Story

 আগন্তুক প্রজাপতি

October 2, 2026

7 views

ছোট ডোবাটার পাশের ঝোপটা আগের মতোই ছিল, সংকুচিত, অর্ধেক আলো আর অর্ধেক অন্ধকারে আটকে থাকা এক জায়গা। এখানে সময় খুব দ্রুত যায় না, আবার পুরোপুরি থেমেও থাকে না। যেন প্রতিটি মুহূর্ত একটু বাড়তি ভার নিয়ে এগোয়। যে কয়েকটা বুনো গাছ সেখানে তাদের অর্ধেকই মরা ডাল ছড়িয়েই রয়েছে। গাছেরা তাদের মরা ডালপালা নিজে ফেলে দেয় না। গাছদের স্বভাব কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের মতো নয়। সেদিন বিকেলে, যখন বাতাসে ধুলো একটু বেশি ছিল, তখনই সে এল। হলদে, কালচে আর লালাভ রঙের সেই প্রজাপতিটা।

তার আগমনটা নাটকীয় ছিল না। চারপাশে সবার অজান্তেই কখন যেন সে হঠাৎ করেই এসেছিল, যেন সবসময়ই ছিল, কিন্তু কেউ খেয়াল করেনি। তবু, ঝোপের অন্য প্রজাপতিরা তাকিয়ে রইল। কারণ তার রঙগুলো শুধু রং ছিল না, ওগুলো যেন কোনো অভিজ্ঞতার দাগ, কোনো অজানা পথের চিহ্ন। সকল অচেনা জিনিস বা প্রাণীকে দেখলে যেমনটা ভাবে সবাই, সেরকমটাই ভেবেছিল সবাই তাকে।
প্রথম কয়েকদিন সে খুব কম নড়াচড়া করল। ঝোপের এক কোণে বসে থাকত। অন্যরা তাকে ঘিরে একটা অদৃশ্য বৃত্ত তৈরি করল, যেখানে কেউ প্রবেশ করে না, খানিক দুরত্ব রেখেই  সবাই তাকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।
একদিন, এই ঝোপের এক বৃদ্ধ প্রজাপতি, যার ডানা প্রায় ছেঁড়া, আর উড়ান ক্লান্ত; ধীরে ধীরে তার কাছে এল।
তুমি কি পথ হারিয়েছ? সে জিজ্ঞেস করল।
প্রজাপতিটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
হয়তো, সে বলল। অথবা হয়তো পথই ছিল না কখনো।
বৃদ্ধ প্রজাপতিটা মৃদু হাসল।
পথ না থাকলে, আমরা যাই কোথায়?
সে উত্তর দিল না। শুধু ডানাটা একটু নাড়লো, যেন কোনো স্মৃতি ছুঁয়ে গেল অথবা ছুঁড়ে ফেলে দিল।
কয়েকদিন পর, একদিন বিকেলে, হঠাৎ বৃষ্টি এল। ঝোপের ওপর টুপটাপ শব্দ পড়তে লাগল। অন্য প্রজাপতিরা পাতার নিচে আশ্রয় নিল। কিন্তু সে বৃষ্টির মাঝেই বসে রইল। একটি তরুণ প্রজাপতি চিৎকার করে বলল,
তুমি ভিজে যাবে!
কথাটা শুনে সে মাথা তুলল।
ভেজা আর শুকনোর মধ্যে পার্থক্য কী? সে ধীর কন্ঠে বলল। শেষ পর্যন্ত দুটোই মাটিতে মিশে যায়।
তরুণ প্রজাপতিটা কিছু বলতে পারল না, বরং অবাক হয়ে সেই আগন্তুক প্রজাপতির পাখায় বৃষ্টির ছোঁয়া দেখতে লাগল। বৃষ্টি বাড়ল। তার ডানার রঙগুলো ধুয়ে যেতে লাগল, হলদে একটু ম্লান হলো, লালাভ যেন ছড়িয়ে পড়ল, কালচে রঙটা আরও গভীর হলো।
সেদিন রাতে, ঝোপে তখন একটা অদ্ভুত নীরবতা ছিল। কেউ কেন যেন কথা বলছিল না। সবাই শুধু নিজের ডানা গুটিয়ে বসে রইল, যেন কেউ একজন এমন কিছু বলেছে, যার জবাব দেওয়া যায় না কিংবা সেটির জবাব কারো কাছেই নাই।
আরেকদিন, সূর্য যখন খুব উজ্জ্বল, তখন সে প্রথমবার একটু উড়ল। খুব বেশি না, ঝোপের এক দিক থেকে আরেক দিকে।
তবু সবাই তাকিয়ে রইল। তার উড়ানটা ছিল অদ্ভুত। না দ্রুত, না ধীর। যেন সে কোথাও পৌঁছানোর জন্য উড়ছে না, বরং শুধু উড়ার মধ্যেই আটকে আছে। একটি প্রজাপতি জিজ্ঞেস করল
তুমি কোথায় যাবে?
সে থামল, মাঝ আকাশে একটু ভাসল। যেখানে যাওয়া অর্থহীন, সে বলল।
অর্থহীন জায়গায় কেন যাবে? সে হালকা হাসল।
কারণ অর্থ খোঁজার চেষ্টাই সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে।
এই কথাটা ঝোপে ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বুঝল না, কিন্তু সবাই অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। কিছুদিন পর, সেই ছোট প্রজাপতিটা আবার তার কাছে এল, যে প্রথম প্রশ্ন করেছিল।
তুমি কি একা? সে জিজ্ঞেস করল।
প্রজাপতিটা এবার সরাসরি তাকাল।
আমরা সবাই একা, সে বলল। শুধু আমরা একসাথে থাকার অভিনয় করি।
