্বাস করতাম।
যে আমি ভালোবাসাকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতাম।
যে আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম।
যে আমি ভাবতাম, দুজন মানুষ একে অপরকে বেছে নিলে পৃথিবীর সব কঠিনতা পার হয়ে যাওয়া সম্ভব।
আজ সেই মানুষটা আর নেই।
তার জায়গায় এসেছে এক অন্য আমি—যে অনেক বেশি নীরব, অনেক বেশি সতর্ক, অনেক বেশি নিজের ভেতরে বাস করে।
কখনো কখনো রাতে একা থাকলে মনে হয়, আমি তাকে নয়—আমি আসলে আমার সেই পুরোনো জীবনটাকেই খুঁজি।
সেই সময়টাকে, যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় ছিল না।
সেই স্বপ্নগুলোকে, যেগুলো ভেঙে যাওয়ার আগে এত সুন্দর ছিল।
সেই আমিটাকে, যে জানত না বিচ্ছেদ শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়; কখনো কখনো নিজের একটা অংশকেও হারিয়ে ফেলা।
তাই হয়তো আমি তাকে কোনোদিন পুরোপুরি ভুলতে পারব না।
ভালোবাসার জন্য নয় শুধু।
কষ্টের জন্যও নয়।
বরং সে আমার জীবনের একটা অধ্যায় বলে।
কিছু অধ্যায় আমরা ছিঁড়ে ফেলতে পারি না। শুধু বইটা বন্ধ করে রাখতে হয়।
সময়ের সঙ্গে সেই অধ্যায়ের অক্ষরগুলো ফিকে হয়ে আসে। ব্যথাটা কমে যায়। একদিন হয়তো নামটা মনে পড়লেও বুকটা আর আগের মতো কেঁপে উঠবে না।
সেদিন হয়তো বুঝব—ভুলে যাওয়া মানে স্মৃতি মুছে ফেলা নয়।
ভুলে যাওয়া মানে স্মৃতির সঙ্গে বেঁচে থাকতে শেখা।
আর হয়তো একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই বলব—
“হ্যাঁ, আমার জীবন একবার তছনছ হয়েছিল। কিন্তু সেখানেই আমার গল্প শেষ হয়নি।”
কারণ কেউ আমার কাছ থেকে একটি অধ্যায় নিয়ে যেতে পারে।
আমার পুরো বইটা নয়।
আমার একাকীত্ব আমার শাস্তি নয়।
এটা হয়তো সেই নীরব সময়, যেখানে আমি ধীরে ধীরে নিজেকে আবার খুঁজে পাব।
আর যেদিন নিজেকে ফিরে পাব, সেদিন হয়তো তার নতুন জীবনের দিকে তাকিয়ে আমার আর কোনো প্রশ্ন থাকবে না।
শুধু মনে হবে—
একসময় সে আমার জীবনের সবকিছু ছিল।
আজ সে শুধু একটি অধ্যায়।
একটি অসমাপ্ত, কষ্টের, তবু অস্বীকার করতে না-পারা অধ্যায়।
আর আমি?
আমি এখনও আমার বাকি গল্পটা লিখছি।