১
সুনীল ধানক্ষেতের ভেতর শুয়ে শুয়ে হাঁপাচ্ছে। দুইদিনের অত্যাচার আর ক্ষুধার্ত দেহ কিছুতেই নড়তে চাচ্ছে না। শরীরের এখানে ওখানে পাকিস্তানিদের অত্যাচারের চিহ্ন। দুইদিন আগে তার বাড়ি হতে তুলে এনেছিলো। এই দুইদিনে জীবনের আরেক রূপ দেখে ফেলেছে সে।
দুইদিন আগে রাতের বেলা। বাড়িতে রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়ার পর চোখ লেগে এসেছিলো। চোখ দুটো যখন ঘুমে জড়িয়ে যাচ্ছিলো, ঠিক সে সময় কারা যেন ঘরের দরজায় নক করলো। সুনীল ঘরের দরজা খুলে দিতেই দেখে জনা বিশেক পাকিস্তানি সৈন্য এবং সাথে পাঁচ ছয়জন বাংগালী তার ঘর ঘিরে রেখেছে। বাংগালীদের মধ্যে তার দুজন সহপাঠিকে দেখতে পেলো। সুনীল বি এ পাশ করে স্থানীয় স্কুলে মাস্টারি করছে। এখনো বিয়ে থা করেনি। পাকিস্তানিদের সাথে আসা তার সহপাঠিদের মধ্যে কামরুজ্জামান তার দিকে আংগুল তুলে পাকিস্তানিদের দেখিয়ে বলল, ইয়ে লোক মুক্তি হ্যায়। সুনীল অবাক হয়ে গেলো কামরুজ্জামানকে এ কথাটা বলতে দেখে। এলাকার অনেকেই রাজাকারে নাম লিখিয়েছে। কামরুজ্জামানও যে রাজাকার, সেটা সে জানতো না।
কথাটা শেষ করতে না করতেই দুজন পাকিস্তানি সৈন্য এসে তার ঘাড় ধরে তাকে উঠোনে এনে মাটিতে ফেলেই হাতের লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার শুরু করল। সুনীল যতোই চিৎকার করে বলছে, সে মুক্তিবাহিনীর লোক নয়; কেউই তার কথা শুনছে না। বরং তাকে কথা বলতে দেখে আরো কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্য এসে ক্রমাগত বুট দিয়ে লাথি মারতে লাগলো। এর মধ্যে একজন বুট জুতা সমেত তার বুকের উপর দাঁড়িয়ে লাফানো শুরু করলো। সারাক্ষণ তার মনে হলো, এই বুঝি সে মারা যাবে। কিছুক্ষন মারধরের পর ক্লান্ত হয়ে পাকিস্তানিরা থেমে গেলে সুনীলের মনে হলো, স্কুলের সহপাঠি কামরুজ্জামানের কি ক্ষতি সে করেছিলো, সে কেন তাকে মুক্তি বলে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিলো! ভেবেও কোন কূলকিনারা পেলো না সুনীল। তার শুধু মনে হলো, শুধু হিন্দু হবার অপরাধেই এ ঘটনাটা ঘটছে। বাড়িতে সে আর তার বাবা ছাড়া আর কেউ নেই। পরিবারের একমাত্র সন্তান সে। মা মারা গেছেন বছর তিনেক আগে। আস্তে আস্তে মাথাটা নাড়িয়ে দেখতে পেলো, কিছু দূরে মাটিতে তার বৃদ্ধ বাবা মাটিতে পড়ে আছে। মারধোরের মধ্যে সে বুঝতেই পারেনি, তার সাথে সাথে তার বাবাকেও মারধোর করা হচ্ছে। সুনীল চিৎকার করে কাঁদছিলো এতক্ষণ। এখন পাশেই তার বাবাকে এভাবে পড়ে থাকতে দেখে কান্না থামিয়ে মাটিতে গড়িয়ে বাবার কাছে যেতে চাইলো। সুনিলকে এভাবে এগোতে দেখে