তাহলে একসাথে থাকার মানে কী?
ভয় কমানো। সে জবাব দিল।
ছোট প্রজাপতিটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তুমি ভয় পাও না?
সে এবার উত্তর দিল না। শুধু চোখ বন্ধ করল, যদি প্রজাপতিদের চোখ বন্ধ করা বলে কিছু থাকে।
দিন কেটে যাচ্ছিল। তার রঙগুলো ধীরে ধীরে বদলাচ্ছিল। হলদে আরও ফ্যাকাসে, লালাভ আরও শুকনো, কালচে আরও ভারী। ঝোপের অন্য প্রজাপতিরা এখন তাকে এড়িয়ে চলে। কারণ তারা বুঝে গেছে, তার কাছাকাছি গেলে কিছু প্রশ্ন মাথায় আসে, আর সেই প্রশ্নগুলো সহজ নয়। সেগুলো খুব কঠিন হয়।
একদিন সকালে, সূর্য ওঠার আগে, বৃদ্ধ প্রজাপতিটা আবার তার কাছে এল।
তুমি কি কিছু খুঁজছ? সে জিজ্ঞেস করল।
সে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
আমি খুঁজেছিলাম, সে বলল। কিন্তু যা পেয়েছি, তা খোঁজার মতো ছিল না।
তাহলে?
এখন আমি শুধু অপেক্ষা করি।
কিসের জন্য?
সে আকাশের দিকে তাকাল। তারপর বলল,
শেষের জন্য। অথবা এমন কিছুর জন্য, যা শেষকে অর্থ দেয়।
বৃদ্ধ প্রজাপতিটা এবার কিছু বলল না। সে শুধু ফিরে গেল, ধীরে, ক্লান্তভাবে।
তারপর সেই দিনটা এল। সকালটা ছিল অস্বাভাবিক শান্ত। বাতাস নেই, শব্দ নেই। ঝোপটা যেন নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। সে ডালের ওপর বসে ছিল—যেমন থাকে সবসময়। কিন্তু আজ তার ডানাগুলো আর নড়ছে না। প্রথমে কেউ খেয়াল করল না। তারপর একসময়, সেই ছোট প্রজাপতিটা এগিয়ে গেল।
তুমি… সে ডাকল।
কোনো উত্তর নেই। সে আরও কাছে গেল। তারপর ধীরে ধীরে বুঝল, সে আর নেই। ডানাগুলো আধখোলা, রঙগুলো স্থির। যেন সবকিছু এক জায়গায় থেমে গেছে।
কেউ কাঁদল না। প্রজাপতিরা কাঁদে না। তারা তখন শুধু উড়তে থাকে। প্রজাপতিদের আনন্দ বা শোক সবই হয়ত উড়তে থাকায়। বাতাস এল একটু পরে। তার শরীরটা ডাল থেকে আলগা হয়ে নিচে পড়ে গেল, ধুলোর ওপর।
ঝোপটা আবার আগের মতো হয়ে গেল। সবাই আবার উড়তে লাগল, ফুলে বসতে লাগল, রোদে ডানা মেলতে লাগল। কেউ তার কথা বলল না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, কিছু বদলে গেছে।
ছোট প্রজাপতিটা মাঝে মাঝে একা বসে থাকে। সে এখন কম উড়ে। কখনো কখনো সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন কিছু খুঁজছে, আবার জানে কিছু পাওয়া যাবে না।
বৃদ্ধ প্রজাপতিটাও সেদিকটায় আর আসে না। হয়তো সে এখন আর উড়তে পারে না। অথবা হয়তো সে বুঝে গেছে, কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড়ালে, বেঁচে থাকাটাই ভারী হয়ে যায়। আর ঝোপটার এক কোণে, যেখানে সে প্রথম বসেছিল, সেখানে আলো আজও পুরো ঢোকে না। কিছু উপস্থিতি চলে যাওয়ার পরও থেকে যায়, অদৃশ্যভাবে।
আর কিছু সত্য এতটাই নির্লিপ্ত যে, তারা আমাদের বদলে দেয়, কিন্তু নিজেদের কোনো ব্যাখ্যা দেয় না। শেষ পর্যন্ত, জীবন হয়তো এর বেশি কিছু নয়।
একটা অজানা জায়গা থেকে এসে, কিছু অদ্ভুত রং ছড়িয়ে, কিছু প্রশ্ন রেখে, নিঃশব্দে মাটিতে মিশে যাওয়া।
আর বাকিরা, যারা রয়ে যায় তারা সেই প্রশ্নগুলোর সাথে বাঁচতে শেখে। অথবা, ভুলে যাওয়ার ভান করে।

Picked up where you left off

Comments

sayed mahmud was this story’s first reader

+20 XP

    Please login to post comment. Login

  • যারা রয়ে যায় তারা জীবনের প্রশ্নগুলোর সাথে বাঁচতে শিখে যায়- আশ্চর্য সত্যকথন। দারুণ লিখেছেন।

  • R Masud 3 hours ago

    দারুণ লিখেছেন। এই জগতের জীবদ্দশার উপলব্ধিকে নিয়ে এলেন প্রজাপতির মুখ থেকে। ভালো লেগেছে।

  • sayed mahmud 4 hours ago First reader

    অসম্ভব রকমের ভালো একটা গল্প। পৃথিবীর বাস্তবতার উপলব্ধি গল্পের শেষে নিয়ে এসেছেন। শেষ পর্যন্ত জীবন হয়ত আসলেই কিছু না। শুভেচ্ছা জানবেন।