একটা পাকিস্তানি সৈন্য এসে তার পিঠে বুটসমেত একটা লাথি বসালো। কোঁক করে একটা শব্দ করে সুনীল সেখানেই স্থির হয়ে গেলো। পাকিস্তানি সৈন্যদের মধ্যে কয়েকজন তাদের ঘরের ভেতর গিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র টেনে এনে উঠোনে ফেলতে লাগলো। তাদের সাথে বাংগালীগুলোও হাত মিলিয়েছে। সুনীল কান্না ভুলে মাটিতে শুয়ে শুয়ে এসব দেখছে। সে এখন বুঝে ফেলেছে, মুক্তি হিসেবে তাকে দেখিয়ে দেয়াটা মূল উদ্যেশ্য ছিলো না। এদের মূল উদ্যেশ্য ছিলো তাদের ঘর লুট করা। মুখের ভেতর লোনা স্বাদ পাচ্ছে সে। বুঝতে পেরেছে, এগুলো রক্তের স্বাদ। এসময় সুনীল দেখতে পেলো, ঘরের ভেতর হতে তার সহপাঠি কামরুজ্জামান বেরিয়ে আসছে। তার হাতে একটা ছোট বাক্স। দৃশ্যটা দেখেই সুনীল চোখ বন্ধ করে ফেলল। ওরা তাদের সিন্দুক ভেংগে মায়ের গয়নার বাক্সটা নিয়ে এসেছে। গয়নার বাক্সটা হাতে নিয়ে সুনীলের পাশ দিয়ে যাবার সময় কামরুজ্জামান দেখতে পেলো, সুনীল তার দিকে তাকিয়ে আছে। শুক্লপক্ষের আলোতে সুনীল দেখতে পেলো, তার একসময়ের স্কুলে সহপাঠি কামরুজ্জামানের চোখে একটা জান্তব উল্লাস। কামরুজ্জামানের চোখে চোখ পড়তেই কামরুজ্জামান চিৎকার করে বলে উঠলো, ইসকো পাস বন্দুক হ্যায়।
সাথে সাথে কয়েকজন পাকিস্তানি সৈনিক এসে সুনীলের উপর চড়াও হলো। সুনীলের গগনবিদারী আর্তচিৎকারে কারো মধ্যে কোন বিকার দেখা গেলো না। মাটিতে ফেলেই ক্রমাগত বুটের লাথিতে সুনীল ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠছে। দুটো পাকিস্তানি সৈন্য তাকে ক্রমাগত লাথি মারছে আর জিজ্ঞেস করে যাচ্ছে, বন্দুক কাহা হ্যায়? ক্রমাগত মারের চোটে ব্যাথায় চিৎকার করতে করতে সুনীল আর সময় পেলোনা, তাদেরকে জবাব দেয়ার যে, তার কাছে কোন বন্দুক নাই। ওরা বন্দুক কোথায় জিজ্ঞেস করতে করতে ওকে শালা মালাউনের বাচ্চা বলেও গালি দিচ্ছে। সুনীল চোখ বন্ধ করে মার খাচ্ছে আর চিৎকার করে কাঁদছে। সকল দৃশ্য সহ্য করার ক্ষমতা সব মানুষের নাই। সুনীলেরও নিজের মার খাবার দৃশ্য সহ্য করার ক্ষমতা নাই।
২
ফ্যালফ্যাল চোখে সুনীল চারপাশটা দেখছে। একটা ট্রাকে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ট্রাকে তার চারপাশে পাকিস্তানি সৈন্যরা। তার দুই হাত পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে। আচমকা মারধোরের কারণে সারা শরীর ব্যাথা। শরীর কোন দিকেই নাড়াতে পারছে না। থুতনির একপাশে কেটে গেছে। সেখান হতে রক্ত ঝরছে। মুখের ভেতর দলা পাকিয়ে থুথু জমছে। থুথু ফেলার মতো কোন উপায় নাই। চুপচাপ নিজের থুথুটা গিলে ফেলল সুনীল। লোনা স্বাদে বুঝে ফেলেছে থুথুর সাথে নিজের রক্তও খেয়েছে সুনীল। আধঘন্টা পর গাড়িটা এসে থামলো থানাসদরের ডাকবাংলোর সামনে। ভোর হয়ে এসেছে। পাকিস্তানি সৈনিকগুলো নামার সময় তাকে ধাক্কা মেরে ট্রাক হতে ফেলে দিলো ওরা। দুই হাত পেছনে বাঁধা বলে ভারসাম্য রাখতে না পেরে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল সুনীল। দৃশ্যটা দেখে সৈনিকগুলো হা হা করে হাসতে লাগলো। একজন এগিয়ে এসে তাকে ধরে দাঁড় করিয়ে দিলো। সৈনিকগুলো ডাকবাংলোর সামনের মাঠে সারীবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালো। এমন সময় ডাকবাংলোর ভেতর হতে একজন অফিসার বেরিয়ে এলেন। সৈনিকগুলো একবার সাবধান হয়ে তাকে সম্মান জানালো। সৈনিকগুলোর একপাশে তাদের বাংগালী দোসররা দাঁড়িয়ে আছে। সুনীল এতোক্ষণে বুঝে ফেলেছে এই বাংগালিরাই রাজাকার। ধর্মের ধ্বজা রক্ষা করার দোহাই দিয়ে মুক্তিবাহিনীর ছেলেপুলেদের হত্যা করছে, মেয়েদেরকে তুলে এনে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিচ্ছে, নিজেরাও ভোগ করছে। সেই সাথে ব্যাপক লুটতরাজ করে বেড়াচ্ছে। সুনীল তাদের দিকে একঝলক তাকিয়ে মনে মনে শুধু বলল, আহারে ধর্ম। এটাই যদি ধর্ম রক্ষা হয়, তবে সে ধর্মের প্রতি সম্মানবোধ কিভাবে রাখে! আলবদরদের মধ্য হতে কামরুজ্জামান এগিয়ে পাকিস্তানি অফিসারটির সামনে গিয়ে সুনীলকে দেখিয়ে বলল, ইয়ে লোক মুক্তি হ্যায়, ইসকো পাস বন্দুক হ্যায়। কথাটি শুনে অফিসারটি চোখ তুলে একবার সুনীলের দিকে তাকালো। সুনীলের চোখে চোখ পড়তেই সুনীল বুঝে ফেলল, পাকিস্তানি সৈনিকগুলো এখন আবার অত্যাচার শুরু করবে। একটু পর সুনীলের ভাবনাটাই যেন সত্য হলো। অফিসারটি পাকিস্তানি সৈনিকদের মধ্যে থাকা একজন হাবিলদারকে ডেকে সুনীলকে দেখিয়ে কি কি যেন বলল। অমনি হাবিলদারটি কয়েকজন সৈনিককে ডেকে বলে দিলো। সৈনিকগুলো এগিয়ে এসে সুনীলকে কাছের একটা আমগাছে পা উঁচু করে বেঁধে ঝুলিয়ে দিলো। আরো কয়েকজন এগিয়ে এসে হাতে লাঠি নিয়ে ঝুলন্ত সুনীলকে বেদম প্রহার শুরু করলো। প্রতিবার আঘাতে সুনীল চিৎকার করে উঠছে। একসময় চিৎকার করার শক্তিও শেষ হয়ে গেলো। সৈন্যগুলোও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। গাছে বাঁধা পাদুটো খুলে দিলো ওরা। তারপর মাটিতে বসিয়ে আম গাছের সাথে তাকে বেঁধে রাখলো।
এভাবে বসে থাকতে ক্লান্তিতে একসময় সুনীলের ঘুম পেয়ে গেলো। হঠাৎ কারো গলার শব্দে ঘুম ছুটে গেলো তার। চোখ মেলতেই দেখে তার সামনে একটা চেয়ারে বসে আছে পাকিস্তানি অফিসারটি। তাকে দেখেই অফিসারটি জিজ্ঞেস করল, অন্য মুক্তিরা কোথায়?
সুনীল কথা বলতে গিয়ে টের পেলো তার জিহবা কেটে গেছে। কোনরকমে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, সে কোন মুক্তিকে চেনে না। অফিসারটি আবার জিজ্ঞেস করলো। সুনীলও একই জবাব দিলো। অফিসারটি আরো কয়েকবার একই প্রশ্ন করলো। প্রতিবার সুনীল একই জবাব দিলো সে কোন মুক্তিকে চেনে না। অফিসারটি বিরক্ত হয়ে কয়েকজন সৈনিককে ইশারা করল। তারা এসেই হাতের লাঠি দিয়ে আবার পেটানো শুরু করলো। সুনীল প্রথম কয়েকবার চিৎকার করে উঠলেও একটু পর চুপ হয়ে গেলো। ঘন্টাখানেক সময় নিয়ে পিটিয়েও সুনীলের মুখ হতে কোন মুক্তির খোঁজ পাওয়া গেলো না। অফিসারটি পুরো সময় ধরে তার সামনে বসে রইলো। সুনীল তখনো একঠায় গাছের সাথে বাঁধা অবস্থায় মাটিতে বসে রইলো।
খুব ক্ষুধা লেগেছে। সেই সাথে বেদম পিপাসা পেয়েছে। অন্তত একটু পানি হলেও মনে হচ্ছে প্রাণে বাঁচতো। জড়িয়ে জড়িয়ে কোনরকমে শুধু উচ্চারণ করলো, পানি, পানি।
একটা সৈনিক এগিয়ে এসে হাতের রাইফেলের বাট দিয়ে তার চোয়ালে আঘাত করে ধমকে উঠলো। ঐ আঘাতে তীব্র ব্যথায় ঝনঝন করে উঠলো মাথাটা। একটা চক্কর দিয়ে উঠলো যেন মাথাটা। সুনীল বুঝে নিয়েছে, এরা পানিও দেবে না। ক্ষুধায় ক্লান্তিতে অবসন্ন শরীরে তীব্র ব্যথায় সুনীলের মনে হলো, আর বোধহয় বেঁচে ফেরা সম্ভব হবে না। তার মৃত্যুটা এখানেই এভাবে হয়তো লেখা হয়ে আছে। এভাবে নিজ দেশে নিজের দেশের আর্মির হাতে এভাবে মার খেতে খেতে অভুক্ত অবস্থায় মারা যাবে, এমনটা সুনীল কখনো ভাবেনি। ভাবতে ভাবতে একসময় তার দুচোখ ঘোলা হয়ে উঠলো। নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছার পারিপার্শিক ভুলে গিয়ে আনমনে চোখের জল ফেলতে লাগলো।
দুপুর গড়িয়ে যেতে যেতে ক্ষুধায় পিপাসায় শরীর নেতিয়ে পড়লো সুনীলের। অন্তত একটু পানি হলেও চলতো। বেঁচে থাকাটা খুব দরকার। সুনীলের শুধু মনে হলো, তাকে অনেকগুলো কারনের জন্য বেঁচে থাকতে হবে। সে মরে গেলে দেশটা অন্যের হয়ে যাবে।
বিকেল গড়িয়ে গেছে। অবসন্ন দেহে গাছের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। দুচোখের পাতা ভারী হয়ে গেছে। চোখ মেলতেও পারছে না সুনীল। সন্ধ্যার আগ মূহুর্তে দুটো সৈনিক এসে তার বাঁধন খুলে দিলো। একা একা দাঁড়াতে চেষ্টা করলো সুনীল। না পেরে মাটিতে বসে পড়লো। সৈনিক দুজন তাকে ধরাধরি করে দাঁড় করিয়ে নিয়ে গেলো ডাকবাংলোর একপাশে একটা টয়লেটের সামনে। তীব্র ইচ্ছাশক্তির জোরে এখন দাঁড়িয়ে আছে সুনীল। কোনরকমে টয়লেটে প্রবেশ করলো সে। টয়লেট হতে বেরিয়ে আসতেই অবাক হয়ে দেখলো সামনে কামরুজ্জামান দাঁড়িয়ে আছে।
সুনীল কিছু না বলে তাকে পাশ কাটিয়ে যেখানে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছিলো, সেদিকে এগোতেই কামরুজ্জামান তাকে বলল, আমি ক্যাম্প কমান্ডারের সাথে কথা বলেছি। হাজার দুয়েক টাকা দিতে পারলে তোকে ছেড়ে দেয়া হবে। সুনীল কথাটা শুনে একটু থমকে দাঁড়ালো। মনে মনে ভাবলো, এরকম ঘটনা প্রচুর ঘটছে। রাজাকাররা এরকম টাকার বিনিময়ে পাকিস্তানিদের বলে কয়ে বন্দিদের ছাড়িয়ে নিচ্ছে। সুনীল কিছু না ভেবেই বলল,
আমি কোথায় এতো টাকা পাবো? তুই তো আমাদের অবস্থায় জানিস।
তোদের কাছে আছে। তোর বাবাকে বল। তোর বাবার কাছে আছে। কামরুজ্জামান বলল।
আমি জানিনা, বাবা দিতে পারবে কিনা। সুনীল জবাব দিলো।
আমি গিয়ে তোর বাবাকে বলবো। কামরুজ্জামান বলল।
যদি এখন টাকার কথাই বললি, তাহলে আমাকে মুক্তি বলে ধরিয়ে দিলি কেন? সুনীল মোটামুটি রাগের স্বরেই বলল। কথাটা বলেই তার মনে হলো, কথাটা বলা ঠিক হয়নি। কামরুজ্জামান এখন তার আরো বড় ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। আর কোন কথা না বলে চুপ হয়ে গেলো সুনীল।
আম গাছের নিচে এসে আবার মাটিতে বসে পড়লো সুনীল। তাকে সেখানে বসে থাকতে দেখে সেই দুই সৈনিক আবার তার কাছে এসে তাকে ভালো করে গাছের সাথে বাঁধলো। বাঁধা শেষ হতেই ক্যাম্পের হাবিলদারটি এসে তাকে জিজ্ঞেস করলো, সে মুক্তি কিনা?
সুনীল মাথা নাড়িয়ে বলল, সে মুক্তি নয়।
এর মধ্যে তিনটা সৈনিক হাতে লাঠি নিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। সুনীলকে মাটিতে বসিয়ে দুপা সামনে বিছিয়ে পেট বুক বরাবর রশি পেঁচিয়ে বাঁধা হয়েছে।
সুনীলকে আবার ঐ হাবিলদার জিজ্ঞেস করলো, সে মুক্তি কিনা এবং অন্য মুক্তিরা কোথায় আছে?
সুনীল এবারেও মাথা নেড়ে বলল, সে মুক্তি নয় এবং অন্য কোন মুক্তিকে সে চেনেনা।
কথাটা শেষ না হতেই তিনজন সৈনিকের হাতের লাঠি তিনটি সপাটে নেমে এল তার দুপায়ের উপর। সুনীলের দুপায়ে ক্রমাগত পেটাতে লাগলো তিনজনে। ব্যথায় চিৎকার করছে সুনীল। কিছু দুরেই কামরুজ্জামান তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সিগারেট খাচ্ছে। সুনীলকে এভাবে মার খেতে দেখেও আশ্চর্য হীমশীতল চোখে নির্বিকারভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে কামরুজ্জামান। কিছুক্ষন পর সুনীল নিজেই আবিস্কার করলো, সৈনিক তিনজন সর্বশক্তি দিয়ে পেটাতে থাকলেও সে আর ব্যথা পাচ্ছে না। একটা ভোঁতা অনুভূতিতে ছেয়ে আছে তার সারা শরীর। যখনই পায়ে লাঠির বাড়ি পড়ছে, তখন ধুপ ধাপ শব্দই পাচ্ছে সে। সুনীল আর চিৎকার করছে না। ঠোঁটে ঠোঁট কামড়ে চুপ করে লাঠির আঘাতগুলো সহ্য করে যাচ্ছে। সন্ধ্যার পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে সৈনিকগুলো বিশ্রাম নেয়ার জন্য একটু থামলে কামরুজ্জামান তার কাছে এগিয়ে এলো। কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, আমি তোকে যে কথাটা বলেছি সেটা নিয়ে ভেবে দেখ। এখন সময় আছে। নইলে কিছুক্ষন পর তোকে নদীর ধারে নিয়ে যাওয়া হবে।
৩
নদীর ধারে নিয়ে যাওয়ার আলাদা অর্থ আছে। এর মানে হলো নদীর ধারে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। কামরুজ্জামানের কথায় কোন ভাবান্তর হলো না। রাত হয়ে এসে হে। গতকাল রাতের পর হতে এক ফোঁটা পানিও জটেনি ভাগ্যে। সারা শরীরে ব্যথা এবং সেই সাথে অসীম ক্ষুধায় সে ক্লান্ত। ক্লান্তিতে সুনীলের কেবল মনে হলো, এরা তাকে কিছুক্ষন পর নদীর ধারে নিয়ে গুলি করে মারবে। খুব একটা দুশ্চিন্তা হলো না নিজের জন্যে তার। এরকমই তো হবার কথা। পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়লে তো মারাই যেতে হয়। নিজে নিজে খুব হতাশ বোধ করলো সুনীল। বাবার কথা মনে পড়লো তার। বাবার সাথে আর দেখা হবে কিনা, একমাত্র ভগবান জানেন। বাবার কথা মনে হতেই দুচোখ বন্ধ করে বাবার চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করলো সে। কি আশ্চর্য, বাবার চেহারাটা স্পষ্ট করে মনে করতে পারলো না সুনীল। চোখ মেলে মাটিতে বসেই নিজের পা দুটোর দিকে তাকালো একবার। দুপয়ায়ের চামড়া ফেটে ফেটে ক্ষত হয়ে গেছে। বিশেষ করে হাঁটুর পর হতে পায়ের পাতা পর্যন্ত দুপায়েই অসংখ্য ক্ষতে দুপায়েই দগদগে ঘা এর মতো দেখাচ্ছে। এখনো তাজা ক্ষতগুলো দিয়ে রক্ত চুইঁয়ে পড়ছে। ডান পায়ে হাঁটুর নিচের হাড়টা ভেংগে গেছে কিনা কে জানে। ভয়ানক ব্যথা হচ্ছে সেটাতে।
সন্ধ্যার পর আশ্চর্য রকমের নিরব হয়ে গেছে ক্যাম্পটা। অনেকগুলো সৈনিক তিনটে ট্রাকে করে কোথায় যেন গেছে। সুনীল বুঝতে পেরেছে, এরা আজ আবার কোথাও হানা দেবে, মানুষের ঘরবাড়িতে আগুন দেবে, কাউকে মারবে অথবা ঘরের বঊঝিদের তুলে আনবে। গাছে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে বসে নিজের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছে সুনীল। এখান হতে বেঁচে ফেরার আর কোন পথ নেই। ক্লান্তির চরম অবস্থায় পৌছে গেছে সুনীল। ক্ষুধা পিপাসায় তার ঘুম পাচ্ছে এখন। গাছটাতে হেলান দিয়ে দুচোখ বন্ধ করে বসে রইলো সে।
ঘুমিয়ে পড়েছিলো কিনা বলতে পারে না সুনীল। কিছু মানুষের কথাবার্তার শব্দে তার চোখ মেলে তাকাতেই দেখে ক্যাম্পে সৈনিকেরা ফিরে এসেছে। তাকে চোখ মেলতে দেখেই দুজন সৈনিক এসে গাছের সাথে তার বাঁধন খুলে দিলো। দু হাতে রক্ত চলাচল বোধহয় বন্ধ হয়েছিলো। হাতের বাঁধন খুলতেই দুহাত ঝিঁ ঝিঁ করতে লাগলো। আম গাছটাতে ভর দিয়ে কোনরকমে উঠে দাঁড়ালো সুনীল। সৈনিক দুটো তাকে সামনে রাখা ট্রাকটার দিকে যেতে ইশারা করলো। এক কদম এগোতেই ডান পায়ের তীব্র ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলো সুনীল। একজন সৈনিক তার পেছনে গিয়ে তার নিতম্বে জোরে একটা লাথি মেরে বলল, শালা মালাউন কা বাচ্চা। সুনীল আর কোন কথাই বলল না। তীব্র ব্যাথায় চোখ মুখ কুঁচকে আস্তে আস্তে কদম ফেলে ট্রাকটার দিকে এগোলো।
ট্রাকে উঠে বসতেই দেখে সেখানে আরো চারজনকে হাত পা বেঁধে রাখা হয়েছে। একমাত্র সুনীলেরই হাত পায়ে কোন বাঁধন নাই। কিন্তু সে একা একা দাঁড়াতেও পারছে না। তাদের পাশে গিয়ে বসে পড়লো সুনীল। ট্রাকটা স্টার্ট নিতেই জনা দশেক সৈনিক এসে উঠলো ট্রাকে।
মিনিট দশেক পর ট্রাকটা থামতেই সুনীল মাথা উঁচু করে দেখে থানা সদরের পাশের নদীর ধারে এসে পড়েছে তারা। এদিকটায় বেশ নির্জন। সৈনিকগুলো ট্রাক হতে নামার সময় তাদের পাঁচজনকেই নামিয়ে নিলো। নদীর কিনারে এক হাঁটু পানিতে ওদের পাঁচজনকে সারীবদ্ধভাবে দাঁড় করালো। নদীর পাড়ে উঁচু জায়গায় সৈনিকগুলো সারী বেঁধে দাঁড়িয়েছে। নদীর পানিতে এক হাঁটু অব্দি ডুবিয়ে তারা পাঁচজন দাঁড়িয়ে আছে। বাকী চারজনের হাত পা বাঁধা দেখেই বিদ্যুতের মতো একটা ভাবনা সুনীলের মাথায় খেলে গেলো। আবছা আলোয় নদীর পাড়ের সৈনিকগুলোকেও ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। আস্তে করে পানিতে বসে পড়লো সুনীল। ঠিক সে সময় সৈনিকগুলোর দিক হতে প্রথম গুলিটা গুড়ুম শব্দে বেরিয়ে এলো। সুনীল মুহুর্তের মধ্যেই বুঝে নিলো গুলিটা তার গায়ে লাগেনি। নদীর দিকে ফিরে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে একটা ডুব দিলো সে। মাঝে মাঝে দম নেয়ার জন্য ভেসে উঠলেও আবার ডুব দিয়েছে সুনীল। তখনো সে গুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছে। নদীটা ছোট। পার হতে বেশী সময় লাগলো না। নদীর অপর পারে ধান ক্ষেত দেখে সেটার মধ্যেই লুকিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে এগোতে লাগলো। কিছুদুর এগিয়ে গিয়ে আর শরীরে কুলোলো না। স্থির হয়ে কাদামাখা শরীর নিয়েই শুয়ে রইলো সুনীল। সেখানে শুয়ে শুয়েই ঠিক করলো, বাড়িতে যাবে না সে। নদীর এ পাড়ে তার এক পরিচিত লোক আছে। তার কাছে যাবে। সে যদি সপ্তাহখানেক তাকে রাখে তাহলেও সে খানিকটা সুস্থ হয়ে যাবে। সুস্থ হলেই সে ইন্ডিয়া চলে যাবে ট্রেনিং এর জন্য। এ দেশের জন্যে তাকে যুদ্ধ করতে হবে।
পুনশ্চ
চার মাস পর সুনীল ফিরে এসেছিলো। তার সাথে মুক্তিবাহিনীর একটা ছোট দল এসেছিলো। যে ক্যাম্পে তাকে মারা হয়েছিলো, সে ক্যাম্পেই তারা রেইড করেছিলো। সে রেইডে ক্যাম্প কমান্ডার ছাড়াও চৌদ্দজন পাকিস্তানি সৈন্য মারা পড়েছিলো। সুনীল ফিরে এসে কামরুজ্জামানকে পায়নি। সুনীলদের দলটা আসার আগে এ এলাকায় মুক্তিবাহিনীর আরেকটি দল এসেছিলো। তাদের হাতে কামরুজ্জামান মারা গিয়েছিলো।
(গল্পটি আমার লেখা প্রতিশোধ নামক গল্পগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। বইটি শিখা প্রকাশনী থেকে ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে)